প্রাচীনতমের বিচারে কাঁথি মহকুমায় তৃতীয় ও পটাশপুর থানায় সর্বপ্রাচীন কিশোররায় মন্দির

চিন্ময় দাশ

পালপাড়া গ্রামের রায় মহাপাত্র বংশের এই নবরত্ন মন্দরটি একদিকে পটাশপুর থানা তথা কাঁথি মহকুমার গর্ব। অপরদিকে, মেদিনীপুর জেলার ইতিহাসের সঙ্গে এই মন্দিরের নাড়ির যোগ। সে-কারণে, প্রথমেই ইতিহাসের পাতায় একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই হবে আমাদের। মেদিনীপুর জেলার সর্ব দক্ষিণে, বঙ্গোপসাগরের কোলে, হিজলী নামের একটি জমিদারি ছিল। মেদিনীপুর জেলায় মুসলমানের একমাত্র জমিদারি সেটি। হিজলীর বিখ্যাত মসজিদে রক্ষিত একটি দস্তাবেজ দেখে, জেলার কালেক্টর মি. ক্রোমেলিন সাহেব তাঁর বিবরণে বলেছিলেন, হিজলীর জমিদারিটি ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে, ইং ১৫০৫ থেকে ১৫৪৬ সালের মধ্যে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন: খড়গপুরের চমকায় ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে অনিন্দ্য সুন্দর শ্রীধর মন্দির

হিজলী জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক রহমত খাঁ। রহমতের পৌত্র তাজ খাঁ ছিলেন ধর্মপরায়ণ জমিদার। ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধি ছিল তাঁর। পর্তুগিজ ভ্রমণকারী ম্যানরিক তাঁর বৃত্তান্তে তাজ খাঁকে বাংলার ‘বারো ভুঁইয়া’র অন্যতম বলে উল্লেখ করে গিয়েছেন। তাজ খাঁর পর, তাঁর পুত্র বাহাদুর খাঁ রাজ্যাধিকারী হয়ে, ‘ঈশা খাঁ মসনদ-ই-আলি’ নাম গ্রহণ করেছিলেন। অসংখ্য পদাতিক, তিরন্দাজ, গোলন্দাজ, এমনকী নৌবাহিনীও ছিল তাঁর। নিজের শৌর্যগুণে মেদিনীপুর জেলার ভোগরাই পরগনা, পটাশপুরের কিছু অংশ, সুজামুঠা, অমর্শি, জলামুঠা পরগণাগুলি ঈশা খাঁ অধিকার করে নিয়েছিলেন। সে-সময় অমর্ষির জমিদার ছিলেন রাজা নরসিংহ। ঈশা খাঁ অমর্ষি আক্রমণ করলে রাজা নরসিংহ এবং তাঁর এক দেওয়ান পরাশর মহাপাত্র আত্মগোপন করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। একই সময়ে বারো ভুঁইয়ার অন্যতম, প্রতাপাদিত্য ছিলেন যশোহরের মহারাজা। তিনি হিজলী আক্রমণ করে, ঈশা খাঁকে হত্যা এবং হিজলী অধিকার করে নেন। সেটি ছিল ১৫৯৪ সালের ঘটনা।

আরও পড়ুন: খড়গপুরের চমকায় ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে অনিন্দ্য সুন্দর শ্রীধর মন্দির

প্রতাপাদিত্যের হিজলী অধিকারের পরে অমর্ষি রাজ্যটি ছোট ছোট অনেকগুলি খণ্ডে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। পরাশরের পুত্র ছিলেন যদু মহাপাত্র। তিনি একটি খণ্ডের অধিকার নিয়ে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পটাশপুর থানার পূর্ব অংশে পালপাড়া গ্রামে স্থায়ী ভদ্রাসন গড়ে তুলেছিলেন যদু মহাপাত্র। পরে, দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনার কৃতিত্ব হিসাবে নবাব দরবার থেকে ‘রায়’ খেতাব পেয়েছিল এই পরিবার। খেতাব লাভের পর থেকে, এই বংশ ‘রায় মহাপাত্র’ বা ‘রায়’ পদবি ব্যবহার শুরু করেছিলেন। পালপাড়ার জমিদার এই রায় মহাপাত্রবংশে তিনটি দেবালয়— কিশোররায়জিউ, মদনমোহনদেব এবং মহাদেব শিবের মন্দির। 

পূর্ণ বংশলতিকা পাওয়া যায়নি সেবাইত পরিবার থেকে। কোন প্রতিষ্ঠা-ফলকও নাই কিশোররায়জিউ মন্দিরে। তবে সুখের কথা, মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতার নামটি জানা গিয়েছে পরিবার থেকে। জমিদারি প্রতিষ্ঠার প্রায় শ’খানেক বছর পরের কথা। সে-সময় জমিদার ছিলেন যদু মহাপাত্রের এক উত্তরপুরুষ— জনৈক গঙ্গানারায়ণ রায়। তিনিই কিশোররায়জিউর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। প্রতিষ্ঠা-ফলকের হদিশ না থাকায় মন্দিরটি কবে নির্মিত হয়েছিল। সাল তারিখ সঠিক জানা যায় না। তবে স্থাপত্য বিচার করে পুরাবিদ তারাপদ সাঁতরা অনুমান করেছেন, সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে এটি নির্মিত হয়ে থাকবে। অর্থাৎ সাড়ে তিনশো বছর আয়ু হতে পারে মন্দিরটির। কিশোররায়জিউর এই নবরত্ন মন্দিরটি অপরূপ স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। আর প্রাচীনতমের বিচারে সমগ্র কাঁথি মহকুমায় তৃতীয় এবং পটাশপুর থানায় সর্বপ্রাচীন মন্দির এটি।

দক্ষিণমুখী, ইটের তৈরি বর্গাকার সৌধটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ২০ ফুট, উচ্চতায় প্রায় ৫০ ফুট। ত্রিতল পর্যন্ত সিঁড়ি রচিত আছে। দ্বিতল ও ত্রিতলে ৪টি করে এবং একটি কেন্দ্রীয় রত্ন– এই নিয়ে নবরত্ন বিন্যাস। গর্ভগৃহকে বেষ্টন করে, চার দিকেই একটি করে অলিন্দ। প্রতিটিতে সুদর্শন ‘ইমারতি’ থাম আর তিনটি করে দ্বারপথ। প্রতিটি দ্বার খিলান-রীতির। দ্বিতল ও ত্রিতলের মাথায় বাংলা ‘চালা-রীতি’র ছাউনি। কার্নিশের বঙ্কিম ভাবটি সুন্দরী রমণীর আয়ত আঁখিপল্লব যেন। অলিন্দের ভিতরের ছাদ বা সিলিং অর্ধ-গোলাকার ‘টানা-খিলান’। মূল গর্ভগৃহের সিলিং হয়েছে ভারি মুন্সিয়ানায়। প্রথমে চার দিকের দেওয়ালে দু’টি করে মোট আটটি ‘পাশ-খিলান’। সেগুলিই মাথার ‘গম্বুজ’ রীতির ছাদটিকে ধারণ করে আছে। দীর্ঘ প্রায় সাডে় তিনশো বছর বয়সি এই মন্দিরের আটটি রত্নই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কেবল সুদক্ষ হাতে গড়া সিলিংয়ের কারিগরিই দু’টি গর্ভগৃহ এবং মাথার কেন্দ্রীয় রত্নটিকে আজও টিকিয়ে রেখেছে।

টিকে থাকা একমাত্র এই কেন্দ্রীয় রত্নটি থেকে বোঝা যায়, রত্নগুলি কলিঙ্গধারায় নির্মিত হয়েছিল। ‘রথপগ-বিন্যাস’ করা হয়েছিল প্রতিটি রত্নের বাঢ় এবং গণ্ডি অংশজুড়ে। কেন্দ্রীয় রত্নে ‘সপ্ত-রথ’ বিন্যাস দেখা যায়। রত্নের গণ্ডি অংশ নির্মিত হয়েছিল ‘পীঢ়-ভাগ’ পদ্ধতিতে। বিশালাকার সৌধটির অপরূপ-কথার চাবিকাঠি ছিল রত্নের এই কলিঙ্গধারার গড়ন। তেমন কোনও অলংকরণ বোধ করি ছিল না। তবে কুর্ম, মৎস্য, বরাহ ও নৃসিংহ— বিুষ্ণর এই চার অবতারের চারটি টেরাকোটা ফলক যুক্ত ছিল, সমীক্ষাকালে তারাপদ সাঁতরা প্রত্যক্ষ করে, তাঁর বিবরণে উল্লেখ করে গিয়েছেন। তবে সেগুলি এখন অতীত কথা।

মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় ৪০০ বিঘা সম্পত্তি বরাদ্দ ছিল দেবতার নামে। জায়গীর জমি দেওয়া হয়েছিল পুরোহিত, দাসী, মালাকার, নাপিত, বৈষ্ণব প্রভৃতি কর্মীদের। সবই বেহাত হয়ে গিয়েছে। ‘‘কটিতে পিয়ল ঘটি পাটনীর ডোর।/ ত্রিভঙ্গবঙ্কিম অঙ্গ নবীন কিশোর।।” এই বর্ণনা মতোই ‘নওল কিশোর’ বিগ্রহ ছিল মন্দিরে। সেই মূর্তিও আর নেই। জীর্ণ মন্দিরটিতে এখন শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানির দু’টি বিগ্রহ নমো নমো করে পূজিত হন। একদিন মেদিনীপুর জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবরত্ন মন্দির ছিল কিশোররায়ের এই মন্দির। আজ এই মন্দিরের চাল নাই, চূড়া নাই। রত্নগুলি আগেই গিয়েছে। এখন ভেঙে ভেঙে পড়ছে দেওয়ালগুলি। দেখবার কেউই নেই জীর্ণ দেবালয়টিকে। থাকবার মধ্যে আছে বুক ভরা বেদনা আর বুক খালি করা হাহাকার।

ছবি লেখক

সাক্ষাৎকার  
সর্বশ্রী বিজয় রায় মহাপাত্র, মৃত্যুঞ্জয় রায় মহাপাত্র— পালপাড়া।

পথ-নির্দেশ  
মেদিনীপুর বা খড়গপুর থেকে কাঁথি রাস্তায় এগরা। কিংবা হাওড়া-দিঘা বাসরুটে বাজকুল স্টপেজ বা রেলপথে দেশপ্রাণ স্টেশন। এগরা-বাজকুল সংযোগকারী পথের উপর পালপাড়া। সামান্য দক্ষিণে রায় মহাপাত্র পরিবারের মন্দির।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *