স্মরণে অধ্যাপক অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০-২১ জুন ২০২০)

Amalendu Bandyopadhyay

ড. অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে, পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলা বাগনান থানার অন্তর্গত মুগ্ কল্যাণগ্রামে। স্কুলজীবনে এই গ্রামে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫২ সালে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিত নিয়ে এমএসসি। এমএসসি-তে বিশেষ পাঠ্য বিষয় ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান। জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ হয়েছিল তৎকালীন হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় খ্যাতনামা গণিতের অধ্যাপক বিষ্ণুবাসুদেব নারলিকারের কাছে। তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকারের পিতা। বিষ্ণুবাসুদেব নারলিকারের কাছ থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার অনুপ্রেরণা। ১৯৮৯ সাল থেকে আনেকদিন পর্যন্ত কলকাতায় এম পি বিড়লা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ সংস্থার, প্রফেসর অ্যান্ড সিনিয়র সায়েন্টিস হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখানকার জ্যোতির্বিজ্ঞানের পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্সের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ পড়াতেন তিনি। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টারের অধিকর্তা।

আরও পড়ুন: দৃশ্যের জন্ম-মৃত্যু

Amalendu Bandyopadhyay

বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার সর্বোচ্চ সংস্থা হল, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন। এটি প্যারিসে অবস্থিত। এই সংস্থার প্রথম নির্বাচিত ভারতীয় সদস্য তিনি। বিলেতের অত্যন্ত খ্যাতিসম্পন্ন ‘রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’র নির্বাচিত ফেলো হন তিনি। বিলেতে মর্যাদাসম্পন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন-এর নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। সম্মানিত হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনলজির নির্বাচিত ফেলো হিসাবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানকে ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করার জন্য ১৯৯৫ সালে ভারত সরকার তাকে ‘রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ‘সম্মানিত করেন।

আরও পড়ুন: জাতীয় ডাক্তার দিবস, ২০২০

Amalendu Bandyopadhyay

জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত কাজের মাধ্যেমে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের কাজে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে নিযুক্ত থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০১ সালে তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্যগুলিকে সারা ভারতের ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত কুসংস্কারগুলো সাধারণ মানুষের মন থেকে দূর করার অদম্য প্রচেষ্টা— এই দুটি অসামান্য অবদানের জন্য বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৩ সালে তাঁকে ডিএসডি ডিগ্রি প্রদান করে সম্মানিত করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্যগুলো বাংলায় লেখা এবং সেগুলো ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এই অসামান্য অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১২ সালে তাঁকে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ‘জগত্তারিণী’ স্বর্ণপদকে সম্মানিত করে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে এই স্বর্ণপদক সর্বপ্রথম ১৯২১ সালে পেয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারতের পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টারের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন ২০১৩ সালে তাঁকে বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন জি পি চ্যাটার্জী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করেন। পশ্চিমবঙ্গে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের কাজের জন্য বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৩ সালে তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন জয়ন্ত বসু স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করেন। বাংলায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্যগুলো সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য করে লেখা— এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ২০১৪ সালে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন শিব নারায়ণ রায় স্মৃতি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছেন।

Amalendu Bandyopadhyay

টোকিও, ওয়াশিংটন, শিকাগো, লন্ডন, প্যারিস, ব্রাসেলস, সিওল, তাইওয়ান, বেজিং সহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গবেষণাপত্র উপস্থাপনা করেছেন। পঞ্চাশটি ওপর গবেষণাপত্র বিদেশ ও দেশে খ্যাতনামা পত্রিকায় প্রকাশিত। বিশেষ আমন্ত্রণ পেয়ে ২০০৯ সালে, আরব দেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়— বাহরাইন ও আবুধাবিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। সারা ভারতে প্রথম শ্রেণির পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত জনপ্রিয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রবন্ধের সংখ্যা ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে আড়াই হাজারের বেশি। ইংরেজিতে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিনটি, বাংলাতে পাঁচটি। রেডিও দূরদর্শনের জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত অসংখ্য জনপ্রিয় অনুষ্ঠান তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। স্লাইড দেখিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে জনপ্রিয় লেকচার দেওয়া এবং বিজ্ঞানকে গ্রামগঞ্জের জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা ছিল তাঁর নেশার মতো। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর লেকচারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে 8 হাজারের ওপর। এইসব লেকচার দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে সংগৃহীত জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই, স্লাইড প্রজেক্টর, রঙিন স্লাইড, ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার, ছবি দেখানো স্ক্রিন ইত্যাদি কেনার জন্য নিজস্ব অর্থ থেকে প্রায় চার লাখ টাকার ওপর দায়ভার তিনি বহন করেছেন।

Amalendu Bandyopadhyay

৯০ বছর বয়সে ও বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এরকম এক জ্যোতির্বিজ্ঞানীর মৃত্যুতে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের বিরাট ক্ষতি হল।

● নিবন্ধক সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগ, বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজ

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *