আব্বাস কিয়ারোস্তামি: জীবনের জয়গান গাওয়া এক কবি

রণদীপ নস্কর

আব্বাস কিয়ারোস্তামির ছবি বললেই আমাদের মনে ভেসে ভাসে কাব্যিক ইমেজারির কথা, ভাইব্র্র্যান্ট রঙের প্যালেটের কথা। বহুবার বহুভাবে কিয়ারোস্তামির মিজঁসিন নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে, ইরানের রুক্ষ, শুষ্ক অঞ্চল থেকে তিনি বের করে এনেছেন অজস্র অতুলনীয় মিনিমাল ফ্রেম। কিন্তু কিয়ারোস্তামির ছবি নিয়ে শুধুমাত্র এইসব বিষয়েই কথাবার্তা বললে কিয়ারোস্তামিকে এক্সপ্লোর প্রায় করাই যায় না, কিয়ারোস্তামির ছবিতে তিরতির করে জীবনের স্রোত বয়ে চলে, তাও ভেবে দেখার। কিয়ারোস্তামি এমন একজন মানুষ, যাঁর ছবিতে প্রায় প্রতিটা অবজেক্ট, প্রতিটা চরিত্র, প্রতিটা সাউন্ড, প্রতিটা ইমেজে রয়েছে জীবনের উদ্‌যাপন। কিয়ারোস্তামির ‘ফাইভ: ডেডিকেটেড টু ওজু’ এবং কোকার ট্রিলজির শেষ ছবি ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ’-র প্রেক্ষিতে এই বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা করব।

ফাইভ: ডেডিকেটেড টু ওজু মাত্র পাঁচটি দৃশ্যের সমাহারে গড়ে ওঠা একটি সংলাপহীন ছবি। তবু এই ছবিতেও কিয়ারোস্তামি জীবনের উদ্‌যাপন করে যান। শুরুর দৃশ্যে দেখা যায়, একটি কাঠের টুকরো সৈকতে পড়ে আছে, সমুদ্রের তীব্র ঢেউ তাকে ক্রমেই দূরে সরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের ঢেউ যেন রূঢ় প্রত্যাখ্যান হয়ে আছড়ে পড়ছে কাঠের টুকরোটির গায়ে, ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে সে। কাঠের দৃশ্যটি যেন খানিক মরিয়া হয়েই দৌড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের কাছে, সমুদ্র রূঢ়তর হয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছে তাকে। এইভাবে খানিকক্ষণ চলার পর কাঠের টুকরোটি ভেঙে যায় খানিকটা, সমুদ্রে ভেসে চলে যায় তার খানিকটা অংশ, বাকিটা ভেঙে পড়ে থাকে সৈকতে। প্রেমে বারংবার প্রত্যাখ্যাত হতে হতেও মরিয়া প্রেমিকের চেষ্টা, তারপর নিজস্বতা হারিয়ে নিজেকে প্রেয়সীর কাছে সমর্পণ; এই বিষয়টি একটা কাঠের টুকরো আর সমুদ্রের ঢেউয়ের আন্তঃসম্পর্কে ফুটিয়ে তুলেছেন কিয়ারোস্তামি। অনেক অনেক পরে কোকার ট্রিলজির শেষ ছবি থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজে খানিকটা এই বিষয়টি ফিরে এসেছিল। হোসেইন বারংবার ছুটে চলেছে তাহেরার কাছে, তাহেরা নিষ্পলক, পাথরের মতো নিরুত্তর থাকে হোসেইনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে। শেষ অবধি হোসেইন সমস্ত কিছু ত্যাগ করে তাহেরার পেছনে ছোটে, তাহেরা কিছু একটা বলে (কী বলে আমরা তা জানি না); হোসেইন দৌড়ে দৌড়ে ফিরে আসে পাহাড়ের মাথায়, ছবিটা শেষ হয়। এই যে মরিয়া চেষ্টা, মরিয়া মনোভাব; একসময়ে নিরুত্তর মানুষেরও মুখ খোলা, তা যেন বারংবার ফিরে আসে কিয়ারোস্তামির ছবিতে।

Abbas Kiarostami: A Tribute in Posters in 2020 | Olive tree, Spanish  movies, Poster

থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজে আমরা দেখতে পাই ভূমিকম্প বিধ্বস্ত কোকারের মধ্যে দিয়ে একটি গাড়ি চলেছে। ভূমিকম্পে প্রায় সম্পূর্ণ কোকার ধরাশায়ী। সেই সময়ে সেই গাড়ির মধ্যে দু’জনের কথোপকথন চলছে। একজন আরেকজনকে বলছেন, “আমি এমনিতে এইসব শিল্প-টিল্পতে আগ্রহী নই। তবে ভূমিকম্পের পর আমার অবস্থা খারাপ, যদি একটু ছবিতে আমায় চান্স দেন, তাহলে খুব ভালো হয়।” ভূমিকম্পের মতো একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর সিনেমাকে আঁকড়ে ধরে মানুষ উঠে দাঁড়াতে চাইছে, কিয়ারোস্তামি ফের জীবন ও সিনেমার জয়গান করেন। আবার একজায়গায় দেখা যায়, রাস্তা বন্ধ বলে ফিল্মের সেটে পৌঁছতে পারছে না একটা গাড়ি। বিরক্ত চালক বলেন, “রাস্তাটা কখন খুলবে? আমার তাড়া আছে।” একজন শ্রমিক হেসে বলেন, “আমরাও কাজই করছি। আমাদের পরিবারের খাবার জোগাতে এই কাজ করতে হচ্ছে আমাদের। আপনার যত কাজই থাকুক, অপেক্ষা করতেই হবে আপনাকে।” একজন মানুষের রুটিরুজি নাকি সময়ে সেটে পৌঁছনো; একটা ক্রাইসিস তৈরি হয় ছবিতে। তখন অন্য রাস্তা দিয়ে বাধ্য হয়ে গাড়িটি চলে যায় ফিল্মের সেটে। কিয়ারোস্তামি আবার একটা অবস্থান নেন।

Postscript: Abbas Kiarostami, 1940—2016 | The New Yorker

আব্বাস কিয়ারোস্তামির ছবি কেবলমাত্র কাব্যিকই নয়, আব্বাসের ছবি কেবলমাত্র নান্দনিক সুখই দেয় না; বরং কিয়ারোস্তামির ছবি জীবনের জয়গান গেয়ে যায়। কিয়ারোস্তামির ছবি জীবনের উদ্‌যাপন করে যায়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *