||আর্টারি ওয়াঘা বর্ডার||

চন্দন দত্ত রায়

অমৃতসর গেছি আর আর্টারি_ওয়াঘা বর্ডার দেখবো না তাই আবার হয় নাকি! আজ যেখানে কাঁটা তার,বড় বড় ঢাউস লোহার গেট।যার পোশাকি নাম আর্টারি বর্ডার ও ওয়াঘা সীমান্ত।

একসময় তো তা পাকিস্তান ভারত কিছুই ছিল না!!সবটাই ছিল আমাদের ভারতবর্ষ।।শাষক বৃটিশ তার কুটকৌশলের মধ্য দিয়ে ভাগাভাগির ব্যবস্থা করেই রেখেছিল!

যদিও আপনারা বলবেন তৎকালীন আমাদের দেশের মানুষদের মধ্যে উপাদান কি ছিল না,সব‌ই কি বৃটিশদের চালাকি!!অবশ্যই ছিল ।আর সে ‌উপাদান ছিল বলেই এই সুমহান উপমহাদেশের বৃহৎ শক্তির ভাগ,দুদেশ‌ই পেলাম এক নদী রক্তের ভাতৃঘাতী দাঙ্গার বিনিময়ে খন্ডিত স্বাধীনতা !

বৃহৎ শক্তি হিসাবে এক থাকলে পৃথিবীর যে কোনো দেশকে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য,প্রাকৃতিক সম্পদ,ক্ষমতা সব দিকে চ্যালেঞ্জ দিতে পারতো!!

মাথায় যার বরফাচ্ছাদিত পাহাড়াদার শ্বেতশুভ্র হিমালয়!তিনদিক ঘেরা অলঙ্ঘনীয় ফেনীল সমুদ্র। অসংখ্য নদ-নদী সেচশোভিত যার মৃত্তিকা।মাটির তলায় যার বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান আকরিক!!

নানা রকমের ফসলে ক্ষেতখামার ভরে থাকে সম্বৎসর !
কত কত বীর প্রসবিনী এই মহান উপমহাদেশের বৃহৎ ধরিত্রী।
সে কি না দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গেল!!কত ভাতৃঘাতী রক্তক্ষয়!!কত যন্ত্রণা!! কত কষ্ট!!

শুধুই ক্ষমতা আরোও ক্ষমতা!!ক্ষমতাই যেখানে শেষ কথা!!

আজ আমার লেখায় ও ছবিতে কাঁটা তারের বেড়া ঘেরা আর্টারি_ওয়াঘাতেই নিয়ে যাবো আপনাদের!!

অমৃতসরে নেমে I.T.B.P র সেই কমান্ডারকে ফোন করে আগামীকাল যাবো বলতেই তিনি বলেন দিলেন অটোকে I.T.B.P কম্পাউন্ড বল্লেই হবে।
সেই মত পৌঁছে কমান্ডারের সাথে হাত মিলিয়ে তাদের অভ্যর্থনা নিয়ে আর্টারিওয়াঘাবর্ডার দেখার কথা বলতেই বিকেলে যেতে বল্লেন।

টেলিফোনে যোগাযোগ করে বলে দিলেন আর্টারি বর্ডারের আগে ০২ নম্বর চেকপোস্টে পাশ রেডি থাকবে।যদি কোনো অসুবিধা হয় ওনাকে ফোন করতে। ওনার নাম ও আমার নাম বল্লেই পাশ পেয়ে যাবো।
যথাসময়ে সেই পাশ সংগ্রহ করে ওনাকে ফোনে সে সংবাদ জানিয়ে আর্টারি পৌঁছালাম,অনেক দুর পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন।
দু’দিকেই বেশি কিছুটা দুরে কাঁটাতারের বেড়া!ওপাশের মানে পাকিস্তানের মানুষজনদের দেখতেও পাচ্ছি।
আর্টারির পাশ আছে বলে আমরা বাঁ দিকের একটা রাস্তা দিয়ে সোজা সামনে!! ভেতরে ঢুকে দেখলাম প্রশস্ত পরিষ্কার গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড !! আমাদের দিকে দুধারে গ্যালারি সামনে কয়েকসারি চেয়ার।শেষে এক বড় লোহার গেট!!

মনে মনে ভাবলাম এই সেই রোড যা একসময় শেরশাহ বানিয়েছিলেন অখন্ড ভারতের কলকাতা থেকে লাহোর পর্যন্ত!!আর আজ তা নামে এক‌ই থাকলেও দ্বিখণ্ডিত!!

আমি আছি ভারতে,মাঝে নো ম্যানস্ ল্যান্ড ওপারে ওই যে পাকিস্তান!

যাই হোক,চেয়ারে বসলাম না,যদিও চেয়ারের জন্য পাশ ছিল। উঠলাম গ্যালারিতে ওপারটা একটু বেশি দেখা যাবে!

দেশাত্মবোধক গান বাজছে,একদল ছোট বড় নানা ধরনের মহিলা ও ছোট ছেলে মেয়েরা জাতীয় পতাকা হাতে আমাদের দিকেই দুই গ্যালারির মাঝের রাস্তার একদিক থেকে আরেকদিকে ছোটাছুটি করছেন।বন্দেমাতরম ধ্বনীতে মুখরিত চারিদিকের আকাশ বাতাস।

ওদিকেও তাই ,পাকিস্তানের পতাকা হাতে ওদিকের মানুষ জন‌ও এক‌ই ভাবে সমানতালে তাদের আল্লা হো আকবর স্লোগান দিচ্ছেন।আর তার সাথেই কি একটা গান বাজছে ঠিক শোনা ও বোঝা যাচ্ছে না,এপারের কোলাহলের শব্দে!!

কিছুক্ষণ পর আমাদের দিকের একজন দীর্ঘদেহী B.S.F জ‌ওয়ান হাতে লাউডস্পিকার সহযোগে স্লোগান দিতে শুরু করলেন।

বন্দেমাতরম,জয় হিন্দ সহ নানা স্লোগান‌ও দেশাত্মবোধক গান। আমাদের দুদিকের গ্যালারি সহ চেয়ারে বসা মানুষজন সমবেতভাবে সেই স্লোগানে গলা মিলিয়ে সমস্ত পরিবেশটাকে একেবারে অন্যরকম আবেগঘন করে তুললেন।

মাঝে মাঝেই ঐ B.S.F জ‌ওয়ান আরোও জোরে স্লোগান দিতে এবং তা পাকিস্তানের দিকে ছুঁড়ে দিতে আহ্বান জানাতে স্লোগানের জোর আরোও আরোও বাড়তে শুরু করলো।।

সম্পুর্ন পরিবেশটাই যেন ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে লাগলো!এক অদ্ভুত উন্মাদনা!!

পাকিস্তানের দিকেও ঠিক এক‌ই রকম!! ওরাও স্লোগান সাউটিং করেছেন!!

কিন্তু আমাদের এদিকের আওয়াজে ওদের আওয়াজ মনে হচ্ছে চাপা পরে যাচ্ছে,ওদের ওখানেই কি এক‌ই রকম ভাবে এদিকের আওয়াজ চাপা পড়ছে!!

এরপর এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত আরেক আবেগঘন মুহূর্ত। দুদিকের গেট খোলা।দু’দিকের প্যারেড,সে এক দেখার মত বিষয়।
গলার আওয়াজ যেন থামতেই চায় না!কতটা দম থাকলে অত দীর্ঘ সময় টানা প্যারেড স্লোগান করা যায়,না শুনলে বিশ্বাস করাও যাবে না!!

প্রায় মাথা সমান প্রসারিত পা,বুক ঠোকা পায়ের চাপে ধরিত্রী যেন কাঁপছে!
একসাথে আমাদের দেশের বলিষ্ঠ জওয়ানদের খাঁকি পোষাক হাঁটু অবধি সাদা মোজা মধ্যিখানে লাল রং শোভিত শিরোচ্ছাদন আর কালোপোষাক ও শিরোচ্ছাদন পরিহিত বলিষ্ঠ পাকিস্তানি রেঞ্জার প্যারেড শেষে করমর্দন। দুই দেশের মাঝের জায়গাটাতে দুই দেশের জাতীয় পতাকা একসাথে ক্রশ আকারে নামিয়ে নিয়ে আসা!!

সুর্য তখন ডুবেছে ঐ পাকিস্তানের একপ্রান্তে!!

শেষে স্বদর্পে আজকের মত দু’দেশের বিশাল লোহার গেট বন্ধ।
আমরা কিছুক্ষণের জন্য এক হয়ে ছিলাম!গেট দুটো আমাদেরকে আবার পৃথক করে দিলো!!ওরা পাকিস্তানি আর আমরা ভারতীয়।

ভারতের শেষ সীমান্ত গ্রাম থেকে কিছুটা দুরে এই আর্টারি_ওয়াঘা বর্ডার একেবারেই হাই সিকিউরিটি জোন।
তবুও আপনি এখানে কাঁটাতারের ওপারের পাকিস্তানের ক্ষেত খামার যা একেবারেই আমাদের মত তার কিছুটা হলেও দেখতে পারবেন।

গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের মাঝে আর্টারি_ওয়াঘা থেকে মাত্র ২৪ কি.মি দুরে পাকিস্তানের লাহোর অপর দিকে ৩২ কি.মি দুরে আমাদের অমৃতসর শহর।

১৯৫৯সালের এই বর্ডার!!আমাদের সামনেই একটা গাড়িকেও আমরা ওপারের বর্ডার পেরিয়ে এপারে আসতেও দেখেছিলাম!পাশপোর্ট ভিসা সহ এই বর্ডার পারাপার করার সময় যতটা জানি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে।

শীতের সময় বেলা ৪-১৫ থেকে গরমের সময় ৫-১৫ থেকে এই বিশেষ প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়।বাইরে বেড়িয়ে এসে চায়ের দোকানে বিস্কুট সহযোগে সান্ধ্য টিফিন সারলাম।

ফিরে আসার সময় স্মরণ করার চেষ্টা করলাম সেই সমস্ত বীর শহীদদের যাঁরা ভারতবর্ষকে বৃটিশ পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করার জন্য নিজেদের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন।অনেক রক্ত অনেক যন্ত্রণা অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে চেয়েছিলেন স্বাধীনতা।

কখনো বৃটিশ বুলেট,কখনও ফাঁসির দড়ি,কখনো বা দুরারোগ্য রোগ যাদের জীবন কেড়ে নিয়ে ছিলো।
তারা কি জানতেন তাদের আকাঙ্খার স্বাধীনতা এভাবে কাঁটাতারের বেড়ায় দেশটাকে খন্ডিত করবে!! বোধ হয় না!!

যাই হোক কিছুটা ভালোলাগা কিছুটা মন খারাপের মিশেলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে করতে ফিরে চল্লাম অমৃতসর।।

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *