অন্য নিমকহারামদের কথা আর পলাশির বাস্তবতা (দ্বিতীয় পর্ব)

Palashi Cover

ড. মাল্যবান চট্টোপাধ্যায়

ইতিমধ্যে শওকত জং দিল্লির বাদশাহর উজিরকে এক কোটি টাকা উৎকোচ দিয়ে বাংলা সুবেদারি ফরমান স্বপক্ষে আনিয়ে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি আইনি কাগজটি এনেছিলেন। মনে রাখা দরকার, বাংলা তখনও মুঘলদের আধীনেই ছিল। এক্ষেত্রে আরও মনে রাখা দরকার যে, সিরাজ-উদ-দৌলার কাছের কোনওদিনই দিল্লির তরফে বাংলার সুবেদারের ফরমান ছিল না। এর অর্থ এটাই যে, সিরাজ কোনওদিনই বাংলার আইনসম্মত শাসক ছিলেন না। আর এর পরেই এই শওকত জংয়ের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য মুর্শিদাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী জগৎ শেঠের কাছে সিরাজ নগদ তিন কোটি টাকা দাবি করে বসেন। এই টাকা দিতে অস্বীকার করলে সিরাজ প্রকাশ্যে অপমান করেছিলেন জগৎ শেঠকে এমনটাও শোনা যায়। শোনা যায়, চড় মেরেছিলেন সিরাজ। এই ঘটনার পরে জগৎ শেঠও সিরাজের উল্টো দিকে যাত্রা সূচনা করেন। সিরাজ অবশ্য এসবের মধ্যেও শওকত জংয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন ১৬ অক্টোবর, ১৭৫৬ সালে। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদের দরবারে অশান্তি বেড়েই চলেছিল। অশান্তির একটা বড় কারণ ছিল, মোহনলাল কাশ্মীরি। ঐতিহাসিক রজতকান্ত রায় লিখেছেন যে, সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে নিজের পরমাসুন্দরী ভাগ্নীর বিবাহ দিয়ে দরবারে মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন তিনি এবং দরবারের সকল আমির ওমরাহদের এবং মনসবদারদের মোহনলালকে প্রত্যহ কুর্নিশ জানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন সিরাজ-উদ-দৌলার তরফে এর পরেই। অধিকাংশ দরবারি ব্যক্তির পক্ষে এটা মেনে নেওয়া যথেষ্টই অসম্ভব ছিল।

আরও পড়ুন: অন্য নিমকহারামদের কথা আর পলাশির বাস্তবতা (প্রথম পর্ব)

কলকাতা আক্রমণের সময় সিরাজ সফল হয়েছিলেন। কিন্তু জয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ইংরেজ বাহিনী মাদ্রাজ থেকে এসে ক্লাইভের নেতৃত্বে কলকাতা যখন পুনর্দখল করল, তখন সিরাজের বাহিনীর ব্যর্থতা পলাশির আগেই প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। অর্থাৎ পলাশির প্রান্তরে ইংরেজদের হাতে প্রথমবারের মতো সিরাজ বাহিনী যে পরাস্ত হয়েছিল, তা কিন্তু বলা যায় না অর্থাৎ এটাও বলা যায় না যে, মিরজাফরের জন্যই সিরাজের পরাজয় হয়েছিল। ইংরেজরা সেসময়ে শুধু কলকাতা পুনরুদ্ধার করেছিল তাই নয়, পাশাপাশি ক্লাইভের নেতৃত্বে তারা আরওই সফল হয়েছিল। চন্দননগর থেকে ফরাসিদের হটিয়ে হুগলি নদীর উপকণ্ঠতেও ইংরেজরা কার্যত বিনা বাধায় পৌঁছে গিয়েছিল ২৩ মার্চ ১৭৫৭ সালের মধ্যেই। সিরাজের মনে ধারণা হয়েছিল, এই ব্যর্থতার সঙ্গে মিরজাফরের যোগাযোগ রয়েছে। তাই কিছুদিনের মধ্যে আবার মিরজাফরকে বকশি পথ থেকে সরে যেতে হয়। আর এ নিয়ে লিখতে গিয়ে সুশীল চৌধুরী বলেছেন, নবাব সম্ভবত ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে চেযেছিলেন। আর সেই জন্যই নবাব এই কাজটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ততদিনে অবশ্য সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছিলেন। যাঁদের নিয়ে তিনি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যেই লুকিয়ে ছিলেন নিমকহারাম।

আরও পড়ুন: রথের দিনে ‘রাধারাণী’-র খোঁজ আজও করি

এর মাঝে আবার কিছুদিন মোহনলাল অসুস্থ থাকার ফলে দরবারে নিযুক্ত ছিলেন না। ১৭৫৭ সালের মে মাসে তিনি দরবারে যুক্ত হলে আবার সেই ষড়যন্ত্র দানা বাঁধতে থাকে। এই ষড়যন্ত্র যে বাস্তব সত্য, তা সিরাজ জানতেও পেরেছিলেন। তাঁকে জানিয়েছিলেন ফরাসি সেনাপতি জা লঁ। আরও কয়েকটি ঘটনার কথা এ প্রসঙ্গে আমাদের জানা ভালো। এসময় ইউরোপের সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের ফলে ইংরেজ কোম্পানির সেনাবহর অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। আর এর সঙ্গে সঙ্গেই এ সময় একটি খবর রটেছিল যে, আফগান রাজ আহমদ খান আবদালি, দিল্লি আগ্রা ধ্বংস করে বাংলার দিকে এগিয়ে আসছেন। এই রটনা এতটাই তীব্র ছিল যে, মুর্শিদাবাদের দরবারে আবদালির গতিরোধ করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে রীতিমতো গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছিল। রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন যে, এই রটনাকে সিরাজ যথেষ্ট বাস্তব বলে মনে করেছিলেন এবং এই ভয়ের জন্য সিরাজ মনে করেছিলেন, আফগান রাজের আক্রমণের থেকে বাঁচার জন্য ইংরেজদের সঙ্গে যদি মিত্রতা স্থাপনও করতে হয়, তাও তাকে করতেই হবে। সম্ভবত সে কারণেই কিছুটা সম্মানহানি করেও আলিনগরের চুক্তিতে ৯ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭ সালে তিনি সই করেছিলেন। ততদিনে অবশ্য সিরাজ বিরোধীরা সিরাজের পরিবর্তে ইয়ার লতিফ খানকে মসনদে বসানোর পরিকল্পনাটিও নিয়ে ফেলেছিলেন। যদিও ইংরেজরা স্পষ্টতই মনে করত যে, সিরাজ সুযোগ পেলেই ফরাসিদের সঙ্গে হাত মেলাবেন, বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করবেন, তবুও তারা এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে আদৌ ইয়ার লতিফের মতো একজন দুই হাজারি মনসবদারকে বাংলাতে বসালে তা আদৌ হয়তো মুর্শিদাবাদের দরবারে সর্বজনগ্রাহ্য হবে না। বিকল্পের সন্ধানে নামেন ষড়যন্ত্রকারীরা।

ইতিমধ্যে মুর্শিদাবাদের দরবারে সুস্থ হয়ে যোগদানকারী মোহনলালকে বাংলা সুবার দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেন সিরাজ এবং তাঁকে যাতে অন্যান্য দরবারি লোকজন কুর্নিশ করে, সে বিষয়েও নির্দেশ জারি করেন। এ নিয়ে আগের মতোই আবার দরবারে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। সিরাজ-বিরোধী ব্যক্তিদের মধ্যে যে ক্ষোভ ছিল, তা আরও সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে সিরাজের এই সিদ্ধান্তের ফলে। মোহনলাল বিষয়ে সিরাজের সিদ্ধান্তকে একেবারেই মেনে নিতে পারেননি মিরজাফর। আর সেই কারণেই মিরজাফর সিদ্ধান্ত নেন সিরাজ-বিরোধী ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি হাত মেলাবেন আর এটা অপমানিত জগৎ শেঠ, উমিচাঁদের কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই ছিল। পুরনো দলিলপত্র এটাই বলে যে, জনৈক আরমানি সওদাগরের মধ্যস্থতায় ইংরেজদের দূত ওয়াটসের সঙ্গে মিরজাফরের প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৭৫৭ সালের ২৪ এপ্রিল। সেই সময়ই মিরজাফর জানিয়েছিলেন যে, তিনি যখনই দরবারে যান তখনই তিনি খুন হবার ভয়ে ভীত থাকেন। এই সময়ের থেকেই বলা চলে মিরজাফরকে ক্লাইভের তরফে সিরাজের বিকল্প মেনে নেবার কথা ভাবার শুরু হয়। ১৭৫৭ সালের পয়লা মে কলকাতার ইংরেজ কমিটি দীর্ঘ আলোচনার পর মিরজাফরের সঙ্গে এক গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে বলা হয় ইংরেজদের দেওয়া শর্তগুলি যদি মিরজাফর মেনে নেন, সেক্ষেত্রে ইংরেজদের তরফে মিরজাফরকে বাংলা সুবার সুবাদার পদে বসানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করা হবে। মিরজাফর যদিও এই গোপন চুক্তিতে সই করেছিলেন তথাপি এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, সিরাজের পতন হবেই সে ব্যাপারে কিন্তু মিরজাফর নিশ্চিত ছিলেন না।

মিরজাফরের এই পরিবর্তিত মনোভাবের কথা যে সিরাজ একেবারেই জানতেন না, তাও মনে করা অনুচিত। মিরজাফরের এই মনোভাবের কথা নবাব জেনেছিলেন এবং সেই জন্য পলাশির যুদ্ধের দুই হপ্তা আগেই মিরজাফরের প্রাসাদের এক বিশাল সেনাদল পাঠান তিনি এবং তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। এই ঘটনা ইংরেজদের বিচলিত করেছিল আর সেই জন্য তারা নবাবকে জানিয়েছিলেন যে, তাঁরা চুক্তিভঙ্গের হেতু কাশিমবাজার আসছেন এবং সেখানে ক্লাইভ পৌঁছে অবশ্যই বিবাদ মেটানোর জন্য ৫ জন দরবারির সাহায্য নেবেন। এই ৫ জনের মধ্যে একজন ছিলেন মোহনলাল আর বাকিরা ছিলেন সিরাজ-বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সিরাজ সেসময় মিরজাফরের প্রাসাদে উপস্থিত হন আবার এবং তাঁর সঙ্গে এক মীমাংসা চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে মিরজাফর এক্ষেত্রে আসন্ন যুদ্ধে নবাবের সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার করেন তিনটি শর্তের ভিত্তিতে। রমেশ চন্দ্র মজুমদারের লেখা অনুযায়ী এই তিনটি শর্ত ছিল। প্রথমত, বিপদ কেটে গেলে মিরজাফর নবাবের অধীনে আর কাজ করবেন না। দ্বিতীয়ত, আসন্ন যুদ্ধে তিনি কোনও সক্রিয় অংশগ্রহণ করবেন না। তৃতীয়ত, তিনি দরবারে যাবেন না।

অর্থাৎ এখানে মিরজাফর পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে, তিনি সম্ভাব্য যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবেন না। খুব সম্ভবত নবাব সিরাজ এটা মনে করেছিলেন যে, পলাশির প্রান্তরে তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে মিরজাফর সেই সময় আলাদা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিতে পারেন। শেষপর্যন্ত নবাব সম্মিলিত সেনাবাহিনী নিয়ে মুখোমুখি হন ব্রিটিশদের, আজকের দিনেই। এরপর এসে যায় পলাশির আমবাগানের ঘটনা। যুদ্ধে আগাগোড়া নিষ্ক্রিয় ছিলেন মিরজাফর, রায় দুর্লভ ও তাঁদের অধীনস্থ প্রায় তিন হাজার সেনা। এক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন রাখেন যে, মিরজাফর বকশি বা সেনাপতি হলে তাহলে সেনাপতি নিষ্ক্রিয় থাকলে কীভাবে নবাবের হয়ে এত সেনা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল? এর থেকে এই ধারণাও অনুমেয় হয় যে সিরাজ জানতেন মিরজাফর যুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার ভূমিকাই পালন করবেন। তাই তিনি এর বিকল্প তৈরি করার কাজও শুরু করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মিরজাফর নামেই সিরাজের বাহিনীর বকশি ছিলেন। ১৭৫৭ সালে ঘসেটি বেগমকে গৃহবন্দি করার পর সিরাজ মির মদনকে ঢাকা থেকে নিয়ে এসে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকে দেওয়া হয়েছিল সমস্ত গোলাবারুদ নিয়ন্ত্রণের অধিকার। তাই পলাশির যুদ্ধের আসল বাঁকবদল মিরজাফরের নিষ্ক্রিয় থাকা বোধহয় নয়। কামানের গোলায় মির মদনের হঠাৎ মৃত্যু হওয়ার কিছু পরেই নবাবের বাহিনী হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। দিশেহারা নবাব সেদিন কিন্তু মিরজাফরের পরামর্শ চেয়েছিলেন। কথিত আছে, মিরজাফর সিরাজ-উদ-দৌলাকে সেদিনের মতো ফৌজকে শিবিরে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দেন। সিরাজ সেটি করেছিলেন আর সেটি তার জন্য কাল হয়েছিল। ক্লাইভের বাহিনীর পিছন দিক থেকে তাড়া করে নবাবের বাহিনীকে সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রাণভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে গিয়ে পৌঁছন সিরাজ। তারপর মুর্শিদাবাদ থেকে অতি অল্প কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি অজ্ঞাত কোনও স্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হন ৩০ জুন। বন্দি অবস্থায় সিরাজ-উদ-দৌলা যখন মুর্শিদাবাদে ফেরেন, ততদিনে অবশ্য মুর্শিদাবাদের মসনদে আসীন হয়েছেন মিরজাফর। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল ব্রিটিশ দাক্ষিণ্য। মনে রাখা দরকার, আলিবর্দি থেকে সিরাজ এই দু’জনের নবাব হবার ক্ষেত্রে এই মিরজাফরের ভূমিকা ছিল অন্যতম। সেই মানুষটির নিজের নবাব হবার স্বাদ জাগাটা কি খুব একটা নিমকহারামির কাজ ছিল?

রবার্ট ক্লাইভ, ১ম ব্যারন ক্লাইভ, পলাশির যুদ্ধের পরে মিরজাফরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। ফ্রান্সিস হেইম্যান দ্বারা চিত্রিত।

পলাশির ষড়যন্ত্রের সমস্ত ঘটনা রটনাবর্জিত ভাবে যদি আমরা দেখি, তবে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল যথেষ্ট বিস্তৃত হয়েছিল এবং তা এতটাই বিস্তৃত হয়েছিল তা আধুনিককালের কোনও গোয়েন্দা গল্পকেও হার মানিয়ে দিতে পারে। আর এই ষড়যন্ত্রে মিরজাফরের যোগদান একেবারে অন্তিম পর্বেই ঘটেছিল এবং এ ব্যাপারে সিরাজ নিজেও অবগত ছিলেন। আর এটা মনে রাখা দরকার, পলাশির যুদ্ধের কিছুকাল আগে যে সিরাজ মিরজাফরকে গৃহবন্দি করে ফেলেছিলেন সেই মিরজাফর যুদ্ধকালে সিরাজকে সুপরামর্শ দেবেন, এটা আশা করাটাই উচিত নয়। ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারেননি এবং তাঁদের দূরদৃষ্টি ছিল না যে, এই যুদ্ধজয়ই কোম্পানির বাংলায় বাণিজ্যিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা এবং একাধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠবে। পলাশির ঠিক পর পর এটা বোঝা অন্য কারোর পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কিন্তু ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কোম্পানির কু-দিকগুলিকে মানুষের কাছে খুব স্পষ্ট করে তুলেছিল আর সেই অভিশাপ যেমন কোম্পানির উপর পড়েছিল, তেমনই এই অভিশাপ ছুঁয়েছিল মিরজাফরকে। কারণ পলাশির ষড়যন্ত্র যার ভূমিকায় থাকুক না কেন, জনগণ মসনদে বসতে দেখেছিল এই মিরজাফরকেই।

মিরজাফর এবং তাঁর পুত্র মিরান উইলিয়াম ওয়াটসের কাছে ১৭৫৭ সালের চুক্তি প্রদান করছেন

উনিশ শতকের বাংলায় যখন জাতীয়তাবাদী ভাবনার উন্মেষ ঘটতে থাকে তখন জাতীয়তাবাদের কাছে পলাশির ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা লাভ করেছিল। এই ঘটনা ও তার সঙ্গে যুক্ত চরিত্রগুলিকে মানুষের মনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন একাধিক সাহিত্যিক লেখক দেশপ্রেমিক ভারতীয়। অক্ষয়কুমার মৈত্র যেমন লিখলেন ‘সিরাজদ্দৌলা’, তেমন নবীনচন্দ্র সেন লিখলেন ‘পলাশির যুদ্ধ’ কাব্যগ্রন্থ। মনে রাখা দরকার শচীন্দ্র সেনগুপ্তকেও, যিনি নাটক লিখেছিলেন ‘সিরাজদ্দৌলা’ নামে। এসব সাহিত্য স্পর্শ করতে চায় মানুষের মনকে আর সেখানে মিরজাফর হয়ে ওঠেন খলনায়ক। যে নামটা আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যান জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ, ইংরেজ কোম্পানির মতো ষড়যন্ত্রের অন্য কারিগররা। যাদের ভূমিকা কম ছিল না। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কারোর বাড়িকেই নিমকহারাম দেউড়ি বলা হয় না, সিরাজ বাংলায় আইনসম্মতভাবে শাসন করেননি বলে তাঁকে বেআইনি শাসকও কেউ বলেন না। কিন্তু সব দায় মিরজাফরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সেকাল থেকে একালেও নিমকহারাম দেউড়ি দেখতে মানুষের কৌতূহল কমে না। সংবাদে প্রকাশ পায় এরকম খবর, মিরজাফরের উত্তরাধিকারীরা লজ্জায় বলতে চান না তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন মিরজাফর। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের ভাবা উচিত ইতিহাসে কে নিমকহারাম আর কে নন।

তথ্যসূত্র

১। রমেশ চন্দ্র মুজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ )।
২। অমর ফারুকি, ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা ১৭৫৭-১৮১৩ (বাংলা অনুবাদ)।
৩। সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী।
৪। রজতকান্ত রায়, পলাশির ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ।
৫। শ্যামল দাস (সম্পাদিত), মিরজাফর কি বিশ্বাসঘাতক?
৬। শুভ্রাংশু রায়, জাফরনামা, রোববার, সংবাদ প্রতিদিন (৩১ মে, ২০১৫)।

● লেখক আসানসোল গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

Facebook Twitter Print Whatsapp

3 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *