একটি লিটল ম্যাগাজিন ও মৃণাল সেন

ধীমান ব্রহ্মচারী

সালটা এই ২০১২ হবে। মানে আজ থেকে সাত বছর আগের সেই সময়। আমি তখন একটা লিটল ম্যাগাজিন করছি, মফস্‌সলে। নাম ম্যানুস্ক্রিপ্ট। তখন এই পত্রিকা বার করার মূল উদ্দেশ্য, উত্তরআধুনিক গোছের কিছু একটা। এখনকার অনেক কবি বন্ধুদের দেখি কথায় কথায় পোস্ট মর্ডানিজম কপচায়। শুনি। হ্যাঁ শুনি।

তো যাক, আসল কথায় আসি। সেই সময় আমাদের শহরে এই একটি মাত্র লিটল ম্যাগাজিন, যেখানে নবারুণ ভট্টাচার্য, মৃণাল সেন, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, সৌমিত্র বসুর মতো লেখকদের লেখা নিচ্ছি। আর যার কাণ্ডারি ছিলাম আমরা চারমূর্তি।

আনন্দবাজার পত্রিকার চন্দ্রিল ভট্টাচার্য যেমন, আমাদের লিটল ম্যাগাজিনের চন্দ্রিল তেমন বাসবেন্দু বর্মণ (ওরফে ওস্তাদ)। এই ওস্তাদ বেসিক্যালি ফিজিক্সের ছেলে, কিন্তু অনর্গল ইংরেজি আর বাংলা বলা আমার বয়সি বন্ধু খুব কম দেখেছি। রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, সমরেশ বসু থেকে সুনীল, সন্তোষ কুমার ঘোষ, কমল কুমার মজুমদার থেকে শীর্ষেন্দু। আবার সত্যজিৎ-ঋত্বিক থেকে তরুণ মজুমদার। পাশাপাশি শঙ্খ ঘোষ, শ্রীজাত, বিনয় মজুমদার, প্রতিদিনের রোববার, ঋতুপর্ণ, বব ডিলন, মার্কারেজ আরো আরও। একটা ছোট্ট পত্রিকার সম্পাদকের এই অভূতপূর্ব অসীম পড়াশোনা এ শুধুই সাধনা।

আরও পড়ুন­:­ মৃণাল সেনের ‘খণ্ডহর’ ও কালিকাপুর রাজবাড়ি

দ্বিতীয় জন কুন্তল বাগ (অসাধারণ স্টুডিয়াস)। এও কম যায় না। আমার তো মনে হয় বিশ্ব সাহিত্যের সব সাহিত্য কুন্তল অবলীলায় পড়েছে। চর্চা করেছে।

তৃতীয় জন আমাদের জুনিয়র সাত্যকি সেন। সত্যাকিকে বলব জিনিয়াস। একটা বিটেক স্টুডেন্ট। অথচ সাবলীলভাবে একটা কেন একশো ঝরঝরে গদ্য লিখতে পারে। যেকোনো মুহূর্তে জীবনানন্দ থেকে বিনয় মজুমদার যাবে আসবে। তুষার রায়ের কথা আর বলছি না। আমি তো এখনো বলি এই ছেলেটা পেন ধরলে সমসাময়িক অনেক কবির রাতের ঘুম চলে যাবে। অসাধারণ শব্দচয়ন।

এসব কথা যাক। এবার বলবেন আপনি এত ‘বাড়’ খাইয়ে তোলা দিচ্ছেন কেন। কেন? এর পরের পর্বেই বুঝবেন।

এই ম্যাগাজিনের উল্লেখযোগ্য লেখা বলতে ‘অসম্পাদকীয়’। এই সম্পাদকীয়ই আমরা ‘অ’-টা জুড়ে দিতাম। এবং সেই সময় এই একটা পত্রিকা যা ৩০০ প্রিন্টের পর পুরোটাই বিক্রি হত। প্রচুর ফোন আসত, অসাধারণ লিখেছেন। তাই সাফল্য বলতে আমাদের ওইটুকুই।

এমতাবস্থায় আমাদের আরো এক বন্ধু রুদ্র যোগ দিল। তৈরি হল টিম। ঠিক হল নামিদামি লেখক-লেখিকা নিয়ে এবার কাগজ তৈরি হবে। আর এহেন পত্রিকায় সিনেমা থাকবে না। তাই হয়! রুদ্র যেহেতু এই লাইনের ছেলে ছিল। তাই আরো তোড়জোড়। ঠিক হল ‘মৃণাল সেন’-এর লেখা ছাপা হবে। সত্যি, সাহিত্যের পাগলামি অনেক সময় অনেক ভয়ানক হয়। সামান্য চার, বারো বা নিদেনপক্ষে বত্রিশ পাতার কাগজে এত বড় মাপের মানুষের যোগসূত্র! আশ্চর্য তো হচ্ছিলামই।

রুদ্রই ফোন নং জোগাড় করল। ঠিক হচ্ছিল কে কথা বলবে। তো যেহেতু আমিই সর্বের সর্বা তাই, আমাকেই ফোন করতে হল। এরপর দিন ঠিক হল। এরকম প্রায় দিনই আমরা সাহিত্য আড্ডায় কবিতা-আলোচনা চালাতাম। আর এবারের বসাটাও অন্য জাতের। তাবড় তাবড় রথী-মহারথী। তাই বারংবার বিবেচনা, তারপরই পদক্ষেপ। তখন স্মার্টফোন ছিল না। ছোট্ট ফোনেই সাড়া হল, সেদিনের সেই বাক্যালাপ। সমসাময়িক যুগেও ‘ভুবন সোমে’র স্রষ্টার সঙ্গে ফোনে কথা। অপার থেকে তখন এক গুরুগম্ভীর শব্দ, ‘কে বলছেন? কী ব্যাপারে?’ বললাম, আমারা একটা লিটল ম্যাগাজিন থেকে বলছি। আপনার একটা লেখা চাই। তো কি নাম? বললাম, ম্যানুস্ক্রিপ্ট। বললেন, ‘শোনো ভালো প্রচেষ্টা। এগিয়ে যাও। কিন্তু শরীর অসুস্থ, তাই লেখালিখি প্রায় বন্ধ। এখন কিছু দিতে পারব না।’ বললাম, স্যার কোনো রকম ভাবেই কিছু না? বললেন, না তা ঠিক নয়। আচ্ছা ধরো, ফোনটা একটু ধরে রাখলাম। বললেন, ‘লেখা দিতে পারছি না, তবে পুরনো একটা লেখা রিপ্রিন্ট করতে পারো।’ ব্যস। ব্যস। এই অনেক। নব্বই বছর বয়সি মৃণাল সেন। অথচ উৎসাহ, উদ্দীপনায় ও সহযোগিতায় কোনো ভাটা নেই। আমরা ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে যে-সব বড় বড় আব ভাব নিয়ে থাকতাম, তাতে মুকুটে পালক বসালেন মৃণাল সেন।

আমরা পুরনো একটা পত্রিকা, ‘আমার সময়’। সেখান থেকে একটা লেখা নির্বাচন করলাম। তাতে অবশ্য আরো এক গ্রন্থকীট বন্ধু জাহিদুর রহমান। ইতিহাস গবেষক। তাঁরই সেই সারা বাড়িময় বইয়ের স্তূপে ঝাঁপ। তারপর খোঁজা একটা লেখা। পুরনো লেখা। এটা ওটা সেটা। সব সংখ্যা নিয়ে বিশ্লেষণে মুখ গুঁজে বসল ওস্তাদ, সাত্যকি আর রুদ্র। উঠে এলো একটা লেখা। নির্বাচন হল তাঁর লেখা। ‘ডিসিকার চরিত্র’ নিয়ে এক তথ্য নির্ভর লেখা। দ্বিতীয় বার ফোন, তাঁকে। স্যার আমরা আপনার এই লেখাটা মনোনীত করেছি। এটা আমাদের আগামী শারদ সংখ্যায় ছাপছি। শুনে বললেন, ওটা চলবে? আসলে ‘বিরাটের পরিচয় তার বিনয়ে’। আমরাও বিনয়ের সঙ্গেই বললাম, স্যার এটাই অনেক। এটাই আমাদের প্রাপ্য। বললেন, বেশ।

এই ‘বেশ’ শব্দই পরশুদিন বারবার কানে বাজল। গুরুগম্ভীর সেই ভৈরবী স্বর ‘বেশ’।

মৃণাল সেন – আপনাকে প্রণাম। শুভেচ্ছা। ধন্যবাদ। আপনি বাংলা সিনেমার স্তম্ভে আগামীতেও থাকবেন। ভালো থাকবেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *