Latest News

Popular Posts

আমি, গাছ, ফুল ও উত্তম কুমার

আমি, গাছ, ফুল ও উত্তম কুমার

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়

পাহাড়ঘেরা দেশে একটা লাল ফুলের গাছ ফুল বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে হাঁটতে হাঁটতে কী যেন মনে পড়েও পড়তে চায় না স্মৃতি হারিয়ে ফেলা নায়কের। অথচ মুখে ছড়িয়ে পড়ে খুশির আভা। এই সময় দূর থেকে বাঁশি বাজিয়ে আসতে দেখা যায় একজন আদিবাসী পুরুষকে— যার সঙ্গিনী একজন মেয়ে। রাঙামাটির পথে ছড়িয়ে থাকা সেই ফুল দেখে সে দাঁড়িয়ে যায়। ‘লাল ফুল’ বলে কুড়িয়ে নেয়। তারপর মরদকে বলে পরিয়ে দিতে। এরপর তারা এগিয়ে যায় নিজেদের পথে। নায়ক, কী যেন ভেবে একটা ফুল কুড়োতে যান।

আরও পড়ুন: উত্তমের আলপনা

‘হারানো সুর’ (১৯৫৭)-এ উত্তম-সুচিত্রার সেই কালজয়ী গান ”তুমি যে আমার…”

কৈশোরে ‘হারানো সুর’-এর উত্তম কুমার আর সকলের মতো আমাকেও আবিষ্ট করেছিল ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি চোখ চলে গিয়েছিল ক্যালকাটা মুভিস্টোন স্টুডিওর সাদা-কালো সেটের ফুলগাছে। ‘লাল ফুল’ মানে শিমুল না পলাশ! শিমুল (Bombax ceiba)-এর বৃন্ত গোল বাটির মতো, যাতে তুলো ধরে। আর পলাশ (Butea monosperma) টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো। শিমুল মাথায় পরা যায় না কিন্তু পলাশ মানুষ চুলে পরতে পারে। অথচ মেয়েটি যে ফুলটি কুড়িয়ে নিয়েছিল তার সঙ্গে এ-দুয়ের আকারের কোনও মিলই নেই। ‘হারানো সুর’-এর আবহ আর নায়ক নায়িকার স্ক্রিন প্রেজেন্স এতটাই আলোচনার বিষয় ছিল যে, আমি এই প্রশ্নটাকে আস্তে আস্তে গিলে ফেলেছিলাম। পরিচালক অজয় করের সেট খুবই দামি ছিল কিন্তু গাছের কথা, ফুলের কথা কেউ কী ভাবেন! হয়তো না ভাবলেও কিছু এসে যায়নি তাতে।

দৃশ্য: হারানো সুর

কিন্তু আমি ভাবি। বন্ধুদের কে যেন বলেছিল— আমাদের দেহের আশি শতাংশই মন। শরীর বলতে বাদবাকিটুকু। মন ভালো আর মনখারাপ ছাপ ফেলে শরীরে। রহস্যে ভরা এই মনকে ছুঁয়ে যায় বাস্তব। তাই কোনও একটি সুর, কোনও একটি রং কিংবা কোনও একটি গন্ধ, এক ঝটকায় মনকে নিয়ে গিয়ে ফেলে কোনও অতীত স্মৃতির দেশে। ‘হারানো সুর’-এ যেমন ‘লাল ফুল’ আর ‘তুমি যে আমার’। এই রং, ছন্দ, গন্ধের জোগানদার হল গাছ, যা একসময় প্রকৃতির ভাণ্ডারে অফুরন্ত ছিল। আজ অনেক কমেছে।

আরও পড়ুন: চিরকুমার উত্তম-ফুটবল

দৃশ্য: হারানো সুর

সাতের দশকে জন্মানো বাঙালি মেয়েদের বেশিরভাগই, পারিবারিকভাবে উত্তম কুমারের ছবি দেখে বড় হয়েছিল। আর সিনেমায় তাদের সেই নায়ক কখন কোথায় গিয়ে দাঁড়ালেন, বসলেন, তাকালেন, শুলেন— সেইসব ঊনকোটি চৌষট্টি মনে রাখাটা তাদের কাছে ছিল খুবই স্বাভাবিক। তাই সিনেমায় যখন সেই নায়ককে প্রথম একটি গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াতে দেখলাম, তখন গাছ এবং নায়ক দুইই আমার কাছে সমান আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়াল। তারপর থেকে সেই প্রিয় নায়ক কোথায় বসলেন, কোথায় দাঁড়ালেন আর কোন্‌ ফুল হাতে নিলেন— এইসব মনে রাখার খেলা শুরু হয়ে গেল আপনমনে। তাই আজকের এই ডিজিটাল যুগেও সেই পুরনো স্মৃতির ছবিগুলো, বলা ভালো স্মৃতির ছবির গাছ, ফুল সবকিছুই, আমার মনের চারপাশে ভিড় করে থাকে।

‘অগ্নীশ্বর’ (১৯৭৫) সিনেমার দৃশ্য

ভিড় জমছে ডাক্তারবাবুর কোঠিয়ার সামনে। চৌকাঠে পা আটকে পড়ে গেছেন তিনি। চশমা ছিটকে পড়েছে একদিকে। দৌড়ে আসছে ছোট্ট এক খুকি ভিড় ঠেলে। কথা বলতে পারে না সে। কথা বলে তার চোখদু’টো আর মুখের অনাবিল হাসি। এভাবেই রোজ ছুটে এসে সে আঁজলাভরা বকুলফুল তুলে দেয় তার ডাক্তারবাবু অগ্নীশ্বর-এর হাতে। ডাক্তারবাবু রোজ অপেক্ষা করে থাকেন কখন এই ‘ভিজিট’ আসবে। সংস্কারমুক্ত ডাক্তার ‘অগ্নীশ্বর’ শেষ মুহূর্তে কোরামিন নিতে অস্বীকার করেন কিন্তু খুকির হাতের বকুলফুল হাসিমুখে চেয়ে নেন শেষ পাথেয় হিসেবে। মুঠি খুলতেই, ফুল এবং নায়ক অগ্নীশ্বরের জীবন ঝরে পড়ে। বকুলফুলের গন্ধ নিয়ে পূর্ণ সিনেমা থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন। অগ্নীশ্বর আর তাঁর প্রিয় বকুলফুল আমার যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল। আজও কোনও বকুলতলা দিয়ে হাঁটলেই মনে হয় বুঝি দূর থেকে ছুটে আসছে খুকি। আর সাদা চুলের নায়ক হাত বাড়িয়ে নিচ্ছেন সেই সাদা বকুল ফুল।

খুকির হাতের বকুলফুল হাসিমুখে চেয়ে নেন শেষ পাথেয় হিসেবে, ‘অগ্নীশ্বর’

বাদাবনের ইতিহাস নিয়ে গল্প। নায়ক এখানে নষ্টচরিত্র এক যুবক, মদ্যপ, বাজারের মেয়েদের সঙ্গে তার ওঠাবসা। সবাই তাকে বলে ‘অমানুষ’। কিন্তু এই অমানুষই তার অতীতের প্রিয় স্মৃতির পথে ফিরে পায় ঝকঝকে নীল আকাশের গায়ে লালে লাল হয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়া। আমরাও তাই বলি বটে কিন্তু ফুলবিশেষজ্ঞরা বলবেন, ওই গাছটি হল গুলমোহর (Delonix regia)। কৃষ্ণচূড়া ছোট গুল্ম জাতীয় গাছ (Caesalpinea pulcherrima) যার রঙের অনেক ভ্যারাইটি আছে। এইসব তথ্য নানা সময় জেনেছি গাছ নিয়ে কাজ করা মানুষজনের কাছ থেকে।

‘অমানুষ’ (১৯৭৫) সিনেমার দৃশ্য…

গুলমোহরের লাল যেন রক্ত চলকে ওঠা উদ্দাম যৌবনের প্রতীক হয়ে ফোটে গরমে। এই ‘মুড’কেই ধরতে চেয়েছেন পরিচালক। সন্দেশখালির ভাঙাতুষখালি গ্রামে, একটা গোটা গ্রাম বানানো হয়েছিল শ্যুটিংয়ের খাতিরে। বাদার ম্যানগ্রোভ তেমন করে ছবিতে আসেনি। যদিও লাল ফুলে ভরা ‘কাঁকড়া’ গাছ (Bruguiera gymnorhiza) সুন্দরবন ম্যানগ্রোভের এক অনন্য সম্পদ, এলে পারত।

‘অমানুষ’ সিনেমার দৃশ্য…

এরকম গুলমোহর এসেছে আরেক বিখ্যাত ছবিতে। যে গাছ লাগিয়েছিল দুই তরুণ-তরুণী, তাদের ঘরের উঠোনে। রোজ জল দিয়ে তাকে বড় করে তোলে সেই রমণী আর পুরুষ স্বপ্নবিভোর চোখে চেয়ে চেয়ে তাই দেখে। তারপর চাকার মতো ঘুরতে ঘুরতে সুখের পরে দুঃখ আসে। গাছ বাড়ল, ফুল ধরল কিন্তু ভালোবাসার নারী হারিয়ে গেল পৃথিবী থেকে। নায়ক বৃদ্ধ হলেন। পরম মমতায় সেই গাছকে ছুঁয়ে যেন তাঁর প্রিয় নারীকেই খুঁজে পেলেন। এইভাবে গুলমোহর গাছটিই হয়ে গেল তাঁর প্রেমের তাজমহল। ‘আনন্দ আশ্রম’ ছবির সেই বিখ্যাত গানে কিন্তু আছে, ‘এই সেই কৃষ্ণচূড়া…’। কৃষ্ণচূড়াই হোক বা গুলমোহর, জীবনের কিছু এসে যায় না তাতে। সে বয়েই চলে। গাছ থাকে। গাছ কাটা পড়ে। বাবা-মা হারানো কত মানুষের জীবনে, আগের প্রজন্মের হাতে-করে লাগিয়ে যাওয়া গাছ, শান্তির ছায়া দিয়ে যায়।

‘আনন্দ আশ্রম’ (১৯৭৭) ছবির সেই বিখ্যাত গানে কিন্তু আছে, ‘এই সেই কৃষ্ণচূড়া…’

এবার সেই অবিসংবাদিত ছবির গল্পে আসি। ‘নায়ক’ নিজেই নিজের যশের শিকলে বন্দি। অর্থের চুড়োয় তাঁর হাঁটাচলা। হঠাৎ সেই টাকার প্রাণহীন শুকনো মরুভূমির চোরাবালিতে তাঁর পা ঢুকে যায়। তলিয়ে যেতে যেতে দেখতে পান, তাঁর যৌবনের নাটকের গুরু শঙ্করদাকে, যাঁর হাত ছেড়ে তিনি অনেক দূর চলে গিয়েছিলেন। এখন সেই হাতকেই প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চান ‘নায়ক’। শঙ্করদা এগিয়েও আসেন কিন্ত হাত ধরেন না। নায়ক তলিয়ে যান দুরন্ত চোরাটানে। জেগে থাকে পাঁচটা আঙুল। দূরে দূরে এরকম আরও কিছু কালো কালো আঙুলওয়ালা হাতের মতো জিনিস নজরে আসে। ওগুলো মরুভূমির কাঁটাগাছ, নাকি জীবনের চোরাবালির টানে হারিয়ে যাওয়া আরও কিছু প্রাণের করতল! দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে ওঠার সময় স্ক্রিনে নায়কের হাতের সেই পাঁচ আঙুল। ধক্‌ করে ওঠে মন। ‘মুখবই’তে আমাদের একটা ‘গেছোগ্রুপ’ আছে, যার গাছ-রসিক ফাল্গুনীদা মিল পেয়েছিলেন ওই হাতের সঙ্গে বুদ্ধবেলি (Jatropha podagrica) ফুলের আকারের। আমারও কিন্তু তাই-ই মনে হয়েছে।

‘নায়ক’ (১৯৬৬) সিনেমার দৃশ্যরা…

এই যে আমার ‘উত্তম-বৃক্ষ চর্চা’ একথা কাউকে বলিনি কোনওদিন। সেই যেমন রাজহাঁসের মতো উন্নত গ্রীবাভঙ্গিতে সুপ্রিয়া চৌধুরি এক অভিমানী রানি, আমরা মেয়েরাই তাঁতে মুগ্ধ কিন্তু সুর আর সুরায় আসক্ত রাজা তাঁর কাছে আসবার সময়ই পান না। এদিন রাতে তিনি এসেছেন তাঁর প্রিয়ার মান ভাঙাতে। গান ধরেছেন, ‘ফুল সাজতে লাগে, খোঁপায় লাগে, লাগে মালা গেঁথে নিতে…’ রাজা তখনও সন্ন্যাসী হয়ে যাননি। প্রেক্ষাগৃহ ভরে যায় ফুলের গন্ধে। সেই গন্ধ বুকে নিয়েই বাড়ি ফিরি। রজনীগন্ধা না জুঁই— কীসের গোড়ে মালা ছিল? কোনটা বেশি ভালো!

কিংবা মনে করা যাক ‘হার মানা হার’ ছবির সেই আপনভোলা নায়ক বহুদিন পর এসেছেন তাঁর এক বয়স্ক ব্যাচেলর হাসিখুশি বন্ধুর বাড়ি। সেই বন্ধুটি আবার চিত্রকর। সেই বন্ধু ছাড়া আর কেউ যে ওই বাড়িতে থাকতে পারে, সেকথা তাঁর মাথাতেও আসেনি। তাই স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে ভুবনভোলানো হাসি নিয়ে পকেট থেকে ফুলের মালাটি বের করে ঝপাং করে পরিয়ে দিতে চাইলেন আর দরজা খুলতে না খুলতেই সে কী বিড়ম্বনা! ‘পরো পরো মালা পরো’, প্রেমিক ও ফুল নিয়ে এমন স্বপ্ন ধরিয়ে দেওয়ার অদ্বিতীয় নায়ক ছিলেন ওই একজনই।

চা-বাগানের গল্প মানেই সবুজ মখমলি গালচে বিছানো পাহাড়। বাঙালি মাত্রেই কিন্তু ভবঘুরে নয়। ঘরকুনো বাঙালির সংখ্যাও নেহাত কম নেই। আমার ছোটবেলা সেইরকম এক বাড়িতে। পাহাড় আমার কাছে তাই ভূগোল বইয়ের পাতায় ছিল অনেকদিন। ‘ধনরাজ তামাং’ ছবি চোখের সামনে আনল সিংটমের সবুজ উপত্যকা, হ্যাপি ভ্যালি। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই চা-বাগানে ছিল আদি ওক, বার্চ আর ম্যাগনোলিয়ার জঙ্গল, যতদিন না ক্রিপ্টোমারিয়া জাপানিকা নামের ভিনদেশি পাইন (কেউ বলেন ধুপি) প্লান্টেশন এসে পাহাড় ঢেকে ফেলেছে। ছবির শুরুতেই সেই ‘চিকন চিকন পাইন পাতা’র গান, সাধ্যের সঙ্গে সাধপূরণের সংগতিহীন বাঙালিকে বেড়াতে নিয়ে গেল ওই চত্বরে। মজার ব্যাপার, এই চা-বাগানের মালিক একজন বাঙালিই। নাম তারাপদ ব্যানার্জি।

‘হার মানা হার’ (১৯৭২)-এর গানের দৃশ্য ‘পরো পরো মালা পরো…’

সিনেমার অনুষঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে আরেক বিখ্যাত ছবি ‘নিশিপদ্ম’। শিউলি স্বর্গের পারিজাত, মা দুর্গার প্রিয় ফুল। ছবিতে ছিল দুর্গাপুজোর আবহে মায়ের আবাহনের প্রস্তুতি, পোটোদের মূর্তি গড়ার শুরু। আর সেই কাজে লাগে বারাঙ্গনার ঘরের মাটি। পোটো আসেন বারবনিতা পুষ্পর ঘরে, মাটির জন্য। আর ঠিক সেইসময় একটা শিউলিচারা পেয়ে ছুট্টে ঢোকে ভূতু, পুষ্প (সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়) যাকে ছেলে পাতিয়েছেন। পোটো উঠোনের কোনা থেকে মাটি নিয়ে যাওয়ার পর সেই খোঁড়া গর্তেই সে শিউলি চারাগাছটি লাগিয়ে দেয়। পুষ্প সেই গাছে জল দেয় রোজ। গাছ বাড়ে। ইতিমধ্যে গল্পের ঘটনা নায়ক আর অন্যান্যদের ছিটকে দেয় নানানদিকে। কিন্ত সেই শিউলিগাছ দাঁড়িয়ে থাকে অমর প্রতিশ্রুতি নিয়ে। নায়ক বলেন— ‘‘যাবার আগে তোমায় আশীর্বাদ করে যাই, তোমার গাছে যেন অনেক অনেক অনেক ফুল ফোটে!’’ গাছ-ভালোবাসা নায়ককে ভালোবেসে ফেলি অজান্তেই, আর অপেক্ষা করে থাকি শিউলি ফোটার।

‘চিরদিনের’ ছবিতে প্রথম ধাক্কা এল এই জেনে যে, গোলাপ গাছ থেকে গোলাপ ছেঁড়ার মানে নাকি ফুলকে হত্যা করা। নায়ক গাইছেন, ‘মানুষ খুন হলে পরে/ মানুষই তার বিচার করে/ নেইতো খুনির মাপ/ তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ!’ সত্যিই গাছ কেটে ফেলা, ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার মতো ঘটনার বিরাম নেই। বিরাম নেই প্রকৃতি নিধনের, প্রকৃতি নির্যাতনের।

অনেক বড় হয়ে গাছপালা বাঁচানোর কথা ছাত্রছাত্রীদের বলার সময় আমি এইসব গান, সিনেমার কথা বলি, যাতে তারা নিজের সংস্কৃতিকে চিনে নিয়ে পড়াশোনোর সঙ্গে এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে নিতে পারে। প্রিয় নায়কের প্রিয় ছবির আলোচনায় আমাদের পড়াশোনোর আড্ডাঘর জমে ওঠে সহজেই। আরও কত এমন ছবি, ফুল, মালার অনুষঙ্গ ভেসে আসে একে একে। ‘এন্টনী ফিরিঙ্গি’-র কবিগানের শেষে নিজের গলার মালা ভোলা ময়রা সাজা কবিয়াল অসিতবরণের গলায় পরিয়ে দিলেন নায়ক। আবার ‘কুহক’ ছবিতে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে, ‘আরও কাছে এসো, যায় যে বয়ে রাত’। আর ‘চিড়িয়াখানা’য় তো গোটা সিনেমাটাই ফুলের নার্সারি জুড়ে।

ব্যক্তিজীবনেও মহানায়ক উত্তমকুমার ছিলেন ডালপালায় ভরা এক বিশাল বাওবাব বা বটগাছের মতো। সংসারে বা সংসারের বাইরে তাঁর শিকড় ছড়িয়েছিল বহুদূরে। মানুষের মনের গভীরে। শাখাপ্রশাখার বিস্তার হয়েছিল বহুদিকে। গাছের শাখায় যেমন ফুল-ফল ধরতে পারে, পাখি বাসা বাঁধতে পারে, থাকতে পারে পরম নিশ্চিন্তে, তেমনি উত্তম কুমার নামক সেই গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির বহু মানুষ এবং কলাকুশলী। শিল্পীসংসদ তৈরির বহু আগে থেকেই এটা কিন্তু চলে আসছিল নীরবে, নিভৃতে। সুসময়ে-দুঃসময়ে বহু মানুষ তাঁর দ্বারস্থ হয়েছেন। পরগাছা, লতানে বহু গাছ তাঁকে অবলম্বন করে বেড়ে উঠেছে, বেঁচে থেকেছে। তিনি নিজে তাদের দু’হাত দিয়ে আড়াল করে রেখেছেন। সূর্যের প্রখর আলোয় সেই সত্যিটাকে প্রকাশ পেতে দেননি।

দাঁইহাটের পাইকপাড়া। এখনও রয়েছে সেই জমিদার বাড়ি। আর এখানেই শ্যুটিং হয়েছিল নিশিপদ্ম সিনেমার।

বাওবাব গাছ নিয়ে একটা গল্প বা মিথ আছে যার সত্যি মিথ্যে জানা নেই আমার। বাওবাব গাছ বহু বছর বাঁচে। কিন্তু তার মৃত্যু হয় একদিনেই। ভেতরে ভেতরে কখন যে তার ক্ষয় শুরু হয়েছে, বাইরে থেকে তা নাকি টেরই পাওয়া যায় না। একদিন সকলে অবাক হয়ে দেখে— ওমা গাছ কই! জায়গাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা!! শুধু সেই জায়গায় স্তূপাকার হয়ে আছে কিছু অবশিষ্ট জীর্ণ কাঠকুটো!!! আমাদের মহানায়কও যেন সেই বাওবাব গাছের মতো। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র সেটে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা বা নামার মাঝখানে কেউ সেভাবে টের পায়নি বা সেদিন রাতের পার্টিতেও, যে তিনি তার পরদিন ঘুমিয়ে পড়বেন চিরকালের মতো। কিন্তু সেই গাছের ছায়ায়, মায়ায় আঁকা ছবি আজও আমরা দেখে চলেছি আজও। তাই মৃত্যুদিনে প্রণাম জানাই সেই আশ্চর্য মহিরুহের মতো নায়কটিকে— যাঁর নাম উত্তম কুমার।

● পিয়ালী পেশায় সরকার প্রোষিত স্কুলের শিক্ষক। গাছ নিয়ে কিছু পাগলামি আছে। স্কুলের ছাদে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে জৈব চাষ করান। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন যখন যেমন সুযোগ মেলে, সঙ্গে থাকে নোটবই যেখানে ছবি আর লেখা জমা হয়। আর ভালোবাসেন বন্ধু পাতাতে। প্রকৃতি ও মানুষ তাঁর কাছে পরম বিস্ময়কর।

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

15 thoughts on “আমি, গাছ, ফুল ও উত্তম কুমার

  1. আমার স্মৃতি তো বসু পরিবার এরও আগে থেকে/ সাড়ে চুয়াত্তর এর সুচিত্রা জুটি তখনো শুরু হয় নি/ ছবি রিলিজ করার পর প্রথম শোএর টিকিট কাটার লম্বা লাইন দেওয়ার অভিজ্ঞতা আজকাল আর কারো নেই, আজকের প্রজন্মের তো উত্তম- নষ্টালজিয়াই নেই|
    শেষে একটা দুঃখের কথা/ উত্তম কুমারের শেষ অভিনয়ের শুটিং এর স্মৃতি অল্পের জন্য হয়ে ওঠে নি/ 1980 সালের ওই রাতে আমিও ওই সেটের পাশের স্টুডিওতে একটা dubbing এর কাজে ব্যস্ত ছিলাম/ আমার দাদা(চণ্ডী লাহিড়ী) বলেছিলো, ওগো বধূ সুন্দরী শুটিং হচ্ছে দেখে আয়/ কিন্তু রাত হয়ে গিয়েছিলো বলে আর ওই ফ্লোরে ঢুকি নি/ পরদিন সকালেই খবর পেলাম, ওটাই তাঁর শেষ শুটিং ছিল|

  2. এ যে দেখি ভাই গরু রচনার মতো হোলো। এই সব সিনেমা তো আমাদের বালিকা বয়সের, এবং নায়ক বা চিড়িয়াখানা ছাড়া পরিণত মনে কিছু দাগ কাটার মত চলচ্চিত্র নয়। যাই হোক এভাবেও যে ভাবা যায়, সেটা খুব প্রশংশনীয়। এ প্রসঙ্গে খোকাবাবুর প্রত‍্যাবর্তনে পদ্মা নদীর পারে রাইচরণবেশী উত্তম কুমারের কদম ফুল তোলার স্মৃতি চোখে ভাসে।

    1. আমার মনে হয় নিবন্ধটির রচয়িত্রী শ্রীমতি বন্দ্যোপাধ্যায় মহানায়ক উত্তমকুমার অভিনীত এই চলচ্চিত্রগুলির কাহিনী বা নির্মাণের বিষয়ে ততটা ভাবনা কেন্দ্রীভূত করেননি । ওনার এমত ভাবনা খুবই নতুনত্বের দাবি রাখে । অত্যন্ত আধুনিক এবং পরিশীলিত মনের অধিকারী একজন মানু্ষ‌ই কেবল এরকম একতরফা ভাবে কল্পনা করতে সক্ষম হন । রচয়িত্রী নিশ্চিত সেইরকম মনের অধিকারী । যাই হোক, আমার নিবন্ধটি পড়ে খুবই আনন্দ হয়েছে ।

  3. আমার মনে হয় নিবন্ধটির রচয়িত্রী শ্রীমতি বন্দ্যোপাধ্যায় মহানায়ক উত্তমকুমার অভিনীত এই চলচ্চিত্রগুলির কাহিনী বা নির্মাণের বিষয়ে ততটা ভাবনা কেন্দ্রীভূত করেননি । ওনার এমত ভাবনা খুবই নতুনত্বের দাবি রাখে । অত্যন্ত আধুনিক এবং পরিশীলিত মনের অধিকারী একজন মানু্ষ‌ই কেবল এরকম একতরফা ভাবে কল্পনা করতে সক্ষম হন । রচয়িত্রী নিশ্চিত সেইরকম মনের অধিকারী । যাই হোক, আমার নিবন্ধটি পড়ে খুবই আনন্দ হয়েছে ।

  4. পিয়ালী, ভীষণ ভালো আর একদম অন্যরকম দৃষ্টিতে দেখা এই লেখা! এভাবে ভাবানোর জন্যেঅনেক অনেক ধন্যবাদ!!!

  5. সত্যিই ভারী সুন্দর লিখেছে পিয়ালী। তাই ও প্রশংসার দাবি রাখে।
    আমার দেখা প্রথম উত্তম কুমারের ছবি : “সাড়ে চুয়াল্লিশ”, যদিও সে ছবির আসল নায়ক ছিলেন মহাতারকা ঁতুলসী চক্রবর্তী। তারপর একে একে চন্দ্রনাথ, হারাণো সুর, এন্টনীফিরিঙ্গী, দেয়া নেয়া, স্ত্রী, অগ্নিপরীক্ষা….!! ব্যস, তারপর আর শেষ নেই চলার…! এখন ভাবি মহানায়ক জানলে সুখী হতেন যে ওঁনার অভিনীত কোনো চলচ্চিত্র আমার সিলেবাসে আর বাকি নেই।
    তোমরা সব্বাই ভালো থেকো…
    ইতি : দাদা মণি, (দীপঙ্কর দা), (মেসো মণি)।

  6. Ei bhabeyo lekha jaye…!!? Gachh – phool- Moha nayok sob mile mishe … Bhari sundor uposthapona… Smriticharon,shroddha gaypon ….. Anek subhechchha aar abhinondon roilo….

  7. এক অদ্ভুত ভালো লাগার গন্ধ পুরো লেখাটায় ছড়িয়ে আছে। বেশ একটা অভিনবত্বের দাবী রাখে।

  8. প্রকৃতির পাঠ জীবনের প্রতিটি বাঁকে জড়িয়ে না থাকলে বোধহয় এমন করে দেখা যায় না! আমরা এই সত্যটিকে ততটাই অবহেলা করি,যে প্রকৃতি বাঁচা আর সভ্যতার আয়ু সমানুপাতি। পিয়ালীর এই ভাবনা ও দর্শন, আমার তো মনে হয়,আজ পর্যন্ত দ্বিতীয় কেউ ভাবেনি,সেদিক থেকে লেখিকা অদ্বিতীয়া।
    ভবিষ্যতে আরও অভিনব প্রতিবেদনের লোভ কিন্তু সামলানো মুশকিল হবে পাঠকের!
    সাধু সাধু।

  9. কী অদ্ভুত সুন্দর ভাবনা! ভীষণ ভালো লাগল লেখাটা পড়ে… বড্ড ভালো

  10. অন্য আঙ্গিকে ভাবা। ভালো লেগেছে।

  11. পিয়ালী, তোর লেখাগুলোর মধ্যে একটা ভীষন ভালোলাগা ছড়িয়ে আছে, যা মনকে ছুয়ে যায়, এক অভিনবত্বের দাবী রাখে।
    সোমা গুহ রায়।

    ও নিজে পোস্টকরতে পারেনি, তাই আমি করে দিলাম।

  12. আমার লেখা পুর্বের কমেন্টে ভুল বশতঃ “সাড়ে চুয়াত্তর” এর বদলে সাড়ে চুয়াল্লিশ লিখে ফেলায়, দয়া করে আমায় মাফ করবেন।
    ইতি,
    বিনীত, দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়।

  13. এ আমার ভাবনার বাইরে। আমার প্রিয় নায়ক উত্তম কুমার। প্রায় সব ছবিই দেখা। অন্যতম ভালো লাগা ছবি অগ্নিশ্বর। ফুল গাছ নিয়ে তোমার পাগলামি জানি তাবলে এভাবে উপস্থাপন করবে এ ভাবতেও অবাক লাগছে। এক কথায় অসাধারণ। আরও নতুন ভাবে লিখতে থাকো গাছেদের কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *