বঙ্কিমের ‘চন্দ্রশেখর’ যতখানি আমার

Bamkim

তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়

ঠিক কোন বয়সে প্রথম বঙ্কিমচন্দ্র পড়তে শুরু করেছিলাম মনে করতে পারি না, তবে প্রথমবার পড়তে গিয়ে ভারী ভারী শব্দ দেখে খানিক ভয় যে চেপে বসেছিল, সে কথা স্বীকার না করলে মিথ্যাচার হয়। স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দাদু। স্নান সেরে, কাঠের চেয়ারে বসে প্রাণ খুলে গাইতেন—
“বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং
মলয়জশীতলাং
শস্যশ্যামলাং
মাতরম্৷৷”

এই গান আমাকে টানত ছোটবেলা থেকেই। তখনও অর্থ বোঝার বয়সে পৌঁছইনি। মা বলেন নিজের মতো করে গানটা আমিও গাইতাম।

আরও পড়ুন: ২৫ জুন— ৪৫ আর ৩৭ বছর পেরিয়ে: আম-ভারতীয়দের দু’টি না ভোলা অভিজ্ঞতা

পরে ‘আনন্দমঠ’ পড়তে গিয়ে এই গানটা পেয়ে আনন্দ হয়েছিল। দেশপ্রেম উপলব্ধির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল ছোটবেলার স্মৃতি যা আমার কাছে কম মূল্যবান নয়। দাদু মারা যাওয়ার পর এখনও ওনার ঘরে কান পাতলে মনে হয় এই বুঝি সর্দি বসা গলায় উনি ‘বন্দেমাতরম্’ গেয়ে উঠবেন। বলে উঠবেন—

“কে কাহাকে ধরিয়াছে? জ্ঞান আসিয়া ভক্তিকে ধরিয়াছে— ধর্ম্ম আসিয়া কর্ম্মকে ধরিয়াছে; বিসর্জ্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে ধরিয়াছে; কল্যাণী আসিয়া শান্তিকে ধরিয়াছে। এই সত্যানন্দ শান্তি; এই মহাপুরুষ কল্যাণী। সত্যানন্দ প্রতিষ্ঠা, মহাপুরুষ বিসর্জ্জন।

বিসর্জ্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে লইয়া গেল।”

‘আনন্দমঠ’-এর শেষ লাইনটা বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়। সত্যানন্দ আর মহাপুরুষের আড়ালে থাকা বৃহৎ সত্যিটাই তো আসলে বোধের আনন্দরূপ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে জানা শুরু হয়েছিল ‘আনন্দমঠ’ দিয়েই তবে আজ লিখতে ইচ্ছে করছে ‘চন্দ্রশেখর’ নিয়ে। যে বয়সে মানুষের প্রেমের উপন্যাস পড়তে ভাল লাগে, সে বয়সে অন্যান্য উপন্যাসের সঙ্গেই বোধহয় প্রথম ‘চন্দ্রশেখর’ পড়েছিলাম। তখনও ঐতিহাসিক রোমান্টিক উপন্যাস কাকে বলে জানি না। ইতিহাসের আবর্ত পেরিয়ে যে চরিত্রটি আজও মনের ভেতর সাড়া জাগিয়ে চলে তা হল প্রেমিক চন্দ্রশেখর।

পরে এই ‘চন্দ্রশেখর’কে কলেজে পাঠ্যবই রূপে গ্রহণ করতে হয়েছিল। ক্লাস ও পরীক্ষার তাড়নায় এই রোমান্টিক ঐতিহাসিক উপন্যাসটির কড়া কাটাছেঁড়া বড্ড কষ্ট দিয়েছিল। যে শিক্ষক উপন্যাসটি পড়াতেন, তিনি বলতেন প্রতাপেরই নায়ক হওয়া উচিত! প্রতাপই যথার্থ প্রেমিক। কালো রঙের বোর্ডে নায়কের বৈশিষ্ট্য লিখে প্রমাণ করেছিলেন প্রতাপ নায়ক।

আরও পড়ুন: ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেট; শুরুর সেদিনের গল্প

সে হোক! প্রতাপ আদর্শ পুরুষ তাতে সন্দেহ নেই। ‘চন্দ্রশেখর’-এর বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ সংস্করণের সম্পাদকীয় পাতায় ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস এই উপন্যাসের কাহিনি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন—
“…তাঁহার সৃষ্ট উপন্যাস-জগতে সর্ব্বপ্রথম আদর্শ চরিত্র হিসাবে তিনি প্রতাপের অবতারণা করিয়াছেন।”

প্রতাপ সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন, তিনি বলেছিলেন প্রতাপ ঐশ্বর্যশালী ও ইন্দ্রিয়জয়ী।

এইরকম একটি চরিত্র নায়ক হবে সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমার মনে প্রিয় প্রেমিকের জায়গাটা কিছুতেই প্রতাপকে ছেড়ে দিতে পারিনি, ওই জায়গাটা বরাবর চন্দ্রশেখরের তাই অনেক তর্ক থাকলেও চন্দ্রশেখরের নামে উপন্যাসটির নাম হওয়াতে আমার বেশ আনন্দ হয়।

দাদুর অত্যন্ত আদরের কাঠের তাক থেকে উদ্ধার করা বঙ্কিম রচনাবলির উপন্যাস খণ্ডটির পোকায় কাটা পাতায় পাওয়া প্রেমিক চন্দ্রশেখর এখনও আমাকে ভাবায়।
শৈবলিনী ভীমা পুষ্করিণী থেকে দেরি করে আসার পরও কারণ জিজ্ঞাসা না করা চন্দ্রশেখরকে আমার ভালো লাগে। অনেকে বলবেন, সে তো পুঁথিতে ডুবে থাকার জন্য জিজ্ঞাসা করেননি! আমার কিন্তু তা মনে হয় না। স্ত্রী মানেই যে স্বামীর ‘সম্পত্তি’ নয় এই বোধের বিকাশ দেখা যায় চন্দ্রশেখরের মধ্যে।

ঘুমন্ত যুবতী শৈবলিনীকে চল্লিশ পেরোনো চন্দ্রশেখরের মনে যে ভাঙাগড়ার খেলা চলে, যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তা আমাকে টানে। শৈবলিনীর রূপের যে বর্ণনা চন্দ্রশেখরের ভেতর ঘনিয়ে ওঠে তাতে আমার তাকে কবি বলে মনে হয়। ঘুমন্ত শৈবলিনীর ‘জ্যোৎস্নার উপর বিদ্যুৎ’ হওয়া হাসি দেখতে গিয়ে খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া চন্দ্রশেখরের মধ্যে আমি খুঁজে পাই একজন প্রকৃত প্রেমিককে। পুঁথি আর স্ত্রীর মধ্যে অসম লড়াইয়ে চন্দ্রশেখর কাকে সত্যিই এগিয়ে রাখতে চায় সে কথা জানতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে এই চরিত্রের পাশে গিয়ে বসি।

এখন পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘কথোপকথন’ পড়তে গিয়ে শুভঙ্করকে আমার কখনো কখনো চন্দ্রশেখর মনে হয়। শুভঙ্কর যখন তার প্রেয়সীকে বলে—

“-সেই ছেলেবেলা থেকে যা ছুয়েছি সব ভেঙ্গে গেছে।
প্রকাণ্ড ইস্কুলবাড়ি কাচের চিমনির মত ঝড়ে ভেঙ্গে গেল।
একান্নবর্তীর দীর্ঘ দালান-বারান্দা ছেড়া কাগজের কুচি হয়ে গেল।
কচি হাতে রুয়ে রুয়ে সাজিয়ে ছিলাম এক উৎফুল্ল বাগান
কুরে কুরে খেয়ে গেছে লাল পিঁপড়ে, পোকা ও মাকড়।
একটা পতাকা ছিল, আকাশের অদ্বিতীয় সুর্যের মতন
তর্কেও বিতর্কে তাও সাত আটটা টুকড় হয়ে গেল।
গাঁয়ের নদীকে ছুঁয়ে কী ভুল করেছি
নদীর ব্রীজ কে ছুঁয়ে কী ভুল করেছি
কাগজ ও মুদ্রাযন্ত্র ছুয়ে আমি কি ভুল করেছি?
নন্দিনী!
তোমাকে যদি বাগান, পতাকা, ব্রীজ, কাগজের মতন হারাই?”

তখন মনে হয় এই কথা যেন চন্দ্রশেখরের বলার ছিল শৈবলিনীকে। শৈবলিনী তার কৈশোরের প্রেমিক প্রতাপের কাছে ছুটে গেছে, একদিন যে প্রতাপকে ডুবে যাওয়ার মুখে একা ছেড়ে এসেছিল সে।

চন্দ্রশেখর, প্রেমিক চন্দ্রশেখর কী পেল?

নবাব দরবার থেকে ঘুরে আসার পর নিজগৃহ দেখে উৎফুল্ল হয়েছিল সে। তার মনকেমন করেছিল শৈবলিনীর জন্য। পণ্ডিত, বিদ্যান চন্দ্রশেখর ভেবেছিল— “যদি গিয়া শুনি যে, শৈবলিনী উৎকট রোগে প্রাণত্যাগ করিয়াছে? তাহা হইলে আমি বাঁচিব না।”

তারপর এসে যখন দেখল শৈবলিনী সত্যিই নেই, উৎকট রোগে নয় তাকে নিয়ে গেছে ফষ্টর সাহেব তখন পুঁথি যার প্রাণ সেই চন্দ্রশেখর, আগুনের বুকে ছুঁড়ে ফেলল সব পুঁথি। নিরুদ্দেশ হল, কারণ? শৈবলিনী!

বোঝা যায় শৈবলিনীকে মনে মনে কতখানি ভালোবাসত চন্দ্রশেখর। শৈবলিনীকে খুঁজে পাওয়ার পরও তার সঙ্গ ছাড়েনি চন্দ্রশেখর। তৎকালীন সমাজের সমস্ত নিয়মনীতিকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে প্রেমিক চন্দ্রশেখর। পাপবোধে ভোগা শৈবলিনীকে আশ্বস্ত করেছেন। রমানন্দ স্বামী শৈবলিনীকে যোগের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত করার যে পথে চালনা করছিলেন সেই পথে শৈবলিনীর তীব্র কষ্ট দেখে চন্দ্রশেখর কেঁদেছেন। গুরুর প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকার পরও আকুল হয়ে বলেছেন— ”গুরুদেব! এ কি করিলে? এ কি করিলে?”

চন্দ্রশেখর শৈবলিনীকে বেদগ্রামে নিয়ে এসেছে। যোগের দ্বারা, রমানন্দ স্বামীর ঔষধের দ্বারা শৈবলিনীর মুখ থেকে সব কথা শোনার পরও তাকে একইরকম ভালোবেসেছে। সাময়িকভাবে শৈবলিনীর উপর বিশ্বাস হারানোর জন্য নিজেকেই ধিক্কার জানিয়েছে সে। ভেবেছে— “হায়! হায়! কি কুকর্ম্ম করিয়াছি- স্ত্রীহত্যা করিতে বসিয়াছিলাম।”

নবাবের দরবার থেকে শৈবলিনীকে নিয়ে ফেরার সময় যুদ্ধক্ষেত্রে চারিদিকে গোলা বৃষ্টির মাঝে চন্দ্রশেখর নিজের কথা ভাবেনি, ভেবেছে শৈবলিনীর কথা। রমানন্দ স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছে— “এক্ষণে শৈবলিনীর প্রাণরক্ষা করি কি প্রকারে?”

যে সময় সাহেব সংস্পর্শে আসাকে জাত খোওয়ানো বলা হত, কোনও অনুনয়-বিনয়েও জাতে ফেরার রাস্তা পাওয়া যেত না সেই সময়ে দাঁড়িয়েও চন্দ্রশেখর শৈবলিনীকে গ্রহণ করেছে। পাপ-পুণ্যের হিসাব চন্দ্রশেখরকে ধরেনি তা নয় তবে তার থেকে নিজেকে অনেকখানি তুলে ধরেছে সে। শৈবলিনীর সঙ্গেই থাকতে চেয়েছে,
বলেছে— “যদি লোক রঞ্জনার্থ কোন প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়, তবে তাহা করিব। করিয়া ইহাকে গৃহে লইব। কিন্তু সুখ আমার কপালে হইবে না।”

চন্দ্রশেখর জানে শৈবলিনী প্রতাপকে ভালোবাসে। চন্দ্রশেখর সে ভালোবাসার ভাগ কখনও পাবে না। জানার পরও শৈবলিনীকে ত্যাগ করতে চায়নি চন্দ্রশেখর। কারণ সুখ না থাকলেও শৈবলিনীর সঙ্গে দূরত্ব যে সে মেনে নিতে পারবে না, তা আগেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। প্রতাপ শৈবলিনীর সুখের জন্য স্বেচ্ছায় যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে প্রাণ দেয়। প্রতাপও প্রেমিক, অবশ্যই প্রেমিক তার মূলে শৈবলিনীর ভালোবাসাও ছিল কিন্তু ভালোবাসা না পেয়েও, অনেকখানি ভাঙাগড়া ও সমস্ত কথা জানার পরও যে চন্দ্রশেখর সংস্কারের বেড়া ডিঙিয়ে শৈবলিনীকে ভালোবেসে গেছে সে চন্দ্রশেখরকে আমি এগিয়ে রাখি। বিদগ্ধ সমালোচক, পণ্ডিত মানুষদের নানান লেখা পড়েও চন্দ্রশেখরের জায়গাটা প্রতাপকে দিতে পারিনি। হয়তো আমারই অপারগতা তবু যে বিশ্বাস চেপে বসে আছে তাকে উপড়ে ফেলতে পারি না বা চাইও না।

বারবার মনে হয়েছে চন্দ্রশেখর নির্বাসিত প্রেমিক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নির্বাসন’ কবিতার সেই যুবক, যে বলে—

“জানি না কোথায় লুকিয়েছি নীরাকে, অথবা নীরা কোথায়
লুকিয়ে রেখেছে আমায়! কোথায় হারালো নিখিলেশ, বিদ্যমানতায়
পরস্পর ছায়া ও মূর্তি,
‘…. আবার একা হাঁটতে লাগলুম, বহুক্ষণ
কেউ এলো না সঙ্গে, না প্রশ্ন, না ছায়া, না নিখিলেশ, না ভালোবাসা
শুধু নির্বাসন।”

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *