Latest News

Popular Posts

৮৩: রুপোলি পর্দায় সোনালি স্মৃতি

৮৩: রুপোলি পর্দায় সোনালি স্মৃতি

সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

খেলার ফল জানা থাকলে লোকে সে-খেলা দেখতে যায় নাকি? এমনটাই তো শোনা যায়। তাহলে ফল জানা সত্ত্বেও ছেলেটা খেলা দেখতে ছুটল কেন? কী দেখতে ছুটল? খেলা না সিনেমা? সিনেমায় খেলার মাঠ যে আগে সে দেখেনি এমন নয়। ফুটবল নিয়ে বাংলা ছবি ‘ধন্যি মেয়ে’ কে ভুলতে পারে! হিন্দি ছবি ‘লগান’-এর কথাও ছেলেটার মনে পড়ে। সেখানেও ক্রিকেট খেলার মাঠে ভারতের জয়ের লড়াইয়ের গল্প ছিল, সাহেবদের হারানোও ছিল। তবে সে তো গল্প; ‘সিনেমায় যেমন হয়’! কিন্তু এই সিনেমা তার কাছে অন্যরকম, একেবারেই অনন্য। সিনেমার নাম ৮৩।

আরও পড়ুন: রানাঘাটের শরীরচর্চার ইতিহাস

ছবি রূপকিশোর সেন

তিরাশি বলতে একটা ঘটনাই তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। তা হল ভারতের বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়। ছেলেটার তখন ক্লাস ফোর। স্মৃতি তো আবছা হয়ে যাওয়ারই কথা। কিন্তু ঘটনাটা এমনই যে, সেই স্মৃতি আদৌ ধূসর বিবর্ণ হয়ে যায়নি। আর যদি স্মৃতির পাতায় ইতিউতি ধুলোও পড়ে গিয়ে থাকে, তবে এই সিনেমা গড়ার ঝড়ে উড়ে গেল সেসব ধুলো। ৩৯ বছর আগের এক গরমকালের রাত ফিরে এলো এবারের শীতের হিমেল হাওয়ার মরশুমে। শীত? নাকি বসন্ত এসে গেল? ভারতীয় ক্রিকেটে বসন্তের আগমনীবার্তা নিয়ে এসেছিল তিরাশি, সেকথা কি ভোলা যায়?

যদি সব মনেই থাকে, তাহলে এছবি দেখার মানে কী! কিন্তু সত্যিই কি সব মনে ছিল? আর একটু এগিয়ে বলি, আদৌ কি সব জানা ছিল? তখনকার দিনে কি আদৌ সব কিছু জানার উপায় ছিল? সেটা কিন্তু শুধু যে সে তখন ক্লাস ফোর বলে নয়। ছেলেটার বাড়িতে সেযুগেও একটা সাদা-কালো টিভি ছিল আর রোজ সকালে বাড়িতে আসত ‘যুগান্তর’ কাগজ। তবে তখন তো খেলার খবর, খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বেরোত না; তার জন্য বরাদ্দ ছিল কাগজের শেষ পাতা বা শেষের আগের পাতা। আর তাতে কি বেরোত? আগের দিনের খেলার খবরটুকু, বড়জোর সম্পূর্ণ স্কোর। এখন তো আমরা সেসব খেলা চলাকালীনই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পড়ে থাকি। সেই সময় খবরের কাগজে খেলার গল্প বেরোত না। ড্রেসিংরুমের ঘটনাও অজানা থেকে যেত। খেলার সরাসরি সম্প্রচার সবসময় হত না। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আসতে তখনও কয়েক দশক দেরি। তাই সবমিলিয়ে এত কিছু জানার সুযোগটুকু ছিল না বললেই চলে।

আরও পড়ুন: এক বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর শহিদের মৃত্যু: চল্লিশ বছর পরে কিছু কথা

ছবি রূপকিশোর সেন

আদৌ কি জানতাম ম্যানেজার মান সিং (অসাধারণ অভিনয়ে পঙ্কজ ত্রিপাঠী) ভারতীয় দলের মান রক্ষায় কতটা যত্নবান ছিলেন? ম্যানেজার গেছেন পাসের ব্যবস্থা করতে। যে পাস মিলেছে, তাতে লর্ডসে ঢোকার ছাড়পত্র নেই। তিনি সে পাস চাইতে গিয়ে পেলেন চরম তাচ্ছিল্য, ‘লর্ডসের পাস নিয়ে ভারত কী করবে? সেখানে তো…’ এরপর যখন ভারত সত্যিই ফাইনালে উঠল এবং মান সিং লর্ডসের পাস আনতে গেলেন তখন সাহেব আধিকারিকদের ঢোক গেলার অবস্থা।

আবার আক্ষরিক অর্থে ঢোক গেলা শুধু নয়, কাগজ গেলার উপাদান এই ছবিতে রয়েছে।

সে গল্প ছবির শেষে বলেছেন স্বয়ং ম্যানেজার মান সিং। এক সাংবাদিক ডেভিড ফ্রিথ-এর গল্প। বিশ্বকাপে ভারতের প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে যখন কপিল বলেছিলেন, ভারত বিশ্বকাপ জিততে এসেছে তখন তিনি বলেছিলেন, টুর্নামেন্টে ভারতের তো কোনও সম্ভাবনাই নেই। আর ভারত বিশ্বকাপ জিতলে তিনি নিজের লেখা গিলে খেয়ে নেবেন। আর কার্যত হয়েছিলও তাই। ভারত বিশ্বকাপ জিতল তিরাশির পঁচিশে জুন। আর জুলাই মাসে বিয়ারের গ্লাস হাতে নিয়ে তিনি সেই লেখার কাগজ আক্ষরিক অর্থে গিলে নিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: ১৯৬২-র ৪ সেপ্টেম্বর: এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা জয়ের রূপকথা পা দিল হীরক জয়ন্তীতে

ছবি রূপকিশোর সেন

এরকমই সব ‘গল্প হলেও সত্যি’ ঘটনাতেই ভর্তি দু’ঘণ্টা বিয়াল্লিশ মিনিটের এই সিনেমা।

এরকম সব ঘটনা ঘটছে সিনেমার পর্দায়; কী ঘটছে তখন দর্শকাসনে? মাস্ক পরিহিত মুখগুলোর হাতে পর্দার আবছা আলোতেও দেখা যাচ্ছিল রুমাল। সেই রুমাল বারবার ব্যবহার করতে হচ্ছে চোখ মুছতে। দর্শকদের সবার চোখের কোণই যে চিকচিক করছে!

যাঁরা এ ছবি দেখছেন তাঁদের সকলেরই মনে যে এই জয়ের স্মৃতি রয়েছে, তা কিন্তু নয়। দর্শকদের মধ্যে কিশোর-তরুণের ভিড়ই তো বেশি। বড়দিনের ছুটিতে মায়ের সঙ্গে আসা ক’জন স্কুলপড়ুয়ার দেখা মিলল যাদের হাতের খাবার হাতেই রয়ে গেছে, যারা গোগ্রাসে গিলছে পর্দার খেলা। প্রথম পর্বে যশপাল শর্মার অসাধারণ ব্যাটিং, পরে সন্দীপ পাতিলের আর শ্রীকান্তের চোখ ধাঁধানো স্ট্রোক। সেমিফাইনাল আর ফাইনালে মহিন্দার অমরনাথের হার-না-মানা লড়াই, মদনলালের জেদ, বলবিন্দার সিং সান্ধু আর কিরমানির নাছোড় মনোভাব— কোনটা ছেড়ে কোনটা বলা যায়? কোথায় যেন ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য আর সম্প্রীতির গল্পও বলে ফেলে এ-ছবি। তাই কার ধর্ম ইসলাম আর কে শিখ, সেটা একবারও মনে হয় না। দেশের হয়ে খেলার মাঠে নিজেকে নিংড়ে দেওয়ার কাহিনিতে ধর্ম আর সম্প্রদায়ের ভেদ থাকে না। বরং জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াইয়ের গল্প থাকে। সে-গল্প তো তিরাশি জুড়েই আছে। আর আছে ক্রিকেটারদের স্ত্রীদের এই লড়াইয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার গল্প। এ-দেশে কেন বিশ্বের প্রেক্ষিতেই মহিলা ক্রিকেটের আক্ষরিক অর্থে প্রসার ঘটতে তখনও ঢের দেরি। তবে তাতে মেয়েদের লড়াই থেমে ছিল না। একদিকে মাঠে বল হাতে আগুনের গোলা ছোটাচ্ছেন কপিল দেব-মদনলাল আর অন্যদিকে গ্যালারিতে আনন্দ আর বিষাদের আলো-আঁধারিতে লড়ছেন তাঁদের ঘরনিরা। আর এ-সবের সঙ্গে যাঁর কথা আলাদা করে বলতেই হবে, তিনি কপিল দেব।

আরও পড়ুন: মান্নাদা ৯৭: এক ফুটবল আত্মার জন্মদিনে কিছু স্মৃতিচারণ

ছবি রূপকিশোর সেন

তিরাশির বিশ্বকাপের কথা বলতে গেলে শুধু কপিলের জন্যই একটা আলাদা অধ্যায় রাখতে হবে, হবেই। সে শুধু কপিল এই দলের অধিনায়ক ছিলেন আর লর্ডসের বারান্দায় বিশ্বকাপটা হাতে নিয়েছিলেন বলেই নয়, কপিল না থাকলে তো বিশ্বকাপ জয়ের রাস্তাটাই তৈরি হত না।

প্রথম ম্যাচে আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা ভারতীয় দল পরের এক ম্যাচে জিম্বাবোয়ের কাছে পাঁচ উইকেটে সতেরো স্কোরে থমকে দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময়ে কপিলের মাঠে নামা। তারপরে অবিশ্বাস্য সেই ইনিংস। ১৭৫ অপরাজিত। সেই সময় সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সেটা একটা রেকর্ড। ইতিহাস বলে বিবিসি-র কারিগরি কর্মীদের ধর্মঘটের জন্য সে-খেলা টিভি-তে দেখানো হয়নি, নেই তার কোনও ধরনের ভিডিয়ো ফুটেজ। সেই ইতিহাসকে হারিয়ে দিল এ ছবি। ছেলেটা দস্তুর মতো দেখল সে-ম্যাচে মারা কপিলের চার আর ছয় মারার মন ভালো করা দৃশ্য। ম্যাচ বাঁচানো আর ম্যাচ জেতানো ইনিংস বুঝি একেই বলে! এই ম্যাচ হারলে ঠিক তার আগে দু’টো ম্যাচহারা ভারত বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে যেত। কিন্তু তা আটকে দিলেন কপিল দেব। যে খেলার ফুটেজ দেখার কোনও সুযোগ নেই, সেই অবিশ্বাস্য খেলা দেখা গেল সিনেমার পর্দায়। বলা বাহুল্য, এই ব্যাটার স্বয়ং কপিল নন, ইনি হলেন তাঁর চরিত্রাভিনেতা রণবীর সিং। কিন্তু এ-ছবিতে তিনি ফিল্মস্টার নন, মেঠো ‘হরিয়ানা হ্যারিকেন’। তিনি ভুল ইংরেজি বলেন, কেতাদুরস্ত নন কিন্তু কখনও ভোলেন না মায়ের কথা; বেস্ট অফ লাক-টাক নয়, ‘বেটা, জিতকে আনা’।

সত্যিই তিনি জিতে নিলেন। জিতলেন বিশ্বকাপ। জিতলেন শত-সহস্র মানুষের মন। আর জেতালেন ভারতীয় ক্রিকেটকে। এও তো স্বাধীনতা। একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় ভারতীয় ক্রিকেটের হারমুক্তি। চল্লিশের কোঠায় থাকা মানুষের মনে পড়ে যাবে এক সেভিং ক্রিমের বিজ্ঞাপন; বিজ্ঞাপনী পণ্যের নামটা পাল্টে দিয়ে বলি ‘কপিল দেবকা জবাব নেহি’।

রুপোলি পর্দায় সোনালি স্মৃতি ফিরিয়ে আনার এই স্মৃতি-জাগানিয়া সিনেমাটাকেও ছেলেটার বলতে ইচ্ছে করল ‘তিরাশি কা জবাব নেহি’!

নিবন্ধকার কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট আলোচক

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

One thought on “৮৩: রুপোলি পর্দায় সোনালি স্মৃতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *