অনেকদিন বাদে হটস্টার উপহার দিল খুব ভালো মানের একটা মিস্ট্রি থ্রিলার ‘নভেম্বর স্টোরি’

অরিন্দম পাত্র

যেকোনো মার্ডার মিস্ট্রি থ্রিলার সিরিজের বিশেষত্ব হওয়া উচিত একদম শেষ অবধি সাসপেন্স ধরে রাখা। পাশাপাশি কে, কীভাবে আর কেন, এই তিনটে প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দেওয়ার মধ্যেও এই ধরনের সিরিজের সাফল্য লুকিয়ে থাকে। এই সবক’টি পয়েন্টেই লেটার মার্ক্স পাবে হটস্টারের নতুন থ্রিলার সিরিজ ‘নভেম্বর স্টোরি’। অনেকদিন বাদে হটস্টার উপহার দিল খুব ভালো মানের একটা মিস্ট্রি থ্রিলার।

আরও পড়ুন: শম্ভু মিত্র: বাঙালির অহংকার

উইকিপিডিয়াতে যে দু’লাইন গল্প লেখা আছে, এই সিরিজের সম্পর্কে আমিও তার চেয়ে বেশি কিছু বলব না। এ গল্প শুধু যে মার্ডার মিস্ট্রি থ্রিলার, তা কিন্তু নয়। পাশাপাশি পিতা ও কন্যার অবিচ্ছেদ্য বন্ডিং, অপত্য স্নেহ, অন্ধ ভালোবাসা ও সর্বোপরি গোপন পারিবারিক এক অতীতের চমকপ্রদ গল্প বলে। এক পুরনো বাড়িতে হঠাৎ আবিষ্কার হয় এক মৃতদেহ ও তার পাশে পাওয়া যায় অ্যালঝাইমার্স রোগে আক্রান্ত স্মৃতিভ্রষ্ট এক প্রখ্যাত রহস্য গল্প লেখক গণেশনকে। পুলিশের যাবতীয় সন্দেহ যখন বৃদ্ধের প্রতি ঘনীভূত হয়, তখন পিতার বিপত্তারিণী হয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হন তাঁর একমাত্র কন্যা অণু! তারপরের সাতটা এপিসোড ধরে গল্প এগিয়েছে খুনিকে, ও কেন খুন করা হয়েছে সেই রহস্যভেদের লক্ষ্যে।

আরও পড়ুন: মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’: মধ্যবিত্তের সংকট

এখনকার ট্রেন্ড অনুযায়ী পরিচালক ইন্দ্র সুব্রহ্মণ্যম সাতটি চ্যাপ্টারে ভাগ করে চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন। এক একটি এপিসোডের সময়সীমা ৪০-৫০ মিনিট। সবমিলিয়ে খুব বেশি প্রলম্বিত করা হয়নি কাহিনিকে। কিন্তু তার মধ্যেই যথেষ্ট রোমাঞ্চ, থ্রিল ও রহস্যের আমদানি ঘটিয়েছেন পরিচালকমহাশয়। প্লটখানি একেবারেই প্রেডিক্টেবল বলা যায় না, বেশ অন্য ধাঁচের একটি গল্প। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভূটের বিখ্যাত ‘অসুর’ সিরিজের ছায়া দেখতে পাওয়া যায় সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে। যেমন প্রত্যেক এপিসোডের শুরুতে সাদা-কালো ফ্রেমে আসল অপরাধীর ছেলেবেলার নানা ঘটনা ও অনুষঙ্গ এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ৪ এপিসোডের পরেই ওই প্রাথমিক অনুষঙ্গ অনুসরণ করলে চালাক দর্শক ধরে ফেলতে পারবেন যে, কে অপরাধী। কিন্তু কেন এই অপরাধ বা তার পেছনের আসল ঘটনাপঞ্জি জানতে গেলে শেষপর্ব অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় কিন্তু রাখেননি ডিরেক্টর। এছাড়াও ‘অসুরে’র মতোই ফরেন্সিক মেডিসিন ও পোস্ট মর্টেমের অনেক খুঁটিনাটি এই সিরিজেও তুলে ধরা হয়েছে সুন্দর করে।

আরও পড়ুন: ‘রাধে’ রিলিজে ধুঁকতে থাকা বলিউডের কতটা উপকার হল, তাতে সন্দেহ থেকে যায়

অভিনয়ে তাক লাগিয়েছেন দক্ষিণী সুপারস্টার অভিনেত্রী তামান্না ভাটিয়া। মিনিমাম মেকাপ লুকেও অসম্ভব সুন্দরী দেখতে লাগার পাশাপাশি জোরদার অভিনয়ও করেছেন তিনি। বিশেষ করে দুরারোগ্য অ্যালঝাইমার্স রোগে আক্রান্ত পিতার চিকিৎসার জন্য টাকা জোগাড়ে কখনও মরিয়া, কখনও অসহায় অবতারে সুন্দর অভিনয় করেছেন অণু-রূপী তামান্না। পাশাপাশি অসহায় বৃদ্ধ পিতাকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব, সেটিও দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। পিতা গণেশনের চরিত্রে জি এম কুমারের অভিনয় মন্দ না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আরও ভালো হতে পারত। স্পেশাল মেনশনের দাবি রাখবেন অভিনেতা পশুপতি এম। তিনি কোন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেটা পর্দায় দেখে নেবেন, এখানে আর উল্লেখ করছি না। বাদবাকি সাপোর্টিং কাস্ট যথাযথ অভিনয় করেছেন। পুলিশের চরিত্রে অরুলদাস বেশ ভালো। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বিশাল থ্রিলিং না হলেও ভালোই।

কিছু কিছু লুপহোলস আছে, যেগুলি নিয়ে বিশদে আলোচনা করতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে, তাই এড়িয়ে যাচ্ছি। তবে শেষপর্বে অণু কীভাবে আসল অপরাধীর ডেরায় বিনা বাধায় পৌঁছে গেল, সেটার কোন ব্যাখা দেওয়া হয়নি। এছাড়া শেষপর্বের ফাইট সিকোয়েন্স অতিরিক্ত প্রলম্বিত মনে হয়েছে। তবে একদম শেষ দৃশ্যের পরিকল্পনা বেশ ভালো লাগে যেখানে বাবার অর্ধসমাপ্ত বইটি অণু নিজে হাতে লিখে ছাপিয়ে নিয়ে আসার পরে সূচিপত্রে ঠিক ওই সাতটি চ্যাপ্টারের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। সবমিলিয়ে থ্রিলার-প্রেমীদের জন্য বেশ ভালো উপহার ‘নভেম্বর স্টোরি’ ডিজনি হটস্টারের তরফ থেকে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *