কবিতার জন্য জীবন, জীবনের জন্য কবিতা

Nirmalendu

আমরা যে শ্রেণি থেকে এসেছি সেই শ্রেণি সব সময়ই সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, সাধারণ মানুষের কাছে আমরা যেতে পারিনি এবং আমাদের হাতেই রয়ে গেছে নেতৃত্ব। সব কিছুর পিছনে, এমনকী সাহিত্যের নেতৃত্বও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। তবুও সুধী দর্শক, আপনারা যাঁরা নির্মলেন্দু গুণ পড়েছেন, আপনারা যাঁরা নির্মলেন্দু গুণের জীবন সম্পর্কে জানেন— আজকে তাঁর জন্মদিনে মানুষটির জীবন নিয়ে আমরা হয়তো বিস্তারিত আলোচনা করতে পারলাম না, কিন্তু ফজলুল আলম-এর সঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণের কথোপকথনে বেরিয়ে এসেছে, তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যেই বাস করেন। তিনি আকাশচুম্বী অট্টালিকায় এয়ার কন্ডিশন ঘরে থাকেন না। জনবিচ্ছিন্ন, গজদন্তনির্মিত কোনও মিনারের বাসিন্দা তিনি নন। কতজন এটা করতে পারেন, জানা নেই। খুব কমই হয়তো পারেন। নির্মলেন্দু গুণের স্বপ্নের পৃথিবী একদিন বাস্তবে রূপ লাভ করবে— এটাই আমাদেরও প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন: কিছুটা ইতিহাস কিছুটা জীবনী, পুরোটাই সালিম আলি: দ্য বার্ডম্যান অফ ইন্ডিয়া

ফজলুল আলম: আপনি আপনার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড ‘আমার কণ্ঠস্বর’-এ বলেছেন, উচ্চশিক্ষা লাভ করে ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য আপনি ঢাকায় আসেননি, বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি। আপনি শুধু কবি হওয়ার লক্ষ্যটিকে সামনে নিয়েই ঢাকায় এসেছিলেন। আসলেই কী তাই?

নির্মলেন্দু গুণ: ‘আমার কণ্ঠস্বর’ বইটা যদি আপনি যদি ভালো করে পড়েন, একটু বড় বই তো, তাই আপনাকে পড়তে বলতে গিয়ে কুণ্ঠিত বোধ করছি। দেখবেন, আমি একটুও বাড়িয়ে বলিনি। পর পর দু’বার বিএসসি পরীক্ষায় ফেল করার পর আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, আমার পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ আর সম্ভব নয়। আপনি জেনে খুশি হবেন যে, বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষায়, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার দিন কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমার খাতাজুড়ে আমি একটা দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটির নাম ছিল ‘কালাক্রান্ত কাশবন’। পরের বছর আমার নামে হুলিয়া থাকায় আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম এবং সবক’টি পরীক্ষা দিতে পারিনি। আমার পরিবার থেকে আমার উপর চাপ দেওয়া হচ্ছিল ভারতে চলে যাবার জন্য। আমি তাঁদের ফাঁকি দিয়ে ভারতে না গিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আমি ঢাকায় চলে আসি।

ঢাকায় এসে আমি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করা, পত্রিকা বিলি করা ও মাঝেমাঝে লেখকদের লেখা সংগ্রহ করা ও প্রুফ দেখার কাজ নিই। বাংলাবাজারেও আমি বিভিন্ন প্রকাশনীতে প্রুফ দেখতাম। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স নিয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। সালটা হচ্ছে ১৯৬৭। আসলে পড়া নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় নাম লেখানোটাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। এক বছর আমি পড়েছিলাম। পরে বেতন না দেবার জন্য বিভাগীয় খাতা থেকে আমার নাম কাটা যায়। তারপর আমার পিতার একান্ত আগ্রহে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে আমি বিএপাশ করি ’৬৯ সালে। ওই বছরই আমি চাকরি পাই ‘দি পিপল’ পত্রিকায়। ইংরেজি দৈনিক। আমি সাব এডিটর হিসেবে যোগ দেই তখন ২৫০ টাকা বেতন ছিল। ২৫০ টাকা দিয়ে তখন প্রায় ২ ভরি স্বর্ণ পাওয়া যেত। সেই টাকা আমার কাছে তখন অনেক টাকা ছিল।

প্রথম মাসের বেতন পেয়েই আমি দুটো জিনিস কিনি। প্রথম জিনিসটি হল— আমি একটা বালিশ কিনি। প্রত্যেক মানুষেরই একটা নিজের বালিশ থাকা দরকার। তারপর আমি একটা থালা কিনি। স্থির করি, আমি নিজের থালায় ভাত খাব। এর আগ পর্যন্ত আজকে কোথায় ঘুমাব আর কালকে কোথায় ঘুমাব, তা অনির্দিষ্ট ছিল না। মানে ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল— এই প্রায় তিনটি বছর আমি রাজপথে— কমলাপুর স্টেশনে, সদরঘাট স্টিমার জেটিতে, ইপিআরটিসি বাস ডিপোতে, বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি বারান্দায়, বন্ধুদের রুমে থেকেছি। মানুষ যেমন রাস্তার পাশে শুয়ে থাকে— আমি বলি, মানুষ যদি রাস্তার পাশে ঘুমাতে পারে আমি কেন পারব না, আমি কেন রাত্রিযাপনের জন্য আমার বন্ধুদের বিব্রত করতে যাব? সো, আমার মনে হয় এইভাবেই আমার জীবনের ভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতা আমি অর্জন করেছিলাম।

ফজলুল আলম: আপনি কখনও কবিতা লেখার প্রতি বিরক্ত হননি?

নির্মলেন্দু গুণ: না। আমি ভেবেছি আমার অনিশ্চিত জীবনযাত্রা আমাকে কবিতা লেখার জন্য বরং সাহায্যই করছে। আমার জীবনযাত্রা নিয়ে আমি কখনও অগৌরব বোধ করিনি।

ফজলুল আলম: কিন্তু আপনি তো কবিতা লেখার জন্য অভিজ্ঞতা খুঁজে বেড়ান না। বেড়ান কি?

নির্মলেন্দু গুণ: খুঁজে বেড়াই— এটাও ঠিক নয়, আবার খুঁজে বেড়াই না—এটাও পুরোপুরি ঠিক নয়। আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়েছে, কথাটা পিকাসোই বলেছেন, I don’t search, I find. আমার ক্ষেত্রেও অনেকটা এরকমই ঘটেছে। আমি কবিতা খুঁজে বেড়াচ্ছি বলেই যে এরকম জীবনযাপন করছিলাম, ঠিক তা নয়। আমি জানতাম, আমার পরিবার আমাকে সাপোর্ট দিতে পারবে না। আমার পরিবার এত সম্পন্ন সচ্ছল পরিবার ছিল না, তারা প্রত্যাশা করছিল আমার উপর নির্ভর করে তারা তাদের দারিদ্র্য মোচন করবে। কিন্তু আমি এদিকে কবিতা লেখায় ব্যস্ত, আমার মন ছুটেছে কবিতার অমরত্ব সন্ধানে। আমার বন্ধু ছিল কবি আবুল হাসান। সেও আমার বোহেমিয়ান জীবনের চমৎকার সঙ্গী ছিল। আমি শুধু একটা ছিলাম না। হাসান থাকাতে আমার এই সুবিধাটা হয়েছিল। আমার আরেক বন্ধু নাট্যকার মামুনুর রশীদ, মামুন সরকারি চাকরি পেয়েই হাতিরপুলের কাছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে একটি গ্যারেজ ভাড়া নিয়েছিলো। মামুনের সঙ্গে সেখানে আমি ও আবুল হাসান থাকতাম।
আগেই বলেছি, বিভিন্ন হলে বন্ধু-বান্ধব ছিল, তাদের আশ্রয়েও থেকেছি অনেক সময়। থাকার জন্য যে নির্দিষ্ট একটা জায়গা থাকতে হয়, খাবার জন্যে যে একটা নির্দিষ্ট থালা থাকতে হয়, ঘুমাবার জন্য যে একটা নির্দিষ্ট বালিশ থাকতে হয়, এইগুলি আমরা অনেক পরে জেনেছি এবং বুঝেছি।

আরও পড়ুন: শতবর্ষে স্মরণ: ‘হেমন্ত-পৃথিবী’র শুরুর কথা

ফজলুল আলম: কিন্তু এই গ্যারেজ ভাড়া করে থাকা, লেপ-তোষক, জামা-কাপড় ছিল না। শৈশবের অধ্যায় থেকে এই বোহিমিয়ান লাইফে আসাতে আপনার কোনো কষ্ট হয়নি?

নির্মলেন্দু গুণ: না। মোটেও না। আমি দারুণ এনজয় করেছি ওই তথাকথিত দুঃসময়টা। এখনও আমার ওই জীবনটা ফিরে পেতে সাধ হয়। কবিতার জন্য একটা উন্মাদনা তখন তো ছিলই। কবিতা রচনায় যে ক্রমশ সাফল্যের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম—এতে আমার ভিতরে এমন একটি সহ্যশক্তি তৈরি হয়েছিল যে এগুলো আর আমার ভিতরে এমন একটি সহ্যশক্তি তৈরি হয়েছিল যে, এগুলো আর আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে হচ্ছিল না। আমি আমার চারপাশে অনেক দরিদ্র মানুষকে দেখছিলাম, আমি চেষ্টা করেছি সমাজের একেবারে নিঃস্ব পর্যায়ে মানুষ যেভাবে বেঁচে থাকে আমি তাদের জীবনের সঙ্গেই নিজেকে ধরে নিয়েছিলাম। আমি জানতাম, ওরা কবি হবে না, কিন্তু আমি জানি কমলাপুর স্টেশনে যাদের সঙ্গে আমি আছি, রাত পাড়ি দিচ্ছি, তারা কেউ কবি নন। কিন্তু আমি রাত্রে একটা কবিতা রচনা করব, কালকে সেটা পত্রিকায় দিব, পরশুদিন সেটা পত্রিকায় ছাপা হবে। আমার সামনে একটা স্বপ্ন আছে। এই সমস্ত মানুষদের সামনে সেই স্বপ্নও নেই। তাই তাদের স্বপ্নকেও আমাকে ভাষা দিতে হবে। আমি মনে করি সমাজকে বোঝার জন্য, মানুষদের কষ্টটাকে বোঝার জন্য, আমি যদি তাদের কষ্টের সঙ্গী হই এবং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যদি আমি তাদের বুঝতে পারি, তাহলে সেটা আমার কবিতার জন্য লাভই হবে।

ফজলুল আলম: তাহলে কী আপনি এই সাধারণ মানুষদের মাঝে মিশে গিয়ে তাদের মনের যে বাসনা, তাদের যে চিন্তাধারা তাদের জীবনযাত্রার ধারার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে আপনি কবিতা লেখায় কোনও উৎকর্ষ পেয়েছেন বলে মনে করেন?

নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ। আমার কবিজীবনের শুরু থেকেই আমার মনে হয়েছিল, আমি জন্মসূত্রে খুব একটা প্রতিভাবান কবি নই। আমার অভিজ্ঞতা হয়তো আমাকে একটু আলাদা জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ জন্মসূত্রেই একজন খুব বড় কবি ছিলেন। যেমন মাইকেল, কালিদাস, তাঁদের কবিতা পাঠ করলেই বোঝা যায় যে তাঁরা খুব বড় কবি। আমি আমার নিজের মধ্যে এরকম বড় কবির অস্তিত্ব উপলব্ধি করিনি। তবে বড় না হলেও একজন কবি অস্তিত্ব আমি নিজের মধ্যে উপলব্ধি করেছিলাম। আমি বড় কবিদের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেছি, কবি হবার গোপন বাসনা দ্বারা তাড়িত হয়েছি। একই সাথে এটাও উপলব্ধি করেছি, আমি অনায়াসে কবিতা লিখতে পারি, এমনটি নয়। চিত্রকল্প আমি যতটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে চাই, তার ভাষা আমার আয়ত্তের মধ্যে নেই। তো সেইক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে, অভিজ্ঞতা হয়তো আমার আয়ত্তের মধ্যে নেই। তো সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে, অভিজ্ঞতা হয়তো আমার প্রতিভার এই যে ঘাটতি, এটা হয়তো আমাকে সেই ঘাটতি পূরণ করতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে।

ফজলুল আলম: রবীন্দ্রনাথ যেখানে বলেছিলেন, ‘আমি কান পেতে আছি’ সেই কবির জন্য, (নির্মলেন্দু: যে আছে মাটির কাছাকাছি) হ্যাঁ। আপনার কি কোনও সময় যে, হয়তো-বা আমিই সেই কবি?

নির্মলেন্দু গুণ: ওই শূন্য জায়গাটা আমি পেতে পারি কি না? না। এত বড় প্রত্যাশা নিয়ে আমি কথাটা বলব না। তবে আমি যে কথাটা বলছি তা হল, জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কম প্রতিভাবানকেও পৃথক করে।

ফজলুল আলম: উনি কিন্তু ওই কবিতাটা লিখেছিলেন প্রায় শেষ বয়সে। শেষ বয়সে তাঁর সন্দেহ হল সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়তো পৌঁছুতে পারেন নাই। কিন্তু সাধারণ মানুষ হয়তো অপেক্ষা করে আছে এমন একজন কবির জন্যই।

নির্মলেন্দু গুণ: আমার মনে হয়, সেই কবি রবীন্দ্রনাথ নিজেই। কারণ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই কিন্তু আমরা মানুষের অনুচ্চারিত বেদনা প্রকাশের ভাষা পেয়েছি। যেমন তাঁর ‘দুইবিঘা জমি’ কবিতার মধ্যে উপেনের যে চরিত্র, আমার চোখে অশ্রু ঝরেছে সেই কবিতা পাঠ করার পর। আমি অশ্রুপাত করেছি ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতার রাখালের জন্য। আমি ‘চাষাভূষার কাব্য’ লিখেছি। রবীন্দ্রনাথ উপেনকে দু’বিঘা পরিবর্তে বিশ্বনিখিল লিখে দিয়েছিলেন। তিনি দার্শনিকভাবে উপেনকে একটা জায়গায় তুলে দিলেন। আমি এই জায়গাটার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। আমি ভেবেছি, না, একটা শ্রেণি সংগ্রাম দরকার যেখানে ভূমিহীনে পরিণত হওয়া উপেন তাঁর জমি সত্যি সত্যিই ফিরে পাবে। আমি যখন ‘ভূমিহীনের পালা’ লিখেছি, ‘ক্ষেতমুজুরের কাব্য’ লিখেছি, ‘চাষাভূষার কাব্য’ লিখেছি সেখানে আমি চেয়েছি সত্যিকার অর্থেই আমাদের সমাজে যারা ভূমিহীন কৃষক, রাজনৈতিকভাবেই তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয়টির সুরাহা হতে হবে।

ফজলুল আলম: তাহলে আমি বলব আপনার কবিতা একটি কমিটেড পয়েট্রি, একটা কমিটেড লিটারেচার, অঙ্গীকারাবদ্ধ, আপনার মধ্যে একটা দায়বদ্ধতা আছে।

নির্মলেন্দু গুণ: আমার ‘চাষাভূষার কাব্য’, ‘দূর হ দুঃশাসন’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘ইস্ক্রা’। ইস্ক্রা-য় মার্কসীয় তত্ত্বগুলোকে আমি পদ্যে পরিণত করেছি, প্রায় ১৬০টা। মার্কস-লেনিনের তত্ত্বগুলোকে আমি পাঠকদের কাছে পদ্যের আকারে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। সেই হিসেবে আমি খুব কমিটেড কবি হিসেবেই নিজেকে দাবি করতে পারি।

ফজলুল আলম: কিন্তু কমিটেড লেটারেচার ওটাই। আপনি লেটারেচারটাকে যদি শুধু সাহিত্যিক কলা হিসেবে দেখেন, নান্দনিকতার দিকটা দেখেন… নান্দনিকরা বলেন শিল্পের জন্যেই নান্দনিকতা, ‘আর্ট অর আর্টসেক’। আপনি বলেছেন ‘আর্ট ফর লাইফ সেক।’ জীবনের জন্যই শিল্প।

নির্মলেন্দু গুণ: না, আমি শুধু এটুকুই বলছি না। আর্টসেক কথাটাও আমি বিশ্বাস করি। আমার কবিতার বইগুলি যদি আপনি পড়েন, সব তো পড়া সম্ভব না, আমার প্রায় চল্লিশটা কবিতার বই, সেগুলি আপনি যদি ভালো করে পড়েন, তো দেখবেন…

ফজলুল আলম: আপনি তো কবিতা লিখছেন সাধারণ মানুষের জন্যই।

নির্মলেন্দু গুণ: আমার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমার বিভিন্ন রকমের কবিতা আছে। আমি মনে করি একজন কবি বেসিক্যালি রোমান্টিক এবং তিনি প্রেমিক। আমার ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ নামক একটি কবিতার বই আছে। সেখানে আমি দেখাতে চেয়েছি যে কবির ভিতর দুটি সত্তা কাজ করে। একটি হচ্ছে, তার ভিতরের বিপ্লবী সত্তা। তাঁর বিপ্লবী সত্তাটি কাজ করে সমাজের নিপীড়িত মানুষের দিকে তাকিয়ে, সমাজের শোষণ, নিপীড়ন, অত্যাচার, যন্ত্রণার বিরুদ্ধাচারণ ক’রে। নজরুল থেকে যেটা আমার সরাসরি পেয়েছি। তারপরে সুকান্তের কাছ থেকে পেয়েছি। যেটাকে আমরা বলতে পারি মার্কসীয় চেতনা। সেই বিশ্বাস থেকে সমাজকে বিশ্লেষণ করা। মানুষের সুখ-দুঃখ কষ্ট সংগ্রামকে কবিতার মধ্যে ধরা। সেটা আমার এটা ধারা। আরেকটা হচ্ছে আমি নিজে। আমার প্রেমিক সত্তা। প্রকৃতি এবং নারীর সৌন্দর্যে যে অভিভূত, যে বারবার প্রেমে পড়েছে এবং সৌন্দর্য তাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার মধ্যেই সে মনে করছে তার কবিকৃতির একটা সাফল্য। সেই ধারাতেও আমার প্রচুর কবিতা আছে। সেগুলোকে পাশাপাশি রেখে যদি আমরা দেখি, তাহলে আমার মনে হয় যে, সেই ক্ষেত্রে দু’টো সত্তাই আমার মধ্যে বিদ্যমান। আর্ট ফর লাইফ এবং আর্ট ফর আর্ট সেক-এই দু’টো ধারণার মধ্যে আমি সমন্বয়সাধন করার চেষ্টা করেছি।

ফজলুল আলম: আমি এখানে একটু বলত চাচ্ছি, মডার্ন লেটারেচারের কথা যখন আসে তখন কিন্তু এই প্রশ্নটাই কেউ আর তোলে না। এইজন্য তোলে না, দেখা যাবে কমিটেড লেটারেটার যেগুলো, অঙ্গীকার লেটারেচার যেগুলো তাতেও কিন্তু আর্ট থাকতে পারে। ভুল বলেছি, থাকতে হবে। সেটাও আর্ট। সেই কমিটেড লেটারেচার, সেই মডার্ণ লেটারেচার, মডার্ন যুগে আধুনিকতার মধ্যে এসে এই আধুনিকতা, মডার্ন লেটারেচারই মূল সাহিত্য। আপনি চিন্তা করেন আপনার এই কবিতাটা আমি যেটা একটু আগে পড়ে শুনালাম, আপনার ‘লজ্জা’— এটা আপনি সুনামির উপর লিখেছেন।

নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ, এটা ১৯৭০-এ যে ভয়াবহ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল, তখন একটা দৈনিক পত্রিকায় খুব মর্মস্পর্শী একটি ছবি ছাপা হয়, ওই ছবির উপর ভিত্তি করেই আমার ‘লজ্জা’ কবিতাটি লেখা।

ফজলুল আলম: আচ্ছা আমি এখন আপনার কবিতটাই আপনাকে শোনাই:
‘অথচ কেমন আজ ভিনদেশী মানুষের চোখের সমুখে
নগ্ন সে, নির্লজ্জ, নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে
জলাধারে পশু আর পুরুষের পাশে শুয়ে আছে।
তার ছড়ানো মাংসল বাহু নগ্ন,
কোমর, পায়ের পাতা, বুকে উত্থানগুলো নগ্ন,
গ্রীবার লাজুক ভাঁজ নগ্ন; —কে যেন উন্মাদ হয়ে
তার সে নিঃশব্দ নগ্নতায় বসে আছে।
তার সমস্ত শরীর জুড়ে প্রকৃতির নগ্ন পরিহাস,
শুধু গোপন অঙ্গের লজ্জা ঢেকে আছে
সদ্য-প্রসৃত-মৃত সন্তানের লাশ।

তার প্রতিবাদহীন স্বাধীন নগ্নতা বন্দী করে এখন
সাংবাদিক, ঝুলন্ত ক্যামেরা নিয়ে ফটোগ্রাফার
ফিরে যাচ্ছে পত্রিকার বিভিন্ন পাতায়। অসহায়,
সূর্যের কাফনে মোড়ানো আমার বোনের মতো
এই লাশের আগের মতন আর বলছে না, বলবে না;
‘আমি কিছুতেই ছবি তুলবো না…।’
সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ভেসে যাওয়া একজন গর্ভবতী নারী সম্পর্কে আপনি হৃদয়স্পর্শী কথাগুলো যেভাবে লিখলেন, এই কথাগুলোর মধ্যে ফুটে উঠেছে যে নান্দনিকতা সেটাই কিন্তু আর্ট ফর আর্ট’স সেক। কিন্তু বিষয় বিচারে সেটা হল ‘আর্ট ফর লাইফ’ সেক। তাই তো?

নির্মলেন্দু গুণ: হ্যাঁ। আপনি এই কথাটা ১০০ ভাগ সত্যি বলেছেন। এবং এই দু’টো ধারণার ভিতর যে একটা সমন্বয় দরকার, সেটা এই কবিতার ভিতর ফুটে উঠেছে। শামসুর রাহমান যেমন আমার রাজনীতিক কবিতার একটা ফ্ল্যাপ লিখে দিয়েছিলেন। সেখানে কিন্তু এই কথাটা তিনি বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন নির্মলেন্দুর কবিতা খুব জনঘনিষ্ঠ, সংগ্রামী উপাদান সমৃদ্ধ এবং জনমানুষের উদ্দীপনায় জীবন কাটানোর জন্য পলিটিক্যালি মোটিভেটেড। ফলে আমি পলিটিক্যালি মোটিভেটেড অবশ্যই। বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা দিলেন, আমিই প্রথম কবি যে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে একটি কবিতা লিখি ১৯৬৭ সালে, তখন তিনি জেলখানায়। তো পরবর্তীকালেও, বঙ্গবন্ধু মারা যাবার পর তাঁকে নিয়ে আমি কবিতা লিখেছি। শামসুর রাহমান বলেছেন, আমার কবিতাগুলি কাব্যের যে শর্ত তা বিসর্জন দিয়ে আমি লিখিনি। সেটা উনি স্বীকার করেছেন উনার একটা লেখায়, আমাকে প্রশংসা করে। তারপরও আমার মনে হয় যে, শ্লোগানসর্বস্ব কবিতাও আমার বেশ আছে। ওইসব কবিতার সাহায্যে বড়-বড় জনসভায় কবিতা পাঠ করার একটা ধারাও আমি তৈরি করেছি আমাদের দেশে। কবিদের সংগঠন থাকা উচিত নয়, জেনেও এক পর্যায়ে আমরা কবিতা পরিষদও করেছিলাম।

ফজলুল আলম: জীবন সম্পর্কে সচেতনতা, আপনার মধ্যে যেটা আমি দেখছি আর কী। যেটাকে আমি আরেকটা নাম দিচ্ছি জীবন সম্পর্কে সচেতনতা। আমাদের দৈনন্দিন জীবন, আমাদের জাতীয় জীবন সম্পর্কে এসব কবিতা। এর থেকে আপনার যে রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা, আপনি তো রাজনৈতিক শ্লোগান লিখছেন না, আপনি কয়েকটি কথামাত্র লিখছেন, এ থেকে কি কোনও গণচেতনা জাগ্রত হতে পারে কি না?

নির্মলেন্দু গুণ: রাজনীতি থেকে যে ফিডব্যাকটা সরাসরি পাওয়া যায়, কবিতা বা শিল্প থেকে কিন্তু সেটা ততটা সরাসরি পাওয়া যায় না। যেমন ধরেন, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে নজরুলের কবিতার যে ভূমিকা। আমরা দেখলাম যে নজরুল ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’ লিখেছেন। এগুলো বিদ্রোহী কবিতা। তাঁর বই বাজেয়াপ্ত হচ্ছে, তিনি জেলে যাচ্ছেন। তো নজরুল জেলে গেছেন বলেই ভারত স্বাধীন হয়ে গেছে, বা নজরুল এরকম কবিতা লিখেছেন বলেই স্বাধীনতা এসেছে, তাও না। কিন্তু ব্রিটিশ-বিরোধী চেতনাকে, স্বাধীনতার বোধকে তিনি পাঠকচিত্তে জাগ্রত করেছেন। শানিত করেছেন। তারও অনেক আগেই কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে’। পরবর্তীকালে শামসুর রাহমান লিখেছেন— ‘স্বাধীনতা তুমি’, বা ‘তোমাকে আসতেই হবে স্বাধীনতা’ বা আমি লিখেছি ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’। বাংলার কবিরা স্বাধীনতার পক্ষে দীর্ঘকাল ধরেই কবিতা লিখেছেন। কিন্তু আমরা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা পেলাম ১৯৭১ সালে। তার আগে প্রচুর কবি, বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ব্যক্ত করেছেন তাঁদের কবিতায়। ফলে আমি বলব যে, কবিতার ইমপ্যাক্টটা খুব সূক্ষ্ম, তা যখন মানুষের মনের মাঝে পৌঁছয়, তখন তা মানুষের মনের খুব ভিতরে কাজ করে। পাঠকচিত্তে একটা চেতনা একটা সৃষ্টি করে। সেই চেতনা এক পর্যায়ে গণবিস্ফোরণের সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়। মানুষ তখন এই কবিতাগুলোকে ব্যবহার করে। পলিটিক্যাল শ্লোগান দিয়ে আমরা দেখেছি, এগুলো একসময় ঝরে যায় কিন্তু কবিতা স্থায়ী হয়। যেমন, মার্কসবাদ অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন আর নেই, আজকে লেলিনকে নিয়ে আমার যে কবিতা লিখেছলাম— সেগুলি কিন্তু আগের মতো এখন আর আবেদন সৃষ্টি করে না। সমাজতন্ত্রের প্রতি মানুষ আগের মতো প্রত্যয় নিয়ে আর তাকায় না। কিন্তু সমাজের মধ্যে যে শোষণ বিদ্যমান রয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান নিতেই হবে। ফিরিয়ে রাখতে পারি না। কানসাটে আমরা দেখি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে দেখছি, তারা তাদের শ্রমের মূল্য আদায় করার জন্য ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে কীভাবে লড়ছেন। শোষণের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ, সেটা ন্যায়সঙ্গত। এই কথাটাই কবিরা বারবার বলতে চেয়েছেন। বলছেন। বলবেন।

ফজলুল আলম: আমাদের সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, কবি।

নির্মলেন্দু গুণ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *