মারাদোনার বিশ্বজয়, ৩৪ পেরিয়ে ৩৫শে পা

1986

শুভ্রাংশু রায়

আপামর ব্রাজিল-প্রেমী বাঙালি সেদিন চরম সংকটে পড়েছিল। সংকট বলে সংকট! এতদিন জুলেরিমে কাপ জয়, জায়ান্ট অফ ব্রাজিল দূরদর্শনের পর্দায় সাদা-কালো বিশ্বকাপের কিছু সাম্বা ম্যাজিক মুহূর্ত কিংবা কলকাতায় পেলের খেলে যাওয়া এই সব স্তম্ভগুলির ওপর দাঁড় করানো ব্রাজিল ফুটবলের ‘কাল্ট ফিগার’ তছনছ হয়ে গিয়েছিল। ‘৮৬-র সেই বিশ্বকাপ বাঙালি মননে জন্ম দিচ্ছিল এক নতুন প্রেম। যার নাম ‘দিয়েগো মারাদোনা’। দেশটার নাম আর্জেন্টিনা। কিন্তু পুরনো বা প্রথম প্রেম তো সহজে ভোলা যায় না। তাই ‘৮২-তে পাওলো রোসির ইতালি আর সদ্য সদ্য প্লাতিনির ফ্রান্সের কাছে পর্যুদস্ত হওয়া ব্রাজিল আসলে শহরের সমর্থনের ভিতকে যেমন জোরে ধাক্কা দিয়েছিল, তেমনি ব্রাজিল-প্রেমও পড়েছিল ভয়ানক ধর্ম সংকটে। সেই চরম ধর্ম সংকটের দিন ছিল ১৯৮৬-র ২৯ জুন।

আরও পড়ুন: এক টিমে সুযোগ পেলেন মেসি-রোনাল্ডো !

সাদা-কালো কিংবা রঙিন টিভিতে ইতিমধ্যে দেখে ফেলা মারাদোনার সেই শতাব্দীর সেরা গোল অথবা ‘হ্যান্ড অফ গডে’র জাদু, ডিফেন্ডারদের নিষ্ঠুর কড়া ট্যাকেলের ধাক্কায় পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ানো ঝাঁকড়া চুলের আর এক ১০ নম্বর জার্সির প্রেমে প্রথমবার বিশ্বকাপ লাইভ দেখতে বসা তরুণ প্রজন্ম নিজেদের সপে দিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গ-ব্রাজিলিয়ানরা, যারা প্রায় দু’দশক ধরে ব্রাজিল মিথ নির্মাণ করে গেছেন, তাঁরা বোধহয় সেদিন মনে কিছুটা সংশয় নিয়েই টিভির সামনে বসেছিলেন। কিছু মারাদোনার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, আর্জেন্টিনার প্রতি নয়। কয়েকজন অবশ্য চায়ের ঠেকে বলতে শুরু করেছিলেন, পেলের মতো দু’টো (‘৬২ হিসেবটা বাদ দিয়ে) না হোক, অন্তত একটা বিশ্বকাপ তো জিতে দেখাক মারাদোনা! আসলে তখন তো বাঙালির চোখে বিশ্বসেরা ফুটবলার হওয়ার এক এবং অদ্বিতীয় মাপকাঠি ছিল ফাইনালের শেষে ফিফা বিশ্বকাপে হাত ছোঁয়ানো।

আরও পড়ুন: বর্ণময় ফুটবল কেরিয়ারকে ‘আলবিদা’ জানালেন মারিও গোমেজ

আর সেই দিনই ছিল মাহেন্দ্রক্ষণ। তবে কিছু ঈর্ষাকাতর বঙ্গজ ব্রাজিলিয়ান কিন্তু সেদিন সকাল থেকে হঠাৎ জার্মান সমর্থক হয়ে পড়েন। প্রকাশ্যে কিছু ইস্টবেঙ্গল কাম হতাশ ব্রাজিল সমর্থকের কাছে এই আন্তর্জাতিক আনুগত্য বদলের জন্য দেশীয় কারণ যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়। ‘ইস্টবেঙ্গল জার্মান তাই আমরাও জার্মান’— এই যুক্তি সাজানো অবশ্য বঙ্গীয় জার্মানের সংখ্যা অবশ্য খুব বেশি হয়নি। কারণ ইস্টবেঙ্গলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের পক্ষে একথা বলা সম্ভব ছিল না। তাই ফাইনালের দিন বা আগের সন্ধে পাড়ার বেশ সোচ্চার স্বঘোষিত বিদেশি ফুটবল বিশেষজ্ঞ (তখন মূলত ব্রাজিল ফুটবলের বিষয়ে কিছু খোঁজখবর রাখলেই এই স্বীকৃতি মিলে যেত) আচমকাই কেমন দার্শনিকসুলভ ভঙ্গিতে বলা শুরু করে দিয়েছিল— “খেলছে তো দুটি বিদেশি দেশ। আমরা কেবল ভালো খেলা দেখতে আগ্রহী।” একথা বললেও বুকের চাপা কষ্ট কিন্তু যেন প্রকাশ হয়ে পড়ছিল।

খুব মনে পড়ে, সেদিন সকালে কোনও একটি বাংলা দৈনিকে ছবি প্রকাশ হয়েছিল গাঁদা ফুলের মালা দিয়ে কোনও এক রাস্তার মোড়ে মারাদোনার একটি ছবিতে কয়েকজন ফুটবলপ্রেমী প্রণাম করছে। কিন্তু তবু তখনও বিশ্বকাপ অধরা। মারাদোনার বিশ্বসেরা হতে তখনও যেন ঠোঁট আর কাপের দূরত্ব রয়েই গেছে। অবশেষে সেই রাত। ফাইনালে অবশ্য তিনি গোল করেননি। আর্জেন্টিনা যখন ২ গোলে এগিয়ে অনেকেরই ধারণা ছিল ম্যাচ বুঝি শেষ। দ্বিতীয়ার্ধে প্রবলভাবে পর পর দু’টি গোল পরিশোধ করে ম্যাচে ফিরে এসেছিল রুমিনিগের জার্মানি। কিন্তু শেষহাসি সেই মারাদোনাই হাসলেন। মার্কার লোথার ম্যাথাউসকে এড়িয়ে ডিফেন্স চেরা এমন একটি ফাইনাল পাস দিয়েগো বাড়ালেন যে, সতীর্থ স্টাইকার বুরুচাগার গোল করা ছাড়া প্রায় উপায় ছিল না। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল বটে আর্জেন্টিনা, কিন্তু বিশ্বজয় করলেন আসলে যেন মারাদোনাই। আরেকটি কাণ্ড অবশ্য করে বসেছিলেন মারাদোনা। বিশ্বকাপ ট্রফি নেওয়ার পর তৎকালীন ফিফা প্রেসিডেন্ট হ্যাভেলাঞ্জের করমর্দনের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যান নতুন বিশ্বজয়ী অধিনায়ক। ঘটনাচক্রে হ্যাভেলাঞ্জ কিন্তু আদতে ব্রাজিলিয়ানই ছিলেন। সেদিনের সেই রাতের কথা এ লেখা পড়ে অনেকের মনে পড়বে নিশ্চিত। গাঢ় হবে নস্টালজিয়ার রং। সেই রং কিন্তু নীল-সাদা।

● লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

Facebook Twitter Print Whatsapp

2 comments

  • Debashis Majumder

    Great. Nice Article.

  • সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়

    সকালটা সুন্দর হয়ে গেল তোমার লেখাটি পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *