কলকাতায় প্রায় বিস্মৃত একটি খেলা এবং কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন

জয়দীপ বসু

আজ থেকে ৫১ বছর আগে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন অমিয় (কানি) দেব, তিরিশের দশকে মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে যিনি সবুজ মেরুনের পক্ষে হ্যাটট্রিক করে অমর হয়ে আছেন ফুটবলপ্রেমীদের মনে। না, সাক্ষাৎকারটি ফুটবল নিয়ে ছিল না। ছিল হকি নিয়ে। আরও খোলসা করে বলতে গেলে, বাংলার হকি নিয়ে। আসলে আমরা ভুলতে বসেছি, ফুটবলের পাশাপাশি কানি দেব ছিলেন একজন দুরন্ত হকি খেলোয়াড়, টানা ১৭ বছর মোহনবাগান ও বাংলা দলের নিয়মিত তারকা। যাই হোক, সাক্ষাৎকারটি কানি একা দেননি, সঙ্গে ছিলেন নির্মল মুখোপাধ্যায়, এক সময় দেশের অন্যতম সেরা হকি গোলকিপার।

এই দুই প্রাক্তন খেলোয়াড়কে প্রশ্ন ছিল, বাংলার সর্বকালের সেরা বাঙালি হকি দল গড়তে হলে তাঁরা কাদের বেছে নেবেন? অনেক ভেবেচিন্তে তাঁরা যে দল গড়ে দিয়েছিলেন, তা ছিল এইরকম।

গোল: নির্মল মুখোপাধ্যায় (মোহনবাগান), রাইট ব্যাক: প্রভাস দাস (মোহনবাগান), লেফট ব্যাক: এস সেনগুপ্ত (উত্তরপ্রদেশ), রাইট হাফ: শৈলেশ চট্টোপাধ্যায় (মোহনবাগান), সেন্টার হাফ: বি দাস (টাউন ক্লাব), লেফট হাফ: যামিনী বন্দোপাধ্যায় (তালতলা), রাইট আউট: অরুণ মিত্র (গ্রিয়ার), রাইট ইন: আর গুপ্ত (জামশেদপুর), সেন্টার ফরোয়ার্ড: কানি (অমিয়) দেব (মোহনবাগান), লেফট ইন: হরিপদ গুহ (কাস্টমস), লেফট আউট: ডি দাস (মোহনবাগান)।

আরও পড়ুন: ৪১ বছর পরে হকিতে মেডেল এলো ভারতের: এখন প্রশ্ন একটা না দু’টি?

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই বাংলার এই সেরা একাদশের অনেক নামই আজ সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত, মনের মধ্যে এই নামগুলি কোনও দোলা জাগায় না। কিন্তু এ তো অর্ধশতাব্দী আগে তৈরি এক দল, তৎকালীন দুই সত্তর ছুঁই-ছুঁই বৃদ্ধের স্মৃতিচারণ মাত্র। এই দলে কি অদলবদল হবে না? যোগ হবে না কোনও নতুন মুখ? দুঃখের বিষয়, সেটা বোধহয় আর সম্ভব নয়। কারণ বাঙালি হকি খেলতে ভুলে গেছে অনেকদিন। ময়দানে হকি কার্যত উঠে গেছে আজ প্রায় তিন দশক হতে চলল, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের একদা ভারত কাঁপানো হকি দল এখন স্মৃতিকথা মাত্র। না, বোধহয় ভুল বললাম। দুই বড় দলের সমর্থকদের স্মৃতির কোটরে কোথাও সম্ভবত স্থান নেই সমর মুখোপাধ্যায়, দেবু পাল অথবা সতু চক্রবর্তীদের জন্য।

কি হবে হকির জন্য ভেবে? হকির জন্য প্রয়োজনীয় টার্ফ কোথায়? ঠিক কথা। তার ওপর অভিযোগ, কলকাতার হকি মাঠে তো নাকি চিরকাল ‘বহিরাগত’দের দাপাদাপি। সুতরাং অলিম্পিকে আটবার সোনা জেতা এই খেলাটিকে তাচ্ছিল্য করা যেতেই পারে। ওই তো রবীন্দ্র সরোবরে টার্ফ বসবার কথা হয়েছিল একবার, রে-রে করে তেড়ে এসে সবকিছু ভেস্তে দিয়েছিলেন এক ক্রীড়াপ্রেমী সম্পাদক। অতএব, বন্ধুগণ, আসুন ভুলে যাই হকির কথা, অমিত বিক্রমে বেঁচে থাকুক আমাদের বিশ্বের ১০৮ নম্বরে থাকা কিংবদন্তি ফুটবল, বিস্মৃতির অতলে, আরও অতলে তলিয়ে যাক সেইসব বাঙালি খেলোয়াড়, যাঁরা একসময় হকি স্টিক হাতে ময়দান কাঁপিয়েছেন বছরের পর বছর।

আরও পড়ুন: পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি, মোহনবাগান এবং বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ: ১৫ আগস্ট, ১৯২০

ছবি সৌজন্য: themohunbaganac.com

আসুন, কয়েকটি নাম বলা যাক। রবি দাস, দেবু পাল, হরিপদ গুহ। চেনেন নাকি? চিনলে, বাংলার হে ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ, দয়া করে জানাবেন, তাঁরা এখন কোথায়, আদৌ আছেন কি না, অথবা শেষ জীবন এঁদের কেটেছে বা কাটছে কীভাবে। ছোট্ট করে পরিচয় দিয়ে দিই এঁদের। এঁরা তিনজনই ১৯৫২ সালে জাতীয় হকি খেতাব বিজয়ী বাংলা দলের সদস্য। এঁদের নিয়ে গত তিরিশ বছরে কোনও সংবাদপত্রের পাতায় কোনওদিন কোনও লেখা পড়েছি বলে মনে পড়ে না।

১৯৬৭ সাল। মাদুরাই শহরে চলছে জাতীয় হকি। কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলার মুখোমুখি দুর্ধর্ষ রেল দল। মুখবেন সিং, হারবিন্দর সিং, বলবীর সিং, যোগিন্দর সিং, মহিন্দর লাল। সবাই তখন ভারতীয় দলের নিয়মিত সদস্য। বাংলার গোল ও ডিফেন্সে বুক চিতিয়ে লড়াই করে গেলেন দুই খেলোয়াড়। জয়ন্ত দেব এবং দেবু ঘোষ। না বললে অন্যায় হবে, সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন ভারত অধিনায়ক গুরবক্স সিং। পরপর তিনদিন খেলা ড্র। চতুর্থ দিনে যোগিন্দার সিংয়ের গোলে হেরে গেল বাংলা। না, দেব অথবা ঘোষ আজ দু’টি পদবি মাত্র। তাঁরা এখন কোথায়, কী করছেন, আমাদের কেউ কি জানেন?

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাগজ খুললে নিয়মিত দেখা যেত দুই বড় ক্লাবের হকি দল একেবারে তারকাখচিত, ফুটবলের কায়দায় সারাদেশ থেকে নিয়ে আসা সেরা খেলোয়াড় দিয়ে সাজানো। কিন্তু অন্য যাবতীয় দল, সে বিএনআর হোক কী ইস্টার্ন রেল, কী গ্রিয়ার― সব দলেই একগাদা বাঙালি খেলোয়াড় নিয়মিত খেলছেন। মোহনবাগানের পক্ষে তখন প্রচুর গোল করছেন অমিত দাশগুপ্ত। একসময় ভারতীয় দলের সদস্য সুদর্শন সমর মুখোপাধ্যায়, তিনি নাকি এখন পাকাপাকি আমেরিকায়। ব্যস, ওইটুকুই জানা আছে। এর বেশি কে খোঁজ রাখে, দরকারটাই বা কি?

আরও পড়ুন: অনন্য অলিম্পিক দর্শন

ছবি সৌজন্য: themohunbaganac.com

ভাবতে অবাক লাগে একটা সময় ছিল যখন দুই প্রধানের হকি ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনা ফুটবলের চেয়ে কিছু কম ছিল না। বয়স্ক হকি-প্রেমীরা আজও বলেন ১৯৬৪ সালে মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গলের লিগের খেলার সেই রক্তারক্তি কাণ্ডের কথা। খেলোয়াড়রা এতটাই উত্তেজিত ছিলেন যে, নিজেদের মধ্যে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। জনা দু’য়েক খেলোয়াড়কে হাসপাতালে পাঠাতে হয়, অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ইনামুর রহমান এই ম্যাচে দৃষ্টিকটুভাবে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে টোকিও অলিম্পিক শিবির থেকে বাদ পড়েন। এতটাই জোরদার ছিল তৎকালীন স্থানীয় লিগ।

এখন তো আমাদের ফুটবল আছে, ক্রিকেট আছে, মহান ক্রিকেটার আছেন, এর বেশি কি চাই? হকি আমাদের খেলা নয়, ধ্যানচাঁদের শ্রদ্ধেয় গুরু হাবুল মুখুজ্জে আমাদের কেউ নন। আসুন, আজ ক্রীড়া দিবসে, ধ্যানচাঁদের জন্মদিনে, এই সমস্ত অস্বস্তিকর প্রশ্ন যতটা সম্ভব দূরে সরিয়ে রাখা যাক।

লেখক বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

2 comments

  • অসাধারণ। কঠিন এবং অপ্রিয় সত‍্যের উন্মোচন করা হয়েছে। রূঢ় বাস্তব উঠে এসেছে এ লেখায়।

  • Debashis Majumder

    Very true and rightly written.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *