‘অবন ও রবি’ স্বয়ং

অনিন্দ্যসুন্দর পাল

দিনটি ৭ আগস্ট, ইংরেজি তারিখ অনুসারে একদিকে অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন ও অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন (যদিও বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আজ, ৮ আগস্ট ২২শে শ্রাবণ)। এমন একটা দিন যা প্রশান্ত, অমৃতরঞ্জিত; একইসঙ্গে বিয়োগান্তক, বেদনাময়, বিষণ্ণ ইত্যাদি এমন অনেক উপমাই কম পড়ে যাবে এই ক্ষণটির সঠিক মূল্যায়নে। কেন-না যে দিনটি ঘিরে একসময় রবিঠাকুর  নতুনভাবে আনন্দ করার স্বপ্ন বা ইচ্ছে বেঁধে ছিলেন, যেদিনটা ঘিরে অতি উন্মাদনায় রাণী চন্দ ও নন্দলাল বসুকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বৃদ্ধবেলায় তাঁর অবনের জন্ম-আনন্দ উদ্‌যাপনের, শুধু তাই, নাটকচর্চার মূল বিন্দুতে রবিঠাকুরের ভুলে যাওয়া পার্টের সংশোধন ধরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে অমলিন ভঙ্গিমায় অবন ঠাকুরের বাই-ডায়লগ, যা দেখেশুনে একসময় স্বয়ং গিরিশ ঘোষও তারিফ না করে পারেননি, এছাড়াও কাটাকুটি থেকে একজন গোটা ‘চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ’ হয়ে ওঠার পিছনে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকটময় প্রচ্ছন্ন ভূমিকা, যাঁকে অবন ঠাকুরের ভাষায়— ‘আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত’ বলে সম্বোধিত করা হয়, প্রভৃতি এমন অনেককিছুই সেখানে অবনীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলা যায়। একজন ব্যতীত একজন নন। এ এক অদ্ভুত কেমিস্ট্রি, যা মজার, শ্রদ্ধার ভালোবাসার ও গভীর প্রেমের, হয়তো-বা এরও বেশি কিছু।

আরও পড়ুন: সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান গাইছেন এবং তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসরাজে সুর তুলেছেন। ১৮৯২

১২৭৮ সালের ২৩শে শ্রাবণ জন্মাষ্টমীর দিন (ইংরেজি ১৮৭১ সালের ৭ই আগস্ট) ঠাকুরবাড়িতে জন্ম অবনীন্দ্রনাথের। সম্পর্কে তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথের প্রপৌত্র এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় ভ্রাতা গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র ও গিরীন্দ্রনাথের পুত্র গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ও বউমা সৌদামিনী ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র। তিনি রবি ঠাকুরের সম্পর্কে ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের পিতৃব্য অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নে। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে নর্মাল স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষার সূত্রপাত। যদিও তাঁর  নর্মাল স্কুলজীবন রবি ঠাকুরের মতোই বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিছুদিন পরে ১৮৮১ থেকে ১৮৮৯ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন সংস্কৃত কলেজে। এরপর কুড়ি বছর বয়সে ভর্তি হন ক্যালকাটা স্কুল অফ আর্টসে। এই ১৮৮৯ সালেই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন সুহাসিনী দেবীর সঙ্গে। কিন্তু এন্ট্রান্স না দিয়েই কলেজ ছাড়েন ১৮৯০ সালে। ১৮৯২ থেকে ১৮৯৫ পর্যন্ত ওলিন্টো গিলার্দি ও চার্লস পামারের কাছে তিনি ছবি আঁকা শিখেছিলেন। তবে জানিয়ে রাখা ভালো, ছবি আঁকাতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতেখড়ি হয় ন’বছর বয়সে। বড়দাদা গগনেন্দ্রনাথ আঁকার পাঠ নিয়েছেন সেন্ট জেভিয়ার্সে, এমনকী ভালো পোট্রেট আঁকতে পারতেন কাকা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও দাদা সমরেন্দ্রনাথের আবার হাতির দাঁতের উপর কারুকার্যের ঝোঁক ছিল।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৩)

মৃত্যুশয্যায় শাজাহান। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০২

১৮৯০ সালের গোড়ার দিকে সাধনা পত্রিকা, চিত্রাঙ্গদা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যান্য রচনায় অবনীন্দ্রনাথের আঁকা অলংকরণ প্রকাশিত হয়। ১৮৯৭ সাল নাগাদ তিনি গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্টের উপাধ্যক্ষের কাছ থেকে ইউরোপিয়ান আকাডেমি পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন বিশেষ করে জলরঙের উপর। এসময় তাঁর আঁকায় মুঘল ছাপ আসতে শুরু করে। এছাড়াও মুঘল প্রভাবিত রীতিতে কৃষ্ণের জীবন অবলম্বনে প্রচুর তৈরি করতে থাকেন। ইউরোপীয় রীতির পাশাপাশি ভারতীয় শিল্পরীতির যে একটা বিরাট পরিবর্তন, তা আসতে শুরু করে। যা একসময় পরে গিয়ে রেনেসাঁর আকার নেয় ঠিক যেভাবে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন আধুনিক চিত্রশিল্পের প্রণেতা। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে রবীন্দ্রনাথ কবিতার কাটাকুটি করতে গিয়ে আঁকা শুরু করলেন চিত্রকলা। ১৯২৪ থেকে ১৯৪১ সালে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার ছবি এঁকে তিনি বিস্ময়কর শিল্প প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পুরোদস্তুর ছবি আঁকা শুরু করেন ১৯২৮ সাল থেকে। নিজের আঁকা ছবি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‘ঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তার থেকেও কিছু বেশি। আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন।’’

আরও পড়ুন: ইমারজেন্সি এবং কিশোর কুমার: পুরনো বিতর্ক নতুন করে দেখা

রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম। ১৯৩০

জীবনের শেষলগ্নে (১৯২৪ থেকে ১৯৪১) বেশিরভাগ ছবিই এঁকেছেন। ছোটবেলার আঁকাআঁকি শেখার পরে শান্তিনিকেতনে চিত্রশিল্প শিক্ষা প্রচলন ছিল। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, পুত্র রথীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী এরাও চিত্রচর্চা করতেন। ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের মতো আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পের পথিকৃৎ জনদের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য, আলাপ-আলোচনা এবং শিল্প পরিবেশ ইত্যাদির মধ্যে তার ছিল বসবাস। জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারে প্রিন্স দ্বারকানাথের ছেলে গিরীন্দ্রনাথ এবং তার ছেলে এবং রবীন্দ্রনাথের জ্ঞাতিভাই। গুণেন্দ্রনাথ মূলত ছবিই আঁকতেন। আর গুণেন্দ্রনাথের তিন ছেলে গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ ভারতের চিত্রকলাজগতের দিক্‌পাল। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তাদের দুই বোন বিনয়িনী ও সুনয়নী দেবীকেও বাদ রাখা যাবে না। জীবনের শেষ সতেরোটি বছর তিনি এঁকে গেছেন দু’হাতে। প্রায় দিনেই তিনি চার-পাঁচটি ছবি এঁকে শেষ করতেন। হাতের কাছে যা পেতেন তাই ব্যবহার করতেন। ভ্রাতুষ্পুত্র চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ যে একে ‘আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত’ বলতেন, সে-কথা আগেই বলেছি। রেখা ও রঙের সমবায়ে নির্মাণ করে অভিনবত্ব এনেছেন তিনি।

আরও পড়ুন: এই ঘর, এই উপশম

‘পূরবী’র পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি, যেখানে চিত্রকলা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন। ১৯২৪

এবার একটা মজার ঘটনা বলা যাক। ঠাকুরবাড়ির কাকা-ভাইপো— রবি ঠাকুর আর অবন ঠাকুর। দশ বছরের ছোট-বড়। যে সময়ের কথা বলছি, তখন বয়সের কোঠায় অবন সবে সাতের ঘরে পা দেবেন, আর রবি শেষ করবেন সাতের ঘর। অবন তখন কলকাতায় আর রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে। সে-বার তাঁর খেয়াল হল, অবনের জন্মদিন করতে হবে— ‘‘অবন কিছু চায় না, জীবনে চায়নি কিছু। কিন্তু একটা লোক যে শিল্পজগতে যুগপ্রবর্তন করেছে, দেশের রুচি বদলে দিয়েছে। সমস্ত দেশ যখন নিরুদ্ধ ছিল, এই অবন তার হাওয়া বদলে দিলে। তাই বলছি, আজকের দিনে এঁকে যদি বাদ দাও তবে সবই বৃথা।” সুতরাং, ঠিক হল বেশ ঘটা করে অবনের জন্মদিন করতে হবে। ব্যস, অবন-শিষ্য নন্দলাল আর স্নেহধন্যা রাণী চন্দকে আয়োজনের ভার দিলেন রবীন্দ্রনাথ। জন্মদিন আসতে তখনও মাসখানেক বাকি। কিন্তু, বুড়ো বয়সে জন্মদিনের ঘটা! এ কিছুতেই অবনের মনে সায় দিল না। তিনি তখন নিজস্ব খামখেয়াল কুটুম-কাটাম পুতুল গড়ায় মজেছেন, তাই নিয়েই মগ্ন থাকেন সারাদিন। জন্মদিনের প্রস্তাবে তাঁর ‘নেতি’ কিছুতেই ‘ইতি’ হয় না। অবশ্য তাঁকে সাধে সাধ্য কার! শিষ্য নন্দলাল ঘুর-ঘুর করেন, স্নেহধন্য রাণী বুঝিয়ে বলতে যান, কিন্তু কে শোনে কার কথা! বেশি বলতে গেলে এমন ধমক লাগান যে, তাঁরা আর পালাবার পথ পান না। ওদিকে রবীন্দ্রনাথও তাড়ায় কমতি দিলেন না। সমানে রাণী সকাশে তাঁর খোঁজ চলতে লাগল, ‘‘অবনের জন্মোৎসব কতদূর কী এগোল?” জন্মদিন যত ঘনিয়ে আসতে লাগল, রাণী ততই বুঝলেন অবনকে বাগে আনা অন্তত তাঁদের কম্ম নয়। সে-কথা কবুলও করলেন। রবীন্দ্রনাথের মাথায় কিছু একটা চাপলে, আর সবাই হাল ছাড়লেও তিনি যে সে-পাত্র নন, এ তো আর কারও জানতে বাকি নেই! ফলে, যা হওয়ার হল। তিনি সশরীরে সটান হানা দিলেন ভাইপোর দরবারে— ‘‘অবন, তোমার এতে আপত্তির মানে কী। দেশের লোক চায় কিছু করতে তোমার তো তাতে হাত নেই।” আর সবার কাছে হম্বিতম্বি করলেও কাকার কাছে সেটি করার জো নেই। কাকার কথার ওপর কথা কোনওদিন বলেননি অবন। বুড়ো বয়সেও পারলেন না। বরং, বাধ্যবালকের মতো লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘‘তা আদেশ যখন করেছ মালাচন্দন পরব, ফোঁটানাটা কাটব, তবে কোথাও যেতে পারব না কিন্তু।” বলেই তড়িঘড়ি প্রণাম করে খেয়ালি কাকার পাল্লা থেকে যেন পড়িমড়ি করে কেটে পড়ে বাঁচলেন। ভাইপোর সেই কাণ্ড দেখে রবীন্দ্রনাথও হেসে ফেললেন, ‘‘পাগলা বেগতিক দেখে পালালো।” পাগলামিই হোক বা খামখেয়ালি কাণ্ডকারখানা, কাকা-ভাইপোর কেউই কম যান না। সে এসরাজে সুর তোলাতেই হোক, স্বদেশিয়ানার হুজুগেই হোক, রাখী-বন্ধনেই হোক কিংবা শিল্প-সাহিত্য-নাটকচর্চাতেই হোক। সবেতেই কাকার দোসর ভাইপো। 

আরও পড়ুন: শাক তোলার গান

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রমন শিব কুমারের আলোকচিত্র। ছবি: রমন শিব কুমারের সৌজন্যে (www.stirworld.com)

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে নাটকের ধুম লেগেই থাকত। কিন্তু সেইবারটা হল একটু অন্যরকম। নাটকচর্চার ধুম লেগেছে ঠাকুরবাড়িতে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রের কাল পেরিয়ে নাট্যচর্চার রাশ ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। আগেই গড়ে উঠেছিল ‘ড্রামাটিক ক্লাব’। চেয়েচিন্তে তার জন্য ফান্ডও তৈরি হয়েছিল। তা, একদিন রবীন্দ্র-প্রস্তাবে সে ক্লাবের মৃত্যু হল এবং অবনের প্রস্তাবে ফান্ডের টাকায় সেই ক্লাবের শ্রাদ্ধ হয়ে গেল। কাকা দিলেন নতুন সভাগঠনের প্রস্তাব, ভাইপো নাম দিলেন, ‘খামখেয়ালী সভা’। এ-ওর বাড়িতে ভোজসভা করাই ছিল মূলত এ-সভার কাজ। বলা বাহুল্য, সাহিত্যপাঠও হত। রবীন্দ্রনাথের ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ নাটকটি এই সবেরই ফসল। তা একদিন ঠিক হল, নাটকটি অভিনয় করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ নিলেন ‘কেদার’-এর পার্ট, আর অবন হলেন ‘তিনকড়ি’। নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই রবীন্দ্রনাথ অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটিয়ে বসতেন। তার মধ্যে একটি বিশিষ্ট বিষয় ছিল, পার্ট ভুলে যাওয়া। নিজেরই লেখা নাটক, তবুও বিপত্তি যেন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ফিরত। ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ অভিনয়ের সময় একবার তো মঞ্চে ঢুকে তিনি ভুলে একটা গোটা সিন বাদ দিয়ে ডায়লগ ধরে ফেললেন; অবন ভাগ্যিস ছিলেন স্টেজে, তিনি ফিসফিস করে সেটা ধরিয়ে দিতে নিজেই নাটকের লেখক কি না, তাই সামলে নিলেন। ব্যাপারটা সে-যাত্রা তেমন কেউ টের পেল না বলে লোকহাসাহাসির হাত থেকে রক্ষা পেলেন।

তবে আর এক মজার ঘটনা ঘটেছিল এই নাটকের অভিনয়েই। সেবার নাটক দেখতে এসেছিলেন স্বয়ং গিরিশ ঘোষ। নাটকে অবন ঠাকুরের চ্যাংড়া ছোঁড়ার রোল। রংদার পোশাক। বুকে পানের পিকের দাগ। হাতে সন্দেশের হাঁড়ি। খেতে খেতে ডায়লগ। কিম্ভুতকিমাকার বেশে চরিত্রে তিনি এমন জমে গেলেন যে, কাকার লেখা ডায়লগ তো বললেনই, সেইসঙ্গে এনতার বাই-ডায়লগ দিতে শুরু করলেন। চরিত্রে ঢুকে গেলে যা হয় আর কি! এদিকে রবীন্দ্রনাথ তো মহামুশকিলে পড়লেন, কিছুতেই ধরাছাড়ার খেই খুঁজে পান না! অথচ ভাইপোকে থামানোও যায় না। সে যাত্রায় টরেটক্কায় ভাইপোকে টেক্কা দিয়ে বেরোতে রবীন্দ্রনাথকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তবে ব্যাপারটা এত স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছিল যে, অভিনয় জমে একেবারে ক্ষীর হয়ে গিয়েছিল। নাটক শেষে গিরিশ ঘোষ তো ঘোষণাই করে বসলেন: ‘‘এ-রকম অ্যাকটার সব যদি আমার হাতে পেতুম তবে আগুন ছিটিয়ে দিতে পারতুম।”

আরও পড়ুন: শিকড়ের খোঁজে

অবন ঠাকুর

‘শারদোৎসব’ নাটকের সময় অবন আর রিস্ক নিতে চাইলেন না। দু’জনেরই বেশ বয়স হয়েছে তখন। ডায়লগ মনে থাকছে না কিছুতেই। যদিও এটি স্বাভাবিক। তাই অবন প্রস্তাব দিলেন যে, এবার দু’জন প্রম্পটারকে স্টেজে তোলা হবে। তারা ডায়লগ এনতার কানে দিয়ে যাবে, তাহলেই ডায়লগ ভুলবার আর জো থাকবে না। কিন্তু দু-দু’টো লোক নাটকের খাতা হাতে স্টেজে পিছন পিছন ঘুরে বেড়াবে শুধুমাত্র ডায়লগ ধরিয়ে দেওয়ার জন্য, এটা কি ভালো দেখাবে? শেষপর্যন্ত লোকে না হাসাহাসি করে! অবন কাকাকে অভয় দিলেন। তারপর ভেবে ভেবে বের করলেন এক দৃষ্টিনন্দন উপায়। ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দুই প্রম্পটারের জন্য মোটা কালো ও নীল কাপড়ের আগাপাশতলামোড়া পোশাক তৈরি করালেন। শুধু চোখের আর মুখের ফোঁকরটুকু রাখলেন। ভেতরে লোকগুলো নাটকের খাতা নিয়ে যাতে পড়ে যেতে পারে, তার ব্যবস্থা রাখলেন।

শুরু হল নাটক। স্টেজের দু’পাশে কাকা ও ভাইপোর পেছন পেছন ঘুরে নীল-কালো কাপড়মোড়া দুই প্রম্পটার ফিসফিস করে ডায়লগ ধরিয়ে যেতে লাগল। ফলে, ডায়লগ ভুল হল না, অভিনয়ে সমস্যা হল না, ডায়লগ ধরিয়ে দেওয়ার ফিকিরটিও কেউ বুঝল না; উপরন্তু দর্শক দেখল দুই ছায়ামূর্তি যেন দু’টো চরিত্রকে যমদূতের মতো অনুসরণ করছে— এটা নাট্যপরিস্থিতির সঙ্গে এমন খাপ খেয়ে গিয়েছিল যে, নতুন এক ব্যঞ্জনা তৈরি করল। 

আরও পড়ুন: শ্রীচৈতন্যদেব ও বাংলার জগন্নাথ সংস্কৃতি

দর্শকের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ। ছবি ঋণ: আনন্দবাজার পত্রিকা

এছাড়াও ছবি আঁকার ক্ষেত্রেও এই রবিকাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল অবনের। এমন একটা ঘটনা বলা যাক। রবীন্দ্রনাথ চিত্রাঙ্গদা শেষ করেছেন। শেষ করে অবনকে বললেন— ‘‘অবন, তোমায় ছবি দিতে হবে চিত্রাঙ্গদার জন্য।” অবনীন্দ্রনাথের বাড়িতেই স্টুডিয়ো। চিত্রাঙ্গদার ছবি কেমন হবে, তা স্বয়ং দেখিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথের উপর তাঁর ভরসা ছিল সম্পূর্ণ। সত্যি কথা বলতে কি, ছবি নিয়ে এত প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য আর কারও ছিল বলে মনে হয় না। আর ভালোবাসা সেটাও তো বিরল। এতদ্‌পরও ব্যক্তিগত জীবনেও অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন নিরহংকার। অনুরাগীরা যখন তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘শিল্পগুরু’, অবনীন্দ্রনাথ নিজে বলতেন, ‘‘নামের আগে কতকগুলো বিশেষণ জুড়ে দিলেই কি খুব বুড়ো হয়ে যাবো!”

আর লেখালিখি, সেক্ষেত্রেও রবিকাকাই ছিলেন তাঁর জীবনের অনেক কিছুর অনুপ্রেরণা। আবার রবীন্দ্রনাথের রাখীবন্ধন ও স্বদেশি আন্দোলনের তিনিই ছিলেন অন্যতম সঙ্গী ও উদ্যোক্তা। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রাখীবন্ধনের দিন রবীন্দ্রনাথের একমাত্র ছায়াসঙ্গী ছিলেন এই অবন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অসামান্য চিত্রকর ও শিল্পীর পাশাপাশি অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন এক অসাধারণ এসরাজ বাদক। ছিলেন অভিনেতাও, এমনকী রবিঠাকুরের খামখেয়ালি সভায় নিয়মিত নাটকও করতেন। যার পরিচয় বা প্রমাণ আমরা আগেই একটি দীর্ঘ পঙ্‌ক্তি জুড়ে পেয়েছি। তবে বলাই বাহুল্য, তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। অবনও সেই কথাটা বারংবার জানিয়ে এসেছিলেন যে, ‘‘গল্প লেখা আমার আসতো না। রবিকা-ই আমার গল্প-লেখার বাতিকটা ধরিয়েছিলেন।” তবে রবীন্দ্র প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে সৃষ্টি করছিলেন ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘রাজকাহিনী’, ‘ভূতপতরীর দেশে’। তবে ১৩১১ সালে নবযুগ পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম নিবন্ধ ‘নবদুর্ব্বা’। পরে অবশ্য ‘আপনা কথা’, ‘বাংলার ব্রত’ প্রভৃতি প্রবন্ধও লিখেছিলেন বড়দের জন্য।

আরও পড়ুন: গামছার গান

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম। ১৯৩৫

তাই, আলোচনার শেষলগ্নে এটুকু বোঝাই যায় অবন ঠাকুর ও তাঁর রবিকাকাই সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্প-নাটক এই সমগ্র সম্মিলিতের মাঝে কীভাবে একে অপরে মিলেমিশে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। আর, সেই শেষ শ্রাবণ, যেদিন রবিঠাকুর চললেন অমৃতলোকে, আর অবনঠাকুর শোকস্তব্ধ নীলিমায় পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণ বান্দায় বসে এঁকে দিচ্ছিলেন যেন তাঁর অন্তিম যাত্রার মসৃণ সরণি, যে শিল্পে নাটকে সাহিত্যে তুলিতে রঙে শুরু হয়েছিল যাঁদের সম্পর্ক ও যাত্রা, সেই সব দিয়েই তো মিলিয়ে মিশিয়ে ম্যুরাল করা হল যেন এক আশ্চর্য ঢঙে। বলা যেতে পারে, এ যেন এক অপরূপ বিদায়ী সংবর্ধনা। সত্যি যেখানে দাঁড়িয়ে শুধু খামখেয়ালিই নয়, শ্রাবণসূত্রও মিলেমিশে গিয়েছিল তাঁদের আগমন ও গমনের অনন্য সৃষ্টিশীলতায়। তারই এই  অনবদ্য প্রকাশ, সেই তো শ্রাবণসূত্রের অন্তিম শ্বাস। তা না হলে এমন সূচনা ও অন্তিমের অমলিন মিলন কি করেই-বা সম্ভব? আর কি করেই-বা জন্ম থেকে মৃত্যু এই গোটা পর্যায়ে দু’জন দু’জনকে অদ্ভুতভাবে বেঁধে রাখলেন এক অনবদ্য আশ্চর্যে? যার উত্তর এককথায়  হয়ত ‘অবন ও রবি’ স্বয়ং।

তথ্যসূত্র
১) জোড়াসাঁকোর ধারে— অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাণী চন্দ— বিশ্বভারতী (বৈশাখ ১৪১৮)
২) ঘরোয়া— অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাণী চন্দ— বিশ্বভারতী (ভাদ্র ১৪১৭)
৩) ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা— সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর— (ফাল্গুন ১৪১৪)
৪) উইকিপিডিয়া বাংলাপিডিয়া, আনন্দবাজার ডিজিটাল প্রকাশিত দু’টি প্রবন্ধ
(১, ডিসেম্বর, ২০১৮-এ আবাহন দত্তের লেখা
এবং ৭ আগস্ট, ২০১৭-এ বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্যের রচনা)

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *