অশান্ত সময়ে ফিরছে আফগানিস্তান!

আলেখ্য দাশ

হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় সামনে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ, সঙ্গে আফগান গায়িকা জারা ইলহামের গান। কাবুলে এমনই একটি ঝাঁ-চকচকে ক্যাফে চালান বছর তিরিশের মিনা রেজাই। আফগানিস্তানের রাজধানীতে হাতেগোনা যে কয়েকটি রেস্তরাঁয় নারী-পুরুষ পাশাপাশি বসে খেতে পারেন, তেমনই একটি রেস্তরাঁ চালান লায়লা হায়দারি। কিন্তু আগামী দিনেও মেয়েদের এই স্বাধীনতা থাকবে তো?

আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা সেনা সরালে শান্তি ফিরুক না-ই বা ফিরুক, তালিবান শাসন যে আরও জাঁকিয়ে বসবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আর সেইসঙ্গে জলাঞ্জলি দিতে হবে নারী-স্বাধীনতা। সিঁদুরে মেঘ দেখছেন লায়লারা। তাঁদের আশঙ্কা, মার্কিন সেনা সরলেই তালিবান আসল চেহারা দেখাবে। তালিবানি জমানায় মেয়েদের অবস্থাটা ঠিক কেমন ছিল মনে করলেই শিউরে ওঠেন ওঁরা। চোখের সামনে স্কুলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল তালিবান জঙ্গিরা। সেই আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল কত মেয়ের স্বপ্ন। সেই আতঙ্ক আবার ফিরে আসছে আফগান ভূমিতে।

‘আফগানিস্তানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হবেই।’ স্বমূর্তি ধারণ করে দু’একবার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তালিবান। আমেরিকা ও কাবুলের গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে আলোচনার ‘নাটক’ করলেও শরিয়ত আইন প্রতিষ্ঠা করাই যে তাদের উদ্দেশ্য, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠীটি। বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী চলে গেলে কাবুলে আশরাফ গনি সরকারের পতন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আর ফের ক্ষমতা হাতে পেলে ন’য়ের দশকের তালিবানি অরাজকতা ফিরবে সে দেশে। শরিয়ত আইন চালু করার নামে ফের মহিলাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। বামিয়ান বুদ্ধের মতো আরও ভাস্কর্য ধ্বংসের মুখে পড়বে। ইসলামের নামে প্রকাশ্যে কাটা হবে মাথা! সত্যিই কি তাই?

আরও পড়ুন: গীতিকার টানে…

পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হামিদ গুল আজ বেঁচে নেই। হামিদ গর্বের সঙ্গে বলতেন, যখন আফগানিস্তানের ইতিহাস লেখা হবে, তখন এ কথাও নথিভুক্ত থাকবে যে, আইএসআই আমেরিকার সাহায্য নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করেছিল। এরপরই নাকি তিনি ব্যঙ্গ করে বলতেন, পরবর্তী সময়ে ইতিহাসবিদরা এটাও লিখে রাখবেন যে, একদিন এই আইএসআই আমেরিকার মদত নিয়ে আমেরিকাকেই হারিয়েছিল।

আফগানিস্তানের মাটিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল বাহিনীকে গুটিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় আইএসআইয়ের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল বলে হামিদ গুল যে দাবি করতেন, তা সম্পূর্ণ সঠিক। এবং পাকিস্তান একই জঙ্গিদের কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তানে একটি মুজাহিদিন গোষ্ঠী তৈরি করে। সেই মুজাহিদিন গোষ্ঠীই হচ্ছে তালিবান। যারা খুব দ্রুত আফগানিস্তান দখল করে এবং আইএসআইয়ের সহযোগী শক্তি হিসেবে গোটা আফগানিস্তান শাসন করতে শুরু করে। তবে হামিদ গুল ও তাঁর বাহিনীর সেই সুখের অনুভূতি বেশি দিন টেকেনি। কারণ, ততদিনে তালিবানের নতুন ‘ইসলামি’ সাম্রাজ্যে গেড়ে বসে ওসামা বিন লাদেন এবং আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের হামলার নির্দেশ দেয়। পরে আমেরিকার তীব্র সামরিক অভিযানে তালিবানের পতন হয় এবং ওসামা বিন লাদেন গা ঢাকা দেয় পাকিস্তানে। অ্যাবোটাবাদে সেই লাদেনকে শনাক্ত করে আমেরিকা এবং ২০১১ সালে মার্কিন বিশেষ বাহিনী তাঁকে হত্যা করে। একইসঙ্গে আফগানিস্তানে চলতে থাকে সংঘর্ষ। পরিস্থিতি সম্পর্কে আফগান পিস মেডিয়েশন টিমের সদস্য তাজ আইয়ুবি সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানান, বর্তমান আফগান প্রশাসন এবং তালিবান— উভয় পক্ষকেই বুঝতে হবে, মধ্যযুগের মতো অবস্থা এখন আর নেই। আগের দিনে শাসক হলেই রাজনৈতিক ক্ষমতা শাসকের হাতে থাকত। কিন্তু এই জমানায় রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে রাখতে হলে অবশ্যই জনগণের সেবক হতে হবে। যখন যুদ্ধ ও শান্তি, প্রশাসন, সম্পদ আহরণসহ বিভিন্ন জাতীয় বিষয় সামনে আসে, তখন সেসব বিষয়ে জনগণের সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলে বিবেচিত হয়।

আরও পড়ুন: ইসরাইল-প্যালেস্তাইন সংঘাত, একপেশে মিডিয়া

তালিবানের প্রধান দাবি, প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকারকে বিদায় নিতে হবে এবং সেখানে একটি অন্তর্বর্তী সরকারকে বসাতে হবে। এ ছাড়া আফগানিস্তানের জেলখানায় যে কয়েক হাজার তালিবান আটক রয়েছে, তাদের সবাইকে ছেড়ে দিতে হবে। প্রেসিডেন্ট গনি এবং তাঁর সরকারের কর্তারা মনে করছেন, তালিবানের দাবি যদি তাঁরা মেনে নেন, তাহলে সেটি সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হবে এবং এতে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর পুরো চেন অব কমান্ড ভেঙে পড়বে। এই বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হতে না পারার বিষয়টিই আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি করেছে। এই অবস্থায় আফগান শান্তি মধ্যস্থতাকারী দল পিস মেডিয়েশন টিম (পিএমটি) সমাধানের রাস্তা বের করার চেষ্টা করে চলেছে।

পিএমটি মনে করে, ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও তালিবানের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তা আফগানিস্তানে একটি শান্তিপূর্ণ সরকার গঠনের বাতায়ন খুলে দিয়েছে। এই চুক্তি দেশটিতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি নৈতিক তাগিদ সৃষ্টি করেছে। পিএমটি চায়, এই শান্তি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের পাশে এসে দাঁড়াক। তালিবান ও আমেরিকার সমঝোতা বৈঠক আয়োজনে কাতার সরকারের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। পিএমটি চায়, তালিবান নেতাদের আলোচনার টেবিলে আনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান আরও সক্রিয় হোক।

ততদিনে আফগানিস্তানের দক্ষিণের বেশিরভাগ অঞ্চলই তালিবানের হাতের মুঠোয়। উত্তরেও একের পর এক এলাকা দখলে তৎপর। তাজিকিস্তান সীমান্ত এলাকায় ক্ষমতা বাড়ানোর কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে অবস্থিত শির খান বন্দরের দখল নিয়েছে তারা। আফগানিস্তানের ৩৯৮টি জেলার মধ্যে অধিকাংশই তালিবানের দখলে।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ জেলার সংবাদ-সাময়িক পত্রের দু’শো বছর

তালিবান আগ্রাসনের সামনে রীতিমতো হার মানছে আফগান বাহিনী। তাজিকিস্তানের সঙ্গে দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যপথ কুন্দুজ শহর। যার দখল আগেই নিয়েছে তালিবান। সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে আশপাশের গ্রামীণ অঞ্চলেও। বন্দর এলাকা দখলের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন তালিবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লা মুজাহিদ। কিছু কিছু জায়গায় প্রায় বিনা প্রতিরোধেই ঘাঁটি গেড়েছে তালিবান বাহিনী। যেমনটা হয়েছে উত্তর আফগানিস্তানের সীমান্ত জেলা ইমাম সাহিবে। কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দোশি জেলাও এখন তালিবানের দখলে। উত্তর আফগানিস্তানের সঙ্গে রাজধানী কাবুলের সংযোগকারী একমাত্র রাস্তাটি গিয়েছে এই জেলা মধ্যে দিয়েই। যে কারণে আতঙ্কিত আফগান সরকার এ বার স্থানীয় ‘স্বেচ্ছাসৈনিকদের’ হাতে অস্ত্র তুলে দিতে ‘বাধ্য’ হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে আতঙ্ক বাড়িয়েছে তালিবানের ছোড়া রকেট এবং স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের আওয়াজ। তা হলে কি ফের অশান্ত সময়ই ফিরছে আফগানিস্তানে? এখনই জবাব না-মিললেও জল মাপছে সব পক্ষই।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *