অন্য নিমকহারামদের কথা আর পলাশির বাস্তবতা (প্রথম পর্ব)

Palashi

ড. মাল্যবান চট্টোপাধ্যায়

দেওয়ান রাজা মোহনলাল মির মদনকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন এবং লড়াই চালাচ্ছেন ও গুলিবর্ষণ করছেন। তাঁর সেনাবাহিনী নানা দিক থেকে অগ্রসর হয়েছে এবং হালকা বন্দুক চালাতে চালাতে আশা দেখতে শুরু করেছেন। সিরাজ-উদ-দৌলা তাঁকে শিবিরে এবং সুরক্ষিত স্থানে ফিরে আসতে নির্দেশ পাঠালেন। তিনি উত্তর পাঠালেন ‘এখন পিছিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যা কিছু ঘটার তা এখানেই ঘটবে। আমি যদি পিছিয়ে যাই, তাহলে সেনাবাহিনীর মধ্যে ভীষণ বীভ্রান্তি দেখা দেবে এবং পলায়নের রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।’ সিরাজ-উদ-দৌলা মির মহম্মদ জাফর খানের দিকে তাকালেন এবং তাঁর মতামত চাইলেন। তিনি তাঁর আগের কথাগুলিই পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘আমি যে রাস্তা ঠিক করেছি সেই মতোই কিছু একটা করতে হবে। আমি চললাম। বাকিটা আপনিই ঠিক করুন।’ সিরাজ-উদ-দৌলা ভয়ে ও উৎকণ্ঠায় এবং মির মহাম্মদ জাফর খানের কথা নির্বিবাদে মেনে নেওয়া আবশ্যক মনে করে জোরের সঙ্গে মোহনলালকে তাঁর এগিয়ে যাওয়া অবস্থান থেকে ফিরে আসতে বললেন। যে মুহূর্তে মোহনলাল তাঁর অবস্থান থেকে পিছিয়ে এলেন, সৈন্যদলের মধ্যে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্বাসঘাতকদের অনুসরণকারীরা ও কাপুরুষরা পালাতে শুরু করল… গোলাম হোসেন তবতবাই, সিয়ারু’ল মুতাখিরিন (সূত্র অমর ফারুকি লিখিত ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা ১৭৫৭-১৮১৩। গ্রন্থটির অনুবাদক শুভ্র মল্লিক)।

আরও পড়ুন: রথের দিনে ‘রাধারাণী’-র খোঁজ আজও করি

১৭৮০-৮১’তে রচিত হয়েছিল এই জবানি। রচনাকারীর পরিবার কোন কারণে সিরাজ-উদ-দৌলার বিরাগভাজন হয়েছিলেন এবং রচনাকার স্বয়ং প্রথমদিকে মিরজাফরকে চিনতেন। পলাশির যুদ্ধে নিজে উপস্থিত না থাকলেও তার যথেষ্ট উপায় ছিল সেখানে কী ঘটেছিল, তা জানার। তবে এই লেখা শেষ দিকটি লক্ষ্যনীয় যেখানে তিনি বিশ্বাসঘাতকদের কথা শুরু করেছেন। বাঙালি মননে বিশ্বাসঘাতকদের একটা সহজ বাংলা আছে। সেটি হল নিমকহারাম।

এবার আসা যাক কেন এই কাহিনি বলছি। এই উপাখ্যান লেখার যে দিন কেন্দ্র করে, আজ সেই ২৩ জুন। ১৭৫৭ সালে আজকের দিনেই ঘটেছিল পলাশির যুদ্ধ। পলাশির যুদ্ধ এবং সেখানে ভারতীয়দের পরাজয়ের হাত ধরে ব্রিটিশ শাসন তার ক্ষমতাকে আস্তে আস্তে বিকশিত করতে শুরু করে ভারতে। অনেকে বলেন যে, ভারত ১৭৫৭-র যুদ্ধ শুধুমাত্র বাণিজ্যগত ক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়েছিল ব্রিটিশদের অনুকূলে। এইসব তর্কের বাইরে ও আরেকটি ঘটনা আমাদের চিরকালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা, জেলা হিসেবে এক ইতিহাস প্রসিদ্ধ জেলা আর তার ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বাংলার নবাবি আমল এবং নবাবি আমলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে পলাশির যুদ্ধ আর সিরাজ-উদ-দৌলা। আরেকটি নিমকহারাম দেউড়ি, যা মিরজাফর এর আস্তানা ছিল, এখনও যেখানে থাকেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা বা তাঁদের লোকজন।

আরও পড়ুন: রথ, লোকারণ্য; ইতি আনন্দ

ইতিহাসের প্রথাগত বিতর্ক বাদ দিয়ে দেখা যাক কারা নিমকহারাম? সত্যিই কি তিনি একা নিমকহারাম? আজ থেকে ২৬৩ বছর আগে আজকের দিনে ঘটে যাওয়া পলাশির যুদ্ধর পরে হয়েছে বক্সারের যুদ্ধ এবং তার ওপরে ১৮৫৭ সালের ঘটনাবলি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে অনেকটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল। এসবের পরে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল এক আন্দোলন। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই জোরদার হয়েছিল এটি এবং বিশ শতকের এটি প্রবল আকার ধারণ করেছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে। এসবের অনেক আগে ঘটে যাওয়া আজকের দিনটির ঘটনাক্রমের সঙ্গে সঙ্গে যেমন জুড়ে আছে মুর্শিদাবাদ জেলা, তেমনই জুড়ে আছে বর্তমানে ভারতের নদিয়া জেলার অন্তর্গত পলাশির প্রান্তরে থমকে অনেক কথা কথা। এসব আমরা বইয়ের পাতা থেকে উচ্চারণ করতে পারি। কিন্তু বাস্তবকে খুঁজতে গেলে যেতে হবে সেই নিমকহারাম দেউড়িতে। যেখানে এখনও ইতিহাস কথা বলে। আড়াইশো বছর পার করার পরেও যেখানে ইতিহাসের হাত ধরে বাস্তব হয়ে ওঠে পলাশি এবং সেই যুদ্ধের বর্ণনাগুলো। আর কাছেই থাকা হাজার দুয়ারি আজও রোজ শোনে টুরিস্ট গাইডের মুখে সেই লোকমুখে প্রচারিত নিমকহারাম দেউড়ির কথা। শুনতে শুনতে কোন ছোট্ট শিশু হয়তো জিজ্ঞেস করে,‘মা নিমকহারাম কে?’ গাইড বলবেন অইতা মিরজাফরের বাড়ি। কিন্তু শুধুই মিরজাফর কেন?

মুর্শিদাবাদ শহরে কিংবা বহরমপুর শহরের এরকম অনেক মানুষকেই পাওয়া যায়, যাঁরা সেকালের ইতিহাস বলে ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করে দু’টো অর্থ উপার্জন করেন, তাঁদের মুখেও এই নিমকহারামের দেউরি স্মৃতি থেকে গেছে। কি বলবেন একে, মৌখিক ইতিহাস? এই মৌখিক ইতিহাস কি আদৌ একমাত্র সত্য?

মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগে আছে মিরজাফরের সমাধিক্ষেত্র এবং তার পাশাপাশি মিরজাফরের বংশধররা থাকেন। সেখানেই রয়েছে এক ভাঙা প্রাসাদ, যার নাম নিমকহারাম দেউড়ি। মিরজাফর মারা গেছেন তারপরে অনেক অনেক সময় কেটে গেছে কিন্তু নিমকহারাম শব্দটি উঠে যায়নি। লেগে আছে তাঁর উত্তরসূরিদের গায়ে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে ১৭৫৭-এর আজকের দিনের টুকরো ইতিহাস স্মৃতি। ১৭৫৭ থেকে আজকের সময়ের মানুষের কাছে আজও টিকে আছে নিমকহারামের দেউড়ি। পলাশি প্রান্তরে ছিল একটা বিশাল আমবাগান, যার কিছুই প্রায় আজ অবশিষ্ট নেই। সেই আমবাগানের অন্দরমহল কি একমাত্র নিমকহারাম বলবে মিরজাফরকে? আজকের দিনে আসুন সেটাই দেখা যাক।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধের দিন থেকে আজ মিরজাফর শব্দটি কীভাবে যেন বাঙালি মননে বিশ্বাসঘাতকতার একটি প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর ভেতরের ইতিহাসটা কেমন? পলাশির প্রান্তরের আমবাগানে কি এই বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধতে লেগে আছে অন্য আরেক ইতিহাসের কথা? শুধু কি তাঁর একার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সিরাজ-উদ-দৌলা পলাশির প্রান্তরে পরাজিত হয়েছিলেন? নাকি সিরাজ-উদ-দৌলা পলাশির প্রান্তরে যখন লড়াই করছিলেন, তখন তাঁর কাছে মিরজাফর আদৌ বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিই ছিলেন না। এই প্রশ্নগুলো ফিরে দেখার প্রয়োজন আজ হয়েছে। কারণ আমরা অনেক দলিল-দস্তাবেজ থেকে অন্যরকমের কথাও খুঁজে পাই। পলাশির যুদ্ধের কয়েক বছর আগে থেকেই বাংলার নবাবি দরবারে স্বার্থের লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশেষত তৎকালীন বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁর শরীর ভেঙে পড়ার থেকেই এর শুরু। কিন্তু আরও স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে আলিবর্দি খাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতা কে পাবে, এই নিয়ে লড়াই কিন্তু শুরু হয়ে গিয়েছিল অনেক আগে থেকেই। পুত্রসন্তান হীন আলিবর্দির উত্তরাধিকারী কে হবেন, এই নিয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা তথ্য পেয়ে থাকি। তাঁর তিন কন্যা ও তিন জামাতার মধ্যে থেকেই তাঁর মসনদের উত্তরাধিকারী নির্ধারণের কথা ভাবা হয়েছিল, এমনটাই সমকালের দলিল-দস্তাবেজ বলে।

এক্ষেত্রে বড় দাবিদার ছিলেন আলিবর্দি খাঁর কন্যার পুত্র শওকত জং। তিনি সে সময় পূর্ণিয়া শাসনকর্তা ছিলেন। এনার আবার বড় সমর্থক ছিলেন আলিবর্দির জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহের-উন-নিসা। যিনি ঘসেটি বেগম নামেই ইতিহাসে পরিচিত। তাঁর নিজেরও কোনও পুত্রসন্তান ছিল না এবং স্বামীর মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগম ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে এক সুরক্ষিত প্রাসাদ নির্মাণ করে বসবাস করতে শুরু করেন। কনিষ্ঠা কন্যা আমিনা বেগম পিতার কাছেই থাকতেন। আর এই আমিনার পুত্রই হলেন সিরাজ-উদ-দৌলা। তাঁর প্রতি আলিবর্দির বিশেষ স্নেহ ছিল এবং শেষপর্যন্ত আলিবর্দি তাঁকেই মসনদে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করবেন বলে মনস্থির করেন।

সিরাজকে বাংলার নবাবের পদে তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা সহজে মেনে নেবেন না, সেটা আলিবর্দি খাঁ বোধহয় আঁচ করতে পেরেছিলেন। এর পাশাপাশি বলা যেতে পারে, ঘসেটি বেগমও সিরাজকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। আলিবর্দি বেঁচে থাকাকালীন সময়ে সিরাজের সঙ্গে ঘসেটি বেগমের সম্পর্ক প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছিল। লোকশ্রুতি অনুসারে, বেগমের দেওয়ান হোসেন কুলি খানকে প্রকাশ্যে রাজপথে সিরাজ হত্যাও করেছিলেন। ইনিই সেই সিরাজ, যাঁকে আমরা বাংলার শেষ নবাব বলি। তিনিও প্রকাশ্য রাস্তায় এই হিংসাটির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। এভাবে বলা যেতে পারে, ক্লাইভের বাহিনী নিয়ে পলাশির প্রান্তরে আসার আগে থেকেই মুর্শিদাবাদের রাজনীতির অলিন্দে যে ফাটল প্রকাশ্যে এসে গিয়েছিল, তাতে লেগেছিল রক্তের দাগ।

এখনও মিরজাফরকে সেভাবে খুঁজে পাচ্ছেন না হয়তো কেউই। এবার তাঁর কথাই বলতে হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আলিবর্দি খাঁর কাছে পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে যিনি সিরাজের মসনদ প্রাপ্তিতে সাহায্য করবেন বলে শপথ নিয়েছিলেন তাঁর নাম মির-জাফর আলি খাঁ। ইতিহাসের পাতায় তিনি পরিচিত মিরজাফর হিসেবে আর মুর্শিদাবাদে যাঁর উত্তরসূরিদের বাসস্থান আজও পরিচিত নিমকহারাম দেউড়ি বলে।

মিরজাফর কথা রেখেছিলেন। সিরাজ মসনদ পেয়েছিলেন। কিন্তু মিরজাফর কি পেয়েছিলেন? শুধুই বোধ হয় নিমকহারাম তকমা আর ক্ষণিকের মসনদ। বাংলার মানুষ সামনে থেকে দেখলেন সিরাজ মসনদ খোয়ালেন আর মিরজাফর মসনদে এলেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে ব্রিটিশরাই মুচকি হেসেছিলেন।

এটা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে যে, মিরজাফর এমন কেই বা ছিলেন যে তিনি ভবিষ্যতের নবাব কে হবেন সে ব্যাপারে আলিবর্দি খাঁর কাছে শপথ গ্রহণ করবেন? এমন কি ক্ষমতা ছিল এই মানুষটির মধ্যে? এবার আসা যাক, সেই মিরজাফরের কথায়। ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল আলিবর্দি খাঁ যখন প্রাণ ত্যাগ করেন, তখন মিরজাফর বাংলার একজন বড় মনসবদার ছিলেন। তিনি বকশি পদে আসীন ছিলেন বহুকাল। নবাব সুজাউদ্দিনের অধীনে মিরজাফর তাঁর জীবন শুরু করেন। আরব দেশের নজর থেকে আসা সৈয়দ আহমেদ নজাফি ছিলেন তাঁর পিতা। বীর হিসেবে তাঁর খ্যাতি অর্জনের শুরু হয়েছিল বাকিবাজার থেকে অস্টেট কোম্পানিকে বিতরণ করার মধ্যে দিয়ে। এরপরেই তাঁর জীবনের উন্নতির সূচনা হয়েছিল। সিরাজের মতো কারোর স্নেহভাজন হয়ে ক্ষমতা পাওয়া তাঁর ভাগ্যে ছিল না।

আজকের ভাষায় ইঁদুর দৌড়ের জীবনে কেরিয়ার গ্রাফ বলতে যা বোঝায়, তার নিরিখে যদি মিরজাফরের কথা বলা হয় তাহলে দেখব তিনি অত্যন্ত ওঠানামার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। গিরিয়ার যুদ্ধে ১৭৪০ সালে আলিবর্দির হয়ে লড়াই করে মিরজাফর নবাবের নজরে পড়েছিলেন। মনে রাখা দরকার এই যুদ্ধ জয় করেই নায়েব নাজিম আলিবর্দি বাংলা সুপার নবাব পদ দখল করেছিলেন। অর্থাৎ আলিবর্দির নবাব হয়ে ওঠার পেছনে অবশ্যই মিরজাফরের একটা বড় ভূমিকা ছিল। এটি কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

তবে এর ফলাফল হিসেবে মিরজাফরকে বেশ উঁচু পদে নিযুক্ত করেছিলেন আলিবর্দি। এরপরে বাংলায় বেশ কয়েক বছর বর্গি আক্রমণ হয়েছিল এবং বর্গিদের উপদ্রবের বিরুদ্ধে মিরজাফর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। ১৭৪৫-এর দিকে শেষবারের মতো বর্গি আক্রমণের বিরুদ্ধে সফল অভিযান করে আলিবর্দির আরও বেশি সুনজরে পড়েছিলেন তিনি এবং এক্ষেত্রে বকশি পদ আগে দেওয়া হলেও তার উপর ওড়িশাকে নিয়ন্ত্রণ করার ভারও দেওয়া হয়েছিল। এর পাশাপাশি মিরজাফরের ভাগ্যে আরও অনেককিছুই প্রাপ্তি হয়েছিল। তিনি মেদিনীপুর, হিজলির ফৌজদারের পদেও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে মারাঠাদের আক্রমণ যখন ওড়িশায় হওয়ার সূত্রপাত হয়েছিল, তখন আলিবর্দির ক্ষেত্রে সহায় হয়েছিলেন এই মিরজাফরই। কিন্তু যাত্রাপথে মেদিনীপুরে প্রান্তরে মারাঠাদের সামনাসামনি পড়ে গিয়েছিলেন তিনি এবং তার পরে তিনি বর্ধমানে পলায়ন করেছিলেন। তাঁর এই নীতি আলিবর্দির ভালো লাগেনি এবং এজন্য আলিবর্দি তাঁকে সমস্ত পদ থেকে সরিয়েও দিয়েছিলেন। এখানে আলোচনায় ঢুকে পড়বেন আরেক এক মানুষ, তাঁর নাম খাজা আব্দুল হাদী খান। তিনি নবাবের সেনাবাহিনীর হিসাবপত্র পরীক্ষা করে আলিবর্দিকে জানান যে, মিরজাফরের অধীনস্থ মনসবদারিতে সেনার সংখ্যা এবং তাঁদের প্রাপ্ত বেতনের রাশির মধ্যে বিরাট হেরফের রয়েছে। প্রভাবিত আলিবর্দি পুনরায় বকশি পদ থেকে মিরজাফরকে সরিয়ে দেন। আব্দুল হাদীকে বৃদ্ধ নবাব আলিবর্দি বকশি পদে নিযুক্ত করেন। যদিও ততদিনই মিরজাফর নবাবের দরবারে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। আলিবর্দি মৃত্যুশয্যায় মিরজাফরের কাছ থেকে সিরাজের নিষ্কণ্টক মসনদ প্রাপ্তির জন্য প্রায় স্বীকারোক্তি আদায় করে নিয়েছিলেন কুরআন স্পর্শ করিয়ে। এটা বুঝিয়ে দেয় যে দরবারি রাজনীতিতে মিরজাফর ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

আলিবর্দির মৃত্যুর পর সিরাজ বাধাহীনভাবে যে মসনদে আসতে পেরেছিলেন, তার অন্যতম কারণ ছিল এই মিরজাফরের নীরব এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা। মুর্শিদাবাদের আনাচে-কানাচে নীরব এবং সাহায্যকারী মিরজাফরকে স্পর্শ করতে চান আজও অনেকে। সেরকমই এই অন্য মিরজাফরের বয়ান পাওয়া যায় মুর্শিদাবাদের মানুষ শ্যামল দাসের গবেষণা থেকে। তিনি দেখিয়েছেন যে, মিরজাফর সাহায্য করলেও সিরাজ প্রথম দিকে মিরজাফরকে খুব একটা বিশ্বাস করতে পারেননি। আজও তাঁর মতো এই জেলার অনেক মানুষই মনে করেন মিরজাফরকে পুরোপুরি বা একমাত্র বিশ্বাসঘাতক বলা যায় না। সিরাজ-উদ-দৌলা অনেকের মনে আঘাত বিদ্বেষ তৈরি করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। আর এর প্রকাশ শুরু হয়েছিল তাঁর ক্ষমতায় আসার পর থেকেই।

এই বিরোধিতার কণ্ঠ শোনা গিয়েছিল সেই মানুষটি থেকে, যাঁর এই মসনদে বসার একটা ইচ্ছা ছিল। তাঁর নাম শওকত জং। এই শওকত জংয়ের বিরুদ্ধ আচরণ এর ক্ষেত্রে অবশ্যই ঘসেটি বেগমের উৎসাহ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শওকত জংয়ের বিরুদ্ধে সিরাজ যখন এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন তিনি খবর পেলেন যে ঘসেটি বেগমের দেওয়ান রাজবল্লভের পুত্রকে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ কলকাতায় আশ্রয় দিয়েছে। এর পরে ১৫ জুন ১৭৫৬ সালে সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতার উপকণ্ঠে তাঁর সেনাদল নিয়ে হাজির হন। সিরাজ বাহিনী কলকাতা দখল এবং কলকাতার নাম পরিবর্তন করে আলিনগর রাখার ঘটনা ঘটে এর পরেই। ২০ জুন ১৭৫৬ সালে এই লড়াইয়ের আড়ালে থাকা মিরজাফরের বীরত্বে সিরাজ-উদ-দৌলা খুশি হয়ে মিরজাফরকে বকশি পদে পুনরায় বহাল করেছিলেন। এই পদ থেকেই আলিবর্দি তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এককালে।

(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল…)

● লেখক আসানসোল গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

Facebook Twitter Print Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *