অভ্যাসবশত

পূর্বা মুখোপাধ্যায়

“ব্যাপ্ত হবার ইচ্ছে, নির্ভরতার ইচ্ছে থেকেই তো মানুষ যূথচারী হয়েছিল প্রথম? যূথবদ্ধতা একটা শক্তি। এমন একটা শক্তি যা মানুষকে বৃহত্তর সীমায় শক্ত করে বেঁধে ফেলে বলে তুমি নিরাপদ, তুমি নিশ্চিন্ত, তুমি সম্পন্ন আর এই এতটা হচ্ছে তোমার সীমা।

সীমার বাইরে কী? মানুষ ভাবেনি কি কখনও? ভাবতে গেলে একটা খাদের কিনারে পা পিছলে যায়। মানুষ কোনও রকমে একটা পাথুরে খাঁজ মুঠোয় আঁকড়ে ঝুলে পড়ে, অনেকক্ষণ ঝুলে থাকার পর যখন শ্বাসের গতি সহজ হয়, ধীর, সুস্থির কৌশলে সে উঠে আসে আবার। কেন-না তাকে চূড়া স্পর্শ করতে হবে। সমুন্নত সীমা।…”

এই পর্যন্ত লিখে নির্বাণ ব্রাশ করতে যায়। জানলার শার্সি খুলে দিয়ে সুপুরিগাছের মাথায় অপলক সূর্য  দ্যাখে। তারপর মুখ ধুয়ে গ্যাস জ্বেলে গুনে গুনে দু-কাপ চায়ের জল বসায়। তার বউ সুবর্ণা বাপের বাড়িতে। চারমাস হল। কিন্তু চারমাস ধরে ওই দু-কাপ জলই চির অভ্যাসে সে মেপে আসছে। ভোরবেলা লো ভলিউমে গান শোনা তার আরেকটা অভ্যাস। ইচ্ছেমতো একেকদিন একেক রকম গান। আজ অবশ্য ইন্সট্রুমেন্টালে মন ঝুঁকেছে। ভায়োলিনে বাজছে “যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে।…”

“এই ভোর হওয়াটা দেখব বলে রাত জেগে থাকি। আমরা দু-জন, দু-রকম জানলার ধারে বসে, অথচ একসঙ্গে এই ভোর হওয়াটা দেখব। চাঁদের পাশে ওই তারাটা দেখতে পাচ্ছ? কী উজ্জ্বল অথচ কী সুদূর! চাঁদের পাশে ও নেই কিন্তু পাশেই তো দেখায়! ভালোবাসি তোমায়, আলেখ্য। সুদূরতার ভেতর যে শূন্য আছে, সেই শূন্য আমি ভরে দেব বলেই তোমার সঙ্গে দেখা না হয়েও দেখা হল…”

“ভোরের হাওয়ায় আমি তোমার গন্ধ পাই নির্বাণ…”

আরও পড়ুন: চোর

মেসেজগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে ইনবক্স ডিলিট করে ফ্যালে নির্বাণ। চা খেতে খেতে ভাবে আজ একবার বাজার যাওয়া দরকার। পাঁচদিন ফ্ল্যাটের বাইরে পা দেয়নি। চাল, আলু, ডিম, মাখন, ম্যাগি সবই শেষ। অনলাইনে অর্ডার দিয়ে আনানো যায়, রাজুকে ফোন করলে সেও পৌঁছে দিয়ে যেতে পারে, দুপুরে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথ তার এটাই। কিন্তু না, একবার বাইরে যাওয়াটা দরকার। ঘরে বসে বসে শিকড় গজিয়ে যাচ্ছে।

বেল বাজল। বিশ্বজিৎ এসেছে। জলের কন্টেইনার যত্ন করে স্যানিটাইজ করে দরজার ভেতর দিকে ঠেলে দিল। ওই সীমা ও ডিঙোবে না। ‘পাঁচটা টাকা বাড়ালাম দাদা, চল্লিশ দিও।’ সে কী রে, এই তো গতমাস পর্যন্ত তিরিশ নিচ্ছিলি, ক-মাস অন্তর বাড়াতিস?’ ‘এই তো না দাদা, তোমরা খালি পুরনো অভ্যেসে বলো, স্যানিটাইজ করে মাল দিচ্ছি, খচ্চা বাড়ছে না? নিউ নর্মালে এসো গুরু।’ কথা না বাড়িয়ে নির্বাণ পঞ্চাশের একখানা নোট বাড়ায়। ‘পরশু অ্যাডজাস্ট করে দিচ্চি খুচরো নেই’ বলতে বলতে বিশ্বজিৎ লিফটে ঢুকে যায়।

‘গুডমর্নিং স্যর, কেমন আছেন? একা রয়েছেন বলে ভাবলাম একটা ফোন করি। চিন্তা হয়। প্রেসারের ওষুধটা খাচ্ছেন নিয়মিত?’ ‘শালিনী, মানুষকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। অভ্যেস হয়ে যায়, জান। অভাববোধও। অভ্যেস হয়ে গেলে অভাব আর অভাব থাকে না। কিন্তু এইরকম করে কেউ বললে কোনও দমকা হাওয়ায় একটা পর্দা উড়ে যায়। যাক গে, গত সপ্তাহের পর তুমিও তো একটা হাওয়া হয়ে গেলে, কেন? পরশু গল্পটা শেষ করলাম। শুনবে? দুপুরে ফোন করো তাহলে। আড়াইটের পর। এখন একটু বেরোব। রাখি। গলাটা এত ওরিড লাগছে কেন? তুমি কোথায় এখন? চিন্তা করো না, আমি ঠিক আছি।’

অলিভ টি শার্টটা গায়ে চড়িয়ে চুলে হালকা করে ব্রাশ বুলিয়ে নেয় নির্বাণ। বডি স্প্রে মাখে। কিচেনের দরজার পেছনের হুক থেকে লাল নাইলনের ব্যাগটা খুলে আনে। চাবি নিয়ে দরজা টেনে লক করে লিফটের দিকে পা বাড়ায়। ফোন বাজে। ‘হ্যালো, বলুন মিস্টার নিয়োগী?’ ‘মিস্টার চ্যাটার্জি, সতেরো তারিখ সন্ধে সাতটায় চেম্বারে আসুন। ব্যাঙ্কের পেপার্স সঙ্গে রাখবেন, একবার দেখে নিচ্ছি, হ্যাঁ। হ্যাঁ, কথা হয়েছে। সুবর্ণা ম্যাম আপনার এগেইনস্টে কেসটা তুলে নিচ্ছেন। ফ্ল্যাট আপনার নামে লিখে দিতেও রাজি আছেন। লোনটা খালি ট্রান্সফার করে নিতে হবে। হ্যাঁ, এটা তাড়াতাড়ি সারুন। উনি যে ধরনের মহিলা, মত পাল্টাতে তো আর বেশি সময় লাগে না!’

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *