২৫ জুন— ৪৫ আর ৩৭ বছর পেরিয়ে: আম-ভারতীয়দের দু’টি না ভোলা অভিজ্ঞতা

Kapil

শুভ্রাংশু রায়

সাতসকালে সিনিয়র সাংবাদিক এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অগ্রজ সুমনদার (সুমন ভট্টাচার্য) একটি ফেসবুক পোস্ট আজকের তারিখের মাহাত্ম্যকে আবার মনে করিয়ে দিল। লকডাউনের মধ্যে ঘরে বসে অনলাইন ক্লাস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন লকডাউন জনিত সংযোজন ওয়েবনারে অংশগ্রহণের মাঝে তাই ভাবলাম আজকের দিন অর্থাৎ ২৫ জুন তারিখের গুরুত্বটা আরেকবার স্মরণ করে নেওয়া যাক। এমনিতে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, ২৫ জুন কেবল এই দুটি ঘটনাই ভারতের ইতিহাসে ঘটেছে।

আরও পড়ুন: ৩৭ বছরেও কপিল ১৭৫ নঃআঃ

সাল তারিখ ধরে খুঁজতে বসলে এমন অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী দু’টি এমন ঘটনা আজকের তারিখে ঘটেছিল, যা কোনও সচেতন ভারতবাসীর পক্ষে ভুলে যাওয়া অসম্ভব। একটি ১৯৭৫ সালের ঘটনা আর অন্যটি ১৯৮৩। হ্যাঁ দিনটির কথা হয়তো অনেকেরই মনে নেই। কিন্তু ঘটনা দু’টি আছে। ঘটনা দুটি সংবাদমাধ্যম, অসংখ্য বইপত্র টিভি চ্যালেনে বহু লিখিত বা আলোচিত। প্রথমটি আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগের। ১৯৭৫-এর ২৫ জুন দেশজুড়ে জারি হয়েছিল ইমারজেন্সি বা জরুরি অবস্থা। আর তার ঠিক আট বছর পরে লর্ডসের মাটিতে ভারত ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয় লাভ করেছিল। দু’টির প্রভাব পড়েছিল দেশের আম আদমির ওপর। যে প্রভাবের ছায়া থেকে বোধহয় আজও ভারত বেরিয়ে আসতে পারেনি।

ভারতীয় রাজনীতির ভাগ্যাকাশে অস্থিরতার ছাপ পড়তে শুরু করেছিল সেই নেহরুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে। নেহরুর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন অবশ্য লালবাহাদুর শাস্ত্রী। অবশ্য নেহরুর মৃত্যুর আগেই কংগ্রেস সভাপতির আসনে বসেছিলেন নেহরু কন্যা ইন্দিরা গান্ধি। নেতৃত্বের উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব গোপন সূত্রপাত বোধহয় তখন থেকেই। অবশ্য অনেকেই বলতে পারেন যে, খোদ নেহরুকেই সাংগঠনিকভাবে স্বাধীনতার পরেই শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল সর্দার প্যাটেলের। কিন্তু নেহরুর ব্যক্তিত্ব এবং প্যাটেলের আকস্মিক মৃত্যু বিষয়টি তেমনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়নি।

নেহরু যুগের শেষের দিক থেকেই কংগ্রেসের মধ্যেই একটি পৃথক ক্ষমতা বৃত্ত তৈরি হতে শুরু করে। নেহরুর পরে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর তাসখন্দে আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে যখন ইন্দিরা গান্ধি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন, তখন কংগ্রেসের অভ্যন্তরে প্রবল বিরোধ দেখা দেয়। ইন্দিরা মূল কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হন। ইন্দিরা গান্ধি কংগ্রেস (আই) গড়ে তোলেন এবং কিছুদিনের মধ্যে দেখা যায়, সমস্ত বিরোধীকে মুছে দিয়ে পুনরায় কংগ্রেসে ইন্দিরার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অধিকাংশ ইন্দিরা-বিরোধী হয় দলের মধ্যে গুরুত্বহীন হয়ে গেছেন অথবা দল থেকে বহিষ্কৃত। ইতিমধ্যে এসে যায় ‘৭১; বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করে বাংলদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তি ভারতজুড়ে অন্য ইমেজ গড়ে দেয় ইন্দিরা গান্ধির। সঙ্গে ছিল ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের মতো জনপ্রিয় পদক্ষেপ।

‘৭১-এ পরিষ্কার জনাদেশ নিয়ে ইন্দিরা গান্ধি যেদিন প্রধানমন্ত্রিত্বের শপথ নিয়েছিলেন, সেদিনই মুক্তিযুদ্ধের সংকট ঘনীভূত হয়েছিল। ভারতে কাতারে কাতারে মানুষ উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। শিমলা চুক্তির মধ্যে পাকিস্তানের বশ্যতা শিকার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ইন্দিরা গান্ধিকে অন্য জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, তা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে এই যুদ্ধজনিত ব্যয় ভারতীয় অর্থনীতির পক্ষে নেতিবাচক ফল প্রসব করে এবং ‘৭৩-এর শুরু থেকে, বিপান চন্দ্রের মতো ঐতিহাসিকও মেনে নিয়েছেন যে ইন্দিরার জনপ্রিয়তার গ্রাফ দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে। তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জন্ম নেয় অর্থনৈতিক মন্দা। সঙ্গে ছিল দেশজুড়ে শিল্পে ক্ষেত্রে ব্যাপক অশান্তি।

১৯৭৪ সালে মে মাসে বাইশ দিনের রেল ধর্মঘট পুলিশ দিয়ে ইন্দিরা গান্ধি ভেঙে দিলেন বটে, জনমানসে তাঁর ইমেজ আরও তলানিতে নেমে গেল। এই সময় গুজরাত এবং বিহারে তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। গুজরাতে ও বিহারে কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন মোরারজি দেশাই এবং জয়প্রকাশ নারায়ণ। বিশেষত জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন বা জেপি মুভমেন্ট ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বিহার নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় এবং ইলাহাবাদ হাইকোর্ট দ্বারা ইন্দিরা গান্ধির ‘৭১-এর লোকসভায় নির্বাচন খারিজ করে দেওয়া এবং ইন্দিরা গান্ধির তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে স্থগিতাদেশ নেওয়া সবমিলিয়ে চাপান-উতোর চরমে পৌঁছয়।

যেদিন জয়প্রকাশ নারায়ণ দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্দিরা গান্ধির পদত্যাগের বিরুদ্ধে বিশাল জমায়েত করার পরেই মধ্যরাতে ইন্দিরা গান্ধির পরামর্শে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফকুরুদ্দিন আলি আহমেদের জারি করা আদেশের মাধ্যমে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা বা ইমারজেন্সি জারি করা হয়। আইনগতভাবে এই ইমারজেন্সি চালু ছিল ২১ মার্চ ১৯৭৭। অর্থাৎ প্রায় উনিশ মাস। ইমারজেন্সির ভারতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ছিল, তা নিয়ে আলোচনা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় আর এই নিবন্ধের লক্ষ্যও সেটা নয়। শুধু এটাই বলার যে, জরুরি অবস্থার শুরুর পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শেষ হয়নি। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সেই সব দিনগুলির যাঁরা সাক্ষী ছিলেন, যাঁরা আজ এই লেখা পড়ে হয়তো নতুন করে তাঁদের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসবেন। তবে ভারতীয় রাজনীতির মানচিত্রে এই ঘটনা যে আমূল পরিবর্তন এনেছিল, তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।

যেমন ঠিক আট বছর পর বিদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া আজকের দিনের একটি ঘটনা দেশের খেলার এবং বিনোদনের জগতের মানচিত্রে আমূল পরিবর্তনের একটি বড় কারণ ছিল সে বিষয়ে খুব বেশি অবশ্য প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই। লর্ডসের মাটিতে শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে ক্রিকেট বিশ্বকাপ ভারত জয় করতে পারবে, সে বিষয়ে আশাবাদী বোধ হয় তেমন কেই ছিলেন না। আগের দু’টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে মাত্র একটি জয় পুঁজি নিয়ে কপিল দেব নিখাঞ্জের নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেট দল তাঁদের প্রথম ম্যাচেই (৯ জুন) চমকে দিয়েছিল আগেরবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৩৪ রানে হারিয়ে।

গ্রুপ স্তরে যখন কেবলমাত্র একটি খেলায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে ভারত গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছয়, তখনও বিশেষজ্ঞরা তেমন গুরুত্ব দেননি ভারতীয় দলকে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের ৬ উইকেটে জয় অনেককেই বিস্মিত করেছিল। তবে অনেক ক্রিকেট পণ্ডিতের ধারণা ছিল ফাইনালে বিশ্বকাপ জয়ের হ্যাটট্রিক থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কেউ রুখতে পারবে না। প্রথমে ব্যাট করে ভারতের ১৮৩ রানে গুটিয়ে যাওয়া সেই সব পণ্ডিতের হাসিকে অনেকটাই চওড়া করে তুলেছিল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং সময় ভিভ রিচার্ডসের সংহার মূর্তি অনেক ভারতীয় সমর্থকদের সঙ্গে কপিল দেবের স্ত্রী রোমি দেবকেও মাঠ পরিত্যাগে উৎসাহিত করেছিল। হোটেলে ফেরার পথে রোমি খবর পেয়েছিলেন কপিল দেবের ভিভ রিচার্ডসের সেই অসামান্য ক্যাচ ধরার কথা এবং তিনি যখন পুনরায় মাঠে ঢোকেন ততক্ষণে বিশ্বকাপের ওপর কপিল বাহিনী কব্জা করে ফেলেছেন।

আর সেই আম ভারতীয়র মধ্যে তিনিও ছিলেন। শচীন তেন্ডুলকর। আজই ফেসবুকে নিজের একাউন্টে পোস্ট করে বলেছেন, নিজের সেই দিনের বন্ধুদের সঙ্গে খেলার দেখার কথা। আর কপিল দেবের সেই ক্যাচ ধরার মুহূর্ত। গোটা দেশের সঙ্গে সেদিনের বালক শচীন নাকি আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিলেন জানিয়েছেন আজকের ‘মাস্টার ব্লাস্টার’। সেদিন অবশ্য তিনি আমআদমি থুড়ি সাধারণ বালক।

The #WorldCup1983 Final like for many was a landmark event in my life. ‬‪I still remember the way me and my friends jumped with excitement when Balwinder Sandhu bowling from the Far End got Greenidge bowled with the ball nipping back in. At Lords the ball usually left the batsman due to the slope but this delivery came back in sharply and deceived Greenidge who was taken by surprise.After that we celebrated every wicket that fell in the same fashion and when Kapil Paaji took that stunning catch running backwards to get Sir Vivian Richards out, we were just ecstatic and that was when we all started to believe that 🇮🇳 could win the ICC Cricket World Cup🏆!What an evening it was. 🙂

Posted by Sachin Tendulkar on Thursday, 25 June 2020

আজ প্রায় চার দশক সময় পরে অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ক্রীড়া গবেষকরা বলেন, সেদিনের সেই জয় শুধুমাত্র বিশ্বকাপ জয় নয় এদেশের ক্রীড়া জগতে হালহকিকত পাল্টে দিয়েছিল। হকি এবং ফুটবলকে পিছনে ফেলে ক্রিকেট এক নম্বর খেলা হিসেবে দেশে স্বীকৃত হয়। আর আজকের দিনে ক্রিকেটকে শুধুমাত্র খেলা বললেই সব কিছু বলা হয় না। আজ ক্রিকেট এদেশে অন্তত কিছু অংশে বিনোদন তো বটেই। তাই সময় চাকাকে পিছন দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে আজকের তারিখকে সামনে রাখলে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা মনে আসতেই পারে। সময় অনেক পেরিয়ে গেছে তবু এই ঘটনা দু’টি ভারতীয় জীবন এবং ইতিহাসে তার গুরুত্ব হারায়নি। বরং এই দু’টি ঘটনা নিয়ে চর্চা ও স্মৃতিমন্থন আজও চলছে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

Facebook Twitter Print Whatsapp

2 comments

  • Debashis Majumder

    Ashadharon. Two religions of India Cricket and Politics. Very well written.

  • সত্যি বলতে গেলে ১৯৮৩ সালের কথাটা তো মনে গেঁথে আছে, কিন্তু ১৯৭৫ এর কথাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।অনেক কিছুই জানলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *