রথের দিনে ‘রাধারাণী’-র খোঁজ আজও করি

Rath Yatra

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

ছোটোবেলায় এক রথের দুপুরে ‘রাধারাণী’ উপন্যাসটি পড়েছিলাম। শ্রীরামপুরের রথের মেলা। রাধারাণীর মা ঘোরতর পীড়িতা। কায়িক পরিশ্রম-জনিত উপার্জন বন্ধ। আহার চলে না। মা রুগ্না, তাই উপবাস; রাধারাণীর আহার জুটল না বলে উপবাস।

আরও পড়ুন: রথ, লোকারণ্য; ইতি আনন্দ

রথের দিন মা একটু সুস্থ হল, পথ্যের প্রয়োজন, কিন্তু পথ্য কোথায়? বঙ্কিমচন্দ্র লিখছেন, “রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে কতকগুলি বনফুল তুলিয়া তাহার মালা গাঁথিল। মনে করিল যে, এই মালা রথের হাটে বিক্রয় করিয়া দুই একটি পয়সা পাইব, তাহাতেই মার পথ্য হইবে। কিন্তু রথের টান অর্ধেক হইতে না হইতেই বড় বৃষ্টি আরম্ভ হইল। বৃষ্টি দেখিয়া লোক সকল ভাঙ্গিয়া গেল। মালা কেহ কিনিল না। রাধারাণী মনে করিল যে, আমি একটু না হয় ভিজিলাম— বৃষ্টি থামিলেই আবার লোক জমিবে। কিন্তু বৃষ্টি আর থামিল না। লোক আর জমিল না। সন্ধ্যা হইল— রাত্রি হইল— বড় অন্ধকার হইল— অগত্যা রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে ফিরিল।”

কতদিন রথের মেলায় গিয়ে বালিকা রাধারাণীদের খুঁজেছি! তাদের কাছ থেকে সুগন্ধি মালা কিনব বলে। ওরা চাঁপা, রজনীগন্ধা, জুঁই ফুলের মালা নিয়ে আজও আসে গ্রাম-শহরের রথের মেলায় মেলায়। এ বছর রথের মেলায় যাওয়া হল না। ওই মালিনীদের কাছ থেকে মালাও কেনা হল না। রথের মেলায় যারা গাছ বিক্রি করতে আসেন, তাদের প্রতি আমার আলাদা একটা মমত্ববোধ কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গের ফুলের হাট-বাজারে এমন কত রাধারাণী দৈনিক ফুলেল-সামগ্রী নিয়ে আসেন। বিক্রি না হলে খালের জলে ফেলে দিয়ে আর্দ্র হৃদয়ে বাড়ি ফেরেন।

আরও পড়ুন: রোগ হলে ওষুধ খাওয়ার চেয়ে যে ওষুধে রোগ হবেই না তা হল যোগ

ফুলের হাটে উঠতি-পড়তির খেলা। বাংলায় ফুল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। বিক্রি না হওয়া ফুলকে প্রক্রিয়াকরণ করে রাখার পরিকাঠামো নেই। ঢক্কানিনাদই বেশি। করোনা পরিস্থিতিতে ফুলচাষিরা প্রভূত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কেবল যাঁরা তুলসীপাতা চাষ করেছেন, তাঁদের খোঁজ করেছে ফুলের বাজার, কারণ তুলসীর ক্বাথ (জলে সিদ্ধ করে প্রস্তুত ঘন নির্যাস বা সার অংশ) করোনা সংক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে, এই বার্তা গেছে নগরে-প্রান্তরে।

বাংলায় তুলসীর ব্যাপক চাষ ও প্রক্রিয়াকরণ যেমন দরকার, তেমনি গাঁদা, নীলকণ্ঠ, পলাশ প্রভৃতি ফুলের পাপড়ি শুকিয়ে তা থেকে ভেষজ রং উৎপাদনের ব্যবস্থা করাও দরকার। নানান ফুল শুকিয়ে ড্রাই-ফ্লাওয়ার ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপক পরিকাঠামো গড়ে ওঠার সুযোগ এ রাজ্যে আছে।

বঙ্কিমচন্দ্র কত বছর আগেই ফুলের বাজারের উঠতি-পড়তির দোলার কাহিনি শুনিয়েছেন, আজও তার সুরাহা হয়নি। ‘রাধারাণী’ উপন্যাসটি প্রথমে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন তিনি; ১২৮২ বঙ্গাব্দে, মোটামুটি ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে। কীভাবে লেখা হল এই উপন্যাস?

বঙ্কিমচন্দ্রের গৃহ-বিগ্রহ ছিল রাধাবল্লভজি। রথযাত্রার দিনটি তাই মহাসমারোহে পালিত হত নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে। এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই। দু’জনের বাড়ি খুব বেশি দূরে ছিল না, নৈহাটি স্টেশন থেকে খুবই কাছাকাছি। রথের দিন বঙ্কিমচন্দ্রের গৃহদেবতাকে বার করে ঘষেমেজে চকচকে করা হত। বাড়ির দক্ষিণে একটা খোলা জায়গায় বেশ একটা মেলা হত, প্রচুর পাকা কাঁঠাল, পাকা আনারস বিক্রি হত, তেলেভাজা-পাঁপড়-ফুলুরির গাদি লেগে যেত, আট-দশখানা বড় বড় ময়রার দোকান বসত— তাতে গজা, জিলিপি, লুচি, কচুরি, মিঠাই, মিহিদানা, মুড়ি মুড়কি, মটর ভাজা, চিঁড়েভাজা, ঘিয়ের খাজা যথেষ্ট থাকত। মেলায় মণিহারী দোকান থাকত অনেকগুলো, তাতে নানা রকম বাঁশি, কাগজের পুতুল, কাঠির উপর লাফ দেওয়া হনুমান, কটকটে ব্যাঙ কিনতে পাওয়া যেত। আর ছিল নানারকমের গাছের কলম। তখনকার দিনে চারা তৈরি ও বিকিকিনি কেমন ছিল, তা কাঁঠালপাড়া রথের মেলার প্রত্যক্ষদর্শী হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিবরণে উঠে এসেছে।

যাঁরা বাগান করতে চান, যাঁরা চারা কিনতে চান, যাঁরা বাগানবিলাসী তাঁদের এক মহাসমারোহ ছিল নৈহাটির রথের মেলা। নারকেল, আম, লেবু, সুপারি, লকেট, গোলাপ জাম, পিচ, সবেদা, ফলসা, গোলাপ, জুঁই, জাতি, বেল, নবমালিকা, কামিনী, গন্ধরাজ, মুচকুন্দ, বক, কুরচ, কাঞ্চন, টগর, সিউলি প্রভৃতি ফল ও ফুলের চারা বিক্রি হত। আট দিন ধরে চলত এই মেলা। বসত পুতুলনাচের আসর; সীতার বিবাহ, লবকুশের যুদ্ধ, কালীদমন প্রভৃতি চল্লিশ-পঞ্চাশ রকমের পুতুল নাচ হত। রথে বহুলোকের সমারোহ ঘটত।

এই মেলার ভিড়েই একটি ছোট মেয়ে হারিয়ে গেছিল ১৮৭৫ সালে। সেবার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র রথের ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। বাচ্চা মেয়েটির আত্মীয়-স্বজনেরা বহু খোঁজ করলেন। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেও অনুসন্ধানে নেমেছিলেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানা যায়, এই ঘটনায় অত্যন্ত আহত হয়েছিলেন বঙ্কিম। ঘটনার দুই মাস পরে ‘রাধারাণী’ উপন্যাসটি লেখেন বঙ্কিম। যদিও ঘটনার বিস্তার অন্যদিকে নিয়ে গেছেন তিনি।

রথের মেলায় নানান ষড়যন্ত্রকারী মানুষের আজও আনাগোনা হয়, সে শহর কলকাতাই হোক, আর বঙ্গদেশের নগরে, গ্রামে। শোনা যায় অনেক সময় দূর থেকে অ্যাসিড ছুঁড়েও মারা হয় মেয়ে মানুষের দিকে, এই হিংস্রতা সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। হিন্দু ধর্মের একটি উৎসব-মুখর দিনে যখন আনন্দ উচ্ছলতা চারিদিকে, তখন নানাভাবে অনুষ্ঠান পণ্ড করার, বিরক্ত করার মানুষ জোটে। মানুষ ভয় পায়; নারী অপহরণ ও নারী-পাচার চক্র পাছে নানান অপকর্ম করে! তাই মেয়ে বালিকার হাত শক্ত করে ধরে রাখে, তারপরই আনন্দ করে রথের মেলায়। কারণ লাভ-জেহাদের ঘটনা অতীতে কম ঘটেনি তো! হিন্দু মেয়েরা সহজ আক্রমণের শিকার।

● লেখক: অধ্যাপক, হর্টিকালচার ফ্যাকাল্টি, বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মোহনপুর। বিশিষ্টতা্: লোকচর্যা ও উদ্যান বিষয়ক লেখালেখি।

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *