নির্মলেন্দু গুণ: কাব্যযাত্রায় ব্যক্তিদর্শন

Nirmalendu Goon

ফারুক সুমন

আধুনিক বাংলা কাব্যমালঞ্চে নির্মলেন্দু গুণ অবধারিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নাম। যাঁর আছে নিজস্ব কাব্যদ্যুতি ও দর্শন। কবিতার বিষয় ও প্রকরণের প্রাতিস্বিক পরিচর্যায় তিনি অনন্য, উজ্জ্বল। কাব্যযাত্রার শুরু থেকেই শিল্প এবং জীবন তাঁর কবিতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে। সমকাল সংলগ্ন থেকে তিনি ব্যক্তির অন্তর্গত কথাগুলো কাব্যরূপ দিতে চেয়েছেন। ব্যক্তিদর্শন কিংবা কাব্যদর্শন প্রকাশে তিনি মোটেও দ্বিধান্বিত নন। এক্ষেত্রে তিনি অকপট ও একরোখা। ফলে বিভিন্নসময়ে তাঁর কবিসুলভ কর্মকাণ্ডে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক, উঠেছে সমালোচনার ঝড়। তবে দিনশেষে সেই ঝড় থেমে গিয়ে কবির দৃঢ় মনোভঙ্গির জয় হতে দেখেছি।

ইতিহাস সাক্ষী, স্বার্থ কিংবা সুযোগ প্রাপ্তির বিবেচনায় প্রতিষ্ঠিত অনেক কবি-সাহিত্যিক খোলস বদলে ফেলেছেন। এই ক্ষেত্রে নির্মলেন্দু গুণ ব্যতিক্রম। কাব্যচর্চার শুরু থেকে অদ্যাবধি তিনি ‘আওয়ামী লীগের চেতনাবাহী’ কবি হিসেবে নিজেকে অকপটে প্রকাশ করেছেন। কখনোই ব্যক্তিবিশ্বাস প্রকাশে ভনিতার আশ্রয় নেননি। তাঁর বক্তব্য দিবালোকের মতো পরিষ্কার:

”একটা জিনিস স্পষ্ট হওয়া দরকার। যদিও আমি সরাসরি আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করি না— কিন্তু আমি মূলত আওয়ামী লীগেরই কবি। আবার আমি মনে করি একইসঙ্গে আমি জনগণেরও কবি। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির বাঁচার দাবি ৬ দফা ঘোষণা করলেন, তার পর থেকে আমি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষে গণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েই কবিতা লিখিতে শুরু করেছিলাম। ১৯৬৬-২০২০, মানে গত ৫৬ বছর ধরে আমার কবিতা ও গদ্য রচনার ঐ ধারাটি অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে। মাঝে-মাঝে, অনেক সময় আমি প্রেমের কবিতা, কামের কবিতা, প্রকৃতির কবিতা এবং সাম্যবাদী ধারার কবিতাও লিখেছি। তবে রাজনৈতিক সংকটকালে আমি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর তৈরি করা দল আওয়ামী লীগকেই সমর্থন করে এসেছি। ১৯৯১-এর সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আমাকে নমিনেশন দেয়নি। তাতে কী?” [ফেইসবুকে দেওয়া নির্মলেন্দু গুণের ব্যক্তিগত মতামত]

উপর্যুক্ত মন্তব্যটি ব্যক্তিকবির অকপট দৃঢ় উচ্চারণ। শুধু তাই নয়, গুণ ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। সেই কবিতা তখন ‘সংবাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বোধ করি বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে লেখা এটাই প্রথম কবিতা। নাম ‘প্রচ্ছদের জন্য’। অবশ্য পরে কবিতাটির নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন ‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’। সাহিত্যিক ও সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্ত তখন বঙ্গবন্ধুকে সেই কবিতাটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। কবিতাটি শোনা শেষে বঙ্গবন্ধু উচ্চকণ্ঠে হেসে বললেন, ”আপনারা আমাকে চিনতে পারেন নাই, কবি আমাকে চিনতে পারছে।”

‘হুলিয়া’ কবিতা লেখার পরে আবদুল গাফফার চৌধুরী তাঁর ‘তৃতীয় মত’ কলামে এই কবিতা নিয়ে লিখলেন। কবিতায় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ থাকায় বঙ্গবন্ধু গাফফার চৌধুরীকে নির্দেশ দিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন।

”রাজু আলাউদ্দিন: এই কথা শোনার পরে আপনার কী অনুভূতি হলো?

নির্মলেন্দু গুণ: একজন কবি হিসেবে তো এটা খুবই সম্মানজনক: বঙ্গবন্ধু আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন। আমি বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্যে, বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে ইনভলবড হয়ে গেলাম ইন দ্য হায়েন্ট ফর্ম। তখন আমি বললাম আমি অবশ্যই যাবো। আজকে না, কালকে করতে করতে ইতিমধ্যে ২৫শে মার্চ চলে আসলো। ২৫শে মার্চের রাত্রে— সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি ছিল (সৈয়দ আহমদ) ফারুক আর আনোয়ারুল আলম শহীদ ছিল জিএস। ওরা এসে আমাকে নিয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হইলো না, কারণ বঙ্গবন্ধু ঘরের ভিতরে ছিলেন, হাই কমান্ডের সঙ্গে মিটিংয়ে ছিলেন।”


[কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন গৃহীত সাক্ষাৎকার]

দীর্ঘকাব্যযাত্রায় কবি নির্মলেন্দু গুণ ব্যক্তি হিসেবে রাজনীতি বিমুখ ছিলেন না। কবিতাকে রাজনীতিবিচ্ছিন্ন মনে করেননি। অন্য সবার মতো কবিরও দায় রয়েছে দেশের প্রতি। এটা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। ফলে সমসময়ে স্বতন্ত্র হওয়ার বাসনায় অনেক কবিই হয়তো সচেতনভাবে রাজনীতি কিংবা সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ এড়িয়ে চলেছেন। গুণ সে পথে না গিয়ে সমকালসংলগ্ন ঘটনাপ্রবাহকে কাব্যময় করে তুলেছেন। উদ্দিষ্ট বিষয় ও বক্তব্য প্রকাশে সহজাত সাবলীল কাব্যভাষা বেছে নিয়েছেন। ফলে স্বদেশ, ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, প্রেম, দ্রোহ, আন্দোলন, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ভাষাসংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িকতাসহ অজস্র বিষয় তাঁর হাতে অনায়াসে কবিতা হয়ে উঠেছে।

গুণের কবিতায় আছে নান্দনিক শোভা। আছে স্লোগান ও স্বগতোক্তি। কবিতায় যাঁরা অতিমাত্রায় বিমূর্ত এবং অধরা অনুভব অন্বেষী। তাঁরা গুণের কবিতা পাঠান্তে হঠাৎ বিভ্রান্ত হতে পারেন বৈকি। কারণ গুণের অধিকাংশ কবিতাই উপমা ও চিত্রকল্পের খোপে উপস্থাপিত হয়েছে। ইন্দ্রিয়ানুগ শব্দ চয়নে তাঁর নৈপুণ্য লক্ষণীয়। কী প্রেমের কবিতা, কী দ্রোহের কবিতা, সবখানে কবিকণ্ঠ উচ্চকিত হয়েছে সারল্যে, সাহসিকতায়। তাঁর জনপ্রিয় দু’টি কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যেতে পারে:

”প্রিয়জন চলে গেলে মানুষই ব্যথিত হয়,
আকাশ নির্বিকার, আকাশ কখনও নয়।
তোমরা মানুষ, তাই সহজেই দুঃখ পাও,
হে ঈশ্বর, আমাকে আকাশ করে দাও।”
[আকাশ ও মানুষ]

কিংবা,

”আমিও তোমাদের মতো প্রতিবাদে বলেছি তখন, প্রেমাংশুর বুকের রক্ত চাই,
হন্তার সাথে আপোস কখনো নাই।
বুকের বোতাম খুলে প্রেমাংশুকে বলিনি কি দেখো,
আমার সাহসগুলি কেমন সতেজ বৃক্ষ;
বাড়ির পাশের রোগা নদীটির নীল জল থেকে
প্রতিদিন তুলে আনে লাল বিস্ফোরণ!”
[প্রেমাংশুর রক্ত চাই]

গত শতকের ষাটের দশকে বাংলাকবিতায় নির্মলেন্দু গুণের আবির্ভাব। প্রথম গ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ (১৯৭০) প্রকাশের মধ্যে দিয়ে গুণ তাঁর আগমনবার্তা পাঠকের কাছে স্পষ্ট করতে সক্ষম হন। গ্রন্থের প্রায় সবক’টি কবিতা সেইসময়ে পাঠকের কাছে বিপুল ভালোবাসায় সমাদৃত হয়েছে। কবি নির্মলেন্দু গুণও প্রথম অভিনন্দিত হলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে, মাত্র চার মাস আগে ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ গ্রন্থটি মানুষকে যুগপৎ প্রেম ও দ্রোহ চেতনায় আলোড়িত করে।

তখন পূর্ববাংলার মানুষের জন্য ছিল ঘোরতর বৈরিকাল। কবি-সাহিত্যক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা সেই আকালের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকেন। তাঁরা লেখা ও প্রকাশনার মাধ্যমে প্রতিবাদ জারি রাখেন। ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন ধরনের বইপত্রে। ফলে স্বৈরাচারী সরকার সেসব গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করে। নির্মলেন্দু গুণ সেই বৈরিসময়ে প্রকাশ করেন ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’। এই গ্রন্থভুক্ত ‘হুলিয়া’, ‘যুদ্ধ’, ‘অসমাপ্ত কবিতা’, ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ এবং ‘মানুষ’ পড়ে পাঠক যেমন দেশপ্রেম ও মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তেমনই ‘চুক্তি’, ‘অসভ্য শয়ন’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-সহ একাধিক কবিতায় প্রেমের বাতাবরণে এসেছে দ্রোহ। ‘মানুষ’ কবিতায় বঞ্চনা এবং ক্ষোভে গুণের কবিকণ্ঠ উচ্চকিত হয়ে ওঠে। উদ্ভিন্ন কবি যেন আর মানুষ থাকেন না। তিনি অন্তর্গত ক্ষত নিয়ে কবিতায় ফেটে পড়েন। যেমন:

”আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়।

——- —– —–

মানুষ হলে উরুর মধ্যে দাগ থাকতো,
বাবা থাকতো, বোন থাকতো,
ভালোবাসার লোক থাকতো,
হঠাৎ করে মরে যাবার ভয় থাকতো।

——- —– —–

মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়;
অথচ আমি সাপ দেখলে এগিয়ে যাই,
অবহেলায় মানুষ ভেবে জাপটে ধরি।”

এই গ্রন্থের ‘হুলিয়া’ কবিতাটি সমসময়ে তো বটেই, এখন পর্যন্ত একটি পাঠকনন্দিত কবিতা। এটি বহুবার বহুভাবে আলোচিত হয়েছে। শ্রেণিসংগ্রামের ফলে সৃষ্ট নানা বৈষম্যের বিরুদ্ধে নির্মলেন্দু গুণ বরাবরই উচ্চকিত ছিলেন। আত্মজৈবনিক আদলে লেখা কবিতাটি পড়ে পাঠক নিজেই যেন ‘হুলিয়া’র শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়ান। একজন সংবেদনশীল কবি কখনোই যে স্বকালবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারেন না। এই কবিতাটি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কবিতাটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বেই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব আবদুল গাফফার চৌধুরী তাঁর ‘তৃতীয় মত’ কলামে কবিতাটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেসময় এই প্রশংসাবাণী তরুণ কবি নির্মলেন্দু গুণকে ভীষণরকম প্রণোদিত করে। পরবর্তীসময়ে এই কবিতাকে কেন্দ্র করে তানভীর মোকাম্মেল নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র।

জীবদ্দশায় জনপ্রিয় কবির তকমা পেয়েছেন গুণ। অবশ্য কবি যখন সবশ্রেণির পাঠকের কাছে বিপুল পরিমাণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তখন বোদ্ধা সমালোচকমহল সংশ্লিষ্ট কবিতার নান্দনিক উৎকর্ষ নিয়ে সন্দেহপোষণ করেন। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা নিয়েও কখনও-সখনও এমনতর অমূলক প্রশ্ন উত্থাপিত হতে দেখা গেছে। কিন্তু গুণ তাঁর কাব্যদর্শনে সদা অবিচল থেকেছেন। এখনও আছেন। দেশের প্রতি, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তিনি অটল ও অবিচল।

‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ (১৯৭০) কাব্যগ্রন্থে দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতার যে আত্মদর্শন নির্মলেন্দু গুণ উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তীসময়ে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ (১৯৭২) ‘কবিতা, অমীমাংসিত রমণী’ (১৯৭৩) ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ (১৯৭৮) ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’ (১৯৭৯)-সহ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে এই বোধ আভাসিত হয়েছে। দেশের স্বার্থে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে তিনি সচেতনভাবেই কাব্যভাষায় প্রাণময়তা দিয়েছেন। শিল্পের পাশাপাশি সামাজিক উপযোগিতাও তাঁর কবিতার বিশেষ দিক।

সমসময়ে শামসুর রাহমান কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের ন্যায় গুণের কবিতাও রাজনৈতিক নানা ঘটনাকে আশ্রয় করে আবর্তিত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ যেমন তাঁর তুলির আঁচড়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মূর্ত করে তুলেছিলেন। নির্মলেন্দু গুণও অনুরূপভাবে তাঁর কবিতার ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধুর আদর্শভাষ্য এবং চেতনাকে মূর্ত করে তুলেছেন। ইতিহাসের এক মহানায়ককে বাংলা কবিতায় উৎকীর্ণ করে রাখার ক্ষেত্রে গুণের লেখা কবিতাগুলো সত্যিই তুলনারহিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর এদেশে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের ভিন্ন চক্রান্ত। তেমন পরিস্থিতিতে জাতির জনকের নাম উচ্চারণ করাও ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। নির্মলেন্দু গুণ সেই প্রতিকূল পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘একুশের কবিতা পাঠ’-এর আসরে প্রথম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করলেন:

”সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।
শহীদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি রক্তাক্ত ইট
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

——- —– —–

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।”

‘৭৫ পরবর্তীসময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এই কবিতাটি প্রথম প্রকাশ্যে পাঠ করেন নির্মলেন্দু গুণ। এটি ১৯৭৭ সালে কবি সিকানদার আবু জাফর প্রতিষ্ঠিত মাসিক সমকাল-এ প্রথম প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণকে উপজীব্য করে নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন কালজয়ী আরও একটি কবিতা ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’। এখানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘কবিতা’ এবং বঙ্গবন্ধুকে তিনি ‘কবি’ অভিধায় ভূষিত করেছেন:

“একটি কবিতা লেখা হবে, তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে/লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’/… শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,/রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।/…কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:/‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’/সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।”

আদতে নির্মলেন্দু গুণ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতি সদা সমর্পিত থেকেছেন। অন্য অনেকের মতো সুবিধামুহূর্তে নিজের ব্যক্তিদর্শন থেকে বিচ্যুত হননি। বিভিন্ন লেখায় ব্যাপারটি তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন। যেহেতু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। যেহেতু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি তাঁর রয়েছে অগাধ অনুরক্তি। সেহেতু তিনি নিজেকে আদর্শের বিবেচনায় ‘আওয়ামী লীগের কবি’ বলতেও দ্বিধা করেননি। অবশ্য প্রকাশ্যে এমন উচ্চারণের জন্য তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন, হয়েছেন বিতর্কিত। কিন্তু কবি হিসেবে তিনি চিরকাল স্পর্ধিত উচ্চারণে অভ্যস্ত। গতানুগতিক প্রচল পথে হাঁটতে চাননি। সর্বোপরি, দীর্ঘকাব্যযাত্রায় নির্মলেন্দু গুণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিবেদিত ছিলেন। এটাই তাঁর কাব্যযাত্রায় স্পর্ধিত ব্যক্তিদর্শন।

[ফারুক সুমন
কবি ও প্রাবন্ধিক]

Facebook Twitter Print Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *