রঙের গাঁ খোয়াবগাঁ

ইন্দ্রজিৎ মাজী

ঝাড়গ্রামের কদম কাননের মেইন রাস্তা থেকে বাঁ-দিকের ক্যানাল পাড় বেয়ে এগিয়ে গেছে লাল মাটির রাস্তা, বৃদ্ধ কাজু বৃক্ষের জ্ঞানের ছায়া ঢেকে দিচ্ছে সংস্কারের অভাব সংবলিত রাস্তার ঠিকরে ওঠা ক্ষত। যুবক কাজু বৃক্ষের উচ্ছ্বসিত নিবিড় ছায়ার আলিঙ্গনে এগিয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা লাল মাটির রাহা। রোদছায়া মাখা লাল মাটির এই রাস্তা ক্রমশ সেঁধিয়ে যাচ্ছে আকাশমণির ছায়াঘেরা কোলে। আশ্চর্য স্তব্ধতার গানে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে পাতা ওড়ার শব্দ। প্রাচীন কোনও প্রবাদের মতো ভেসে আসছে ছাগলের গলায় বাঁধা ঘণ্টার টুংটাং। লাল মাটির সংকীর্ণ এই রাহা আকাশমণির কোল ছেড়ে শাল মহুলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা লোধা শবরের সপ্নের গাঁয়ে বিলীন হয়েছে…

আরও পড়ুন: খড়দহে দোল খেলার কথা

এই গাঁয়ের অতীত পরিচয় ছিল লালবাজার নামে। মাত্র ৭৫ জন মানুষ ঘর বেঁধে, স্বপ্ন বেঁধে বাস করেন ১৩টি ক্যানভাসের দেওয়াল দেওয়া ঘরে। বছর কয়েক আগে লেখক ও বুদ্ধিজীবী শিবাজি বন্দোপাধ্যায় এই গাঁয়ের নাম পালটে দিয়েছেন, নাম রেখেছেন খোয়াব গাঁ। সহৃদয় মৃণাল মণ্ডল মহাশয় ও সেবায়তনের কয়েকজন শিক্ষক মহাশয়রা গড়ে তুলেছেন চালচিত্র আকাদেমি। এখানে গড়ে উঠেছে ‘ওপেন স্টুডিয়ো’।  দীপা, শিখা, দীপ, রাখী, টিয়া, আহির প্রমুখ খুদে শিল্পীদের হাতের তুলিতে এই গাঁয়ের দেওয়াল প্রাণ পেয়েছে, স্বপ্নের স্পন্দনে স্পন্দিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ‘বসন্তে-বসন্তে তোমার কবিরে দাও ডাক’

এইসব ভবিষ্যতের খুদে শিল্পীরা পড়াশোনার ফাঁকে শুধুমাত্র রংতুলিতে নয় হাত পাকাচ্ছে মাটির পুতুল গড়তেও, খেলার ছলে খেলনা পুতুল বানিয়ে খোয়াব সাজাচ্ছে শিল্পময় আগামীর। বৃক্ষ হত্যার জীবিকা ছুড়ে ফেলে শিল্পকে জীবিকা করবার স্বপ্নের ভেতরে গাঢ় হয়ে বসছে এই গাঁ। হাতের কুড়ুলে যতই জং ধরছে নিবিড় হয়ে, ততই পোক্ত হচ্ছে শিল্পকলা।

আরও পড়ুন: বনের দোল, মনের দোল

এই গ্রাম শুধু ছবির নয় এই গ্রাম সাজু রূপাইয়ের প্রাচীন নকশী কাঁথারও গ্রাম, এই গাঁয়ের গৃহবধূরা সুচের ডুব সাঁতারে আঁকেন নকশী কাঁথা। ব্ল্যাঙ্কেট আর কম্বলের সভ্যতায় ব্রাত্য হয়ে যাওয়া কাঁথা শিল্পকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা করছেন। যদিও চাহিদা কম বাজারে, জানেনও না অনেকে তবুও স্বপ্নের জোগানে স্পর্ধায় কমতি নেই শিল্পীদের।

আরও পড়ুন: রানাঘাটে রঙের উৎসব

এই গাঁয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে যেমন পুরাকাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ভাবিত প্রাচীন শিল্প কাটুম কুটুমও আত্মীয়তা বাড়াচ্ছে শিল্পী ষষ্ঠীচরণ আহিরের এক হাত ধরে, কারণ জন্ম থেকেই ওনার একটি হাত পঙ্গুত্ব গ্রাস করেছে। এই শিল্প খানিকটা কোলাজ পদ্ধতিতে সৃজন হয়। গাছের শুকনো ডাল, মৃত শেকড়, বাঁশের গোড়া, বাঁশের খোলস প্রভৃতিকে কেটেকুটে, জোড়াতালি দিয়ে তৈরি এই শিল্প। ষষ্ঠীচরণ আহিরবাবুকে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন শিক্ষা দিয়ে তাঁর দুই শিক্ষক রামেশ্বর হাঁসদা ও যজ্ঞেশ্বর হাঁসদা মহাশয়। ষষ্ঠীচরণবাবু কাঠের ভাস্কর্যের কাজও শুরু করেছেন যদিও হাত পাকেনি এখনও তেমনভাবে তবুও খামতি নেই স্বপ্নে।

আগাছা পরিষ্কার করে পর্যটকদের জন্য বানানো হয়েছে পার্কিং জোন, পরিত্যক্ত বস্তুর জন্য শৈল্পিক ওঁচলাকুড় বানিয়েছেন এই স্বপ্ন সৈনিকেরা। সদ্য সোলার বাতি বসেছে সরকারি উদ্যোগে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসছে…

ছবি লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *