আগ্রাসন

গৌতম দে

ব্যস্ত সময়। একেবারে জিকজ্যাক প্রাইম টাইম। সবুজবাতি জ্বলছে। কয়েক সেকেন্ড পরেই হলুদবাতি। তারপর লালবাতি জ্বলবে।

আমি সবার পিছনে। পিছন মানে পোঁদ। খুব সহজেই মারা যায়। বিভিন্ন সাইজের সেইসব ক্ষতবিক্ষত পোঁদের পিছনে আমিই আপাতত শেষ ব্যক্তি। দাঁড়িয়ে আছি। না বোকার মতো। না চালাকের মতো। আমাকে দেখে কারুর মায়া হয় না। ভালোবাসা জাগে না। কেবল রাগ হয়। কেন হয়? জানি না। এইসব ক্ষতবিক্ষত পাবলিক পোঁদের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল ভাবি। ভাবতে থাকি অনেক কিছু…।

তারপর যেই ফুটপাথ থেকে রাস্তায় পা রাখি অমনি সাদাকালো ডোরাকাটা চিহ্নগুলো মাদুরের মতো গুটিয়ে চলে এলো আমার কাছে। আমার গায়ে জড়িয়ে গেল। মুহূর্তে আমি যেন মানুষ থেকে জেব্রা হয়ে উঠলাম। আমার ঠোঁটজোড়া নড়তে লাগল। যুবক দাঁতের সারি দুই পাটিতে প্রবল ধাক্কা মারতে লাগল। অথচ একটুও শব্দ বাইরে প্রকাশ পেল না। রাস্তায় নামা হল না। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বড় বড় বাড়ি দেখতে লাগলাম। দামি দামি গাড়ি দেখতে লাগলাম। আর দেখতে লাগলাম ক্ষতবিক্ষত পাবলিক পোঁদের দ্রুত নড়াচড়া। ডচ করতে করতে এগুচ্ছে। কেউবা ছুটছে।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (২য় অংশ)

কী আশ্চর্য! আশ্চর্য হবারই কথা। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুন্দর পূর্ণবয়স্ক জেব্রা।

পাবলিক অবাক দৃষ্টিতে দেখছে আমাকে। কেউবা আবার জ্বালা ধরা পোঁদ সবার সামনে বেমালুম চুলকোতে চুলকোতে দেখছে। অনেক প্রশ্ন উঁকি মারছে। কোথা থেকে এলো এই সুন্দর নিরামিষ প্রাণীটি?  আকাশ থেকে টপ করে গড়িয়ে পড়ল? নাকি মাটি ফুঁড়ে বেরুল?  প্রশাসন বলতে কি কিছু নেই? বনদপ্তরের ফোন নম্বর কারোর কাছে আছে?

উত্তর জানা নেই।

তো এইরকম হাজারও প্রশ্ন ভাবতে ভাবতে অনেকেই ভয়ে ভয়ে খুব কাছে এসে হাসিমুখে আমার শরীরে হাত বোলায়। জ্বালা জ্বালা ভাবটা বেমালুম উবে যায়। পোঁদের গুচ্ছ গুচ্ছ লোম মুহূর্তে জেব্রার লেজ হয়ে ওঠে। তারপর তিড়িক তিড়িক নাচতে থাকে।

অনেকেই মোবাইলে টপাটপ ছবি তুলছে। কেউবা আমাকে সামনে রেখে সেলফি তুলছে। আমার ভালো লাগছে।

ঘাড় উঁচু করে গাড়ি দেখছি। বাড়ি দেখছি। ধস্ত পাবলিক দেখছি। পোঁদমারার কাঠিকলের খেলা দেখছি। প্রতিটি সময়ে। প্রতিটি দিনে। প্রতিটি বছরে।

দেখছি। শুধু দেখছি।

কোনও প্রতিবাদ নেই। আন্দোলন নেই। শুধু মোমবাতি আগুনের ন্যাকামোপনা আছে।

অথচ ঠোঁট নড়ছে। আমার। দুই ঠোঁটের ভিতর আন্দোলনের গান থেমে আছে। থেমে আছে মিছিলের হাঁটার শব্দ। সব…স…অ…ব। প্রকাশ পায় না। কিছুতেই না।

ফুটপাথ দিয়ে আনমনে টুকুর টুকুর করে চলতে থাকি। টকাটক খুঁড়ের আওয়াজ হয়। বুঝতে পারি, পিছন পিছন অনেক মানুষ ধেয়ে আসছে আমার দিকে। অনেকেই থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে সরল জীবটিকে।

কেউবা বনদপ্তরে ফোন করছে। হ্যালো… হ্যালো মিস্টার বড় পোঁদ শিগগির রেসকিউয়ের জন্য লোক পাঠান… পাঠান দমকল গাড়ি…পাঠান ডিজাস্টার টিম… একটা জেব্রা… নিশ্চিত চিড়িয়াখানা থেকে… না না সার্কাস থেকে…।

আরও পড়ুন: শম্ভু মিত্র: বাঙালির অহংকার

আমাকে এইরকম অবস্থায় বাড়ি আসতে দেখে বাবা নামক মানুষটি আচমকা সিংহ হয়ে উঠলেন। বুঝতে পারলাম আমার ঘেঁটি কিংবা গলার নলিটা তার প্রথম পছন্দের। প্রথম আঘাত। প্রথম কামড়। পানবিড়ি খাওয়া দাঁতগুলো অনেকটা উচ্চতা নিয়ে ঝলকাচ্ছে যেন! ভয়ংকর পাড়াকাঁপিয়ে গর্জন করতে লাগলেন। মাটিতে পা-জোড়া দাবড়ালেন বেশ কয়েকবার। একটু ধুলো উড়ল। তারপর কেশর ফুলিয়ে বিরাট থাবা উঁচিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

— আর কতদিন এইভাবে আমার পোঁদ মারবে?

— মানে! আমি গলাটাকে দুহাতের তালুতে পেঁচিয়ে বললাম।

— মানে খুব পরিষ্কার। বলছি চাকরি-বাকরির চেষ্টা তো করতে হবে?

— তুমি কী ভাবছ, আমি চেষ্টা করছি না?

— সে তো দেখতেই পাচ্ছি। দিন দিন বাপের অন্ন ধ্বংস করছ, আর কাপ্তেন সেজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছ…।

— আঃ থাক না। মা আঁচলে ঠোঁট চেপে বলেন।

— তুমি থামো। তোমার আস্কারায় এমনটি হয়েছে।

মা ভীষণ ভয় পেলেন। নিমেষে কচ্ছপের মতো হয়ে গেলেন। তারপর নিজেকে খোলসের অনেক ভিতরে গুটিয়ে নিলেন। গুটিগুটি চলছেন। রান্নাঘরে। কাজের জায়গা। কাঁদছেন। হলুদের গন্ধে কান্না। জিরের গন্ধে কান্না। লালমরিচের গন্ধে কান্না। ভীষণ কাঁদছেন।

বারবার আঁচলে চোখ মোছেন। তখনও উনুনে অনেকটা আগুন।

আরও পড়ুন: বাঁক বদলকারী সাহিত্যস্রষ্টা মানিক

প্রতিনিয়ত সিংহের থাবা থেকে নিজেকে বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। অসম হারজিতের লড়াই চলতে থাকে মনের ভিতর। মোক্ষম ঝটকায় প্রাণ বাঁচাতে পড়িমরি ছুটি। বারবার পিছন ফিরি। তাকাই। সিংহের নাগাল থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে চলে এসেছি।

চারদিকে ঘন গভীর মানুষের জঙ্গল।

ফুটপাথের ধারে চলে এসেছি প্রায়। রাস্তা পার হব। ওপারে যাব। নতুন রাস্তায় যাব। যেখানে আমার পা পড়েনি। বুড়ো হাতির পিঠের মতো রাস্তা দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে গাড়িগুলো এলোমেলো ছুটছে। আমাকে রাস্তা পার হতে হবেই।

আচমকা সাদাকালো ডোরাকাটা খোলসটা শরীর থেকে আপনাআপনি খুলে নির্দিষ্ট জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। কখন যে ছড়িয়ে পড়ল বুঝতে পারলাম না। বরং অবাক হলাম। ভীষণ অবাক হলাম। নিমেষে নির্ভেজাল ছা-পোষা মানুষ হয়ে গেলাম! আমার দুই ঠোঁটের ভিতর মিছিলের শব্দ, আন্দোলনের শব্দ, গানের শব্দ ছিটকে বেরুতে লাগল গুলি বন্দুকের মতো। ক্ষতবিক্ষত পোঁদ নিয়ে হাজার হাজার পাবলিক ঘুরে দাঁড়াল…।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *