মানুষ বিধানচন্দ্র রায়ের গল্প

Dr. Bidhan Chandra Roy

মিত্রাংশু ব্যানার্জ্জী

১৯৬১ সালের আগস্ট মাসের ৬ তারিখ। ভারতবর্ষের এক অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জে এফ কেনেডি এক সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারে বসেছেন। হঠাৎ সেই ব্যক্তি কেনেডির দিকে ভুরু কুচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন, “আমার মনে হয় আপনি আপনার পিঠে অনেকদিন ধরেই একটা তীব্র ব্যথা অনুভব করছেন।” ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত হয়ে গেলেও নির্ভুল ডায়াগনসিসের জন্য অচিরেই কেনেডি সেই ব্যক্তির কাছে তাঁর সমস্ত মেডিক্যাল রিপোর্ট তুলে ধরলেন। সেই রিপোর্ট দেখে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি লিখে দিলেন নতুন প্রেসক্রিপশন এবং অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন— এক মাসের মধ্যে যদি কেনেডির এই ব্যথা দূর না হয়, তাহলে তিনি আবার আসবেন তাঁকে দেখতে, সম্পূর্ণ নিজের খরচায়। একপ্রকার বাক্-রুদ্ধ কেনেডি জানতে চেয়েছিলেন, একজন রাজনীতিবিদ হয়ে তিনি একাজ কী করে করতে পারেন? উত্তর এসেছিল, Sir I am doctor by profession and a politician my passion. মিটিং শেষে যখন দু’জনেই করমর্দন করে টেবিল ছেড়ে উঠে আসছেন ভারতীয় মুখ্যমন্ত্রী নির্দ্বিধায় চেয়ে বসলেন তাঁর ফিজ। ঠিকই তো, বড় ভুল হয়ে গেছে, ঈষৎ লজ্জিত কেনেডি জিজ্ঞাসা করেছিলেন— ফিজ হিসেবে তাঁকে কী দিতে হবে? তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর রাজ্যের উন্নতির জন্য চেয়ে নিয়েছিলেন ৩০০ কোটি টাকা, যা পলকের মধ্যে গ্রান্ট করে দিয়েছিলেন কেনেডি। জানতে ইচ্ছে করছে কে সেই মুখ্যমন্ত্রী! তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন আধুনিক বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। তিনি সেই গুটিকয় বিরল ব্যক্তিত্ব যাঁদের একই তারিখে জন্ম ও মৃত্যু ঘটেছে। আর আজ ১ জুলাই। আজ একইসঙ্গে বিধান রায়ে জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী।

আরও পড়ুন: স্মরণে অধ্যাপক অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০-২১ জুন ২০২০)

তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে বিষয় খুঁজে পাওয়া ভীষণ কঠিন। কারণ যে বিষয়ে বলতে যাই না কেন, সেই ক্ষেত্রটিই অসীম। ডাক্তারির কথা যখন উঠলই, তখন আর একটা গল্প বলি। সময়টা তিরিশের দশক। আইন অমান্যের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ভারতের প্রত্যন্ত প্রান্তরেও। আগেই বলেছি, নেশায় রাজনীতি করতেন বিধান রায়। আর তখন রাজনীতি মানে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম। ব্রিটিশের ব্যাপক ধরপাকড়ে বিধান রায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন। তাঁকে নিয়ে আসা হল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। তাঁর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে কিন্তু বেঁকে বসলেন তিনি। তাঁর দাবি, তাঁকে অন্যান্য সাধারণ অপরাধীদের সঙ্গে রাখতে হবে। সাধারণত জেল কর্তৃপক্ষ এহেন দাবি-দাওয়াতে কর্ণপাত করেন না, কিন্তু এহেন বিশেষ ব্যক্তিত্বকে জেল কর্তৃপক্ষ অগ্রাহ্য করতে পারেননি। অতএব তাঁর থাকার ব্যবস্থা হল জেনারেল সেকশনেই, অর্থাৎ সশ্রম কারাদণ্ড। সময়টা ভালো না, চারিদিকে নিউমোনিয়া এবং টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব। জেলেও প্রায়ই কয়েদিরা মারা যাচ্ছে একপ্রকার বিনা চিকিৎসায়।

বিধানবাবু আসার ক’দিনের মধ্যেই জেল কর্তৃপক্ষ লক্ষ করলেন মৃত্যুর হার সেখানে বিশেষভাবে কমতে শুরু করেছে। এতদিন বিশেষ লক্ষ করা হয়নি। হঠাৎ একদিন জেলার সাহেব দেখলেন, গলায় স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন সুপুরুষ ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ইনি কে! ইনি তো জেলের ডাক্তার নন! ভালো করে লক্ষ্য করে বোঝা গেল, তিনি আর কেউ নন তিনি হলেন বিধান রায়। স্বেচ্ছায় বিনা পারিশ্রমিকে তিনি জাতি-ধর্ম অপরাধ নির্বিশেষে সেবা করে চলেছেন জেলের কয়েদিদের। শুধু তাই নয়, নিজের পয়সা খরচা করে বাইরে থেকে তাঁর ভাইকে দিয়ে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও নিয়ে আসছেন তিনি। জেলে যেন এক শোরগোল পড়ে গেল। স্বয়ং ধন্বন্তরি যেন জেলে আবির্ভূত হয়েছেন। কেবলমাত্র মুখের দিকে তাকিয়ে এবং পালস দেখে তিনি ডায়াগনসিস করতেন। কথায় বলে অর্ধেক অসুখ সঠিক ডায়াগনোসিসেই ঠিক হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আর সঙ্গে ওষুধের নিয়মিত জোগান তো ছিলই। এহেন জ্ঞানী মানুষটির সকল বিষয়ই শেখার আগ্রহ ছিল চরম। জেলে থাকাকালীন তিনি কারুবিদ কানাই গাঙ্গুলীর সঙ্গে পরিচিত হন। যিনি ছিলেন জার্মান ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ। ছ’মাসের কারাবন্দির জীবন শেষে বিধান রায় যখন আলিপুর জেল ছেড়ে যাচ্ছেন, তিনি জার্মান ভাষা প্রাথমিকভাবে রপ্ত করে ফেলেছেন। কারণ একদিনে তাঁর হাজার কাজের মধ্যেও তিনি একদিনের জন্যও কানাইবাবুর কাছে জার্মান ভাষার পাঠ নেওয়া থেকে বিরত থাকেননি। এমনি ছিল তাঁর অধ্যবসায়।

আরও পড়ুন: দৃশ্যের জন্ম-মৃত্যু

দুর্গাপুর হসপিটাল পরিদর্শন কালে

ছোটবেলাটা কিন্তু মোটেই ভালো কাটেনি ভজনের। হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন। ঠাকুমা আদর করে নাম রেখেছিলেন ভজন। আর নামকরণের দিন অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন, তিনিই নাম রাখেন বিধানচন্দ্র। পরিবারের অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না তাঁদের। একান্নবর্তী পরিবারের সকল ভাই-বোনেদের মিলে বিধানবাবুরা ছিলেন মোট ১৮ জন। তাঁর বাবা ছিলেন নিতান্ত সাধারণ এক সরকারি কর্মচারী। সরকারি কাজে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার দরুন সরকারের পক্ষ থেকে তাকে একটি ঘোড়া এবং সেই ঘোড়ার খাবার বাবদ বিট গাজর ইত্যাদি সবজি দেওয়া হত। ভাবতে অবাক লাগে অভাবের তাড়নায়, খিদের জ্বালায় বিধানবাবু এবং তাঁর ভাই-বোনেরা সেই বিট গাজর খেতেন এবং ঘোড়াকে খাওয়াতেন ঘাস।

পটনা থেকে পায়ে হেঁটে কলকাতায় এসেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। নাহ, ডাক্তার হবেন বলে আসেননি। এসেছিলেন পড়াশোনা শিখে নিতান্ত একটা চাকরির জন্য। সেই কারণেই শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ দুই জায়গাতেই তিনি ফর্ম ফিলআপ করেন। মেডিক্যাল কলেজের লিস্ট আগে বের হওয়ায় তিনি ডাক্তারিকে পড়াশোনা এবং পেশা হিসেবে বেছে নেন। এই প্রবাদপ্রতিম ডাক্তারও মেডিক্যাল কলেজের বিএম পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় তিনি থাকতেন ওয়াইএমসিএ হস্টেলে। হাত খরচের টাকার জন্য প্রয়োজনে তিনি রাস্তায় ট্যাক্সিও চালিয়েছেন একসময়। মাত্র ১২০০ টাকা সম্বল করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের পড়াশোনা শেষ করে তিনি বিলেতে গিয়ে এমআরসিপি এবং এফআরসিএস একসঙ্গে পাশ করার স্বপ্ন দেখেন। বিশ্বাস করবেন না, সেন্ট বার্থলোমিউ কলেজ তাঁর এই অসাধ্য এবং অবাস্তব ইচ্ছেকে ৩০ বার নাকচ করলেও তিনি দমে যাননি, ৩১ বারের মাথায় তাঁর আবেদন গৃহীত হয় এবং নির্দিষ্ট সময়েই তিনি এই বিরল সম্মান এবং সাফল্যের অধিকারী হন। তাঁর ডাক্তারির গল্প বলে শেষ করার নয় এবং প্রতিটা যেন একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে চায়।

অ্যাকাডেমী অফ ফাইন আর্টসে

এবার আসি তার রাজনৈতিক জীবনের কিছু টুকরো গল্পে। আজকে সল্টলেককে চেনেন না পশ্চিমবঙ্গে এমন মানুষ খুব কমই আছেন। বহুতল ইমারত, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন খেলার মাঠ, পরিকল্পনামাফিক গড়ে ওঠা রাস্তাঘাট, কি নেই এখানে। কিন্তু জানেন কি সরকার এই সল্টলেকের জমি কত টাকায় কিনেছিল! টাকার অঙ্কটা ছিল ১। হ্যাঁ, ঠিকই দেখছেন এবং এটা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র বিধানবাবুর জন্যই। বিধানবাবুর মন্ত্রিসভায় সেচমন্ত্রী ছিলেন হেমচন্দ্র নস্কর। এবং তার চেয়ে বড় কথা, ওই গোটা সল্টলেকের জমির মালিক ছিলেন তিনি। তখন সেই অঞ্চল জুড়ে ছিল বিশাল বিশাল ভেরি। একপ্রকার জোর করেই বিধানবাবু সেচমন্ত্রী থেকে এই জমি নিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধ ফেলতে পারেননি সেচমন্ত্রী। সরকারের ভাড়ার তখন প্রায় শূন্য। অথচ বাংলাদেশ থেকে হু-হু করে মানুষ ঢুকতে শুরু করেছেন কলকাতায়, ফলে শহরের বিস্তার না ঘটলে বাসস্থান পাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠবে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিলে পরবর্তীকালে কথা উঠবে তাই এক টাকার বিনিময়ে তিনি হেমচন্দ্রর থেকে নিয়ে নিয়েছিলেন সল্টলেকের এই বিশাল জমি।

সল্টলেকের সূচনাকালে

কলকাতার উপকণ্ঠে কল্যাণী নগরীর উত্থানের গল্প তো সবাই জানেন। এককালে ড. নীলরতন সরকারের কন্যা কল্যাণীর পাণিপ্রার্থী ছিলেন বিধানবাবু। কিন্তু সরকার মহাশয় সবেমাত্র ডাক্তারিতে ঢোকা বিধানবাবুর হাতে তাঁর মেয়েকে তুলে দিতে চাননি এই অজুহাতে যে, বিধানবাবু মাসিক উপার্জন তাঁর মেয়ের হাত খরচের থেকেও কম। আশাহত বিধানবাবু আর কোনদিনও বিয়ে করেননি, কিন্তু কল্যাণীকে তিনি ভুলতে পারেননি। তাই সল্টলেকের পর যখন আর এক নতুন পরিকল্পিত নগরী সূচনা ঘটল, তিনি ভালোবেসে তার নাম রাখলেন কল্যাণী। সল্টলেক বা কল্যাণী ছাড়াও তাঁর হাতেই সৃষ্টি হয়েছে ইস্পাত নগরী দুর্গাপুরের। আবির্ভাব ঘটেছে চিত্তরঞ্জন রেল কারখানার। কর্মসংস্থান এবং দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তিনিই তৈরি করেছিলেন হরিণঘাটা দুগ্ধ প্রকল্প। আরও কত কী যে তিনি তৈরি করে গেছেন, তা শেষ বয়সে এসে তিনি নিজেও ভুলে গিয়েছিলেন।

একদম মাথায় ডানদিকে বিধান রায় ও কেনেডির সাক্ষাৎকারের খবর।নিউ ইয়র্ক টাইমস, ৭ আগস্ট ১৯৬১

সাহিত্য এবং সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর টান ছেলে যথেষ্ট। একসময় আইন করে বুদ্ধদেব বসু অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রবোধ সান্যালেরর মতো লেখকদের লেখার বেশ কিছু অংশকে আপত্তিকর বলে লালবাজার সেগুলোকে নিষিদ্ধ করতে শুরু করলে তাঁরা তারাশঙ্কর এবং সজনীকান্তকে সঙ্গে নিয়ে বিধানবাবুর সঙ্গে দেখা করেন। এতে অত্যন্ত বিচলিত এবং লজ্জিত বোধ করে বিধানবাবু তৎক্ষণাৎ লালবাজারের বড়বাবুকে ভর্ৎসনাস্বরূপ এই জাতীয় আইনকানুন বদলানোর নির্দেশ দেন। কোনওরকম বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’কে সরকারি প্রযোজনার ব্যবস্থা করে দেন।

সব প্রধানমন্ত্রীরাও এই সম্মান পান না। বিধানচন্দ্র রায়ের ডাকটিকিট

গান্ধিজি এবং নেহরুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল যথেষ্ট সখ্যতার। গান্ধিজি তাঁকে সংযুক্ত প্রদেশের গভর্নর হিসেবে চেয়ে থাকলেও তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে যোগ দেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য গান্ধিজি বিধান রায়কে বলেছিলেন যে, “তোমাকে ইওর হাইনেস বলে ডাকব ভেবেছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে সে সুযোগ দিলে না।” প্রত্যুত্তরে ঠাট্টা করে বিধান রায় বলেছিলেন, “আমার পদবি রায়, আর আমি উচ্চতাতেও ছ’ফুটের কিছুটা উপরেই, ফলে আপনি অনায়াসে আমাকে ‘রয়’আল হাইনেস’ বলে ডাকতে পারেন।” একবার জওহরলাল নেহরু কঠিন পরিস্থিতিতে বিধান রায়কে বলেছিলেন, কেন্দ্রের তরফ থেকে যতটা পরিমাণ চাল বাংলার প্রাপ্য তিনি ততটা দিতে পারবেন না। একদিন বিধান রায় যেন গম দিয়েই কাজ চালিয়ে নেন। নেহরুর কাছে ভাত এবং রুটির পার্থক্য না থাকলেও বিধান রায় জানতেন বাঙালির কাছে ভাতের মর্ম কী। তাই তৎক্ষণাৎ তিনি বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করলেন এবং আদমশুমারির মতো করে প্রতি বাড়ি গিয়ে তাদের খাদ্যদ্রব্যে ভাত আগে না গম, সেটার একটা লিস্ট করে ফেললেন। তিন মাসের মধ্যে তিনি নেহরুকে একটি চিঠি লিখে জানালেন যে, আমার রাজ্যে রুটি খাওয়া মানুষদের চালের জোগান দিতে আমি পারব না। তাই তাঁদের রুটির ব্যবস্থাটা নেহরুকেই করতে হবে। নেহরু চিঠি সারমর্ম বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আর দেরি না করে বাংলাকে পুনরায় তাঁর প্রাপ্য চাল দিতে শুরু করেন।

সারাজীবন কাজকে কথার থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে যাওয়া একজন মানুষ

তাঁর রাজনৈতিক জীবনে জ্যোতি বসু ছিলেন বিরোধী দলনেতা। একবার একটি বিল পাস করানোর সময় জ্যোতিবাবু বিধান রায়ের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, এ তো হিটলার কথা বলছে মনে হচ্ছে। মুহূর্ত কালক্ষেপ না করে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ঠিকই বলছেন, এখানে হিটলার কথা বলছে স্ট্যালিনের সঙ্গে। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও বিধানবাবু সম্পর্ক ছিল বেশ মসৃণ। উভয়ই একে অপরকে সম্মান করতেন। এমনকী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় থাকার দরুন শ্যামাপ্রসাদবাবুকে দিয়ে তিনি বাংলার জন্য বেশকিছু দাবি-দাওয়াও আদায় করে নেন।

মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনও তিনি প্রত্যেকদিন সকাল সাতটা থেকে নিজের বাসায় বিনা পারিশ্রমিকে রোগী দেখতেন। শুধু তাই নয় এই কাজের সুবিধার জন্য তিনি নিজের পকেট থেকে খরচা করে দু’জন অতিরিক্ত ডাক্তার রেখেছিলেন। ক্ষমতার চরমতম জায়গায় থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে কেউ এক টাকারও তছরুপের অভিযোগ আনতে পারেনি। ৫ টাকা ২৫ পয়সা নিয়ে পটনা থেকে কলকাতায় আসা মানুষটি যখন নিজের বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করছেন, বাড়িতে পাওয়া গিয়েছিল ১১ টাকা ২৫ পয়সা। অর্থাৎ সারা জীবনের সঞ্চয় ছয় টাকা। হয়তো অঙ্কের এই সরল হিসেবটাই উত্তর দিয়ে যায় তিনি কে এবং কী ছিলেন এই দুটো প্রশ্নের। আজ তাঁর জন্ম এবং মৃত্যুদিনে এই লেখাই হোক দেশের ‘জাতীয় ডাক্তার’-এর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *