হুল দিবসকে স্মরণ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের তরফে দু’দিনের ওয়েবিনার আয়োজন

মৌনী দেবনাথ, ইন্দ্রজিৎ মেঘ

সাঁওতালদের অস্তিত্ব কোনও নির্দিষ্ট স্থান বা সময়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। এক অসংবদ্ধ সময়ে আঞ্চলিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক রূপান্তরের কিনারে ছিল তাদের টিকে থাকার লড়াই। সাঁওতালদের হুল বিদ্রোহ হয়েছিল ১৮৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায়। যদিও কেবলমাত্র একটিমাত্র ঘটনা বা তারিখে হুল বিদ্রোহকে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে সাঁওতাল হুল বিদ্রোহের বিচারবিভাগীয় এবং ঔপনিবেশিক অফিসের ঐতিহাসিক নথি থেকে বোঝা যায় যে, সাঁওতালদের এই বিদ্রোহের কোনও সুস্পষ্ট শুরু বা শেষ চিহ্নিত করা যায়নি। হুল বিদ্রোহকে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টায় ঔপনিবেশীয় অফিসাররা তাঁদের রেকর্ডে কেবল চার নেতা সিধু, কানহু, চাঁদ এবং ভৈরব, একই পরিবারের ভাইদের তরফে চালিত সংগ্রাম হিসেবে কেন্দ্রীভূত রাখতে চেয়েছেন।

আরও পড়ুন: বব ডিলানের কণ্ঠে এবার জর্জ ফ্লয়েড

হুল বিদ্রোহের আরম্ভ সম্বন্ধে বিভিন্ন মৌখিক বর্ণনা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যে বংশানুক্রমে চলে আসছে। হুল বিদ্রোহে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, কারাবন্দিত্ব এবং স্থানচ্যূতি ঘটেছিল। সাঁওতালরা অর্থনৈতিক এবং সমাজিক অবস্থার মধ্যে চূড়ান্ত বিপন্ন হয়ে উঠেছিল। ১৭৯৩ সালে লর্ড রানি কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাদের উপর অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল। সিপাহি বিদ্রোহের ঠিক দু’বছর আগে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা সোচ্চার হয়েছিল। ১৮৫৫ সালে সাঁওতালরা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল তাদের অধিকার আদায়ের জন্য। তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল ইংরেজদের শাসন-শোষণ, সুদখোর মহাজন ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সৈন্য ও তাদের দোসর অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। সান্তাল হুলের ইতিহাস থেকে জানা যায়, দামিন-ই কোহ ছিল সাঁওতালদের নিজস্ব গ্রাম, নিজস্ব দেশ।

যাইহোক বাস্তব ছিল ভিন্ন। সাঁওতাল পরগনা ছিল জাতিগত এবং ধর্মীয় দিক থেকে সম্পূর্ণ বিচিত্র একটি জেলা। কিন্তু সাঁওতালরা তাদের নিজস্ব গ্রাম চায়নি। তারা হিন্দু জাতি এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী উপজাতিদের সান্নিধ্য চেয়েছিল। সাঁওতাল অভ্যুত্থানের সময় থেকে তাদের নিজেদের এবং প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন লোকাচার, গান, কবিতা এবং নাটকে হুলকে সাঁওতাল সচেতনতার ইতিহাসে বর্ণিত এবং স্মৃতিচারিত হয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের তরফে দু’দিনের ওয়েবিনার আয়োজন করা হচ্ছে হুল দিবসকে স্মরণ করে। দু’দিন ব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সেমিনার, Revisiting Hul – The Santal Rebellion of 1855-এর উদ্দেশ্য হল ১৮৫৫ সালে হুল বিদ্রোহ এবং বর্তমান বিষয়ক অবস্থার সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতা বোঝা। তাছাড়াও এই সেমিনারে ইতিহাস এবং ইতিহাস চর্চার বিভিন্ন ধারা বিবরণের পাশাপাশি এই বিদ্রোহ, প্রগতিবাদ এবং ঐতিহাসিক ঘটনার পুনরুজ্জীবনের উপর আলোকপাত করবে।

আরও পড়ুন: বছর পঁয়তাল্লিশ পরে, চুনীবাবুর তীর্থপতির ট্রফি-ঘরে…

১৮৫৫ সালের ৩০ জুন বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৮৫৬ সালের নভেম্বরে শেষ হয়। সাওতাঁলরা তির-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করলেও ইংরেজ বাহিনীর ছিল বন্দুক ও কামান। তারা ব্যবহার করেছিল ঘোড়া ও হাতি। এ যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা বীরগতি প্রাপ্ত হন। সাঁওতাল বিদ্রোহের লেলিহান শিখা ব্রিটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধে সিধু-কানহু-চাঁদ ও ভৈরব পর্যায়ক্রমে নিহত হলে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষ হয়। বিদ্রোহের অবসান ঘটে। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন প্রায় ৩০ হাজার সাঁওতাল কৃষক বীরভূমের ভগনাডিহি থেকে সমতলভূমির উপর দিয়ে কলিকাতাভিমুখে পদযাত্রা করেন। ভারতের ইতিহাসে এটাই প্রথম গণ পদযাত্রা। আগামীকাল সেই ৩০ জুন। দিনটিকে বর্তমানে হুল দিবস হিসাবে পালন করা হয়। হুল দিবস উপলক্ষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের তরফে ২৯ এবং ৩০ জুন আয়োজিত সেমিনারে বক্তা হিসাবে উপস্থিত থাকবেন রুবি হেমব্রম, মারুনা মুর্মু, শিবু সরেন, রেজিনা হাঁসদা, মহাদেব হাঁসদা, মেরিন ক্যারিন, যোগেন্দ্রনাথ মুর্মু এবং নিশান্ত চোকসী।

অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকী দেশের অন্যত্র বা বিদেশে বসবাসকারী অসংখ্য ইতিহাস অনুরাগী মানুষ এই ওয়েবিনারে নাম নথিভুক্ত করেছেন। উদ্যোক্তাদের তরফে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে ই-মেলের মাধ্যমে এই ওয়েবিনারে প্রবেশের পাসওয়ার্ড ও আইডি পাঠানোর পাশাপশি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এটি ইউটিউব ও ফেসবুকে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যবস্থা করতে চলেছেন।

Facebook Twitter Print Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *