অপত্য সম্পর্ক

মনিরুল ইসলাম

‘বাবা’ শব্দটি খুব ছোট। কিন্তু শব্দটির ব্যাপকতা বিশালতা আকাশচুম্বী। কঠোর শাসন, পরম ভালোবাসা, স্নেহময় দরদ সব মিলিয়ে হয় একজন বাবা। একজন সন্তানের কাছে বাবা মানে আস্থার প্রতীক, নিরাপত্তার ঠিকানা। যে ঠিকানা কোন দিন ছিন্ন হবে না। ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বটবৃক্ষের মতো সুশীতল ছায়া দিয়ে যায় অবিরাম। তীব্র রোদ, আর ঝুম বৃষ্টিতে বাবা ছাতার মতোন মাথার উপর থাকেন। এমন বহু শব্দ, বাক্য আছে, যাহা দিয়ে বাবাকে অলংকৃত করে শেষ করা যাবে না। চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করেও বাবার ত্যাগ তিতিক্ষার অবদানের হিসাব করা মুশকিল হবে। সন্তানের সুন্দর আগামীর ঝলমলে ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে বাবারা অসীম সংগ্রাম করেন। নিজের সব আনন্দ, প্রাচুর্য বিসর্জন দিয়ে, সন্তানদের আনন্দ দিয়ে থাকেন। সব ধরনের পাহাড়সম দুঃখ-কষ্ট একাই সহ্য করেন বাবা। তিনি সর্বদাই চেষ্টা করেন সন্তানকে যেন সীমাহীন কষ্ট স্পর্শ না করে। সন্তানের আরাম আয়েশ, সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা করে তিনি সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান নিরন্তন। কখনো ক্লান্তির কথা সন্তানকে বুঝতে দেন না।

একজন শিশুর কাছে বাবা শব্দটি অমৃত মধুর মতোন। নশ্বর পৃথিবীর বুকে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটির মুখ থেকে অচিরে বাবা শব্দটি বেরিয়ে আসে। তখন বাবার মনপ্রাণ আনন্দে পুলকিত হয়ে ওঠে। মতোয়ারা হয়ে যান এক নিমিষে। বাবার হাসি মাখা অনুভূতির ঢেউ, অবুঝ সন্তানের হৃদয়কে আনন্দিত, উদ্বেলিত করে দেয়।
বাবা তো বাবা, যিনি সবসময় তুলনাহীন। যার জন্য এই পৃথিবীর অপার লীলাভূমির রং, রূপ, আলোর আঁধারি অবলোকন। সেই বাবা শব্দটির সাথে আমরা নিবিড় বন্ধনের মায়া জালে জড়িয়ে থাকি। যে বন্ধন আমার কাছে চীনের প্রচীর থেকেও দৃঢ় শক্তিশালী মনে হয়। আমরা প্রতিদিন যে শব্দটি বেশি বার মুখে উচ্চারণ করি, তাঁর মধ্যে বাবা শব্দটি সুন্দরতম। অনন্য।

ঠিক ৫ বছর আগেকার কথা। আমাদের স্কুল জেলা স্টেড়িয়ামে ইয়াং টাইগার্স ক্রিকেট টুর্নামেন্ট খেলায় অংশ গ্রহণ করে। স্কুল টিম থেকে আমি আর বন্ধু সাজেদুর রহমান শুভ চূড়ান্ত ভাবে খেলার জন্য সিলেক্ট হয়েছিলাম। আর সব খেলোয়াড় কলেজ থেকে নিয়েছিল আমাদের ক্রীড়া শিক্ষক হাফিজুর রহমান স্যার। আমি এর আগে কোনদিন ডিউস বলে খেলি নাই। একদম আনকোরা বলা যায়। বিন্দুমাত্রাও অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু মনে শখ জমিয়েছিল। ডিউস বলে খেলার জন্য মনপ্রাণ আঁকুপাঁকু করে। তাই খেলার জন্য মনস্থির করলাম।

কিন্তু সমস্যা বেঁধে গেল। তখন বিরোধী দলের সকাল সন্ধ্যা হরতাল চলছিল দেশে। যানবাহন তেমন একটা চলাচল করে না। তবে দুই একটা চলে, ভাড়া খুব চড়া দামে। ৩৫ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা আদায় করে। তা আবার নিজের খরচে যেতে হবে। স্কুল থেকে কোন খরচপাতি বহন করবে না। আমার কাছেও কোন টাকাপয়সা নেই। তারপর বাবার দ্বারস্থ হলাম। বাবার কাছে সব কিছু খোলাসা করে বলেছি। তিনি খুশিমনে আমার আবদার মেটানোর জন্য সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। আমি তো অবাক। যে মানুষটি ঘুণাক্ষরেও ক্রিকেট খেলা পছন্দ করে না। কত ব্যাট, বল আগুনে পুড়ে ফেলেছে। সেই কিনা তোড়জোড় না করে টাকা দিবে? আমি তাজ্জব বুনে গেলাম। এটা হয়তো সন্তানের জন্য বাবাদের অজন্ম ভালোবাসা টান। তারপর সন্ধ্যায় বাবা আমাকে ৩০০ টাকা দিলেন। মুখে একফালি হাসি দিয়ে বললেন, ভালো করে খেলিস। সে কথাটি এখনো স্মৃতিপটে ভেসে উঠে।

আমি যথারীতি খেলার জন্য জেলা স্টেড়িয়ামে গিয়েছিলাম। আমরা প্রথম ম্যাচটি বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করেছি। কিন্তু আমাদের আর পাঁচটি ম্যাচ খেলতে হবে। আমি তখন ভীষণ চিন্তার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম। পাঁচ ম্যাচ খেলতে আরও ১৫০০ টাকা দরকার। আমি এত টাকার কথা শুনে পিছপা হলাম। কিন্তু বাবা আমাকে বললেন, আমি টাকা দিবো। তুই খেলা চালিয়ে যা। টাকার ব্যবস্থা করে দেব। কোন সমস্যা নেই।

কিন্তু আমি তারপরও খেলা থেকে নিজ নাম প্রত্যাহার করেছি। সন্তানের জন্য বাবার টান দরদ, ভালোবাসার সেদিন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলাম। তিনি কত বড় হৃদয়ের মানুষ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর সে মমতা, ভালোবাস আজ অবধি অটুট অবিচল আছে। একটুও বদলায়নি। শত কষ্ট সংগ্রামের মধ্যেও আমাদের মুখে হাসি ফোটতে সে কী প্রবল চেষ্টা। যাহা আমাদের মাঝে মাঝে কাঁদিয়ে তোলে। ভাবিয়ে তোলে। পৃথিবীতে বাবা মানুষটি কি এমন দরদি হয়? নিজে রোদ বৃষ্টিতে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর কষ্টের ছাপ একটু প্রতীয়মান হয় না।

বাবা দিবস কি শুধু একটি দিনের জন্য? একটা গোলাপ ফুল কিংবা একটি রঙিন খামের কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানালে বাবা ভীষণ রকমের খুশি হবেন। কিন্তু ব্যাপারটা কী এখানে চুকিয়ে যাবে? বাবার প্রাপ্তি কী শুধু এতটুকুই? ছোট বড় সবার কাছে বাবার চাহিদা থাকে পর্বতসম। সব সন্তানের কাছে বাবা একজন রোল মড়েল। একজন পথপ্রদর্শক। যিনি সন্তানকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে উৎসাহ, সাহস যোগান। আর তাঁর অবদানের কথা হরহামেশাই স্বীকার করা আমাদের মুখ্য দায়িত্ব। আজকে যাদের বাবা পৃথিবীতে বেঁচে নেই। তাঁরা নিশ্চয়ই বাবার শূন্যতা টের পাচ্ছেন। তাঁরা পূর্ণিমার রাতে আকাশ পানে বাবাকে খুঁজে বেড়ান। বাবার স্মৃতি মনসপটে স্মরণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাবার বাস্তব ভালোবাসা আগেকার মতোন পান না। তবুও বাবাকে নিয়ে ভালোবাসার কমতি ঘাটতি নেই। সবর্দা বাবার জন্য ভালোবাসার পুষ্পমালা সতেজ তাজা রাখেন। পৃথিবীর সকল বাবাদের রাশভারী চেহারার পেছনে কুসুমকোমল হৃদয় আছে, তা মাতৃ হৃদয়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

আজকে যাদের বাবা প্রয়াত। নিশ্চয়ই তাদের কাছে দিবসটি বেদনাবিদুর, হৃদয়বিদারক । তাদের মন বড্ড রিক্ত। কিন্তু তবুও বাবার স্মৃতি অজান্তে জেগে ওঠে মনের কোণে। বাবার জন্য হৃদয়নিংড়ানো শ্রদ্ধা, ভালোবাসার একটুও ভাটা পড়েনি। বরাবরের মতোন অটুট থাকে। বাবা সন্তানের এমন ভালোবাসা সবসময় অটুট, অনড় থাকুক আজীবন। চিরভাস্বর থাকুক। বাবা শাশ্বত,বাবা মহান। কখনো যেন বিস্মৃতির অতলান্তে নিমজ্জিত না যায় এটাই কাম্য, এটাই প্রত্যাশা। বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবার কাছে রক্তিম লাল গোলাপ শুভেচ্ছার বার্তা রইল।

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *