|| স্বর্ণমন্দির ||

চন্দন দত্ত রায়

টিমে অনেকজন আছে, কিছুতেই মতৈক্য হোলো না,আমি এবং আরোও কয়েকজন যেতে চাইছি সিমলা,অন্য সবাই অমৃতসর!!
কি আর করা যাবে,এখানেও যে দলের পাল্লা ভারী তার দিকেই ঝুঁকতে হোলো।
আপাতত সিমলা থাক!পরে যদি কোনদিন হয় দেখা যাবে!!
আপনারা ভাবতেই পারেন,এ আমার কি রকম কথা,আগে থেকে ঠিক করে নিয়েই তো সবাই ঘুরতে যায়! কোথায় সিমলা! কোথায় অমৃতসর! না বাবা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না,কেমন যেন গাঁজাখুরি গাঁজাখুরি মনে হচ্ছে!!

খোলসা করেই বলি তাহলে,আমরা তখন কয়েকজন পাঞ্জাব ও হরিয়ানার রাজধানী চন্ডিগড়ে।।

এই আলোচনাটা হচ্ছে ওখানেই!!যাই হোক আমার এক ভাই কাম বন্ধু ইন্দো টিবটিয়ান বর্ডার পুলিশ (ITBP) এ কর্মরত অফিসার।সে সেই সময় চন্ডিগড়েই ছিল।তার সাথে যোগাযোগ করলাম,সে আর্মগার্ড সহ জিপে করে চলে এলো!
আমাদের দু’জনকে তাদের অফিসার মেসে নিয়ে গিয়ে খাতির যত্ন করার পর তাকে জানতে চাইলাম সিমলার দিকে কতটা সে নিয়ে যেতে পারবে,বা যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারবে!!তার কথায় যা বুঝলাম,এখন ওদের গাড়িই ওদিকে অসুবিধার মধ্যে পরছে,চারিদিক বরফাচ্ছাদিত!!

ওদের জওয়ান আর বর্ডার রোড ওয়েজ রাস্তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে।অত‌এব সিমলা আপাতোতো ক্যানসেল!! চলো অমৃতসর!ভাইটি আবার অমৃতসরের একজন অফিসারকে ফোনে জানিয়ে দিল আমাদের যাওয়ার বিষয়ে,আর ওনার ফোন নম্বর আমাকে দিয়ে দিল,যোগাযোগ করার জন্য।
চাপলাম বাসে চল্লাম অমৃতসর!! অমৃতসরে এসে ঐ অফিসার ভদ্রলোকের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম,গেছিলাম ওনাদের I.T.B.P কম্পাউন্ডেও,সে ওয়াঘা সিমান্তের ব্যাপারে!সে লেখা পরে আবার কোনদিন।

আজ শুধুই স্বর্ণমন্দির———🌹

অমৃতসরে গুরুদ্বোয়ারা রোডে একটা গুরুদ্বোয়ারায় থাকার ব্যাবস্থা করে মালপত্র রেখে চল্লাম প্রধান আকর্ষণ স্বর্ণমন্দির দেখতে।


প্রথমেই যে বিষয়টায় অবাক হলাম তার হলো জুতো জোড়া খুলে রাখার বিষয়। একটা জায়গায় জুতো রাখতে গিয়ে প্রায় চমকে উঠে দেখলাম যারা পরম যত্নে আমাদের ধূলোমাখা চটি জুতো গুলোকে নিয়ে একটা নির্দিষ্ট খাপে রেখে আমাদেরকে একটা করে কুপন ধরিয়ে দিচ্ছেন তারা কেও হেলাফেলা করার মানুষ না!!ফেরার সময়ও সেই যত্ন সহকারে তার আবার প্রায় পায়ের কাছে নামিয়ে দেওয়া!!
যাই হোক জানি না আর কি চমক অপেক্ষা করছে!!প্রধান প্রবেশ দ্বারের সামনে দুজন দীর্ঘ দেহি শিখ যুবক পাহাড়ায়!!আমাদের কাছে সিগারেট লাইটার আছে জানাতে,তার মধ্যে একজন সামনের দিকে পাঁচিলের গ্রীলের নিচে নির্ভয়ে রেখে যেতে বল্লেন। সত্যিই ফিরে এসে ঐ জায়গাতেই এ জিনিষ গুলো ফিরে পেলাম!!
মাথায় ফেজের মত কাপড় দিয়ে সামনে বয়ে চলা জলে পা ভিজিয়ে পা কে শুদ্ধ করে প্রবেশ করলাম স্বর্ণ মন্দিরে।
আশ্চর্য নিরাবতা!!এত মানুষ কিন্তু সবাই কেমন চুপচাপ!!কথা বল্লেও খুবই আস্তে আস্তে!!
সামনেই হরমিন্দর সাহিব!!মানে সেই বিশাল সরোবর! চারিধারে বাঁধানো পরিষ্কার চ‌ওড়া মোজাইকের চত্বর!!জলে খেলা করে চলেছে বড় বড় রং বে রঙ্গের মাছ!!কেও কেও তাদের দিকে খাবার ছুঁড়ে দিচ্ছে!!
ডান দিকে সরোবরের বেশ কিছুটা ভেতরে সেই বিখ্যাত হরমিন্দর সাহিব বা দরবার সাহিব। যাকে আমরা চলতি কথায় বলে থাকি স্বর্ণমন্দির।
বাঁ দিক দিয়ে ঘোরা শুরু করে প্রথম লঙ্গরখানা দেখলাম!!কি বিশাল!!
একে একে বড় বড় বিল্ডিং যা ওখানে থাকার জন্য ব্যবহার করা হয় সেগুলি দেখে আরেকটি দরজার সামনে এসে পৌঁছলাম!!
ব্লু স্টার অপারেশন এর সময় নাকি এই দিক দিয়েই ভারতীয় ফৌজের বাহিনী মন্দিরে পৌঁছেছিল!!
এগিয়ে চল্লাম তাকে অতিক্রম করে!!
লক্ষ এবার হরমিন্দর সাহিব বা স্বর্ণমন্দির!!সামনেই ডান হাতে সরোবরের বেশ কিছুটা ভেতরে যা একটা সেতুর মাধ্যমে মুল মন্দিরের সাথে যুক্ত।অগনিত মানুষ কয়েকটা দীর্ঘ লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে!
দাঁড়ালাম! এগিয়ে চল্লাম ধীরে ধীরে একসময় মুল মন্দিরের চাতালে এসে প্রবেশ করলাম গর্ভ গৃহে!! শিখ ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহেব রাখার জায়গাটি একটা ঘেরা জায়গায় রাখা তাকে ঘিরে ভজন গেয়ে চলেছেন একদল ধর্মপ্রান শিখ ধর্মের মানুষ।যে ভজনের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে স্বর্ণমন্দির সহ সমস্ত চত্বরে!!এক অদ্ভুত নিরাবতা অন্যান্য মানুষদের!!ফেরার সময় একজন প্রত্যেকের হাতে দিচ্ছেন প্রসাদ!!এত মানুষ কোনো বিশৃঙ্খলা নেই!সকলেই ধীর স্থির!!অবাক হ‌ওয়ার‌ই বিষয়!!
দু’দিন ছিলাম,সকাল রাত মিলিয়ে তিনবার গেছিলাম। লঙ্গরে বসে খেয়েও ছিলাম,সেখানেও চমক!! সুশৃঙ্খল ভাবে হাজারে হাজারে মানুষ খাচ্ছেন,ধনী দরিদ্রের কোন ভেদাভেদ নেই,নেই জাত ধর্মের ভেদাভেদ!সব্বাই নিজের থালা বাটি সংগ্রহ করছেন,মাটিতে একসঙ্গে বসে পংক্তি ভোজন করছেন!!খাওয়ার পর আবার নির্দিষ্ট জায়গায় তা রেখেও দিচ্ছেন।
সব থেকে অবাক হ‌ওয়ার বিষয় যারা আমাদের এঁটো বাসন মাজছেন তারা কেওয়‌ই সাধারণ যে অর্থে আমরা বলি গরীব মানুষ তা নয়!!এনারা সমাজের বিভিন্ন অংশের নারী পুরুষ তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত মানুষ জন!!এটা একটা সেবা হিসাবেই এনারা করে থাকেন।
স্বর্ণমন্দির চত্বরে না কি কোন একজন মানুষ পাওয়া যাবে না সে রক্ষী থেকে শুরু করে মিনিটে মিনিটে মন্দিরের সমস্ত চত্বর এলাকা পরিষ্কার করার মানুষজন সহ রান্না,পরিবেশন,এঁটো বাসন মাজার মানুষজন সহ!!

এতো গেলো মন্দিরের বিষয়।

মন্দিরটি কিভাবে এখানে হোলো সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করি!!
১৫০২সালে লাহোর থেকে ২৫কি .মিঃ দুরে জি.টি.রোডের ধারে এই প্রকান্ড জলাশয় দেখেন শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক।তিনি সেই জলাশয়ের নাম রাখেন অমৃক সায়র।তিনি এখানে এক মন্দির প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন।
সেই জলাশয়েরকে ঘিরেই তার পরবর্তী সময়ে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা হয়!গড়ে ওঠে অমৃতসর শহর। সরোবরের নাম করন হয় হরমিন্দর সাহিব।
ষোড়শ শতকে শিখ ধর্ম গুরু রামদাস মন্দির নির্মাণ শুরু করেন।
সম্ভবত ১৬০৪সালে শিখ ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহেব এখানে প্রতিষ্ঠিত হন।
প্রায় সাড়ে ৪ বর্গ কি.মি জায়গা জুড়ে এই মন্দির চত্বরে অনেক বিল্ডিং আছে,আরও গুরুদ্বোয়ারা আছে, আছে থাকার জায়গা,খাবার জায়গা লঙ্গরখানা,আর আছে একটি মিউজিয়াম।
দশম শিখ গুরু গুরুগোবিন্দ সিং শিখদের চিরন্তন গুরু ও শিখ ধর্মের নেতা বলে ঘোষণা করেন।

বিশ্বের প্রধান প্রধান দ্রষ্টব্য স্হানগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি ভীড় হয় এখানেই-“লন্ডনের ওয়ার্ল্ড বুক অফ রেকর্ডস” থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *