রথ, লোকারণ্য; ইতি আনন্দ

Rath Cover

তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়

“প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই
তাই দিই দেবতারে; আর পাব কোথা!
দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা!”

দেবতাকে যখনই আন্তরিকতার সঙ্গে প্রিয় করে তোলার ইচ্ছে দেখিয়েছে মানুষ তখন দেবতাও মানুষের কাছে এসেছে। প্রমাণ হয়েছে উজাড় করা ভালোবাসা, ভক্তি ও নিবেদন এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দেবতার নেই। ওড়িশার ‘উৎকল খণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক দুই প্রাচীন পুঁথিতে পাওয়া যায় মালবদেশের অবন্তীনগরের সূর্যবংশীয় রাজা, বিষ্ণুর পরম ভক্ত ইন্দ্রদ্যুম্ন নীল পর্বতের শবরদের দ্বারা পূজিত নীলমাধবের দর্শন না পেয়ে যখন কাতর হয়েছিলেন, তখন তাঁর ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুদেব জগন্নাথ রূপে রাজার কাছে পুজো নেওয়া শুরু করেছিলেন৷ শোনা যায়, দারুব্রহ্ম থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি তৈরি করতেও বিষ্ণুদেবই ছুতোর রূপে এসেছিলেন ইন্দ্রদ্যুম্নের রাজ্যে। এই মালবদেশের বর্তমান নাম ওড়িশা।

আরও পড়ুন: ঘরে বসেই লাইভ দেখুন পুরীর ঐতিহাসিক রথযাত্রা, ক্লিক করুন এখানে

mysepik.com
চেন্নাইয়ের রথযাত্রার চিত্রকর্ম, ১৯১৪

জগন্নাথদেবের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে রথযাত্রার প্রচলন হল। ‘রথ’ একটি যান। প্রাচীনকাল থেকে এই যানের ব্যবহার আছে। এই রথে ভ্রমণ করেন বাকি দেবতারাও। তাঁদের সব নানানরকম রথ। বেশিরভাগই ঘোড়ায় টানা। প্রাচীনকালে রাজারাও রথে ভ্রমণ করতেন। যুদ্ধের সময় রথ ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যান। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথি হয়েছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ— এই কথা তো সবার জানা।

জগন্নাথদেব ও তাঁর দুই ভাইবোনকে বছরে একবার, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়ায় মাসির বাড়ি ঘোরানোর জন্য এই রথই তাই একমাত্র উপায়। জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার এই মাসির বাড়ি ভ্রমণ হয়ে উঠল মহা উৎসব। এই মাসির বাড়ি ভ্রমণকে গুন্ডিচা ভ্রমণও বলে। আটদিন পর জগন্নাথদেব মাসির বাড়ি থেকে ফিরে আসেন নিজের বাড়ি, সেই রথযাত্রার নাম উল্টোরথ।

আরও পড়ুন: আমাদের কোনও থাকার জায়গা ছিল না

এবছরের ছবি। পুরোহিত এবং পুলিশকর্মীরা বার্ষিক রথযাত্রার জন্য জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার তিনটি রথকে রথ খাল থেকে জগন্নাথ মন্দিরে টেনে আনেন। (পিটিআই চিত্র)

এ তো গেল ওড়িশার কথা কিন্তু বাংলা! আজ যে বাংলা ও বাঙালিদের সঙ্গে রথ এমন জড়িয়ে গেল তার কারণ?

তার মূলেও আছে ভক্তির পূর্ণ প্রকাশ। শোনা যায় চতুর্দশ শতকে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক বাঙালি সাধু পুরী বা শ্রীক্ষেত্র গিয়েছিলেন তীর্থ করতে। তাঁর ইচ্ছা ছিল জগন্নাথদেবকে নিজের হাতে ভোগ খাওয়াবেন কিন্তু তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ হয় না। তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। অত্যন্ত দুঃখিত ও ব্যথিত হয়ে ধ্রুবানন্দ অনশনে বসেন। তিনদিন পর জগন্নাথদেব স্বয়ং তাঁকে দেখা দেন, নির্দেশ দেন, বঙ্গদেশে বা বাংলায় ভাগীরথী তীরে মাহেশ নামে একটি গ্রামে আছে সেখানে ফিরে যেতে। ধ্রুবানন্দ মাহেশে আসেন। ভাগীরথী নদীতে জগন্নাথদেবের কৃপায় দারুব্রহ্ম ভেসে আসে। সেই দারুব্রহ্মে জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি তৈরি করে পুজো শুরু করেন ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী। আমরা এখন শ্রীরামপুরের মাহেশে যে মন্দির ও রথ দেখি, তা ১৭৫৫ সালে কলকাতা নিবাসী নয়নচাঁদ মল্লিক তৈরি করে দেন। মাহেশে জগন্নাথ মন্দির থেকে কিছু দূরেই আছে গুন্ডিচা মন্দির বা জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি। শোনা যায় প্রভু শ্রীচৈতন্যদেব এই মন্দির দর্শন করেছিলেন এবং ‘দ্বিতীয় নীলাচল’ আখ্যা দিয়েছিলেন।

হুগলির মাহেশের রথযাত্রা

এই মাহেশের রথ বাংলার প্রাচীনতম এবং ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা। এরপর প্রতিষ্ঠা হল হুগলির গুপ্তিপাড়ার রথ, পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের রথ! এখন তো পশ্চিমবাংলার প্রায় সব জেলাতেই মহা সমারোহে রথ উৎসব পালিত হয়। মাহেশে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা শুরু হতেই তা জড়িয়ে গেল উৎসব প্রিয় বাঙালির জীবনে। জড়িয়ে গেল সাহিত্যেও। জড়িয়ে গেল সাহিত্যেও যার উদাহরণ হিসাবে জ্বলজ্বল করছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট।

রথের রশি টানার জন্য লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হতে শুরু করল। কেউ যদি রথের রশি টানে তাহলে পুণ্য তো হবে সঙ্গে তার নাকি আর কোনও জন্ম হবে না। বিশ্বাস চেপে বসল মানুষের মনে। তবে বিশ্বাস আর ধর্মের ঊর্ধ্বে যা মাথা তুলে দাঁড়াল, তা হল আনন্দ। কোথাও একমাস, কোথাও পনেরো দিন এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। উপচে পড়ে মানুষের ভিড়। পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষেরা ভিড় করে সে মেলায়। মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হয়। কুশল বিনিময় হয়।

পুরীতে আজকের দিনে চিত্রটা এমনই থাকে। যদিও এবছর ব্যতিক্রমী…

গ্রামেগঞ্জে ছেলেরা নিজহাতে রথ বানায়। রঙিন কাগজ মুড়ে, কাগজের ফুলে রথ তৈরি করে গ্রাম ঘোরে। টিপটিপ বৃষ্টি হয়। কাঁসর বাজিয়ে রথ বের করা ছেলেরা বাড়ি বাড়ি যায়। গৃহস্থ একটাকা দু’টাকা দিয়ে জগন্নাথদেব ও তাঁর ভাইবোনদের প্রণাম করেন। আষাঢ়ের বেলা আনন্দের ঘণ্টাধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। আনন্দের বাঁকে বাঁকে জুড়ে যায় সুখ দুঃখের গল্পও। বাবার মুখে একটা ছড়া শুনি—

“ও পাড়ার ময়না বুড়ো
রথ করেছে তের চূড়ো
তোদের হলুদ মাখা গা
তোরা রথ দেখতে যা
আমরা পয়সা কোথা পাবো
আমরা উল্টোরথে যাবো।”

হলুদ মাখা গায়ের অর্থবানেরা সোজা রথে যায়, মেলায় জিনিস কেনে আর পয়সা কম থাকা মানুষ যায় উল্টোরথে। মেলায় তখন জিনিসের দাম কমে।

গুপ্তিপাড়ার রথ

তবে এই শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কিছু মানুষ যখন জাত, ধর্মের হিসাব কষতে ব্যস্ত তখন তাদের মুখে প্রায় ছাই দিয়েই রথযাত্রা এই হিসাব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। রথযাত্রা সবার। বঙ্গদেশের রথযাত্রা সমস্ত বাঙালির, সমস্ত মানুষের। বাঙালি নিজের মতো করে উপভোগ করে রথ। বিশ্বাস রাখি, কখনও কোথাও যদি জাতপাতের হিসাব করা হয় তবে যেন রথের চাকা বন্ধ হয়ে যায় ঠিক যেমনটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখিয়েছিলেন ‘রথের রশি’ নাটকে।

ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত মানুষের জীবন থেকে যখন আনন্দ চলে যাচ্ছে, তখন এই মেলা আর উৎসবের প্রয়োজন একটু আছে বইকি! ‘আমি’র ভেতর আটকে পড়া মানুষকে খানিক বিশ্রাম নিতে হয়। পরিবারের লোকের সঙ্গে পাঁপরভাজা খেতে খেতে সাময়িকভাবে কম্পিউটারের নীল আলো ভুলে যাওয়া কোনও মানুষের আনন্দের জন্য, সারাবছর কঠিন পরিশ্রম করে এক শ্রমিক বাবার তাঁর ছেলে বা মেয়েকে নিয়ে জিলিপি খাওয়ার বা কাঠের পুতুল কেনার আনন্দের জন্য কিংবা রাম, শ্যাম, রহিম, নূরুলের হাত ধরাধরি করে নাগরদোলা চাপা, কাঠি আইসক্রিম কিনে খাওয়ার আনন্দের জন্য রথের মেলা থাকুক। থাকুক রথযাত্রা।

নবদ্বীপের জগ্ননাথ, বলরাম, সুভদ্রা

করোনা সংকটে ঘরবন্দি মানুষ যখন ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে, যখন এই বছরের মতো রথযাত্রা স্থগিত করা হয়েছে তখন পূর্বের স্মৃতিরাই চলকে উঠুক। মানুষ ভাবুক, এইবারটা কোনও রকমে কষ্ট করে কাটিয়ে দিই, পরের বছর না-হয় অনেকখানি বেশি আনন্দ করে নেব।

Facebook Twitter Print Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *