চলুন কফি ক্ষেতে যাই

Coffie

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

আমার বাগানের গাছগুলিতে প্রতিবছর প্রায় একসঙ্গেই ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট সাদা সাদা বাসমতী ফুল ছেয়ে থাকে, সুগন্ধে বাগান মথিত হয়। তারপর সেই ফুল জন্ম দেয় সমসংখ্যক কচি কফি ফলের। দীর্ঘ সময় ধরে ডাগর হয় সেই সব সবুজ ফল, কচিসবুজ রং হয় কালচে সবুজ। তারপর সাদাটে-গোলাপি থেকে সিঁদুরে লাল রং। এই তো গাছ নেমে গেছে, সময় হয়েছে সব টুকিয়ে নেবার! সব ফল তো একই রকম পুষ্ট থাকে না— তাই কারোর রং ধরতে সময় লাগে। ভুলবশত তোলা না হলে গাছেই ফলের লাল রং রোদে জ্বলে কৃষ্ণবর্ণের হয়ে যায়। বোঁটা আলগা হয়ে গাছের তলাতেই পড়ে থাকে অনেক ফল, উড়ো মাটি এসে ঢেকে দেয় তাদের, আর জলীয় ছোঁয়া পেলেই কলকলিয়ে ওঠে কফির নতুন চারা।

*

“সেখানে যে কফি ফলে আর চেরী গাছে যে টুকটুকে লাল রঙের বাহার ধরে
তা আমারই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, যা জমে কঠিন হয়েছে।
কফিগুলিকে ভাজা হবে, রোদে শুকুতে হবে, তারপর গুঁড়ো করতে হবে
যতক্ষণ না তাদের গায়ের রঙ হবে আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙে
ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।”

আমি আমার কফির গাছের কাছে দাঁড়াই আর কানে ভেসে আসে কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠে বহুশ্রুত এক অসামান্য কবিতার আবৃত্তি। নিগ্রো কবি আন্তোনিও জাসিনটো-র লেখা ‘সেই মানুষটি, যে ফসল ফলিয়েছিল’, কবিতাটির অনুবাদক ছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

*

গাছ থেকে পেড়ে আনলেই তো হবে না, দিনের পর দিন কড়া রোদে শুকিয়ে ঝুনঝুন করে ফেলতে হবে যাতে বাদামি ও কালো রং সেঁটে যায় ফলের গায়ে।

আমার কফির pod-গুলো তো প্রস্তুত হল। এবার বস্তায় ভ’রে ছোট বাঁশের মুগুর দিয়ে রগড়ে, পিটিয়েও দেখা গেল খোসা থেকে বাদামকে বের করা যাচ্ছে না। এবার আমার বউ আর তার বান্ধবী জাঁতায় পিষতে গিয়ে দেখল জুতসই নয়। এবার জাঁতার ওপর রেখে নোড়া দিয়ে সেই অসাধ্য সাধন করে ফেলল স্বল্পশ্রমেই। খোসা ভেঙে বেরিয়ে আসতে লাগল দানা দানা অভ্রের মতো কফি বীনস। এরপর ঝাড়াই পর্ব, কুলোর বাতাস দিয়ে কালো খোসা, ভেতরের সাদা চোকলা আর গুঁড়ো ময়লা ফেলে দেওয়া দানা বের করার মতোই শ্রমসাধ্য। বাছাই করতে হবে না হলে কিছু কুঁড়ো কিছু নষ্ট দানা থেকে যেতে পারে! এবার দেখা গেল কেজি দশেক এই পরিক্রমা-শেষে দাঁড়াল মাত্র কেজি তিনেকে। তবে এই পুরো পর্ব জুড়ে কফির মাদক গন্ধ ‘খাবো-খাবো’ ভাবটা উসকে দিতে জুড়িহীন।

কফি বীনগুলোকে আরও রোদ খাইয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার আটা-চাকি কলে। কারণ এগুলোকে ছাতুর মতো মিহি করে পেষাই করা দরকার। বাড়িতেও করা যায়, হামানদিস্তায় ভেঙে নিয়ে তবেই গ্রাইন্ডার-মিক্সার মেশিনে ফেলে কয়েকবারের চেষ্টায় মিহি করা সম্ভব। ফলে সময় ও শ্রমসাপেক্ষ। অন্তিম পর্বে বারে বারে চেলে আরও মিহি করে নেওয়া। বাজারি চালুনির থেকে অনেক ভালো প্রাচীণ পদ্ধতি— সাদা ধুতির দু’প্রান্তের খুঁট দু’দিকের খুঁটিতে শক্ত করে বেঁধে কাপড়ের মাঝখানে মুঠো মুঠো কফিগুঁড়ো ঢেলে বাটির উলটো পিঠ দিয়ে ঘসলেই নীচে সাদা কাগজের ওপর ঝরতে থাকে বাদামি ধুলোর মতো কফি আর বাতাসে উড়তে থাকে কফির দামি ঝিম ধরানো সুঘ্রাণ।

বর্ষব্যাপী অল্প অল্প শ্রম পুঞ্জীভূত করে পাওয়া যায় ৫০০ গ্রামের মতো পানের জন্য প্রস্তুত কফি। নিজের শ্রম, সময়, পরিচর্যা ও অর্থব্যয় থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা দিয়েই বোঝা যায় কফি কত দামি! ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চাষ, ফলসংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদির জন্য অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজন যন্ত্র কেনা, মানে অর্থবিনিয়োগ। এর সঙ্গে যুক্ত হবে সর্বগ্রাসী লাভের লোভ। এইভাবেই শৌখিন ফসল cash crop আখ্যা পেয়ে যায়! বাগিচা মালিক পায় ক্যাশ আর মজদুর কেশে বেড়ায় অনাহারক্লিষ্ট যক্ষ্মায়।

সারা পৃথিবী জুড়ে মূলত দু’টি প্রজাতির অর্থাৎ Coffea robusta Coffea আর Coffea arabica চাষ করা হয়। আমি তো কফি ‘চাষ করি আনন্দে’! বছর ত্রিশেক আগে জলপাইগুড়ির বন্ধুর বাড়ি থেকে ২০টি লাল পাকা ফল/বীজ এনেছিলাম। জানতাম না কোন ভ্যারাইটির বীজ সেগুলো। কফি চাষের জন্য উৎকৃষ্ট পাহাড়ি আর্দ্র বেলে মাটি যার জন্য দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলির অনুসরণে উত্তর-পূর্বের ‘সাত বোনের রাজ্য’গুলোতে বিশেষত অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরাতে কফি চাষ যথেষ্ট বেড়েছে। কফি চারা তৈরি হয় পাকা ফলকে শুকিয়ে ঝুরো মাটিতে/ বালিতে বসিয়ে। আমি শুকনো বীজগুলোকে বালিতে বসিয়ে দারুণ সাফল্য পেয়েছিলাম, ২০তে ২০টাই জার্মিনেট করেছিল। বন্ধু-বান্ধব অত্যুৎসাহে আমার কফি চারাগুলো নিয়ে যায়, আমার কাছে খান পাঁচেক চারা থেকে যায়। তারাই ক্রমে সোমত্থ হয় আর বছর বছর অজস্র ফল প্রসব করতে থাকে। আমার কফিপরিবার ক্রমশঃ ফুলেফেঁপে উঠেছিল। আনন্দ ছিল কফি-বাগান ঘিরে।

*

অথচ আনন্দ যে কফি উৎপাদক দেশ ইথিওপিয়াতে কখনোই বিরাজ করে না! সেখানকার বাগিচাগুলোর দাসপ্রতিম কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও তাঁদের দারিদ্র্য এক জীবনে ঘোঁচে না! নিরক্ষীয় ইথিওপিয়ার কফি-বাগিচার মালিকদের ক্যাশক্রপ চাষের জন্যে পুরো দেশটাকে খরাক্লিষ্ট বুভুক্ষু মানুষের দেশ-রূপে চিহ্নিত করে দিল বিশ্ব মানচিত্রে। খরাক্লিষ্ট কৃষ্ণমানবদের এই বুভুক্ষা দেখে বিশ্ববাসী নাকি উদ্বেল হয়ে ওঠে! তাই প্রথম বিশ্বের কিছু বিবেক মানুষ গড়ে তুলেছিলেন সংগঠন: USA for AFRICA— সামনে থাকলেন বিতর্কিত পপস্টার ‘মাইকেল জ্যাকসন’। তিনি গাইলেন নাম-গানটি ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’, ১৯৮৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হল একই নামের গানের অ্যালবামটা (১০টা গানের সংকলন)।

এটাও স্মরণগ্রাহ্য থাকুক যে, ওই একই সময় ওড়িশার কালাহান্ডি সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল খরায় পুড়ছিল। ১৯৮৬ সালে গড়ে উঠল W.B. Organising Committee for Sport Aid India for Drought Stricken Children of Africa— ক্যাসেটে ছিল ১০টি গান। জ্যাকসনের গানটার বঙ্গানুবাদক শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও সংগীত পরিচালক রুমা গুহঠাকুরতা।

এটাও জানা জরুরি যে, উভয় ক্ষেত্রেই বিক্রয়লব্ধ অর্থে খরাক্লিষ্ট মানুষের ত্রাণের অঙ্গীকার ছিল। এবং উভয় ক্ষেত্রেই ‘মানবিকতা’র সম্প্রসারণের আয়ু আমার নজরে পড়েছিল বড়জোর দু’টি বছর। তারপর? কালাহান্ডি একইরকম ক্ষুধার রাজ্য থেকে গেছে! ইথিওপিয়াতে এখনও কালা আদমিদের অসীম যন্ত্রণা গায়ে মেখেই কফি ফলে!

*

আমার বাগিচার কফির রং দেখতে বা স্বাদ চাখতে পারেন সাক্ষাতে। সৌগন্ধ অনুষঙ্গ দিয়ে বোঝাতে পারি— দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি অথবা আরাকু উপত্যকায় বেড়াতে গেলে ভ্রামণিকেরা যে কফি কিনে আনেন, আমার বাগানের কফিও সেসবেরই সমগন্ধী। তবে আমরা যেসব ‘ইন্সট্যান্ট কফি’ বাজার থেকে কিনে থাকি সেইসব কফির সঙ্গে এর স্বাদে-গন্ধে প্রচুর অমিল। কফির সঙ্গে চিকোরি (Chicori) কন্দ শুঁকিয়ে গুঁড়ো করে মেশানো যায় চিকোরি-ব্লেন্ডেড কফি নামে। আবার কোকো পাউডারও মেশানো যায় কফিতে। এইসব মিশেলের সঙ্গে নানা বস্তুর ভেজালটাও মনে রাখতে হবে। অবিমিশ্র কফির স্বাদ পেতে গেলে অবশ্যই দক্ষিণ ভারত/উঃপূঃ ভারতে প্রস্তুত অথবা আমাদের হাতে তৈরি কফিই আদর্শ। পাবেন রোস্টেড কফির বুক ভারী করা সুঘ্রাণ। তবে এই কফি-পানীয় বারংবার ছাঁকলেও কাপে তলানি থাকবেই।

চলুন, কফি খেতে যাই! মৌতাত করে নিজেদের বানানো কফির কাপে চুমুক দেওয়া যাক!

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *