বিশ্ব সংগীত দিবস: স্মরণে বড়ে গোলাম আলি

Bade Gulam Ali

দীপান্বিতা হাজরা

গল্পটি অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় আগের। কে আসিফের মুঘল-ই-আজম তখন তৈরি হচ্ছিল। ছবিতে মুঘল সুলতানিয়তের মহিমা তুলে ধরতে আসিফ তৎকালীন দরবারি সংগীতের ঝলক দেখাতে চেয়েছিলেন। এই সময় তাঁর মনে হল যে, মুঘল বাদশাহ আকবরের রাজদরবারের নবরত্নের মধ্যে অন্যতম ‘সংগীত সম্রাট’ তানসেনের একটি গানের জন্য প্লেব্যাক গাওয়ানো উচিত বড়ে গোলাম আলি খানকে দিয়েই। তবে খান সাহেব যেভাবে নিজেকে চলচ্চিত্র থেকে দূরে রাখতেন, তা দেখে চলচ্চিত্রে সংগীতের দায়িত্বে থাকা নওশাদ তৎক্ষণাৎ বলেছিলেন যে, নাহ এটি সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: কিছুটা ইতিহাস কিছুটা জীবনী, পুরোটাই সালিম আলি: দ্য বার্ডম্যান অফ ইন্ডিয়া

আসিফ তাতে রাজি হননি। তাঁর জেদ দেখে নওশাদকে বড় গোলাম আলির কাছে যেতে হয়েছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই খান সাহেব প্রথমে রাজি হননি। কিন্তু নওশাদও ছাড়ার পাত্র নন। খান সাহেবকে বারবার ফোন করতে লাগলেন তিনি। অগত্যা সিনেমায় গান গাইবেন না বলে বড়ে গোলাম আলি বলে দিলেন যে, গান গাইতে তিনি পঁচিশ হাজার টাকা নেবেন। সেই সময় পঁচিশ হাজার টাকা মানে বিশাল পরিমাণ অঙ্ক। লতা মঙ্গেশকর এবং মহাম্মদ রফির মতো প্রতিষ্ঠিত গায়করাও একটি গানের জন্য পাঁচশো টাকা পর্যন্ত নিতেন সেই সময়। তবে আসিফকে যখন নওশাদের কাছে শুনলেন, গোলাম আলি খান সাহেব পঁচিশ হাজার টাকা চেয়েছেন, তখন বললেন যে, খান সাহেব অনেক কম চেয়েছেন। তিনি টাকার অঙ্কটা আরও বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন। এর পরে নওশাদ শাকিল বাদায়ুনিকে প্রসঙ্গ অনুযায়ী গান লিখতে বললেন। গান প্রস্তুত হওয়ার পরে ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খানের হাতে দিয়েছিলেন। ওস্তাদ ঠুমরির ঠাটে ব্যবহৃত রাগ সোহনিতে গেয়েছিলেন এই গান। এভাবেই ‘প্রেম জোগান বান কে’-র মতো কালজয়ী গানটি প্রকাশ্যে এসেছিল।

এহেন মানুষটি যখন সংগীতের দুনিয়ায় পা রাখেন, স্বীকৃতির জন্য সহজ পথে হাঁটেননি। সেই সময় শ্রোতাদের মাতিয়ে রাখার জন্য শিল্পীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল একধরনের এক্সট্রা মিউজিক্যাল ইম্প্রেশন। যাতে করে শ্রোতারা আচ্ছন্ন থাকতেন। তবে বড়ে গোলাম আলির নজর ছিল ভিন্ন। বলা যায়, রাগ, তাল কম্পোজিশন নিয়ে কখনোই এক্সট্রা মিউজিক্যাল ইম্প্রেশন, যাতে চমক থাকে, তা সৃষ্টি করতে চাননি। সাধারণ সংগীতপ্রেমীদের সম্পর্কে তিনি আরও একটি সত্য উপলব্ধি করেছিলেন— শ্রোতারা চান শোনার সময় যেন তার কান ভরে যায়। পেশাদার বিনোদনদানকারী শিল্পীরা শব্দের তীব্রতা বাড়িয়ে, স্বরের ভিন্নতা এনে আরও নানা কারসাজি করে দর্শকদের সন্তুষ্ট করতে চান কিন্তু গোলাম আলি শুধু অবিরাম মিষ্টি সুরের ওপরই নির্ভর করেছেন। তিনি অবিভক্ত ভারতের লাহোরের (বর্তমান পাকিস্তান) কাছে ছোট্ট শহর কাসুর শহরে ১৯০২ সালের ২ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ এবং অভিনব দক্ষতার মাধ্যমে তিনি কেবল তাঁর সময়ের শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করেননি, আজও তাঁর বিপুল সংখ্যক ভক্ত রয়েছেন।

আরও পড়ুন: কবিতার বনফুল

বড়ে গোলাম আলি খান সবসময় বলতেন সংগীত হচ্ছে খেলা, নাচ কিংবা ঢেউয়ের ছন্দের মতো। তাঁর এই ইম্প্রেশনস্টিক মনোভাব থেকে বোঝা যায়, তিনি সংগীতকে গাম্ভীর্য থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। সংগীতকে তিনি সিরিয়াসভঙ্গি থেকে উপভোগ্য করতে চেয়েছেন। এমনও হতে পারে তিনি সংগীত নিয়ে সব সময় সিরিয়াস হয়ে থাকতে চাননি। আর তিনি তার এই মনোভাবকে প্রতিষ্ঠা করতে অসাধারণ আবেদনময়, সহজবোধ্য সংগীত উপহার দিয়েছিলেন।

“একবার শখ চাপল শাস্ত্রীয় সংগীতকে মূলে রেখে ছবি করবেন বিকাশ রায়। ‘বসন্ত বাহার’। সংগীত পরিচালনার জন্য ডাকলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষকে। খুব ইচ্ছে ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলির ‘আয়ে ন বালম্’ গানটি ব্যবহার করবেন। জ্ঞানপ্রকাশ অনেক বলেকয়ে রাজি করালেন খানসাহেবকে।

টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় সাতসকালে রেকর্ড করতে এলেন বড়ে গোলাম। তখনকার দিনের স্টুডিয়ো আজকের মতো নয়। এখন যেমন বাইরের শব্দ ভেতরে না আসে, তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে, সে কালে তেমন ছিল না।

আওয়াজ রুখতে একটাই উপায়, স্টুডিয়োর দরজা বন্ধ রাখা। জ্ঞানপ্রকাশ এসেছেন। অন্য কলাকুশলীরাও। সবাই খান সাহেবের রেকর্ডিং দেখবেন। হঠাৎ বড়ে গোলাম বেঁকে বসলেন। বন্ধ ঘরে এই সাতসকালে তাঁর মেজাজ আসবে না। দরজা খুলে দিতে হবে। বাবুরাম ঘোষ রোড, চণ্ডী ঘোষ রোডে তখন অত গাড়িঘোড়া চলত না বটে, কিন্তু একেবারে জনশূন্য তো নয়। ফলে চারদিকে লোক পাঠানো হল, যারা এ পথে কিছু সময় যানচলাচল রুখে দেবে।

খানসাহেব গাইলেন। অভিভূত সবাই। শুধু বিকাশের মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার জোগাড়! গানের মেজাজটি যে ছবির সঙ্গে একেবারেই যায় না! এখন কী করা?
ততক্ষণে ছবির গানের রেকর্ডিং করতে বসে পায়ে পায়ে বেড়াজালে আক্রান্ত, বিরক্ত খানসাহেব বাড়ি ফেরার জন্য উঠে পড়েছেন! তাঁকে আবার গাইতে বলা কার সাধ্যি?
তার ওপর রাতে তাঁর গান আছে কনফারেন্সে। ফিরে একপ্রস্থ বিশ্রাম নিতে হবে। তবু বিকাশকে যে বলতে হবেই! কাছে গিয়ে প্রণাম করে খান সাহেবের পায়ের কাছে বসলেন তিনি।

— কেমন হল গান?
— আপনার গানের কি তুলনা আছে, বাবা! তবে গল্পটা শোনাই।

আবেগে গলা চুবিয়ে বিকাশ গল্প শোনালেন ‘বসন্ত বাহার’-এর। শুনতে শুনতে চোখ ছাপিয়ে জল উথলে উঠল ওস্তাদের। শেষে বললেন, ‘এ গল্প আমায় আগে শোনাওনি কেন? নাও আবার রেকর্ড করো। কিছুই গাওয়া হয়নি।’

সুরমণ্ডলের তারে হাত চালিয়ে চোখ বুজলেন উস্তাদ। এবার গলায় যে হাহাকার ছেয়ে গেল, তাতে মুহূর্তে যেন চাঁদে ধোয়া আকাশের মায়া! নির্জন পুকুরঘাটের ধু ধু হাওয়া। আশপাশের সবাইকে কান্নায় ডুবিয়ে থামলেন গোলাম!”

আজ ২১ জুন ফরাসি ভাষায় ফেট ডে লা মিউজিক— বাংলায় যা বিশ্ব সংগীত দিবস। এমন দিনে খান সাহেবকে সশ্রদ্ধ প্রণাম।

তথ্যসূত্র

১। আনন্দবাজার পত্রিকা আর্কাইভ (কিছু স্মৃতি কিছু কথা, বিকাশ রায়)।
২। বণিক বার্তা পত্রিকা।
৩। satyagrah.scroll.in

Facebook Twitter Print Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *