পাহাড় নেশার সঙ্গী-সাথি

Pahar

তুহিন চক্রবর্তী

চেতরাম, খুশাল, দীপক সিং, লিম্বু লেপচা, সন্দীপ ভাইয়া, দাইজি— লকডাউনের মধ্যে মাঝেমাঝেই ওদের কথা মনে পড়ছে। ওরা প্রত্যেকেই ট্রেক গাইড। এই তো, মে মাসে সুন্দরধুঙ্গা ভ্যালি যাওয়ার কথা ছিল। নাহলে অক্টোবরে গোয়েচালা। কিছুই হল না। আমরা এসি ঘরে, সন্ধেবেলা লাইট-পাখা জ্বালিয়ে, দেদার নেট খরচা করে ফেসবুকে নামজাদা ট্রেকার-মাউন্টেনিয়ারদের লাইভ দেখলাম। দশদিনে দশটা করে চরম সুন্দর সুন্দর পাহাড়ের ফোটোও দেখলাম। আর দিন পনেরো অন্তর অন্তর হয় থালা বাজালাম, নয় শাপ-শাপান্ত করলাম। কিন্তু ওরা?

আরও পড়ুন: ||আর্টারি ওয়াঘা বর্ডার||

বাঁ-দিক থেকে তৃতীয় খুশাল, ডানদিকে চতুর্থ দীপকজী। পানগড়চুল্লা ট্রেক শেষের গ্রুপ ফোটো

ভালোই আছে হয়তো। চেতরামের সঙ্গে আলাপ গতবছর। পিন পার্বতী পাসে। আমার থেকেও ছোট ছেলেটির চেহারা দেখলে বয়স কোনওভাবেই পঁয়ত্রিশের কম বলে মনে হবে না। ট্রেক শুরুর দিনই কথায় কথায় জানলাম, দ্বিতীয়বার বাবা হয়েছে সপ্তাহ তিনেক আগে। এখনও মেয়ের মুখ দেখেনি। “সামার মে মুশকিল সে দো মহিনা ক্লিয়ার মিলতা হ্যায়। অউর বারিস খতম হোনে কে বাদ চার সে ছে হপ্তা। সাল ভর কা কামাই ইসি মে কর লেনা হোতা হ্যায় দাদা। উইন্টার মে তো ঘর মে হি বইঠে রহেঙ্গে।” শুধু প্রকৃতিই নয়, সমতল আর পাহাড়ে ভালোবাসার ধরনও হয়তো বদলে যায়।

আরও পড়ুন: মৃণাল সেনের ‘খণ্ডহর’ ও কালিকাপুর রাজবাড়ি

পিন ভ্যালি, পিন পার্বতী পাস ট্রেক

জানুয়ারিতে ফেসবুকেই দেখেছিলাম, বাড়ির উঠোনে হাঁটু অবধি জমা বরফ সরাতে ব্যস্ত চেতরাম। মানালি থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে কোনও এক গ্রামে ওর বাড়ি। রং-বেরঙের কাঠের রেলিং ঘেরা বারান্দা। টালির ছাদে বরফ জমে ছিল। লকডাউন হওয়ার পরেও একবার দেখেছিলাম, কাছাকাছি কোথাও পাহাড়-জঙ্গলে কাঠের আগুন জ্বালিয়ে গান গাইছে। খুব ইচ্ছে করছিল জিজ্ঞেস করি টাকা-পয়সার কি অবস্থা, কোনও সাহায্য লাগবে কিনা। জীবনযুদ্ধে জেতার রসদের সম্ভার দেখে আর এইসব তুচ্ছ বিষয়ে কিছু বলতে ইচ্ছা করল না।

নন্দাদেবী থেকে টাল্লি লেক, পানগড়চুলা ট্রেক থেকে ফেরার পথে

দীপকজি এখন অবধি আমার আলাপিদের মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত। অন্তত হওয়া উচিত ছিল। পোড়া দেশে শীতকালীন এশিয়ান গেমসের জাতীয় স্কিইং কোচের আর কতই বা কদর! পানগড়চুলা পিক ট্রেকে আলাপ। অপেক্ষাকৃত পরিচিত কুঁয়ারি পাস বা কার্জন ট্রেলের পাশেই এই সামিট, গাড়োয়াল হিমালয়ে। ট্রেকের শেষে আউলিতে তাঁর স্কিইং ইনস্টিটিউট দেখিয়েছিলেন দীপকজি। গরমে ট্রেক গাইড, আর শীতে স্কি ইন্সট্রাক্টর— বছরভর ব্যস্ত মানুষটা ফেসবুকে বেশ অ্যাক্টিভ থাকতেন। গত দু’মাস কোনও ‘আপডেট’ নেই। যোগাযোগও করতে পারিনি।

আলু পরোটা দিয়ে লাঞ্চ, পানগড়চুল্লা সামিটে। গোলাপি জ্যাকেটে খুশাল আর ডানদিক থেকে দ্বিতীয় মুখঢাকা দীপকজি

খুশাল আর লিম্বু তো একেবারেই ছোট। কুড়ি আর বাইশ। দু’জনেই কৃষক পরিবারের ছেলে। খুশাল তবু কিছুটা গোছানো। বারো ক্লাস পেরোনোর পর বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করে নিয়েছে। ডিসট্যান্সে গ্র্যাজুয়েশনের পাশাপাশি চলছে ট্রেক গাইডের কাজ। পানগড়চুলা গেছিল ‘কুক’ হিসেবে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ট্রেকের পর যখন সামিটে পৌঁছই, মাথার ওপর স্নো-ফল আর পেটের ভিতর ছুঁচোর ডনবৈঠক— দু’টোর বেগই ক্রমাগত বাড়ছে। আমাদের প্যাকড লাঞ্চের বাক্স থেকে গরম আলু-পরোটা গোগ্রাসে গেলা দেখে যে অমলিন হাসিটা উপহার দিয়েছিল খুশাল, মনে রাখার মতো। তুলনায় লিম্বু কিছুটা ছন্নছাড়া। মানেভঞ্জনে গাইড অ্যাসোসিয়েশনের অফিস ঝাড়পোঁছ করতে এসেছিল। আর কেউ না থাকায় ওকেই আমাদের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় সান্দাকফু-ফালুট হয়ে শ্রীখোলা অবধি নিয়ে যাওয়ার জন্য। বেচারা বাড়িতে জানানোর টাইমটুকুও পায়নি। পরে অবশ্য জেনেছিলাম এমনটা প্রথমবার নয়, আগেও হয়েছে!

সান্দাকফু থেকে ফালুট যাওয়ার পথ

ট্রেকের একেকদিন আমি যেক’টা ফোটো তুলতাম, পুরো ট্রেকে বোধহয় তার থেকেও কম শব্দ উচ্চারণ করেছিল লিম্বু, এতটাই মিতভাষী। একশো দিনের কাজ আর টুকটাক চাষবাস করে দিন কাটানো ছেলেটা শ্রীখোলা থেকে আমাদের সঙ্গেই গাড়িতে উঠেছিল প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে মানেভঞ্জন যাবে বলে। পথে এমন বমি শুরু হল, গাড়ি থেকে নেমে বলে বাকিটা হেঁটেই যাবে। শর্টকাট আছে, তাতে নাকি তাড়াতাড়িও হবে! খুশালকে তবু মাঝেসাঝে ফেসবুকে দেখি, লিম্বুর সঙ্গে কোনও যোগাযোগই নেই। কে জানে কেমন আছে !

বাঁ-দিকে সন্দীপ ভাইয়া, ডানদিকে চেতরাম। মান্তালাই লেকের পাশে

সমতলের লোকেরা প্রায়ই বলেন, পাহাড়-ফাহাড় ঘুরতে যাওয়ার জন্যই ঠিক আছে। কিছুদিন একটানা থাকলেই সব নেশা নাকি কেটে যায়! ভাগ্যিস সন্দীপ ভাইয়া আর দাইজির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। নাহলে কি জানতে পারতাম কী ভীষণ ভুল ধারণা!

ডানদিকে প্রথম লিম্বু, মেঘমা গ্রামের পাশে একটা লেকের ধারে

সাঁইত্রিশের সন্দীপ ভাইয়া চেতরামের মামা হয়। আটচল্লিশের দাইজি সবারই দাইজি, নেপালি ভাষায় ‘দাদা’। দাইজি নেপালেই থাকেন। গরমে ভারতে চলে আসেন, দিন-সাতেক হেঁটে, খানকতক পাহাড় টপকে। ভারত-নেপাল-বর্ডার-পাসপোর্ট আবার কি, সবুই হিমালয়! নেপালে গাইড হওয়াও এখন ঝক্কি, ইউনিয়নবাজির দাপট। তাই ভারতই ভালো। বরফ পড়ে গিরিপথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই দাইজি নেপালে ফিরে যান। সন্দীপ ভাইয়ার স্টাইল ছিল দেখার মতো। চোখ-মুদে-গালে-টোল-ফেলে হাসি, পনিটেলে বাঁধা চুল, কাঁধে আইস-অ্যাক্স। পাসের মাথা থেকে পিন ভ্যালিতে বরফের উপর স্লাইড করে নামার সময় দুই মাঝবয়সি ‘যুবকের’ দৌড়াদৌড়ির সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে আমাদের সঙ্গে আসা কুকুর তিনটেও হাঁপিয়ে উঠছিল। আমি বাপু ওসব তালে নেই। পাশে দাঁড়িয়ে সাক্ষাৎ প্রাণশক্তি দু-চোখ ভরে দেখছিলাম। দাইজি এখন নেপালে। কবে ফিরবেন, কেউ জানে না। সন্দীপ ভাইয়াকে চেতরামের ফেসবুক পোস্টে দেখি।

সামিট থেকে নামার সময়, পানগড়চুলা

শুনেছি, এই বছর নাকি প্রকৃতি নিজের অতিরিক্ত ভার কমাচ্ছে। তাই যদি হয়, তবে ওদের হয়তো কিছু হবে না। ওরা যে প্রকৃতির ঘরেরই লোক।

মানথালাই লেক ক্যাম্পসাইট, পার্বতী নদীর উৎস, পিন পার্বতী পাস ট্রেক

● ছবি: লেখক

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *