৪১ বছর পরে হকিতে মেডেল এলো ভারতের: এখন প্রশ্ন একটা না দু’টি?

শুভ্রাংশু রায়

নিন্দুকেরা এখনও বলেন ষড়যন্ত্র। ভারতকে অলিম্পিকের শ্রেষ্ঠত্বের আসন থেকে হটানোর জন্যই অ্যাস্ট্রো টার্ফ চালু করা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। ঘাসের মাঠে খেলে অভ্যস্ত ভারতীয়দের পক্ষে কৃত্রিম মাঠে পাওয়ার হকিতে স্বাচ্ছন্দ্য পেতে সময় লেগেছিল সত্য। তা ছাড়া কৃত্রিম টার্ফ বানানো ব্যয়সাধ্য। কিন্তু ১৯৮০-তে মস্কো অলিম্পিকে ভারতের পুরুষ দল কৃত্রিম মাঠেই হকিতে সোনা জিতেছিল। যদিও বয়কটের কারণে সেই বছর অনেক পশ্চিমি দেশ অংশ নেয়নি এটা ঠিক। কিন্তু অলিম্পিকের আসরে সোনা অবশ্যই সোনা। কিন্তু তারপর ৪১ বছর পরে হকিতে পদক তালিকায় ইতিমধ্যে নাম তুলে ফেলল ভারত পুরুষ দল। জার্মানিকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে ব্রোঞ্জ। সে পদকের রং যা-ই হোক। শূন্য হাতে তো নয়। এর মধ্যে আটটি অলিম্পিকে ভারত গ্রুপ পর্যায় থেকেই বিদায় নিয়েছে। একবার তো মূলপর্বে পুরুষ দল পৌঁছতেই পারেনি। তবে এবার আরেকটি সংযোজন আছে। মহিলা হকি দলও সেমিফাইনালে উঠেছিল এবং সেই ম্যাচে ভারত ১-২ গোলে হেরে গেলেও ভারতীয় প্রমীলা দলের এখনও ব্রোঞ্জ মেডেল জেতার সুযোগ আছে। আগামীকাল তাঁদের ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচ গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে। দেখা যাক জোড়া পদক আসে কিনা। হলে এবারের টোকিও অলিম্পিক্স গেমস অনন্য ইতিহাস তৈরি করবে দেশের অলিম্পিক ইতিহাসে।

আরও পড়ুন: ’৮৮-র সিওলের সেই দুপুর নয়, ’৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিকের বিকেলকেই যেন ফিরে পেতে চায় ভারতীয় হকি দল

টোকিওতে ১৯৬৪-তে এর আগে বসেছিল অলিম্পিকের আসর। ১৯৬০ রোমে অলিম্পিকে আসরে ভারত পাকিস্তানের কাছে শ্রেষ্ঠত্বের আসন হারিয়েছিল ফাইনালে হেরে। কিন্তু টোকিও অলিম্পিকের (১৯৬৪) আসরে ভারত ফেরত পেয়েছিল সেই গৌরব আবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে। অনেকেই আশাবাদী ছিলেন, এবার সেই টোকিওতে ভারতীয় হকি ফেরত পাবে সে পুরনো গৌরব। গত তিন বছরে বিশ্ব হকি র‍্যাঙ্কিংয়ে (পুরুষ) ভারত বরাবর প্রথম পাঁচে ছিল। অলিম্পিকের আসর শুরুর আগে ভারতীয় পুরুষ হকি দলের স্থান ছিল চতুর্থ। আজ জার্মানিকে হারিয়ে অলিম্পিক পদক তালিকায় ৪১ বছর পরে পুনরায় নাম তোলার পরে অবশ্যই ভারত জুড়ে মনপ্রীতদের নিয়ে নতুন উন্মাদনা দেখা দেবে আশা করাই যায়।

আরও পড়ুন: সেই টোকিওই কি ফিরিয়ে দেবে ভারতীয় পুরুষ হকি দলের মহিমা

তবে আশার প্রশ্নে মেয়েদের দল নিয়ে তেমন ইতিবাচক কেউই ছিলেন না। বিশেষত কোনওক্রমে গ্রুপ পর্যায়ে আয়ারল্যান্ডকে টপকে যখন কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতীয় মহিলা দল বিশ্বের দ্বিতীয় দল অস্ট্রেলিয়ার সামনে পড়ে যায়। তারপরে ঘটে এবারের অলিম্পিকের অন্যতম বড় অঘটন। ভারতীয় মহিলারা অস্ট্রেলিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যান। রানি রামপালের দল সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ১-২ হারলেও ব্রোঞ্জ পদক জয়ের সম্ভাবনা এখনও খোলা। কাল আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর পাব যে, জোড়া অলিম্পিক পদক হকিতে আমাদের দেশ পাবে কিনা।

আরও পড়ুন: মেডেল জয়ের নেপথ্য নায়ক ‘ওয়ারেবল টেকনলজি’

ভারতীয় পুরুষ দল যে যথেষ্ট মিডিয়া এক্সপোজার পুরস্কার ইত্যাদি পাবেন, তাতে সন্দেহ নেই। এত বছরের খরা কেটেছে। কিন্তু মেয়েরা? যদি তাঁরা কালকে ব্রোঞ্জ জিততে নাও পারেন দয়া করে ‘ধুর জিততে পারল না’ বলে এক মিনিটেই তাঁদের মন থেকে মুছে দেবেন না যেন। ১৯৮০-র অলিম্পিক সোনাজয়ী পুরুষ দলের কথা আলোচনার বৃত্তে মাঝেমাঝেই ফিরে আসে। কিন্তু ওই অলিম্পিকেই চতুর্থ স্থান পাওয়া ভারতীয় মহিলা দলের উল্লেখ কি আমরা সেইভাবে কোথাও আগে উল্লেখ করতে দেখেছি? ১৯৮০-র মস্কো অলিম্পেকে মহিলা হকি দল সম্পূর্ণ বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছে নিদেনপক্ষে যেন একটি ব্রোঞ্জ মেডেল না পাওয়ার কারণেই। সেই কারণে অন্তত এই প্রজন্মের অনেকে রিওতে মেয়েরা যখন দীর্ঘদিন পরে অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জন করল, তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে ফেলেছিলেন এই বলে যে, ‘প্রথমবার অলিম্পেকের আসরে ভারতীয় মহিলা হকি দল’। উইকির সৌজন্যে অবশ্য সেই ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি। কিন্তু ১৯৮০-র অলিম্পিকের মহিলা হকি দল এবং তাদের পারফরম্যান্সের ওপর বিস্মৃতির আচ্ছাদন সরে যায়নি। আর ঠিক সেই কারণেই ভয় লাগে।

ওড়িশা সরকারকে ধন্যবাদ তাঁরা অন্তত মেয়েদের হকিতে মর্যাদা দিয়েছেন তাঁদেরও সমান স্পনসর করে। এবার আমাদের পালা। কিছু না একটু খবর রাখি। স্থানীয় স্তরে একটু উদ্যোগ। আর হ্যাঁ, আমাদের শহর কলকাতায় অবশ্যই অন্তত একটা সঠিক অ্যাস্ট্রো টার্ফ দরকার। একটা দিয়েই শুরু হোক। বিশ্বের প্রাচীনতম হকি টুর্নামেন্ট বেটন কাপ কিন্তু এখনও এই শহরেই খেলা হয়। এ রাজ্যে মেয়েদের হকি লিগ নমোনমো করে চালু আছে। আপনি কি জানেন সে খবর? এতদিন জানতেন না তো কি হয়েছে, এবার একটু খোঁজখবর নিন না। সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকটা পোস্ট হোক না। কে বলতে পারে ভবিষ্যতের কোনও রানি রামপাল এই শহর থেকেই উঠে আসবেন না।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

3 comments

  • Snehasish Bhadra

    পুরুষ কর্তৃত্বের খেলায় মেয়েদের চিরকাল বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে ভালো খেলা সত্ত্বেও। এবারেও তা যেন না হয় সেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন লেখক। কিন্তু এই বৈষম্য কি এত সহজে ঘুচবে? মিডিয়া, সরকার জনমানসে প্রভাব বিস্তার করলে ও কাঠামোগত উন্নয়ন না করলে মেয়েদের চিরকাল অবহেলিত হয়ে থেকে যেতে হবে। এই চাক্ষুষ বিষয়ের উপর দারুন আলোকপাত করেছেন লেখক।

  • Subhankar Biswas

    খুবই সময়োপযোগী লেখা,স‍্যার

    • খেলার মাঠে নারী পুরুষের বৈষম্যের সমাপ্তি কবে হবে তা নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয় । তবে আশাবাদী রইলাম আগামীদিনে হকিতে মহিলাদের অধিক সংখ্যক অংশগ্রহণ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *