আমাদের কোনও থাকার জায়গা ছিল না

Nirmalendu Goon

কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর অনেক পরিচয়, মূলত তিনি কবি। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমিসহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি পুরস্কার ও সম্মাননা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে। এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘হুলিয়া’ নিয়ে পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ বিষয়কে কেন্দ্র করে এই সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন গিরীশ গৈরিক

গিরীশ গৈরিক: দাদা, আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ মুক্তিযুদ্ধের চার মাস পূর্বে প্রকাশিত হয়। আপনার এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পূর্বের স্মরণীয় ঘটনা জানতে চাই।

নির্মলেন্দু গুণ: আমার এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৯৭০ সালের নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের কোনও এক তারিখে। সম্ভবত ২২ কি ২৩ নভেম্বর হবে। অনেক স্মরণীয় ঘটনার একটি তোমাকে বলি: ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া সামরিক সরকারের পছন্দ নয় এমন বইপত্র বাজেয়াপ্ত কাজে লিপ্ত ছিলেন। এসব বইপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বাইশ থেকে চব্বিশ, সম্পাদক: সিরাজুল ইসলাম খান ও আমিনুল হক বাদশা, ‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, আবুল কালাম আজাদ’, ‘সোশ্যাল হিস্ট্রি অব ইস্ট পাকিস্তান, কামরুদ্দিন আহমদ’, ‘জেলে তিরিশ বছর, মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী’, ‘আল বেরুনী, সত্যেন সেন’, ও ‘সত্যের মতো বদমাশ, আবদুল মান্নান সৈয়দ’। লেখক স্বাধীনতার ওপর সামরিক সরকারের এভাবে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তখন দেশব্যাপী প্রতিবাদ করেন কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক শিক্ষক ও রাজনীতিবিদসহ আনেক শ্রেণির মানুষ। সেই সময় ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বাসায় আমরা কবি লেখকবন্ধুরা মিলে একটি সভা করি এবং আমরা একটি মিছিল বের করে প্রতিবাদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

পরে আমরা ১০-১৫ জানুয়ারি, ১৯৭০ সালের কোনও একদিনে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করি। মিছিলটি যখন আবদুল গণি রোড ধরে গুলিস্তানের আভিমুখে যাত্রা নিল, তখন আমি মিছিলের সামনে থেকে স্লোগান দিচ্ছিলাম ‘আল বেরুনী, আল বেরুনী অথবা সত্যের মতো বদমাশ, সত্যের মতো বদমাশ’, মিছিল থেকে জবাব আসছিল ‘পড়তে চাই, পড়তে চাই’। তখন আমার কোন খেয়ালে মনে হল, আমার প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থের কথা। আমার মনে হল, আমার কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পেলে নিষিদ্ধ হবার যোগ্যতা রাখত। বইটি বের হয়নি বলে নিষিদ্ধ হয়নি। তাই স্লোগান দিলাম ‘পেমাংশুর রক্ত চাই, প্রেমাংশুর রক্ত চাই’। মিছিল থেকে জবাব এল ‘পড়তে চাই, পড়তে চাই’। কয়েকবার পড়তে চাওয়ার পড় আমার গোপন ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে যায়। আমার মনে হয় ওই আন্দোলন থেকে কারও লাভ না হলেও, আমার কিন্তু লাভ হয়েছিল।

গিরীশ গৈরিক: আপনাদের সময় তরুণ কবিদের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করা সহজ ব্যাপার ছিল না। আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’-এর প্রকাশক কীভাবে পেলেন?

নির্মলেন্দু গুণ: আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের জন্য নওরোজ কিতাবিস্তান, মাওলা ব্রদার্স ও বইঘরের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও ব্যর্থ হই। তখন কোনও প্রকাশকই আমার বই প্রকাশ করতে চাননি। আসল সত্য হল, তখন আধুনিক কবিতা বইয়ের বাজার একদম কম ছিল। সেই সময়ে আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ কবি সাহিত্যিকদের যৌথ উদ্যোগে কপোতাক্ষ প্রকাশনী থেকে বের হয়েছিল, শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল তার বন্ধুর টাকায়, আবদুল মান্নান সৈয়দ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ প্রকাশ করেছিলেন নিজের গাটের টাকায়। কিন্তু খান ব্রাদার্স আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিজ থেকে প্রকাশ করতে আগ্রহী হওয়ায় আমি পুলক অনুভব করি। এই সৌভাগ্য তরুণ কবিসমাজে আমি প্রথম পেয়েছিলাম।

আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের এই গল্পটি আরও চমকপ্রদ। ২১ জুলাই, ১৯৭০ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তরুণ কবিদের নিয়ে একটি কবিতাপাঠের আসর করেছিল। সেই কবিতাপাঠের আসরে আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, সানাউল হক খান, দাউদ হায়দার, হুমায়ুন কবীর প্রমুখ কবি কবিতা পাঠ করেছিলেন। ওই আসরে সম্ভবত আলোচক অথবা সভাপতি ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। সেখানে আমি ‘হুলিয়া’ কবিতাটি পাঠ করি। এই কবিতা শুনে আবদুল গাফফার চৌধুরী তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘তৃতীয় মত’-এ ‘হুলিয়া’র বিষয়বস্তু নিয়ে বড় ধরনের মন্তব্য করেন।

আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘তৃতীয় মত’ কলামটি তখন খুব জনপ্রিয় হওয়ার কারণে আমার ‘হুলিয়া’ কবিতাটি অনেকে খোঁজ করা শুরু করেন। এই কলামটি আমার কাব্যভাগ্য আরও প্রসারিত করে। তখন আমার ‘হুলিয়া’ কবিতাপাঠ করে খান ব্রাদার্সের মালিক মোসলেম খান তাঁদের ছেলেদের ‘হুলিয়া’র কবিকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। তাছাড়া আমার গুণ পদবিটির প্রতি তার এক ধরনের দুর্বলতা ছিল, কারণ তিনি ছাত্রজীবনে মণীন্দ্র গুণের ছাত্র ছিলেন। একদিন বিউটি বোর্ডিংয়ে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি ‘হুলিয়া’ কবিতার প্রশংসাপূর্বক আমার কাব্যগ্রন্থ তৈরি করতে বলেন। ওই প্রকাশনী থেকে জীবনানন্দ দাশেরও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল।

১৯৭০ সালে যখন সারাদেশ নির্বাচনের জ্বরে আক্রান্ত, তখন আমি প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের আনন্দজ্বরে আক্রান্ত। ওই সময়ে আমার খাওয়া ঘুম বন্ধ হবার মতো হয়েছিল। খান সাহেব বই প্রকাশের সকল দায়িত্ব আমার ওপর ন্যাস্ত করেন। আমি সিদ্ধান্ত নেই, ১২৫০ কপি ছাপব এবং আমার সাথে খান সাহেব ও তাঁর পুত্রদ্বয় সম্মতি পেষণ করেন। সেই সময় ৫০০ কপির বেশি বই ছাপা হত না। আমি দুর্লভ লাইনো টাইপে বইটি প্রকাশ করার জন্য আলেকজান্দ্রা স্টিম মেশিন প্রেসের মালিক নুরুল হক সাহেবের কাছে দ্বারস্থ হই। প্রেসটি নওয়াবপুর রোডে আবস্থিত ছিলো। তখন দেশে লাইনো মেশিন ছিল হাতে গোনা দুই একটা।

আলেকজান্দ্রা স্টিম মেশিন প্রেসের মালিক নুরুল হক সাহেব প্রথমে তাঁর প্রেস থেকে বইটি ছাপতে রাজি হয়নি। যেহেতু এত ছোট বই এবং কম ছাপা হবে, সেই কারণবশত। কিন্তু আমি হাল না ছেড়ে তার আফিস ও বাড়িতে গিয়ে বিরক্তি করা শুরু করলে তখন তিনি নিরুপায় হয়ে রাজি হন। আমি রাতদিন পরে থাকতাম প্রেসে। কবিতা বদলামতাম ও প্রুফের কাটাকাটি দেখে অপারেটরেরা বিরক্ত হতেন খুব। প্রেসের হ্যান্ড কম্পোজিটর বুড়া ক্ষেত্রবাবুর সাথে হুঁক্কায় তামাক টেনে তাদের বুঝাতাম আমি তাঁদের দলের লোক। তাতে বেশ কাজ হত।

গিরীশ গৈরিক: দাদা, কবিদের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম নির্ধারণে এক ধরনের কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরেন, সেক্ষেত্রে আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম নির্ধারণে কি হয়েছিল এবং তাঁর প্রচ্ছদ পরিকল্পনা জানতে চাই?

নির্মলেন্দু গুণ: তুমি ঠিকই বলেছ। আমার বইয়ের নাম নির্ধারণে আমি এক প্রকার নাস্তানাবুদ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যেসব নাম নির্ধারণ করেছিলাম, তা আমার কয়েকদিন পছন্দ হলেও পরে আবার অপছন্দ লাগত। আমার দেওয়া নামগুলোর মাঝে ছিল: হুলিয়া, দাঁড়ানো মহিষ, আগুন নিয়ে বসে আছি এই সব আরকি। নাম নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। তখন বন্ধুবর জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত আমাকে নামের ব্যাপারে সহযোগিতা করে। সে আমাকে বলেছিল: কবি আপনি তো ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ শীর্ষক কবিতাটির ভিত্তিতে নামকরণ করতে পারেন। তখন জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের সাথে পূরবী বসু একমত পেষণ করাতে আমি আর দ্বিমত করিনি।

প্রথমে বইটির প্রচ্ছদের ব্যাপারে আমার শিল্পীবন্ধু কাওসার আহমেদর সাথে আলোচনা করি। তখন আমাদের দু’জনের সিদ্ধান্ত আনুযায়ী আমার শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখচ্ছবি ব্যবহার করি। আমার বিভিন্ন পোজযুক্ত কয়েকটি ছবি নিউ মার্কেটের একটি স্টুডিও থেকে তুলে নেন আমার শিল্পীবন্ধু। তার মধ্য থেকে চমৎকার ছবিটি নির্বাচন করা হয় প্রচ্ছদের জন্য। বাংলাবাজারের চুন্নু মিয়ার ব্লক তৈরির কারখানা থেকে প্রচ্ছদের জন্য জিংক ব্লক তৈরি করা হয় এবং বাবুবাজারের খেয়ালী আর্টপ্রেস থেকে প্রচ্ছদ ছাপা হয়। প্রচ্ছদটি ছিল খুবই আসাধরণ। লাল রঙের রিভার্সে সাদা হরফে ছিল আমার ও কাব্যগ্রন্থের নাম এবং কালো রঙে ছায়ছন্ন অবয়বে পুরো পাতাজুড়ে ছিলো আমার শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখাবয়ব। ৪২ পাউন্ড কার্টিস পেপার, লাইনো টাইপে ছাপা, একশো গ্রাম আর্ট পেপারের জাকেট, চার ফর্মার বইটির দাম ধরা হয়েছিল তিন টাকা।

গিরীশ গৈরিক: কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হবার পর আপনার বাবার প্রতিক্রিয়া কি ছিল?

নির্মলেন্দু গুণ: কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশের পরপর বাবার প্রতিক্রিয়া কী, তা আমি জানতে পারিনি। জেনেছি প্রকাশের অনেক পর। ২৫ মার্চের কালো রাতের পর বাড়ির সাথে আমার কোনও যোগাযোগ ছিল না। বাড়ির সকলে ধরে নিয়েছিল, আমি আর বেঁচে নেই। ভারতের আকাশ বাণী ও বিবিসির সাংবাদ শুনে এলাকার সকলে জেনেছে, আমার কর্মস্থল ‘দ্য পিপল’ পত্রিকা আফিসটি পাকবাহিনী ডেনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। ওই সংবাদ পাওয়ার পর আমার পরিবার জীবনাশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত ছিল। বিশেষ করে বাবা ছিলেন আরও বেশি। ভাইবোনদের কাছে জেনেছি, বাবা দিনরাত আমার কবিতার বইটি হাতে নিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে আমার আসার অপেক্ষায় পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তাছাড়া বইটি বাবাকে উৎসর্গ করে আমি লিখেছিলাম, ‘আমার বাবার মতো সবাই যদি আমাকে স্বাধীনতা দিত’। বাবাকে উৎসর্গে বর্ণিত কথাটি দুঃসময়ে আনন্দের চেয়ে দুঃখ বেশি দিত। বইটির প্রচ্ছদের আমার ছবি দিকে তাকিয়ে বাবা নীরবে কাঁদতেন। তখন আমার কব্যগ্রন্থটি বাবার কাছে শ্রীমদ্ভাগবতগীতার মতো প্রতিদিনের পাঠ্য ও পবিত্র হয়ে উঠেছিল।

গিরীশ গৈরিক: দাদা, এবার আপনার ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থের ভেতরের কবিতার প্রসঙ্গে আসি। আপনার সম্পর্কে যতদূর জানি, আপনি ১৯৬৯ সালে বেতারে প্রথম কবিতাপাঠ করেছিলেন। সেই কবিতাটি আপনার ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে, এ সম্পর্কে জানতে চাই।

নির্মলেন্দু গুণ: বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে, তুমি ঠিক বলেছ, সালটি ১৯৬৯; কিন্তু কোন মাসে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল, তা আমার মনে নেই। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ওই আনুষ্ঠানে আমিসহ আবুল হাসান, আবু কায়সার, হুমায়ুন কবীর ও হুমায়ুন আজাদ উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানে আমরা কবিতা বিষয়ক অনেক জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম: ‘অমিতব্যয়িতা আমার স্বাভাব, ব্যক্তিগত জীবনে এবং স্বভাবতই কবিতাতেও। কবিতা কী, জানিনে। ছন্দ কাকে বলে, ভালো করে বুঝিনে। কাব্য বিচারের মানদণ্ড কী? আমি নিরুত্তর। আমি শুধু উড়নচণ্ডী প্রেমিকার মতো অবিবেচক, যুক্তিহীন এবং ব্যক্তিগত। আমার কাছে কবিতা তাই, আমি যা লিখি। অন্যের কাছে সেটা গল্প হলেও ক্ষতি নেই, এলজাব্রা হলেও না।’

আমি তখন দুটি কবিতাপাঠ করেছিলাম, একটি ‘মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাক’ আরেকটি ‘ফুলদানি’। ‘মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাক’ কবিতাটি ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থে এবং ‘ফুলদানি’ কবিতাটি ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ কাব্যগ্রন্থে আছে।

গিরীশ গৈরিক: কবিতাপাঠের পরে কোনও প্রতিক্রিয়া জানতে পেরেছিলেন?

নির্মলেন্দু গুণ: যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম, তা আমার জন্য সুখকর নয়। ওই অনুষ্ঠান শুনে আমার বাবা চিঠিতে লিখলেন: ‘যেদিন তুমি জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, সিকানদার আবু জাফরের মতো কবিদের সাথে রেডিওতে কবিতা পড়বে, সেদিন থেকে আমি তোমাকে বড় কবি মনে করব। তার আগে নয়।’

আরেক সুন্দরী মহিলার প্রতিক্রিয়া ছিল আরও ভয়াবহ। ওই সুন্দরী ছিলো আমার স্বল্পপরিচিত এক যুবকের ভাবী। আমরা বন্ধুরা একদিন সন্ধ্যার দিকে নিউ মার্কেটে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তখন ওই যুবক তাঁর ভাবীর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর সেই মহিলা আমাকে একপলক দেখেই বললেন: ‘ছি! ছি! ছি! আপনি এত নোংরা কবিতা লেখেন।’

ওই মহিলার কথা শুনে আমি বিষম লজ্জা পাই। পরে ওই যুবকের কাছে জেনেছি, আমার ‘মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাক’ কবিতাটি শুনে তিনি ডাইনিং টেবিলে বমি করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে আমার ওপর তাঁর এত রাগ। তারপর, আমি ওই মহিলার কাছে দুঃখ প্রকাশ করি বলি: ভয় নেই, আপনার মতো সুন্দরী নগরবাসিনীদের চমৎকার বমি তুলে নেবার জন্য আমার মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাকটি সর্বদা রেডি আছে।

গিরীশ গৈরিক: আপনার ‘আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম’ কবিতাটি খুবই ট্রাজিডিপূর্ণ। আপনার এই বিখ্যাত কবিতাটি ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই কবিতাটির নেপথ্যচিত্র জানতে চাই।

নির্মলেন্দু গুণ: ‘আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম’ এটা ‘মানুষ’ কবিতার লাইন, কবিতার শিরোনাম নয়। কবিতাটি বিখ্যাত কিনা জানি না। আমি ও আবুল হাসান ছিলাম বহেমিয়ান প্রকৃতির মানুষ। আমাদের কোনও থাকার জায়গা ছিল না, যেখানে রাত সেখানে কাত হয়ে ঘুমিয়ে পরতাম। আসলে আমরা ঢাকার ফুটপাতের অধিবাসী ছিলাম। মাঝেমাঝে আমরা বন্ধুদের মেসে হানা দিতাম, বিশেষ করে নাট্যজন মামুনুর রশীদের মেসে। কিন্তু এসবের একদিন অবসান হয়, যখন আমি ‘দ্য পিপল’ পত্রিকায় চাকরি পাই। আমার বেতন ছিল ২৫০ টাকা। চাকরির প্রথম মাসের টাকা দিয়ে আমি প্রথমেই একটা বালিশ ও থালা কিনি। এর আগে আমার কোনও বালিশ বা থালা ছিল না। আমি বালিশ ও থালা নিয়ে নিউ পল্টন লাইনের একটি টিনশেড মেসে উঠি। সময়টা ১৯৭০ সালের শেষের দিকে হবে। তখন ওই মেসের সুখের জীবনে এসে আমার ফুটপাথের জীবনের কথা মনে পরত ওই নরম বালিশে শুয়ে। তখন আমি ‘মানুষ’ কবিতাটি লিখি। ‘মানুষ’ কবিতাটির মাঝে আমার ব্যক্তিজীবনের হাহাকার আছে, চরম বেদনা আছে, নিজের সৃষ্টি চরম দরিদ্রতা আছে, সর্বোপরি আমার ব্যর্থতা আছে।

গিরীশ গৈরিক: আপনার তিন লাইনের ‘যুদ্ধ’ কবিতাটি সাহিত্যের এক আড্ডায় কবি শহিদ কাদরীকে উৎসর্গ করেছিলেন, আমি কি ঠিক বলেছি।

নির্মলেন্দু গুণ: ঠিক বলেছ। এ তো দেখি তুমি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমার ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থের বিষয়ে প্রশ্ন করছ। কবিতা উৎসর্গের ব্যাপারে আমি খুবই কৃপণ। আমার অসংখ্য বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী থাকতেও ২০টি কবিতা উৎসর্গ করেছি। আমার ‘যুদ্ধ’ কবিতাটি খুব ছোট: ‘যুদ্ধ মানেই শত্রু শত্রু খেলা, / যুদ্ধ মানেই / আমার প্রতি তোমার অবহেলা।’ এই কবিতাটি আমি একবার রেক্স-এর আড্ডায় পাঠ করেছিলাম। সেই আড্ডায় আমার অগ্রজ কবি শহিদ কাদরী ছিলেন, তখন তিনি কবিতাটি পছন্দ করেন এবং তাঁকে উৎসর্গ করতে বলেন। আমি অগ্রজের ইচ্ছাকে মান্য করতে কবিতাটি তাঁকে উৎসর্গ করি।

গিরীশ গৈরিক: দাদা, আপনার ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থে আমার খুবই প্রিয় একটি কবিতা আছে, কবিতাটি হলো ‘লজ্জা’। ‘লজ্জা’ কবিতার প্রেক্ষাপট জানতে আগ্রহী, বলবেন।

নির্মলেন্দু গুণ: আমার বইটির যখন কাজ চলছিল, তখন শেষের দিকে চার পৃষ্ঠা খালি ছিল। আমি প্রেসে যেতেই নুরুল হক সাহেব বলেন: গুণবাবু, আপনার গল্প কম পড়েছে; চট করে আরেকটি গল্প লিখে দেন। তিনি আমার ‘হুলিয়া’ কবিতাকে গল্প মনে করতেন, তাই তিনি রসিকতা করে আমার কবিতাকে গল্প বলতেন।

আমার বইয়ের সাথে যায় এমন সঙ্গতিপূর্ণ কবিতা তখন আমার কাছে ছিলে না। সেই সময় আমি নুরুল হক সাহেবের রসকিতাকে চ্যালেঞ্জ মনে করে হঠাৎ কবিতা লেখার জন্য মনস্থির করি। কী লিখব ভাবছি, এমন সময় দেখি টেবিলের উপর দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম পাতায় সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া মৃত এক নগ্নিকার ছবি এবং তার গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসছিল নবজাতক সন্তান; কিন্তু মায়ের সঙ্গে নাড়ির বন্ধনটি ছিন্ন হয়নি। ছবিটি দেখে আমি খুব বেদনা বোধ করি এবং সেই বেদনা থেকে আমি খুব দ্রুত ‘লজ্জা’ কবিতাটি লিখে ফেলি। আমার বইটি প্রকাশের কিছুদিন পর চিত্রপরিচালক আলমগীর কবির-জহির রায়হান সম্পাদিত ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় একটি আলোচনা লেখেন এবং ‘লজ্জা’ কবিতাটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছাপেন। ওটাই ছিল আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম আলোচনা এবং ইংরেজিতে আমার কবিতার প্রথম অনুবাদ।

গিরীশ গৈরিক: দাদা, ‘হুলিয়া’ আপনার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা। এই কবিতাটি আপনি ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা হিসেবে নির্বচান করেছেন। আমরা জানি আপনার এই কবিতা নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে। এই কবিতার নেপথ্য ইতিহাস জানতে চাই।

নির্মলেন্দু গুণ: ‘হুলিয়া’ কবিতা আমি যে রাতে রচনা করি, সে রাতে আমি ও আবুল হাসান সলিমুল্লাহ হলের একটি রুমে ছিলাম। রুমটি ছিল হাসানের বাল্যবন্ধু মাহফুজুর হক খানের। পান ও আড্ডার কারণে আমরা অনেক রাতে ঘুমাই। ঘুম থেকে জেগে দেখি, টেবিল থেকে ‘হুলিয়া’ উধাও। রুমের বাইরে এসে দেখি আমার ‘হুলিয়া’ ছিন্নভিন্ন হয়ে পথে পথে ছড়িয়ে আছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না, এ কাজ কে করেছে। আমিও সেই ছিন্নভিন্ন ‘হুলিয়া’র পথ দেখে দেখে হাসানের অবস্থান নির্ণয় করি। এই বিষয়টি আনেকটা শ্রীরামচন্দ্র যেমন জটায়ুর কর্তিত ডানা পথে পড়ে থাকতে দেখে সীতার সন্ধান পেয়েছিলেন, তেমন আরকি। হাসানের সন্ধান পেয়ে দেখি, সে তার কিছু ভক্তদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। তখন আমি ‘হুলিয়া’ প্রসঙ্গ তুললে সে বলে: এটা তো কবিতা নয়, গল্প; তুমি চাইলে আবার লিখতে পারো। আমি বুঝলাম হাসান মুখে যাই বলুক না কেন, সে এই কবিতাটি ভালো কবিতা হওয়ার দরুন সে সহ্য করতে না পেরে ছিঁড়ে ফেলেছে। আমি ওই দিনই পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে আবার ‘হুলিয়া’ কবিতাটি লিখি। কিন্তু আমার এই কবিতাটি রচনার কোনও সাল তারিখ মনে নেই। আমি ‘আমার কণ্ঠস্বর’ লিখতে গিয়ে অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি ‘হুলিয়া’ লেখার সাল তারিখ নির্ণয়ে। আমার শুধু মনে পড়ে বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে আমি কবিতাটি প্রথম পাঠ করেছিলাম। খুব সম্ভবত ১৯৭০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে। আমার জীবনের হুলিয়া যে এভাবে আমার কবিতায় এসে ধরা দিবে, তা আমি কখনও ভাবিনি।

‘হুলিয়া’র মাঝে একটি লাইন আছে: ‘পুনর্বার চিনি দিতে এসেও রফিজ আমাকে চিনলো না…’। লাইনটির কথা সত্য ভেবে আমার গ্রামের বন্ধুরা রফিজের চায়ের স্টলে গিয়ে রফিজের প্রতি চড়াও হয়। রফিজও তাদের ভয়ে তার ভুল স্বীকার করে, কিন্তু আমার কবিতার মাঝে এ ধরনের কোনও সত্যতা নেই। রফিজ আমার বাল্যবন্ধু ছিল, জীবনের এক পর্যায়ে সে চায়ের স্টল দিয়েছিল। পরবর্তীতে আমি গ্রামে গেলে রফিজ তার এই ভুলের জন্য আমার কাছে মাফ চেয়েছিল, আমি শুধু হেসেছি।

Facebook Twitter Print Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *