দুটি কবিতা

Duti Kobita

নির্মলেন্দু গুণ

সাতই আষাঢ়

আবার এসেছে ফিরে সাতই আষাঢ়।
কালোমেঘে আকাশ ভরিয়ে,
প্রকৃতির চোখে কবিতার কাজল পরিয়ে
সে এসে ডাক দিয়েছে আমাকে-
তার জন্মদিনের উৎসবে।
এতদিন গুরু গুরু মেঘের গর্জনে
মিশেছিল বিদ্যুতের ডাক,
মনে হয়েছিল এ শুধু ঝড়ের পূর্বাভাস
এ শুধু শিলাবৃষ্টির খেলা।

উড়ন্ত মেঘের আঁচলে লুকিয়েছিল
সুন্দরের মুখ, তার দীর্ঘতম বেলা।
শিশুর কান্নার মধ্যে সুপ্ত ছিল তার কণ্ঠস্বর,
নিশ্চলতায় লুকানো ছিলো তার ছন্দ-
সে আজ হঠাৎ এসে মিললো আমার
অন্তরের গোপন গুহায়।

পঁচিশে বৈশাখের মায়াবী খোলস ভেঙ্গে
তরঙ্গশিখরস্পর্শী প্রভাতসূর্যের
প্রথম রশ্মির মতো
সে এসে লুটিয়ে পড়লো সাতই আষাঢ়ের
ছড়ানো-ছিটানো মেঘের চূড়ায়।
মাধুরীমন্দ্রিত মেঘদল উড়তে উড়তে এসে
পাখা মেলে বসলো আমার
হৃদয়মন্দির আলো করে
জন্মদিনের আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো
কল্পনার ব্যথিত আকাশ, সেই সাথে বুঝি
বাস্তবের পৃথিবীও গেলো পাল্টে।
পাখি হয়ে উঠলো গান,

আকাশ হয়ে উঠলো আমার হৃদয়।
মেঘ হয়ে উঠলো মুক্তি।

ছন্দের সতর্ক প্রহরীয় বন্দী অনুভব
চঞ্চল ঝর্নার মতো সুউচ্চ পাহাড় থেকে
ঢল হয়ে নেমে এলো ইচ্ছেমতো পেখম ছড়িয়ে
দু-কূল ভাসিয়ে নদী ছুটলো সমুদ্রের অভিসারে,
চিররাখালের হৃদয় বাসনা ছুঁয়ে
গাঁয়ের মেঠোপথে বেজে উঠলো বিরহের বাঁশি।

সাতই আষাঢ় আমাকে দু-হাত ধরে
টেনে নিয়ে গেলো মফস্বলের ঐ কাদাভরা পথে,
কাশবনের ছিন্নকুটিরে, যেখানে আমার জন্ম,
আমার আঁতুড়ঘরের ভেজা মাটি।
অচেনা পাখির বিচিত্র সংগীতে মুখরিত
প্রদোষবেলার প্রথম চিৎকার, এখনো সেখানে
ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে,
খুঁজে বেড়ায় সাতই আষাঢ়ের এ কবিকে।

না জানি সে আজ কোন রূপে
এসেছে আমার গাঁয়ে?
কোন শাড়ি পরেছে সে?
কোন ছন্দে হাওয়ায় দিয়েছে দোলা?
আজ কোন রঙে মেতেছে আকাশ কাশবনে?
প্রশংসাকাতর চিত্ত আজ ভিখিরির মতো
শূন্য পাত্র হাতে ছুটে যেতে চায়
আমি- শূন্য সেই গাঁয়ের উদ্দেশে।

সাতই আষাঢ় এলে সে আমার কণ্ঠে পরাতো
সদ্যফোটা কদমফুলের ঘ্রাণময় মালা,
কপালে আঁকতো বটপাতার সাদা কষের টিপ।
আম-জাম কাঁঠালের অঢেল উপঢৌকনে
আমার দৃর্বৃত্ত রসনাকে করতো তৃপ্ত।
বৃষ্টিমুখরিত দ্বিপ্রহরে এনে দিতো
গ্রাম্য ললনার স্নানসিক্ত স্বপ্নের সন্ধান।

তুলসীতলায় বধূরা জ্বালাতো মঙ্গলপ্রদীপ,
আকাশ কাঁপিয়ে আযান উঠতো
ভক্তপ্রাণের রক্তে শিখার মতো।
সকলের অগোচরে এইভাবে ক্রমাগত
আমার জন্মদিনের উৎসব হয়েছে চিহ্নিত,
সাতই আষাঢ় হয়েছে ধন্য।
লাঙ্গল- জোয়াল কাঁধে ভোরের কৃষক
ক্লান্তসিক্ত হয়ে ফিরেছে সন্ধ্যায়।
কালবৈশাখীর ডাকে
বৈকালী আকাশ হয়েছে পাগল।
বর্ষার প্রথম বর্ষণের ছোঁয়া পেয়ে
পুকুর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে মাছ;
পড়ার বই ছুড়ে ফেলে
দুর্বিনীত কিশোর ছুটেছে সেই পলাতক
মাছের সন্ধানে, বনবাদাড় ডিঙিয়ে।
শান্ত-স্থির আষাঢ়ের উচ্চাঙ্গ বর্ষণে
উদ্বেল হয়েছে তার হৃদয়।
স্বপ্ন এসে বারবার ভেঙেছে রাতের নিদ্রা।
ষড়ঋতুর ষড়যন্ত্রের ঢেউ লেগেছে শিরায়,
ষড়রিপু হয়েছে জাগ্রত। আঁটির অঙ্কুর হয়ে
কোথায় লুকিয়েছিল এই কবি?

হেলায় খেলায় কেটেছে আমার বেলা,
সন্ধ্যার সূর্যকে ফাঁকি দিয়ে
প্রসারিত হয়েছে আমার দিন;
সংকুচিত হয়েছে আমার রাত্রি।
কত প্রশ্ন রয়েছে উত্তরহীন পড়ে-
তবু সামন্য বলে ফিরিয়ে নেয়নি চোখ
বনান্তের সদ্যফোটা ফুল।
বক্তজবা, কদম, বকুল
সবাই দিয়েছে ধরা
আষাঢ়ের বিকশিত গোপন কেশরে।

তারপর উত্তীর্ণ কৈাশোরে একদিন।
নগরে প্রবেশ করেছে আমার নৌকো।
সময়ের অগ্নিকুণ্ডে বসে, দুরন্ত যৌবন
বাজি রেখে রচনা করেছি কাব্য,
স্বপ্নকে দিয়েছি মুক্তি।
অস্থিমজ্জারক্তবীর্য ঢেলে
শব্দ ছেনে গড়েছি প্রতিমা সুন্দরের।
তার আদল অনেকটাই মিলেছে
আমার গাঁয়ের সঙ্গে। সে হয়নি
ছলনাময়ী নগরনটিনী, উর্বশীর মতো।
তার কোথাও পড়েছে রবীন্দ্রনাথের
গীতিকবিতার ধ্যানমৌন ছায়া,
কোথাও নজরুলের বিদ্রোহের
দীপ্তি পেয়েছে প্রকাশ, কোথাও বা
সুকান্তের শ্রেণিঘৃণা পেয়েছে প্রাধান্য।
প্রতারক সুন্দরের সংজ্ঞার নিগড়ে
আবদ্ধ হয়নি তার রূপ।
জীবনের অনুগত করেছি শিল্পকে,
কল্পনার চেয়ে বাস্তবকে দিয়েছি মর্যাদা।
গোলাপের চেয়ে কাঁটাকে এঁকেছি বড়ো করে,
শোষণের হিংস্রতার কালি দিয়েছি মাখিয়ে
সুন্দরের মুখের লাবণ্যে।

সুপুষ্ট স্তনের সাথে জোড়া বেঁধে দিয়েছি
অপুষ্ট স্তন, অক্ষরের যথেচ্ছ খোঁচায়
দিইনি ঘুচিয়ে পার্থক্যের সীমা।
সামাজিক সত্যকেই বলেছি সুন্দর।
দা ভিঞ্চির মোনালিসা সে হয়নি বলে
আমার আক্ষেপ নেই কোনো।
কাশবনের সেই কৃষক কন্যার
গোপন ব্যথার একটি কণাও যদি
প্রতিফলিত হয়ে থাকে
আমার কাব্যের প্রতিমায়,
যদি তার বিপুল ঘৃণার একটি স্ফুলিঙ্গও
প্রজ্বলিত হয়ে থাকে আমার ঘৃণায়,
যদি তার গোপন স্বপ্নের একটি পাপড়িও
প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে আমার ভালবাসায়,
জানি, একদিন তোমাদের প্রেমে, প্রশংসায়
অভিষিক্ত হবে আমার কবিতা,
ধন্য হবে সাতই আষাঢ়।

আপাতত আষাঢ়ের নীরব নির্ঝরে
জ্বলুক আমার জন্মদিনের একলা শিখা।

স্ববিরোধী

আমি জন্মেছিলাম এক বিষণ্ন বর্ষায়,
কিন্তু আমার প্রিয় ঋতু বসন্ত ।

আমি জন্মেছিলাম এক আষাঢ় সকালে,
কিন্তু ভালোবাসি চৈত্রের বিকেল ।

আমি জন্মেছিলাম দিনের শুরুতে,
কিন্তু ভালোবাসি নিঃশব্দ নির্জন নিশি।

আমি জন্মেছিলাম ছায়াসুনিবিড় গ্রামে,
ভালোবাসি বৃক্ষহীন রৌদ্রদগ্ধ ঢাকা।

জন্মের সময় আমি খুব কেঁদেছিলাম,
এখন আমার সবকিছুতেই হাসি পায়।

আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম,
এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি ।

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *