বঙ্কিমচন্দ্র ও বাঙালি পাঠকসমাজ

Bamkim

বল্লরী সেন

তিনিই প্রথম নারী মনস্তত্ত্বের প্রশিক্ষক, নারীর সুপ্ত অবচেতনের আদি ভাষ্যকার। তাই কপালকুণ্ডলা কোনওদিন মৃন্ময়ী হতে পারেনি। ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্বের ভারতীয় ব্যাখ্যায় নৌকায় শৈবলিনীর স্বপ্ন বাংলা উপন্যাসের একটি মাইলস্টোন। লরেন্স ফস্টরকে শ্বেত শূকর আর প্রতাপকে এক সুবর্ণ নির্মিত রাজহংস হিসেবে পাঠকের কাছে তুলে ধরার মধ্যে নারীর লিবিডো বা সুপ্ত যৌনকামনাও কথা বলেছে। তাই শৈবলিনীর প্রেম আত্মহত্যা চায়নি, প্রতাপকে কথা দিয়ে ও প্রতিশ্রুতিভঙ্গ করে স্রোত পেরিয়ে লোকালয়ে বা সমাজে ফিরেছে। পরে স্বামীর অবহেলায় আবার মুঙ্গের পৌঁছে প্রতাপকে আবিষ্কারের মধ্যে তার দ্বন্দ্ব ও অবদমনের প্রকল্প, নরকযন্ত্রণার সংস্কার ও অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার গল্প, আসলে নারীর প্রতিবাদ। প্রতিবাদ বিবাহ ও বিবাহিত জীবনের নীতিনিয়মের বিরুদ্ধে, যা ১৯ শতকে এরকম উচ্চারণ গোটা বিশ্বের সামনে একটা বিরাট নিদর্শন বৈকি।

আরও পড়ুন: বঙ্কিমের ‘চন্দ্রশেখর’ যতখানি আমার

মনে পড়বে, রুশ মনস্তাত্ত্বিক সাবিনা স্পিয়েলরেইন (Sabina Spielrein) ২৯ নভেম্বর ১৯১১ সালে তাঁর একটি বক্তৃতায় যৌনচেতনায় হননের বোধের কথা বলেন। প্রকৃতি জগতে ক্ষুদ্র এককোষীদের মধ্যে যৌনক্রিয়ার পরেই মৃত্যু অনিবার্য হয়। সাবিনা এই ধারণায় ডারউইনের তত্ত্বে ও অস্বীকার করলেন আর নির্মাণ করলেন যুগান্তকারী মতবাদ, Destructive component of the sexual instinct, যার প্রভাব স্বীকার করলেন স্বয়ং ফ্রয়েড তাঁর ১৯২০ সালে প্রকাশিত Beyond the pleasure principle বইটিতে। সামান্য তলিয়ে দেখলে আশ্চর্য হতে হয়, বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭৫ নাগাদ শৈবলিনীর মধ্যে আত্মহনন বিরোধী এরোস্ বা যৌন প্রৈতিকে কীভাবে স্বতন্ত্র পরিশীলনে জাগরূক করেছিলেন। বলা যায়, Rajmohan’s Wife কাহিনির মাতঙ্গিনীর মধ্যে তার বীজ ছিল। এ যেন ঈশ্বরকে ইভ প্রশ্ন করেছেন, যা কবিতা সিংহের কবিতায় আমরা বিশ শতকের ছয়ের দশকে পাই।

প্রবাদ হয়ে যাওয়া উক্তিটা গোড়া থেকেই সত্য। মুগ আর মুসুর ডাল বাছতে বাছতে চন্দ্রশেখরের পাতায় চোখ আটকে গেল। ১৮৭৫-এ নারীর মনোবিকলনের গল্প! আর গুগল্ রেটিং ৩.৫/৫।

আরও পড়ুন: ২৫ জুন— ৪৫ আর ৩৭ বছর পেরিয়ে: আম-ভারতীয়দের দু’টি না ভোলা অভিজ্ঞতা

নজরটান দিলাম। সারাবিশ্ব যখন উপনিবেশিক শাসনতন্ত্রে বিভক্ত, তখন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের গবেষণাপত্র পেশ হবার ২৫ বছর আগে বঙ্কিমের শৈবলিনী সমকালের এক আশ্চর্য অকালবোধন দেখিয়েছিল আমাদের। সে প্রতাপের পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিয়ে ভাগীরথীর উত্তাল তরঙ্গমালায় ডুবে যাবার মুহূর্তে কেন যে বেঁকে বসল! আর তার এই না দিয়ে সে একে একে কপালকুণ্ডলা, দলনী বেগম, রোহিণী— এদের সরিয়ে আলাদা একটা কাল্ট্, আলাদা একটা সম্পর্কের দর্শন তুলে ধরেছিল।

তাকে আমরা বিনা কারণে কেবল হিন্দু বেদজ্ঞের স্ত্রী হিসেবে দেখলাম এতগুলো বছর, কিন্তু ১৯ শতকে তার প্রাসঙ্গিক সংকট বুঝবার চেষ্টা করলাম না। বিবাহিতার পরকীয়া খুবই উল্লাসের, কিন্তু সে যখন স্বামীকে ত্যাগ করে, আবার প্রণয়ীকে ও, তখন এই বাঁজা মাগীকে বেশি কিছু যে কেউ দেবে না, বঙ্কিম বিলক্ষণ জানতেন। তাহলে ভাগীরথীর তীরে আম্রকাননে যে কাহিনির সূত্রপাত, তা একান্তভাবে নারী মনস্তত্ত্বের বিজ্ঞানসম্মত একটি নিগূঢ় বৈকল্যের সূত্র উন্মোচিত করতে সমর্থ।

আমরা জানি যে, এই স্কট টোকা লেখকটি ফ্রয়েড জানতেন না। কিন্তু তাঁর কলমে নারীর মানসিক অবদমনের রেখাচিত্র দেখেও আমরা সামান্য বিস্ময় প্রকাশ করিনি। বলেছি তিনি নীতিবাগীশ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন। চট্টোপাধ্যায়ের টিকি আর ন্যায়নীতির মুসাবিদা ছাড়া কিচ্ছু নেই। অতএব ফেলো। বঙ্গদর্শন পত্রিকার টীকা আর দু-একটা কুইজেই শেষ। ‘যবন’ বঙ্কিমচন্দ্র আজ ও অপাঙ্ক্তেয়। অথচ রাজমোহন্স ওয়াইফ-এর মাতঙ্গিনী চরিত্রটি থেকেই দাম্পত্যের অসুখ নিয়ে কথা বললেন বঙ্কিম। নামে চন্দ্রশেখর থাকলেও আসলে এ যে শৈবলিনীর অবদমনের গল্প, তা বুঝতে কত বছর লাগল? কিন্তু তাঁকে চিনেছিলেন আর এক উপেক্ষিত মনীষী, গিরীন্দ্রশেখর বসু। ১৯১৭ থেকে অবচেতনতত্ত্ব নিয়ে লেখালিখিশুরু, ১৯২২-এ প্রতিষ্ঠা হল The Indian Psycho-analytic Society এবং ওই সালেই ফ্রয়েডের অনুরোধে তাঁর নাম রাখা হল co-editor হিসেবে Indian Journal Of Psycho-analysis-এর ৩০টি সংখ্যার জন্য।

ফ্রয়েড লিখেছিলেন, ”I heartily congratulate you on the reception of your society as one of the groups of the International Psychoanalytical Association which occurred at the Berlin Congress a month ago… I beg you to consent that your name be printed on the cover of both journals as the leader and representative of the Indian group. (Bose— Freud Correspondence 1999: 10).

উপক্রমণিকায় ‘বালক-বালিকা’ অধ্যায়ে বঙ্কিম কাহিনির সূত্রপাত করলেন ভাগীরথীর তীরে। এখানেই আম্রকাননে প্রতাপ ও শৈবলিনীর খেলাচ্ছলে পরস্পরের প্রতি মনোযোগ ও আগ্রহ শুরু হয়। স্থলভাগের যে জীবন প্রতিষ্ঠানের বাঁধা নিয়মে বন্দি, সেখানে যখন তাদের বিবাহ নিষিদ্ধ হল— তখন জলই হল তাদের যৌথ স্বপ্নের প্রাথমিক চুক্তি, জলকে অবলম্বন করে তারা সাঁতার দিতে দিতে লোকালয় ত্যাগ করে অনেক দূর চলে আসে। নদী তখন তাদের স্বপ্নপূরণের বাসনা পূরণের আশ্রয়। গঙ্গার এই উত্তাল তরঙ্গে পরে একদিন আবার তারা দু’জনে পাশাপাশি সাঁতার দেবে এবং নতুন শর্তে সারা জীবনের জন্য বিচ্ছেদকে মেনে নেবে। অর্থাৎ, উপন্যাসে গঙ্গা কেবল প্রেক্ষাপট নয়, বালক-বালিকার মনস্তাত্ত্বিক জীবনের একমাত্র অবলম্বন ও সময়ের স্মারক। কালতরঙ্গ ও চেতনাপ্রবাহ দুইয়ের সম্মিলন হয়েছে এর মধ্যে। তাই শৈবলিনী এই জলের ওপরই নিজের মনকে প্রশ্ন করেছে, ”প্রতাপ আমার কে?” আর তাই, চুক্তি অগ্রাহ্য করে, ”প্রতাপ ডুবিল, শৈবলিনী ডুবিল না।” কিন্তু দুই নর-নারীর হারানো সুতোকে যুক্ত করলেন চন্দ্রশেখর, তিনি প্রতাপকে উদ্ধার করলেন ও শৈবলিনীকে বিবাহ করলেন। শৈবলিনী চলে এলেন ভীমা পুষ্করিণীর পাশে। এখানেও জলের সঙ্গে সখ্য এবং লরেন্স ফস্টরের বজরায় গৃহত্যাগের নতুন বাঁক নিল গল্প। এখানেই মুঙ্গের পৌঁছে শৈবলিনীর মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্ন আদ্যন্ত রূপক ও সংকেতে নির্মিত। নিজেকে সে দেখছে প্রস্ফুট পদ্মের মধ্যে, যে জলের ওপর ভেসে আছে, ডোবেনি। ফস্টর হল সেই শ্বেত শূকর আর সুবর্ণ রাজহাঁস হল প্রতাপ। পদ্মের পা দু’টি মৃণালে বদ্ধ, তাই তার ইচ্ছেপূরণের উপায় নেই। এই স্বপ্নকে আমরা বাংলা উপন্যাসের প্রথম মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্নের নিদর্শন বলবো যা ফ্রয়েডের ১৮৯৬-এর অনেক আগে। এখানে জলাশয়কে স্বপ্নে বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে শৈবলিনীর স্মৃতি ও বাসনার যুগ্ম আধার, তার কিশোরীবেলার লিবিডোর প্রখর সূত্রপাত তো এই জলের অনন্ত আবেষ্টনীতে! প্রতাপের সঙ্গে তার প্রথম স্বপ্নদৃশ্য ছিল, ”দাঁড়ের জলে কেমন সোনা জ্বলিতেছে।” এখানে দ্ব্যর্থক ভাষায় লেখক বুঝিয়ে দিলেন তাদের যুগল জীবনের অভিপ্রায়, যা সমাজ অনুমোদিত নয়, কিন্তু জলের প্রবাহে তার কোনও নিষেধ নেই। তাই জলাশয় বা নদীপ্রবাহ দুই-ই ভিন্ন কোনও বাস্তবকে নির্মাণ করেছে। ব্যক্তি বা তার আবেগ সেখানে আলাদা কোনও গুরুত্ব পায় না, ”জড় প্রকৃতির দৌরাত্ম্য”।

নারী অবচেতনের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান এই প্রবাহের ভেতরে নিহিত। সে নিজেও এই সুররিয়াল জগতের একজন, তাই তারা গণনা, নৌকা গণনা সব কিছুতে সে ভুল করলেও সে যেন তাদেরই একজন। তাই স্বপ্নে শৈবলিনী একটি ফুল্ল পদ্মের স্বরূপ নিয়েছে। জলেই তার জন্ম, নামেও সে গতিমান প্রবাহের চিহ্ন বহন করেছে। উপক্রমণিকায় কথিত “আকাশ নদী বৃক্ষ” আসলে ত্রিস্তরীয় বিন্যাসের কথা বলে। আম্রকানন বা বৃক্ষছায়ায় তারা পরস্পরের যৌথ জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল, নদীর জলকল্লোলে কান পেতে সময়ের প্রথাকে, সামাজিক নিয়মকে বুঝতে হত তাদের। প্রতাপ জানত যে বিবাহ অসম্ভব। শৈবলিনী জানত না। আকাশলোকে শেষপর্যন্ত প্রতাপের বিদায়, বঙ্কিম তাকে আত্মবিসর্জন বলেছেন। ফ্রয়েড কি একেই ইদ্, ইগো ও সুপার ইগো বললেন?

আজ বঙ্কিমের জন্মদিনে না হয় আবার একবার তাঁকে পাঠ করা ভীষণ জরুরি এটা মেনে নিই?

● লেখক পরিচিতি
নব্বই দশকের শেষ ভাগে বই প্রকাশ পেল ‘ভিন্‌ দেশি পাখি’। ‘মনখারাপের গায়ে হলুদ’, ‘বিহানরাতের বন্দিশ’, ‘লেফাফা বন্দি দুই তারা’, ‘রাত্রি যখন শিউলি গুনে তোলে’ এবং ‘বিষাদ গেরস্থালি’— এই তাঁর পেনসিলের শব্দবুদ্‌বুদ। নানা নিরীক্ষার অনুশীলনে ইংরেজিতেও লিখেছেন কিছু সময়ের প্রবাহকে, নাম ‘The Window Seller’. সদ্য প্রকাশ পেয়েছে খসড়া খাতা থেকে বাংলাদেশের কবি শরাফত হোসেনের সঙ্গে যৌথভাবে কবিতা সংকলন ‘কাফনলিপি’।

Facebook Twitter Print Whatsapp

9 comments

  • Niloy Goswami

    চমৎকার লাগল পড়ে।

  • Kausik Chatterjee

    Bhalo lekha. Tothyosomridhdho o bishleshondhormi.

  • অপূর্ব লাগলো ।

  • Mitrangshu Banerjee

    বেশ ভালো।

  • ভীষণ সুন্দর বিশ্লেষণ-অপূর্ব বর্ণনা

  • ‘ দুর্দান্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ দুঃসাধ্য সিদ্ধান্ত!’
    সম্পূর্ণ প্রশংসা অর্থে।
    এমন আরো দেখা পাওয়ার আশায় থাকব।

  • Chayanika Chakraborty

    কত সহজে কত জটিলতাকে যুক্তি ও মেধা পূর্ণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সহজ ভাবে তুলে ধরা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *