ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেট; শুরুর সেদিনের গল্প

1932 Cover

মিত্রাংশু ব্যানার্জ্জী

সৌরভ গাঙ্গুলি, মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি; ভারতবর্ষে থাকা ক’টা মানুষ এই নামগুলো চেনে না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এঁরা একদিকে যেমন সফলতম ক্রিকেটার, অন্যদিকে তেমনি ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন দাপুটে ক্যাপ্টেন। কিন্তু যদি বলি সি কে নাইডু; ক’জন চেনেন তাকে! আজকে যে ভারতবর্ষ ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদ, যে ভারতবর্ষ জানে যে ভারতীয় ক্রিকেট টিম মাঠে দশবার নামলে কমপক্ষে সাতবার জিতে মাঠ ছাড়বে, সেই ভারতীয় ক্রিকেট দলের সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে কিছু কিছু গল্প বলব। আর সি কে নাইডু কে? তিনি ছিলেন সেই সৃষ্টি ইতিহাসের কর্ণধার, ১৯৩২ সালে প্রথমবারের জন্য টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নামা ভারতীয় দলের অধিনায়ক।

আরও পড়ুন: আইপিএলের জন্য পিছু হঠতে নারাজ পিসিবি: সময়মতোই হবে এশিয়া কাপ, জানাল পিসিবি সিইও

এক নতুন ইতিহাসের সূচনা। ভারতীয় টিমের লন্ডনে পদার্পণ। ভিক্টোরিয়া স্টেশন লন্ডন ১৯৩২

ক্রিকেট মূলত ব্রিটিশদের খেলা হলেও অচিরেই তা সারা পৃথিবীর খেলা হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ভারতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দলিল থেকে জানা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ক্রিকেট খেলা হয়েছিল গুজরাতের কচ্ছে ১৭২১ সালে। যদিও এদেশে ক্রিকেটের সূচনা ঘটেছিল ব্রিটিশদের হাত ধরেই। তারা নিজেদের অবসর কাটানোর জন্য কলকাতায় ১৭৯২ সালে প্রথম একটি ক্রিকেট ক্লাবের সূচনা করে। নাম রাখা হয় ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব ক্লিপার্স। ১৭৯৯ সালে দক্ষিণ ভারতের শ্রীরঙ্গপত্তমে তৈরি হয় এরকম আরও একটি ব্রিটিশ ক্রিকেট ক্লাব। এভাবেই শুরু। প্রথমদিকে রাজপরিবার, জমিদার, ব্যারিস্টার, ডাক্তার প্রভৃতি সামাজিক প্রতিপত্তি সম্পন্ন মানুষরা ব্রিটিশদের আমন্ত্রণে এই এই খেলা শেখা বা অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও আস্তে আস্তে এদেশের অনেক মানুষের মধ্যেই ক্রিকেটের বীজ বপিত হয়ে যায়। আর্কাইভের রেকর্ড অনুযায়ী ৩ মার্চ ১৮৪৫ সালে ভারতীয় সেপাই এবং ইউরোপিয়ান সিপাহিদের মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটে একটি ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয়েছিল। তবে এগুলো সবই ছিল ব্রিটিশ উদ্যোগে।

ঐতিহাসিক টেস্টের কিছু বিরল মূহূর্ত

কিন্তু এহেন চিত্তাকর্ষক খেলা থেকে ভারতের মতো খেলাপাগল দেশের দামাল ছেলেরা কত দিনই বা দূরে থাকতে পারে! আর তাই ১৮৪৮ সালে মুম্বইয়ে পার্সি সম্প্রদায় খুলে ফেললেন প্রথম ভারতীয় ক্রিকেট ক্লাব। নাম রাখা হল পার্সি ওরিয়েন্টাল ক্রিকেট ক্লাব। ১৮৬৪ সালে দেশে শুরু হল প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতার। সেখানে প্রথম অংশ নিয়েছিল দুই প্রেসিডেন্সি; কলকাতা এবং মাদ্রাজ। ১৮৭৭ সাল থেকে মুম্বই প্রেসিডেন্সির অঞ্চলগুলোতে শুরু হয়েছিল এই প্রতিযোগিতার। নাম রাখা হয়েছিল বম্বে ট্র্যাঙ্গুলার, যা পরবর্তীতে নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়েছিল বম্বে কোয়াড্র্যাঙ্গুলার।

আরও পড়ুন: ২৪ জুন: দীর্ঘতম টেনিস ম্যাচটি ১০ ​​বছর আগে শেষ হয়েছিল, ম্যাচের আয়ু ছিল তিনদিন

ভারতীয় পেস ব্যাটারি; জাহাঙ্গির খান (বাম দিকে) এবং মহম্মদ নিসার

ভাববেন এসব কেন বলছি! গল্প তো ভারতের প্রথম টেস্টের বলব বলেছিলাম। এই কারণেই বলছি যে, সময়কালটা একটু দেখুন। ভারতে ব্রিটিশরা তখন নিজেদের ভিত শক্ত করতে ব্যস্ত। পলাশি এবং বক্সারের যুদ্ধে বাংলাকে তারা ইতিমধ্যেই পদানত করেছে। ভিনসেন্ট স্মিথের ভাষায় স্বাধীন বাংলার স্বপ্নকে কোম্পানির বাহিনী বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। দক্ষিণে এবং পশ্চিমে যথাক্রমে ইঙ্গ-মহীশূর এবং ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ চলছে পুরোদমে। আর তারই মাঝে ভারতে আবির্ভাব ঘটছে ক্রিকেটের। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে জাতীয়তাবোধের জন্ম ঘটলেও ১৮৪৫-এ যখন ব্রিটিশ সেনার ভারতীয়রা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নামছে তখন তারা মাঠেই বুঝে নিতে চাইছে তাদের উপর ঘটা নানা বৈষম্যের হিসেব নিকেশ। তাকে জাতীয়তাবাদী অনুভূতি না বললেও অপমানের প্রতিশোধ স্পৃহা তো বলাই যায়। ফল যাই হোক। আজকে হেলায় বিপক্ষকে হারিয়ে ভারতীয় দল যেভাবে সিংহের মতো মাঠ ছাড়ে তার সূচনা ঘটেছিল হাজার ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ পরাজয়ের গ্লানি থেকেই।

তখনকার দিনে লর্ডসের ময়দান

এভাবেই কেটে যেতে লাগল সময়ের চাকা। ভারতে তখন জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘেটেছে। মহাত্মা গান্ধির খিলাফত অসহযোগ, আইন অমান্যের ঢেউ যেন মানুষের উপর দুর্বার প্লাবনের মতো বয়ে চলেছে, গান্ধিজির নির্দেশে প্রথম গোল টেবিল বৈঠক বয়কট করা হয়েছে। গান্ধি-আরউইন আলোচনার দিকে গোটা দেশ তাকিয়ে আর ঠিক এই আবহেই সদ্য পাকাপাকি ক্রিকেট খেলা দেশ হিসেবে অনুমোদন পাওয়া ভারতের ইংল্যান্ড সফর, তার প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলতে। গান্ধিজির প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল তখন ছোট্ট একটা কথা না বললেই নয়। ‘জাতির জনক’কে সবাই ব্যারিস্টার এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্ব হিসেবে চিনলেও অনেকেই যেটা জানেন না, সেটা হল তিনি কিন্তু ক্রিকেটটাও মন্দ খেলতেন না। রাজকোটের রাজকুমার কলেজে তিনি এবং কে এস রঞ্জিত সিং (পরবর্তীতে যাঁর নামে রঞ্জি ট্রফি) ছিলেন ব্যাচ মেট। সেখান থেকেই ক্রিকেটে তাঁর আগ্রহ জন্মায়।

সি কে নাইডু, দ্য ইন্ডিয়ান ওয়াল অফ ১৯৩২

যাইহোক ফিরে আসি আসল গল্পে। ১৯২৮-এর শেষের দিকে বিসিসিআই-এর আবির্ভাব ঘটার পর ১৯৩২-এ ভারতীয় ক্রিকেট দল তার প্রথম টেস্ট খেলার আকাঙ্ক্ষায় পাড়ি জমায় সুদূর ইংল্যান্ডে। ১৯১১ সালে অবশ্য একবার ভারতীয় ক্রিকেট দল ইংল্যান্ডে পাড়ি জমালেও আইসিসির স্বীকৃতি না থাকায় সেই সময়ে কোনও টেস্ট ম্যাচ তারা খেলতে পারেনি। খেলেছিল ১৪টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। জিতেছিল ২টি, ড্র ২টি আর পরাজয় ১০টিতে। ফলাফলের নিরিখে ১৯১১-র ভারতীয় ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ড সফর গুরুত্বপূর্ণ না হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের উচ্চশ্রেণির হিন্দু প্রাধান্য যুক্ত এই দলে জায়গা করে নিয়েছিল তথাকথিত অচ্যুত শ্রেণির দুই ভাই, বালু এবং শিবম পালওয়াঙ্কার। এই টিম গঠন কালে সিলেক্টররা স্থাপন করেছিলেন এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। বলেছিলেন, ক্রিকেট মাঠে ট্যালেন্ট কথা বলে জাতপাত নয়। নিজের সিলেকশনের প্রতি সুবিচার করেছিলেন বাঁ-হাতের স্পিন বল করা বালু। তিনি ২০.১২ গড়ে ৭৫টি উইকেট নিয়েছিলেন, তাঁর বেস্ট ফিগার ছিল ১০৩/৮। বহু ব্রিটিশ ক্লাব তাঁকে ইংল্যান্ডের থেকে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু বালু তা করেননি।

পালওয়াঙ্কার বালু, ভারতের প্রথম দলিত ক্রিকেটার

যাইহোক, ১৯৩২ সালের এই ইংল্যান্ড সফর ‘নিখিল ভারত’ ক্রিকেট টিমের পক্ষে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তিনটে টেস্ট খেলার পরিকল্পনা থাকলেও বৃষ্টির জন্য দু’টি টেস্ট বল মাঠে গড়ানোর আগেই বাতিল হয়ে যায়। ফলত ইংল্যান্ড এবং ‘নিখিল ভারতের’ মধ্যে একটিই মাত্র টেস্ট খেলা হয়েছিল। তখন ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা আজকের মতো ৩০ ডিগ্রি ছুঁত না। ফলে এক প্রকার মনোরম পরিবেশের মধ্যেই লর্ডসের মাঠে শুরু হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ। টস জিতে ইংল্যান্ড টিম তার পরিচিত পরিবেশের প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওপেন করতে নামেন সেই সময়ের বিশ্ব সেরা ওপেনিং ব্যাটসম্যান হারবার্ট শাটক্লিপ। সেই সময় তাঁর টেস্ট গড় ছিল ৬০.৭৩, ইংল্যান্ডের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং বিশ্বে ষষ্ঠ। তাঁকে সঙ্গ দিতে নেমেছিলেন পার্সি হোমস। হারবার্ট এবং পার্সি মিলে ততদিনে ওপেনিং জুটিতে ৫৫৫ রান করে ফেলেছেন। যা ছিল তখন বিশ্বরেকর্ড। অন্যদিকে, নাইডু বল তুলে দিয়েছিলেন মহম্মদ নিসার এবং অমর সিংয়ের হাতে। জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ গুটিকয় ভারতীয় দর্শকদের ২৫ হাজার ব্রিটিশ দর্শকের মাঝে নিতান্তই সংখ্যালঘু লাগছিল।

প্রতিযোগিতা খাতায়-কলমে অসম মনে হলেও নাইডু মাঠে তা প্রকাশ পেতে দেননি। নিসারের হাতে বল তুলে দিয়ে তিনি হার্ভার্ডের জন্য বিছিয়ে দিলেন তিনটে স্লিপ এবং দু’টি ফরওয়ার্ড শর্টলেগ। নিসারের প্রথম বল গুড লেন্থ ইনসুইংকে মিড উইকেটে ঠেলে দিয়ে হারবার্ট তিন রান নিতেই ইংল্যান্ডের দর্শক হাততালিতে মাঠকে সরগরম করে তুলল। পরের বলটা ছিল একটু খাটো লেন্থের। পার্সি তাঁকে গালির দিকে ঠেলে দিয়ে এক রান নিলেন। ইনিংসের তৃতীয় বল, তখনও সকলে সিটে বসে পারেননি, হঠাৎ লর্ডসের মাঠ জুড়ে যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা নেমে এল, তারই মধ্যে গুটিকয় ভারতীয়র যারপরনাই উল্লাস। তারাও যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না নিসারের বাঁক খাওয়ানো ইন সুইঙ্গিং ইয়র্কারে হারবার্টের লেগ স্টাম্প মাটিতে শুয়ে পড়েছে। এই ঘোর ঠিক করে কাটতে না কাটতেই যেন আবার এক ইন্দ্রপতন। এবারে নিসারের বল পার্সির মিডিল স্টাম্প ছিটকে ফেলে দিয়েছে। ফল ১১ রানে ২ উইকেট। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ তো দূরের কথা অতি বড় ভারতের সাপোর্টারও ইংল্যান্ডের এহেন সূচনার কথা ভাবতে পারেনি। এখানেই শেষ নয়, ইংল্যান্ডের দলগত রান যখন ১৩ লাল সিংয়ের নিখুঁত থ্রোতে ভেঙে যায় উলি-র স্টাম্প। সেই উলি, যনি পরবর্তীতে হল অফ ফেমে জায়গা পেয়েছেন। ইংল্যান্ডও দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না, ওয়েলি হ্যামন্ড এবং ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক ডগলাস জারদিন ডাগ নিসার, অমর সিং এবং জাহাঙ্গির খানের আগুন ছোটানো পেস বোলিং সামলে ৮২ রানের একটি পার্টনারশিপ যোগ করেন। অমর সিং হ্যামন্ডকে যখন বোল্ড আউট করেন, ইংল্যান্ডের স্কোর তখন ১০১ রানে ৪ উইকেট। ৫০ রানের মাথাতেই ইংল্যান্ড হারিয়ে বসে তাদের আরেক বিশ্ববিখ্যাত ব্যাটসম্যান এডি পেইন্টারকে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যেন খেই হারিয়ে ফেলে। উইকেট কিপার নাভলে ব্রিটিশ ব্যাটসম্যান লিস এইমসের একটি সহজ স্টাম্পিং মিস করেন এবং সেই এমসই ৬৫ রানের একটি ইনিংস খেলে চলে যান। নির্দ্বিধায় এটাই ছিল এই টেস্ট ম্যাচের মোর ঘোরানো মুহূর্ত। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ২৫৯ রানে। এই ইনিংসে ইংল্যান্ডের পক্ষে সর্বোচ্চ রান করেন ক্যাপ্টেন জারদিন ৭৯, এবং ভারতের পক্ষে মহম্মদ নিসার তুলে নেন পাঁচটি উইকেট।

ম্যাচের সম্পূর্ণ স্কোর

ভারতীয় ওপেনার নাউমাল জাওমাল এবং জনার্দন নাভলে প্রথম দিনের মিয়োনো আলোতে ভারতের ইনিংস শুরু করতে লর্ডসের মাঠে নামেন। এবং ইংল্যান্ডের আগুন ঝরানো নতুন বলের স্পেলকে সামলে প্রথম দিনের শেষে ভারতীয় স্কোরবোর্ডে বিনা উইকেটে ৩০ রান যোগ করেন। ভারত তার দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু করে প্রথম দিনের শেষের মেজাজেই এবং সেই সাবলীল ব্যাটিং লাঞ্চ অবধি চলতে থাকে। ততক্ষণে অবশ্য দুই ওপেনারকে হারিয়েছে ভারত। ক্রিজে রয়েছে ভারতের দুই শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান সি কে নাইডু এবং ওয়াজির আলি। কিন্তু লাঞ্চের পরে যেন পালাবদল ঘটতে থাকে। ইংল্যান্ডের দুই পেস বোলার ভয়েস এবং বোয়েস ভারতের অনভিজ্ঞ মিডিল অর্ডার এবং টেলেন্ডারদের অনায়াসেই প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠিয়ে দেন এবং ভারতের স্কোর ১৮৯ রানে শেষ হয়ে যায়। ইংল্যান্ড পেয়ে যায় ৭০ রানের এক মহামূল্যবান লিড।

উলি রান আউট হওয়ার আগের মূহূর্তে। বাজপাখির মতো বলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন লাল সিং

ইংল্যান্ড সেকেন্ড ইনিংস তুলনামূলকভাবে ভালো শুরু হলেও জাহাঙ্গির খান এবং অমর সিংয়ের বোলিং নৈপুণ্যে অচিরেই স্কোর দাঁড়ায় ৬৭ রানে ৪ উইকেট। কিন্তু আগের ইনিংস যেখানে শেষ করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই খেলা ধরেন অধিনায়ক জারদিন এবং তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন পেইন্টার, রবিনস এবং ব্রাউন। মূলত এঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসের স্কোর যখন ২৭৫, তারা ভারতকে ৩৪৬ রানের লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে ইনিংস ডিক্লেয়ার করে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের পক্ষে এই রান তাড়া করা ছিল এক অসম্ভব কাজ। ভারতীয়রা ব্যাটিং শুরু করলেও এবারে যেন বিপর্যয় আরও তাড়াতাড়ি নেমে আসে। অচিরেই ভারতীয় স্কোর ১০৮ রানে ৭ উইকেট হয়ে পরে। এই পরিস্থিতিতে একটা ঝোড়ো ইনিংস খেলে যান অমর সিং। তিনি সেই সময়ের বিখ্যাত বোলার রবিনসকে একটি ছয় সহ এক ওভারে ১৯ রান নিয়ে এবং ৪৫ মিনিট ব্যাট করে ব্যক্তিগত ৫১ সহ ৭৪ রানের একটি পার্টনারশিপ গড়েন লাল সিংকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু তখন সবই প্রায় শেষ হয়ে গেছে। শেষ চেষ্টাও বিফলে যায়। কারণ ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস ১৮৭ রানেই গুটিয়ে যায়। ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল ১৫৮ রানের একটি বিরাট জয় লাভ করে। হেরে গেলেও এই ম্যাচ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। কারণ ভারতীয় বোলিং এবং ফিল্ডিং দেখে সকলেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ভারতের পক্ষে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ছিল, তৎকালীন বিখ্যাত ব্যাটসম্যান নবাব ইফতিখার আলি খান পতৌদি এবং দলীপ সিংয়ের না খেলাটা। তাঁরা ইতিপূর্বে ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে জায়গা পেয়েছিলেন। তাই তাঁরা হাজার ১৯৩২ সালে ‘নিখিল ভারত’ ক্রিকেট দলের হয়ে খেলতে অস্বীকার করেন। অনেকেই মনে করেন এই দুই ব্যাটসম্যান যদি ভারতীয় দলে থাকতেন, তাহলে যে মানের বোলিং এবং ফিল্ডিং ভারত করেছিল তাতে এই দুই ব্যাটসম্যানের চওড়া ব্যাট যোগ হলে ভারত হেলায় ইংল্যান্ড দলকে হারাতে পারত। তবে এ বিতর্কে না ঢোকাই ভালো।

সেদিন লর্ডসে ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট চলাকালীন ইংল্যান্ডের ডগলাস জারদিন অসামান্য ব্যাটিংয়ের নিদর্শন রেখে করেছিলেন ৭৯ ও ৮৫

যদিও ভারতীয় দল ইংল্যান্ড সফরে সেবার মোট ৩৭টি ম্যাচ খেলেছিল, যার মধ্যে ২৬টি ছিল প্রথম-শ্রেণির ম্যাচ। যদিও ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার আগে পোর বন্দরের মহারাজাকে এই দলের অধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তিনি সেভাবে কোনও ম্যাচে খেলেননি। কার্যকরী অধিনায়ক হিসেবে সি কে নাইডু ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই ম্যাচগুলির মধ্যে ভারতীয় দল ৯টিতে জয়ী, ৮টিতে ড্র এবং ৯টিতে পরাজয় স্বীকার করে। ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দলনেতা সি কে নাইডু অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন এবং সবক’টি ম্যাচ খেলে ৪০.৪৫ গড়ে ১৬১৮ রান করেন। ইংল্যান্ড সফরে আরও একজন খেলোয়াড়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তিনি হলেন ডি এন দেওধর। যাঁর নামে আজকের দেওধর ট্রফি। সেই সময় তাঁর ৪০ বছর বয়স হয়ে গিয়েছিন বলে সিলেক্টররা তাঁকে দলে নিতে অস্বীকার করেন। অথচ তারও ৮ বছর পর হাজার ১৯৩৯-৪০ এবং ৪০-৪১’এ পর পর দুই সেশনে দেওধর মহারাষ্ট্রকে রঞ্জি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন করান। এখানেই হয়তো পাঠকরা তুলনা আনার চেষ্টা করবেন সৌরভ গাঙ্গুলি বা মহেন্দ্র সিং ধোনির। বয়স কি সত্যিই একটা বড় ফ্যাক্টর! নাকি ‘এজ ইজ জাস্ট অ্য নম্বর।’

লর্ডসে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাইডু

সাউদার্নটন ‘উইজডেন’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, “…the tour proved of immense value to the Indians and the lessons learnt will no doubt the past on the Indian cricket of the future. ” আজ সেই ২৫ জুন। বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসে ভারত আজ রাজ করছে তার চওড়া ব্যাট এবং ক্ষুরধার বোলিং ফিল্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে। তবু গাছ যেমন যত বড় হয়, তার ডালপালা বা ঝুড়িগুলো তত নিচের দিকে নেমে আসে। ঠিক তেমনই আমাদেরও উচিত ভারতের ক্রিকেট খেলার সূচনা পর্বটাকেও মাঝেমধ্যে মনের মণিকোঠা থেকে বার করে ধুলো ঝেড়ে নেড়েচেড়ে দেখা। কারণ জ্ঞানী মানুষরা অনেকদিন আগেই বলে গেছেন— “…never forget your root.”

ফেরার পালা। ভিক্টোরিয়া স্টেশন, লন্ডন ১৯৩২

তথ্যসূত্র

  1. A corner of a Foreign Field— Ram Chandra Guha.
  2. Indian Mirror— History of Indian Cricket.
  3. Times of India— The link between Gandhi and Cricket.
  4. Probashi online.
Facebook Twitter Print Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *