বোলপুরের অনতিদূরে সেরান্দী গ্রামের পটের দুর্গাপুজো যেন এক জাঁকহীন জৌলুস

তিরুপতি চক্রবর্তী

বোলপুর থেকে কুড়ি-একুশ কিলোমিটার দূরের গ্রাম হাটসেরান্দী। লোকে কেবল সেরান্দী বলে। এই গ্রামে পটের দুর্গাপুজো হয়। সপ্তমীর দিন সকালে গোটা গ্রামের লোক একসঙ্গে সব পুজোর দোলা আনতে যায় গ্রামের মুখে এক কাঁদরে। সে এক বিশাল আয়োজন। গ্রামের বেশিরভাগই বাড়ির পুজো। তার মধ্যে ছ’টা বাড়িতে পটের দুর্গা হয়। সেও এক এক প্রান্তে।

আরও পড়ুন: শান্তিপুরের প্রথম বারোয়ারি পুজো সূত্রাগড় বঙ্গপাড়া বুড়ো বারোয়ারি

শেষ দুপুর। সবে ঝিমুনি কাটিয়ে সবাই আবার কাজে লাগতে শুরু করেছে। কয়েক বাড়িতে পট এসে গেছে। ঘুরতে শুরু করলাম গোটা গ্রাম। পটের পুজো হয় ঘোষ বাড়ি, চ্যাটার্জি বাড়ি, দুই মণ্ডল বাড়ি-সহ আরও দুই বাড়িতে। মেদিনীপুরের পটচিত্র বিখ্যাত। বিষ্ণুপুরের দশাবতার তাসও বিখ্যাত পট। কিন্তু বীরভূমের পটের কথা কিন্তু ততটা কেউ জানে না।

আরও পড়ুন: ২০০৪-এর আগে গ্রামে হত না দুর্গাপুজা, স্থানীয় ঢাকিরা ঢাকে বোল তুলে পুজোর জানান দিত

যে দু’জন শিল্পীর সঙ্গে আলাপ হল, দু’জনেই কমবয়সি। পদবি সূত্রধর। নিজেদের বাড়িতে বসেই আঁকেন। পঞ্চমী বা ষষ্ঠীর দিন পট পৌঁছে যায় পুজো বাড়িতে। পাঁচটা বাড়িতে বরাবরই পটে পুজো হয় আড়াইশো বছর ধরে। এক মণ্ডল বাড়িতে বছর সাতেক ধরে পটে হচ্ছে পুজো, কারণ মানত ছিল।

আরও পড়ুন: ছাতাটাঁড়ের দুর্গাপুজোর পৌরোহিত্য করতে বাঁকুড়া থেকে এসেছিলেন ঝাড়খণ্ড, বাকিটা ইতিহাস

কথা হল দুই পটুয়ার সঙ্গে, বাচ্চু আর রামকৃষ্ণ। বড় মণ্ডল বাড়ির বর্ষীয়ান কর্তা সত্যনারায়ণ মণ্ডলের সঙ্গেও কথা বললাম। তিনি জানালেন, ২৫০ বছর আগে তাঁর ঠাকুরদাদার হাত ধরে শুরু হয়েছিল এই পুজোর।

পটুয়া বাচ্চু মণ্ডল জানালেন, সারাবছর তিনি কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। পুজোর সময় দু-তিনটে পট আঁকেন। আর একজন সারাবছর টোটো চালান, এই সময় দুর্গার পট আঁকেন। দিনে নিজের পেশার কাজ করে রাতে পট আঁকা। এঁরা বংশপরম্পরায় পট আঁকেন এক এক পরিবারের। কিন্তু সারাবছর পটের কোনও চাহিদাও নেই, পট এঁকে সংসারও চলে না। তাই শিল্পী হয়েও শিল্পের মর্যাদা পান না আর কোথাও। যদি এঁদের পেশা বজায় রেখেও পটুয়াদের কিছু কাজ সারাবছর কোনওভাবে বিক্রির ব্যবস্থা করা যায়, সেই দিকেও আলোকপাত করা উচিত।

এতদসত্ত্বেও হাজার হাজার টাকার জৌলুসের বদলে এ এক অবাক করা অন্য দুর্গা দর্শন। এই দুর্গার বিসর্জনটিও উল্লেখযোগ্য। সারাগ্রামের সব ঠাকুর এক জায়গায় একত্রিত হয়ে স্থানীয় কাঁদরে বিসর্জন হয়।

প্রসঙ্গত, এই গ্রামেই বাড়ি অনুব্রত মণ্ডলের, ওরফে বীরভূমের কেষ্টদার। তাঁর বাড়িতেও পুজো হয়। তাঁর উদ্যোগে প্রাচীন মন্দিরগুলি নবরঙে রাঙানো হয়েছে। তার ফলে মন্দিরগুলির সৌন্দর্যায়ন হয়েছে।

ছবি লেখক

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *