বব ডিলানের কণ্ঠে এবার জর্জ ফ্লয়েড

Bob Dylan

অনিন্দ্য বর্মন

১৮৯০-এর সময়। জার্মানি অধিকার করে নিয়েছিল ফ্রান্সের দু’টি প্রদেশ— অ্যালসেস এবং ল্যোর্যেকন। জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিল মাতৃভাষা ফ্রেঞ্চের বদলে জার্মান। ইতিহাসে এই হত্যার পোশাকি নাম— লিঙ্গুইস্টিক শভিনিসম। অর্থাৎ কারও ভাষা কেড়ে নেওয়ার নির্মমতা।

আরও পড়ুন: বঙ্কিমচন্দ্র ও বাঙালি পাঠকসমাজ

একটু পিছিয়ে ১৮৭০। রাস্তায় কাঁপতে কাঁপতে মারা যাচ্ছেন এক হতদরিদ্র মহিলা। সভ্য সমাজ আহা-উহু করেই পাশ কাটিয়ে গেলেন। মহিলার নাম হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়ে। জীবনে একটিই কিতাব রচনা করেছিলেন। ১৮৫১-তে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর একমাত্র উপন্যাস— আঙ্কেল টম’স কেবিন।

কি ছিল সেই বইয়ে? লেখিকার ভাষ্যে ধরা পড়েছিল উন্নত আমেরিকার দুর্দশা। ধরা পড়েছিলেন আঙ্কেল টম। বাগিচায় ক্রীতদাস হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন মানুষটি। অকথ্য অত্যাচার এবং দৈনন্দিন পাশবিকতার মাশুলে দিয়েছিলেন নিজের জীবন। এই পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধেই সরব হয়েছিলেন অ্যাব্রাহ্যাম লিঙ্কন। আমেরিকা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল ক্রীতদাস প্রথা।

আরও পড়ুন: ২৫ জুন— ৪৫ আর ৩৭ বছর পেরিয়ে: আম-ভারতীয়দের দু’টি না ভোলা অভিজ্ঞতা

২০২০-তে নতুন করে এই উপন্যাস লেখার সুযোগ এসেছে। নাম হতেই পারে— আঙ্কেল জর্জ’স সং। লেখক, থুড়ি গায়কের নাম রবার্ট অ্যালেন জ্যিমারম্যান।

কে এই রবার্ট জ্যিমারম্যান? একটা ছোট্ট গল্প বলে নিই। তখন পুরোদমে চলছে ভিয়েতনামের যুদ্ধ। হাজারে হাজারে আমেরিকান তরুণ চলেছে ভিয়েতনামে। একদিন, আমেরিকার একটি বিমানঘাঁটি থেকে আকাশযান উড়ে যাবে ভিয়েতনামের উদ্দেশ্যে। সৈনিকরা তৎপর। হঠাৎ দেখা গেল, একটি লোক, কাঁধে গিটার, সেখানে বসে গান গাইছে। পাগল অথবা ক্ষ্যাপা। তবু পায়ে পায়ে তার সামনে ভিড় করছে তরুণ সৈনিকেরা। প্রায় নির্দেশ অমান্য করেই। কারও চোখে জল।

লোকটি একাত্মভাবে গেয়ে চলেছে— হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক দাউন, বিফোর হি ইস কলড আ ম্যান…

কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়… ওই গানটি অনুবাদ করেছেন আমাদের সুমন চট্টোপাধ্যায়। অধুনা, কবীর সুমন। সুমন একপ্রকার গুরু মানেন ওই ক্ষ্যাপা গায়কটিকে।

অনেকেই আসল নামটি নাও জানতে পারেন। কিন্তু তাঁর পোশাকি নামে উদ্বেল সমগ্র পৃথিবী। আমরা অখ্যাত রবার্ট জ্যিমারম্যান-কে চিনি অন্য নামে।

বব ডিলান। জন্ম— ২৪ মে, ১৯৪১।

বর্ণময় চরিত্র এই ডিলান। উদ্দাম প্রেম, মায়াবী লেখনী, আর এই সমস্ত কিছু ঢেলে, তাঁর সুর করা গান বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছে গত ৬০ বছর। সৃষ্টি করেছেন বিখাত গান— ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড, মিঃ ট্যাম্বোরিন ম্যান, রেইনি ডে ওম্যান, ডেসোলেশন রো, ভিশনস অফ জোয়ানা, ফরএভার ইয়াং এবং আরও অনেক জীবনদর্শন ফুটে উঠেছে তাঁর গানে।

তাঁর বহু গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তাঁরই প্রিয় জ্যোন বায়েজ। একবার জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন— গানের জন্য আমি নোবেল পুরস্কার নেব না। ওটা আমার কর্তব্য। ২০১৬-তে নোবেল কমিটি তাঁকে সাহিত্যের ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করে। তাঁর গানও একপ্রকার লিরিসিস্ট লিটারেচার হয়ে উঠেছে।

ভালোবাসা থেকে প্রতিবাদ, চরম থেকে নির্মম— সবকিছুই ধরা পড়েছে তাঁর লেখনী, সুর এবং গানে। যেমন ২০২০-তে ধরা পড়ে গেলেন জর্জ ফ্লয়েড।

এক সামান্য মানুষ। পৃথিবী যাঁকে সম্প্রতি চিনেছে— অ্যাফ্রো-আমেরিকান। কিছুদিন আগেই বর্ণবৈষম্যের কারণে যিনি প্রাণ হারালেন— জর্জ ফ্লয়েড।

যাঁর রক্তের প্রতিবাদে মিশিয়ে দিয়েছেন সুর, সেই একই হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়ের মতোই। নতুন গান বাঁধছেন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে। কোনও এক অখ্যাত জর্জ ফ্লয়েডের জন্য।

দুর্ভাগ্যবশত, সাদা চামড়ার আধিপত্য ১৮৫০-এও ছিল। আজও আছে। পায়ের নিচে মাটির রং কালো। বৃষ্টি আসে আকাশের কালো মেঘে। দুঃখে কালো হয় মুখ ও মেজাজ। আর কালো সময়ে গিটারে প্রতিবাদ তুলতে চান বব ডিলান।

শুধু সময়ের অপেক্ষা। তারপরই হয়তো সুরে বাধা পড়বে— হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ‘জর্জ’ ওয়াক ডাউন, বিফোর হি ইস কলড আ ব্রাদার।

আমরা অপেক্ষায় আছি রবার্ট। আমরা অপেক্ষায় আছি বব।

জর্জ অপেক্ষা করছেন, এক নতুন সকাল তাঁর কালো শরীরে বুনে দেবে সূর্যের ঔজ্জ্বল্য।

Facebook Twitter Print Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *