ত্রাসের‌ ‌কবিতা‌ ‌

যশোধরা‌ ‌রায়চৌধুরী‌ ‌

১‌ ‌

প্রতিটি‌ ‌কোষ‌ ‌ঝনঝন‌ ‌করে‌ ‌ভেঙে‌ ‌পড়ছে‌ ‌
আলাদা‌ ‌আলাদা‌ ‌ঘরে‌ ‌বসে‌ছিল‌ ‌যেসব‌ ‌ ‌
পরস্পরের‌ ‌মুখ‌ ‌না‌ ‌দেখা‌ ‌আত্মীয়‌-স্বজন‌ ‌
ঝগড়া‌ ‌হয়ে‌ ‌যাওয়া‌ ‌বন্ধুরা‌ ‌
এখন‌ ‌একটাই‌ ‌ছাতহীন‌ ‌উন্মুক্ত‌ ‌প্রান্তরে‌ ‌তারা‌ ‌

রক্ত‌ ‌থেকে‌ ‌ঠেলে‌ বের‌ ‌করে‌ ‌দিয়েছে‌ আমাদের‌ ‌
মজ্জা‌ ‌থেকে‌ ‌তাড়িয়ে‌ ‌দিয়েছে‌ ‌আমাদের‌ ‌
প্রতিরোধ‌ ‌ক্ষমতা‌ থেকে‌ ‌নির্বাসন‌ ‌দিয়েছে‌ ‌আমাদের‌ ‌

ঠকঠক‌ ‌করে‌ ‌কাঁপছি‌ ‌আমরা‌ ‌এক‌ ‌পৃথিবী‌ ‌লোক‌ ‌
আমরা‌ ‌মৃত্যুর‌ ‌ত্রাসে‌ ‌জল‌ ‌রক্ত‌ ‌রক্ত‌ ‌জল‌ দেখি‌ ‌আজ‌ ‌
অথচ‌ ‌আমাদের‌ ‌স্বার্থপরতা‌ ‌মরে‌ ‌না‌ ‌
আমরা‌ ‌যুদ্ধের‌ ‌ভেতর‌ ‌দেখেছি‌ ‌অপমান‌ ‌ ‌
আর‌ ‌মারীর‌ ভেতর‌ ‌দেখছি‌ লোভ‌ ‌
ঘৃণা‌ ‌দেখছি,‌ ‌
দেখছি‌ ‌পাশের‌ ‌মানুষকে‌ ‌ঠেলে‌ ‌ফেলে‌ ‌দিয়ে‌
নিজে‌ ‌এগিয়ে‌ ‌যেতে‌ ‌চাওয়া‌ ‌

অথচ‌ ‌প্রতিটি‌ ‌দেওয়াল‌ ‌ভেঙে‌ ‌পড়েছে‌ ‌আজ‌ ‌
সমস্ত‌ ‌পৃথিবী‌ ‌এক‌ ‌মারীর‌ ‌ছত্রছায়ায়‌ ‌
করুণ‌ ‌কান্নার‌ ‌মত‌ো ‌বাজছে‌ ‌হাওয়া‌ ‌
সূর্যের‌ ‌আলোকে‌ ‌মনে‌ ‌হচ্ছে‌ ‌ঈশ্বরের‌ ‌সমতুল্য‌ ‌
আর‌ ‌প্রতিটি‌ ‌নিশ্বাসকে‌ ‌বহমান‌ ‌দেখতে‌ ‌পাওয়া‌ ‌যাচ্ছে‌ ‌
এতদিন‌ ‌আমরা‌ ‌বেঁচেছিলাম‌ ‌না‌ ‌ ‌
আজ‌ ‌মৃত্যুর‌ ‌পটভূমিতে‌ ‌কী‌ ‌ভীষণ‌ ‌বেঁচে ‌থাকছি‌ ‌আমরা‌ ‌
প্রতি‌ ‌শ্বাসে‌ ‌বেঁচে ‌নিচ্ছি‌ ‌নিজেদের।‌ ‌

ক্ষুদ্রবুদ্ধি‌ ‌দিয়ে‌ ‌বেঁচে ‌নিচ্ছি‌ ‌আর‌ ‌নিয়ত‌ ‌মরে‌ ‌যেতে যেতে‌ ‌
পরস্পরকে‌ ‌ঠেলে‌ ‌দিচ্ছি‌ ‌দূরে‌ ‌আর‌ ‌একা‌ ‌হয়ে‌ ‌যাচ্ছি…‌ ‌
দূরত্ববিধি‌ ‌বজায়‌ ‌রাখুন‌ ‌বলতে‌ ‌বলতে‌ ‌ ‌
আমরা‌ ‌আসলে‌ ‌একটাই‌ ‌বদ্ধ‌ ‌ঘরে‌ ‌আটকে‌ ‌যাচ্ছি‌ ‌সবাই,‌ ‌একসাথে‌ ‌
যত‌ ‌আশপাশ‌ ‌খালি‌ ‌করে‌ ‌দিচ্ছে‌ ‌মারী‌ ‌
তত‌ ‌ঘন‌ ‌হয়ে‌ ‌আসছি‌ ‌আমরা‌ ‌
পরস্পরকে‌ ‌বলছি,‌ ‌আচ্ছা,‌ ‌আমরা‌ ‌হয়তো ‌বেঁচে ‌যাব,‌ ‌তাই‌ ‌না?‌ ‌ ‌

আরও পড়ুন: যখন বৃষ্টি নামে

২‌ ‌

মৃত্যুর‌ ‌তীব্র‌ ‌সুর,‌ ‌সাইরেনের‌ ‌ডাকে‌ ‌
আমাদের‌ ‌দিন‌ ‌ফোটে,‌ ‌আমাদের‌ ‌সকালের‌ ‌ফাঁকে‌ ‌
গুঁজে‌ ‌যায়‌ ‌মৃত্যুসংবাদগুলি…‌ রোল‌ ‌করে‌ ‌ছুঁড়ে‌ ‌দেওয়া‌ ‌কাগজের‌ ‌বদলে‌ ‌নীরবে‌ ‌
ক্লিক‌ ‌করে‌ ‌নেমে‌ ‌আসে‌ ‌ব্রাউজার‌ ‌আলম্বনহীন।‌ ‌ ‌
আগুনে‌ ‌বসানো‌ ‌থাকে,‌ ‌উথলানো‌ ‌দুধের‌ ‌মতো ‌কান্নাপরিসর।‌ ‌

প্রতিদিন‌ ‌দুঃসংবাদ‌ তৈরি‌ ‌হয়,‌ ‌তৈরি‌ ‌করি‌ ‌আমরা‌ ‌সকলে…‌ ‌
নিজেদের‌ ‌অনিঃশেষ‌ ‌আগ্রহ‌ ‌যা‌ ‌কাদা‌ ‌রক্ত‌ ‌এবং‌ ‌কান্নায়‌ ‌বৃদ্ধি‌ ‌পায়‌ ‌
পুষ্টি‌ ‌পায়‌ ‌ক্ষুধা‌ ‌আর‌ ‌চৌর্যবৃত্তি‌ ‌আর‌ ‌ঈর্ষা‌ ‌থেকে‌ ‌
শেষ‌ ‌হয়‌ ‌‘সকলের‌ ‌মৃত্যু‌ ‌আছে’ এইরূপ‌ ‌বোধোদয়‌ থেকে‌ ‌ ‌
অসাড়‌ ‌বেবাক‌ ‌হওয়া‌ ‌মন‌ ‌শুধু‌ ‌পাশে‌ ‌পড়ে‌ ‌থাকে‌ ‌ ‌

আরও পড়ুন: দেবজ্যোতি কর্মকারের ‘জন্মান্তর পেরিয়ে অলৌকিক জন্ম’

৩‌ ‌

নিচু‌ ‌এক‌ ‌ছাত‌ ‌আর‌ ‌ততোধিক‌ ‌নিচু‌ ‌এ‌ ‌আকাশ‌ ‌
আমাদের‌ ‌গ্রামে‌ ‌গ্রামে‌ ‌কলহের‌ ‌লেপ‌ ‌মুড়ে‌ ‌ঘুমোয়‌ ‌পুরুষ‌ ‌আর‌ ‌নারী‌ ‌
রোগের‌ ‌গোয়ালে‌ ‌বাড়বৃদ্ধি‌ ‌পায়‌ ‌শূন্যগর্ভ‌ ‌পশু‌ ‌
ক্লান্তির‌ ‌দেওয়ালে‌ ‌আমরা‌ ‌লেপে‌ ‌দিই‌ ‌নষ্ট‌ ‌তালুছাপ‌ ‌
ঘুঁটের‌ ‌মূল্যের‌ ‌দর‌ ‌স্বর্ণ‌ ‌হলে,‌ ‌গোবর‌ ‌সংগ্রহ‌ ‌করতে‌ ‌বেরোয়‌ ‌শিকারি…‌ ‌
পরস্পরে‌ ‌ঠেলে‌ ‌দিই‌ ‌সন্দেহ,‌ ‌খুরিভর্তি‌ ‌মৃত্যু‌ ‌আর‌ ‌ত্রাণহীন‌ ‌ঘৃণা‌ ‌ ‌

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • সিদ্ধার্থ মজুমদার

    ভয়ংকর ত্রাস লিখলে যশোধরা!! ‘প্রতিদিন দুসংবাদ তৈরি হয়… পরস্পরকে ঠেলে দিই সন্দেহ.. খুরিভর্তি মৃত্যু আর ত্রাণহীণ ঘৃণা’…. সত্যি হারহিম হয়ে আসে… ত্রাস… ত্রাস….
    ‘আমরা হয়তো বেঁচে যাব,তাই না? ‘…..সাংঘাতিক সত্যির রক্ত মজ্জা রস সব ফেটে পড়েছে।

  • ত্রাসের কবিতা এতো কঠোর বাস্তব .. হাড় হিম করা অনুভূতি এভাবে বাঙময় হয়ে উঠেছে এ কবিতাগুচ্ছে..
    কবিকে আমার কুর্নিশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *