নবানে কার্তিক ও কার্তিকের কৃষি সম্পৃক্ততা

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

কার্তিক নবান্নের দেবতা। রাঢ়বঙ্গের কোনও কোনও স্থানে (কাটোয়া মহকুমা) নবান্ন উৎসবে কার্তিক পুজো হয়। এই কার্তিক ‘নবানে কার্তিক’ বা ‘নবান্নে কার্তিক’ নামে অভিহিত। ‘নবান্ন’ একটি কৃষিকেন্দ্রিক লোকানুষ্ঠান। ‘নবীন ধান্যে নবান্ন পালিত হয়। শস্যরক্ষাকর্তা দেবতাকে তুষ্ট করে শস্য ঘরে তোলার জন্য ‘নবান্নে কার্তিক’ পূজিত হয় বলে মনে করা যেতে পারে। বাংলার শস্য উৎসবে যখন শস্যদেবতারূপে কার্তিক পূজিত হন (‘নবান্নে কার্তিক’), তখন মধ্যরাত্রে ফসল চুরির অভিনয় করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। লোকসমাজে কার্তিক শস্য দেবতাদের অন্যতম। কার্তিক সংক্রান্তির দিন ও তার আগে এই কৃষিদেবতার ব্রত উদ্‌যাপিত হয়। ব্রতিনীরা একটি ঘটের চারিদিকে আলপনা দিয়ে নানা আচার পালন করেন। সারারাত গাওয়া হয় কৃষি-সংগীত; ফসলের কীটশত্রু, জীবজন্তু তাড়িয়ে ফসল সুরক্ষার কাহিনিই গানের বিষয়বস্তু। পুজো বা ব্রতানুষ্ঠানের পর কার্তিকের মূর্তি জলে বিসর্জন দেওয়া হয় না, তাকে শস্যক্ষেত্রে রেখে দেওয়া হয় ফসলের রক্ষাকর্তা হিসাবে।

আরও পড়ুন: বঙ্গদেশে চ কালিকা

লোকসমাজে দেখা যায়, সন্তান কামনায় বন্ধ্যানারী কার্তিক পুজো করেন। সন্তান উৎপাদনের দেব-দেবী কার্তিক-ষষ্ঠী যুগ্মদেবতা ভ্রূণ সৃষ্টকারী দেবতা রূপেই পূজিত। আবার লোকসমাজে কার্তিক বৃত্তি পাল্টিয়ে মানব-প্রজনন থেকে উদ্ভিদ প্রজননের দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন। বারবণিতারা কার্তিকের পুজো করেন আকস্মিক ভ্রূণ উৎপাদন বন্ধ করতে।

আরও পড়ুন: ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’

বাহনসমেত কার্তিক উর্বরতাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কুক্কুট বা ময়ূর— কার্তিকের যে বাহনই হোক না কেন, পাখি দু’টি উর্বরতা-কেন্দ্রিক। ময়ূরের মিলনানন্দ তখনই যখন বর্ষায় সজল মেঘের আনাগোনা, আর তখনই কিশলয়ের নবসৃষ্টির মরশুম। ময়ূর অগ্নির প্রতীকরূপে অভিহিত ও ব্যাখ্যাত, আবার পুরাণে কার্তিক সূর্যসম্ভব দেবতা। ‘কুক্কুট’ শব্দের অর্থও অগ্নিপিণ্ড। বৌদ্ধ শিল্পদর্শনে কুক্কুট সূর্যের দ্যোতক হিসাবে প্রতিভাত। মোরগের কাছেই সৌরালোক প্রথম স্বাগত-সম্ভাষণ পায়।

আরও পড়ুন: নৃসিংহবন্দিতা দেবী বংশবাটী-বিলাসিনী

একটি লোককথায় দেখা যায়, দেবসেনাপতি কার্তিকেয় ও দেবকন্যা ঊষার প্রপম বিবাহের কাহিনির মধ্যে তাদের কৃষি-সম্পৃক্তি জড়িয়ে আছে। কার্তিক ঊষাকে বিয়ে করেছেন, কিন্তু তাঁর খেয়াল হল মায়ের অনুমতি নেওয়া হয়নি। অনুমতি নিয়ে নিয়ম করেই নববধূকে গৃহে আনতে চান। কাজেই এক শস্যক্ষেত্রে ঊষাকে রেখে দ্রুত মায়ের কাছে গেলেন। সেদিন মায়ের অদ্ভুত আচরণে কার্তিক যারপরনাই বিস্মিত, আতঙ্কিত হয়ে শপথ নিলেন চিরকুমার থাকার। অন্যদিকে কার্তিকের জন্য অপেক্ষায় থেকে প্রহরের পর প্রহর গুনে লজ্জায়, অপমানে ঊষা শস্যক্ষেত্রে চিরজীবনের জন্য অদৃশ্য হলেন। এই যে শস্যক্ষেত্রে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মোটিফ, তার মধ্যেই কৃষি-সম্পৃক্ততা নিহিত রয়েছে। বেদ ও পুরাণানুসারে ঊষা সূর্যের স্ত্রী আর কার্তিক সূর্যসম্ভূত দেবতা। ঊষা হলেন সৌরশক্তি; আমরা জানি সৌরশক্তি শস্যের ক্লোরোফিল-সমৃদ্ধ সবুজ কলায় শোষিত হয়ে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য উৎপাদিত হয়, এরই নাম সালোকসংশ্লেষ। এই কিংবদন্তির জাগতিক তাৎপর্য এখানেই। সৌরদেবতা কার্তিক এভাবেই কৃষির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কার্তিক পুজো অনুষ্ঠিত হয় সৌরতিথি অনুসরণে— রবির তুলো রাশি থেকে বৃশ্চিক রাশিতে সংক্রমণের দিন, যাকে বলা হয় কার্তিক সংক্রান্তি।

আরও পড়ুন: মালঞ্চের ৩০০ বছরের দক্ষিণা কালীর টেরাকোটার মন্দির এখন বয়সের ভারে জীর্ণ

উর্বরতাবাদের সঙ্গে কার্তিকের সংযুক্তির আর একটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হল— কার্তিক সরা যা অ্যাডোনিস গার্ডেনের অনুরূপ। এটি লোকাচারের অঙ্গীভূত নকল শস্যক্ষেত্রের আদলে গড়া একটি শস্য-সরা। পূজাবেদিতে পঞ্চশস্য অথবা ধান ছড়িয়ে তার প্রতিমা স্থাপিত হয়, কোথাও আবার কার্তিক মূর্তির পাশে রাখা হয় ইতুসরার মধ্যে ইতুর ঘট। বঙ্গদেশে ইতুপুজো হচ্ছে সূর্যপূজার নির্দেশক এবং তা কার্তিক সংক্রান্তিতে সূচনা, শেষ হয় অঘ্রাণ সংক্রান্তিতে। সরায় গঙ্গামাটি রেখে তাতে বোনা হয় ধান, ছোলা, মটর আর রোয়া হয় কচু আর সুশনি শাক। শস্যক্ষেত্রের একটি প্রতিরূপ বা অ্যাডোনিস গার্ডেন এভাবেই গড়ে ওঠে। বরিশাল অঞ্চলে ধানের চারাকে কার্তিকের প্রতীকরূপে পুজো করা হয়। মাটিতে সমকেন্দ্রিক কয়েকটি বৃত্তাকার চওড়া দাগ কেটে, মাটি তুলে, সেইস্থানে বোনা হয় ধানের বীজ, সেই তোলা মাটি গুঁড়ো করে বীজ আচ্ছাদিত করা হয়। এই বীজ বোনার সূত্রপাত হয় কার্তিক মাসের প্রথমার্ধে এবং সংক্রান্তিতে চারা বেশ কিছুটা লম্বা হয়। মনে করা যেতে পারে আদিকালে মূর্তির বদলে ধানের চারাই কার্তিকরূপে পূজিত হত; হয়তো মানবরূপী কার্তিক প্রতিমা পরে চালু হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে বোরোধানের জন্য ধানের বীজের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষাও  বলা যেতে পারে; সেখানে বোঝা যায় বীজের গুণমান অনুযায়ী কত হারে জমিতে বপন করা হবে।

আরও পড়ুন: আমার কালীপুজো

কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, গোয়ালপাড়া এবং রংপুরের রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় সমাজের গ্রামীণ নারীরা কার্তিকের জন্য পাতা ঘটের পশ্চাতে ফলন্ত মোচাসহ কলাগাছ আর ফলন্ত ময়নাগাছের শাখা রাখে। এই কৃত্যও কার্তিকের সঙ্গে উর্বরতাবাদকে মিলিয়ে দিয়েছে। যে মায়েরা সন্তান চান, তাঁরা কার্তিক ব্রত করেন আর সন্তানবতী মায়েরা নৃত্যের তালে তালে সেই কলাগাছ প্রদক্ষিণ করে কলা ও ময়না ফল ছিঁড়ে পশ্চাতে দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে সন্তান মানতকারী মায়েদের আঁচলে নিক্ষেপ করেন। এই পুজোর শেষে গাওয়া হয় গীদালী গান আর তাতে কৃষিকাজের প্রসঙ্গ আবশ্যিক।

কোচবিহারের মাঘপালা গ্রামে কার্তিক পুজোর দিন বর্ষণদেবতা হুদমদেওর আশীর্বাদ প্রার্থনায় গোপনে কৃষিক্ষেত্রে পরিবেশিত হয় নারীর নগ্ননৃত্য। কার্তিক শস্যরক্ষক দেবতা হবার জন্য তা করে লোকসমাজ, সেখানে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ। এটি হয়তো উর্বরতাবাদের চরম দর্শন।

কভার ছবি ময়ূরে অধিষ্ঠিত কার্তিকেয়। কালীঘাট ঘরানায় এঁকেছেন কলম পটুয়া। @mapbangalore সংগ্রহ থেকে।

লেখক বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ফ্যাকাল্টির বিশিষ্ট অধ্যাপক। তাঁর বিশেষ খ্যাতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ফোকলোর এবং ফল-ফুল-উদ্যান বিষয়ক লেখালেখির জন্য।

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *