অনশনশিল্পের খুঁটিনাটি

জয় ভদ্র

সাধারণ বিবেচনায় প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত মানুষের বাধাবিপত্তি নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতোই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দুঃখ যেন তাদের জীবনের একমাত্র নিয়তি, যা তারা প্রত্যক্ষ করে অনিবার্যভাবে। যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাওয়া সেই মানুষগুলোর মানসিকতাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। কঠোর বাস্তব এই যে, পৃথিবীর সর্বত্রই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকগতভাবে প্রান্তিক মানুষদের জীবন সর্বদাই ক্ষমতাবান মানুষের রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে, রাজনীতির গাণিতিক নিয়মে সেই জীবন অনিবার্যভাবে শৃঙ্খলিত হয়ে আছে। কিন্তু এর মধ্যেও একটা কথা আছে, আকাশের কালো মেঘ, যা কি-না সর্বদাই চলমান— তা একসময় যখন আকাশ থেকে সরে যায়, কিংবা মেঘেদের ছেঁড়া পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে সূর্য— মানুষের জীবনও তাই। অন্তত ন্যূনতম বেঁচে থাকার সংগ্রামে, মানুষ সে-বিপদ সরিয়ে আবার নতুনভাবে বেঁচে ওঠার স্বপ্ন দেখে, নিজের এবং পাশের বিপন্ন মানুষগুলোকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। প্রসঙ্গতই, গৌতমের মতন একজন সৃষ্টিশীল, স্পর্শকাতর সংবেদনশীল মানুষদের জীবন প্রান্তিক বা দরিদ্র মানুষের দুর্ভাগ্যগুলো এক সুবৃত্তাকার ও পরিপক্ক ব্যাপ্তি হিসেবেই দেখার অনুপ্রেরণা লাভ করে। এক্ষেত্রে গৌতম প্রান্তবাসী মানুষদের নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচাতে চাওয়ার বিশ্বাসকে নির্লিপ্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর লেখনী শৈলীর মধ্যে দিয়ে।

আরও পড়ুন: জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ১)

গৌতম অর্থাৎ লেখক গৌতম গুহ রায়। ওঁর সাম্প্রতিকতম রচিত গ্রন্থটি আমার হাতে এলো এই কয়েকদিন আগে। বইটা হাতে পাওয়া মাত্রই প্রচ্ছেদ শিরোনামটির দিকে তাকিয়ে মুহূর্ত কয়েকের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। “অনশন শিল্পের খুঁটিনাটি”। অনশন, অর্থাৎ ‘উপবাস’, ‘অনাহারক্লিষ্ট’, ‘উপবাস পিরিত’ বা ‘অনাহারে কাতর’— এইসব শব্দসমূহের শিল্পিত প্রকাশ। হ্যাঁ, প্রসঙ্গতই কাফকা’র ‘অনশন শিল্পী’ (A Hunger Artist) গল্পটির কথা স্মরণে আসে: এই গল্পে আমরা দেখতে পাই শিল্পের প্রতি নিবেদিত একজন অনশন শিল্পীকে। একজন মানুষের দিনের পর দিন না-খেয়ে বেঁচে থাকা ইউরোপে দর্শনীর বিনিময়ে প্রদর্শনীর বিষয় হয়েছিল। একটা খাঁচার মধ্যে অনশন-শিল্পী থাকতেন। তাঁকে ঘিরে উৎসুক জনতা, ম্যানেজার, পাহারাদার…

অর্থাৎ কি-না চরিত্র এখানেই নিজেই অনাহারের পূজারি। সময় যদিও তাঁর চল্লিশ দিনের। কিন্তু তাঁর ভাষণে তিনি অনন্তকাল অনশন চালিয়ে যেতে পারবেন।

সুতরাং কাফকা প্রসঙ্গ আপাতত থাক। বরং আমরা গৌতমেই মন সন্নিবিষ্ট করি। কারণ গৌতমের অনশন-শিল্প শব্দবন্ধটি নিজেই শিল্প সুষমায় ভাস্বর হয়ে প্রতিভাত হয়েছে। অনশনের পরিব্রাজকের ভূমিকাটি সম্পূর্ণ হয়েছে মোট চারটি বড় কাহিনির সমারোহে। উঠে এসেছে এই বাংলার এক ভূখণ্ডের প্রান্তবাসী বা অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষিত মানুষদের জীবনের চিত্র-বিচিত্র্য রূপ, যেখানে সেই মানুষগুলো বাঁচার মরিয়া চেষ্টা করেও শেষপর্যন্ত পরাজিত হয়; নিজের মৃত্যুকে করে তোলে মহৎ।

গৌতমের এই গ্রন্থের চারটি আখ্যানেরই ভৌগলিক বৃত্ত উত্তরবঙ্গ; পটভূমিকা চা-বাগান। সময়কাল বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের প্রায় মাঝপর্ব থেকে শুরু করে বর্তমান শতকের সাম্প্রতিক অতীত। তাই খুবই সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসের ঘটনা মাত্র। আখ্যানগুলো পড়ার পরে মন স্বাভাবিকভাবেই ভাত শিকারের সন্ধানে পরাজিত মানুষগুলোর হাহাকারের জন্মলগ্নটি আবিষ্কারের দায় এসে পড়ে। তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘নৈতিক’ শোষণের চিত্রটি স্পষ্ট হয়।

আরও পড়ুন: অন্ধেরা, নির্বোধেরা

কিছুটা অন্তর্জালের সাহায্য নিতে হয়েছিল। ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেয়ে গেলাম জলপাইগুড়ি বিষয়ক ২০১৫-র ২০ জানুয়ারি আনন্দবাজার অনলাইন সংস্করণের এক রিপোর্ট: “বন্ধ চা বাগানে আসুন মুখ্যমন্ত্রী, দাবি যৌথ মঞ্চের”—এই রিপোর্টের কিছু উদ্ধৃতাংশ তুলে ধরা হল, যাতে গৌতমের আখ্যানগুলোর উৎসমুখকে চিহ্নিত করা যায়:

ক) “খাবার, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, চিকিৎসার দাবি জানান বান্দাপানি বাগানের রেখা ওঁরাও, সুরেন্দ্র নগরের নীরজ ছেত্রীর মতো শ্রমিকরা। তাঁদের দাবি মুখ্যমন্ত্রী এসে দেখে যান অভুক্ত শ্রমিক আর বন্ধ বাগান।”

খ) “… সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, যে সব বাগান কর্তৃপক্ষ চালাতে পারছে না, সেগুলি রাজ্য সরকার অধিগ্রহণ করবে।… “রাজ্য সরকার নির্দেশ মানছে না। ঢোকলাপাড়া বাগান ১৪ বছর থেকে বন্ধ হয়ে রয়েছে। প্রচুর শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।”

গ) “উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির মূলে রয়েছে চা শিল্প। রাজ্য সরকার মেলা করতে ব্যস্ত।”

ঘ) “শ্রমিকদের পিএফ, রেশন, গ্র্যাচুইটির টাকা আত্মসাৎ করে বন্ধ বাগানের মালিকরা বহাল তবিয়তে রয়েছেন। সরকার তাদের ধরতে উদ্যোগী হচ্ছে না।”

সুতরাং স্পষ্টতই ধরা যায় উত্তরবঙ্গের চা-শিল্পজনিত অনশনের খুঁটিনাটি বিষয়টিকে। গৌতমের আখ্যানগুলো এসবেরই অনুষঙ্গ জড়িত, সম্পৃক্ত। আমরা আরেকটু ধৈর্য ধরি। মূল আলোচনায় আসার আগে গৌতমের কাহিনিগুলোর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পটভূমিকার ঐতিহাসিক বৃত্তটাতে একটু ভ্রমণ করে আসি:

চা-বাগান সম্পর্কিত ইতিহাসের সামান্য কিছু কোলাজ

উত্তরবঙ্গের অহল্যাভূমিতে শিল্পের সাধনা বলতে একমাত্র চা-শিল্প। প্রায় ৪০০-র মতো চা-বাগান আছে এখানে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আয়তনের প্রায় ২৪.৬২ শতাংশ অঞ্চলে এই চা-বাগানগুলো গড়ে উঠেছে। ঔপনিবেশিক ভারতের চা-শিল্পের ইতিহাসে ওয়ারেন হেস্টিংস-এর নাম চলে আসাটা একপক্ষে অনিবার্যই বলা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনের একচেটিয়া অধিকার খর্ব করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চা উৎপাদনের বিকল্প দেশ হিসেবে ভারতকেই বেছে নিয়েছিল।

আরও পড়ুন: মানভূমের মনসা পরব

উত্তরবঙ্গ ও অসম চা-শিল্পের মানচিত্রে জায়গা পেলেও এটি কোনও যন্ত্রনির্ভর শিল্প নয়, এটি একটি শ্রমনির্ভর এবং বাগিচা শিল্প। স্থানীয় রাজবংশী জনজাতির বনভূমি পরিষ্কারের জন্য কোনওদিনও এই চা-বাগানগুলোতে কাজ করতে চাইনি। তাই ব্রিটিশ শাসকদেরকে বাইরে থেকে আনতে হয়েছিল শ্রমিক। শ্রমিক হিসেবে এমন মানুষকে আনতে হয়েছিল যাতে তারা বাবুমানুষদের সব হুকুম মুখ-বুজে তামিল করবে, কিন্তু তাদের প্রশ্ন করার কোনও অধিকার থাকবে না। ভারতের এমন আদিবাসী বা জনজাতিদের এখানে বলপূর্বক নিয়ে আসা হত। একবার বাগানের সীমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারলে তাদের আর সেখান থেকে বের হবার কোনও উপায় থাকত না। যাতে এরা মালিকের অত্যাচারে শেষপর্যন্ত সইতে না-পেরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়— সেটাও রোধ করার জন্য চালু হয়েছিল— “Workmen’s Breach of Contract Act (1859)”। মালিকের অত্যাচার কেমন ছিল, তা লেখক সনৎকুমার বসু তাঁর গ্রন্থ Capital and Labour in Indian Tea Industry (1859) বইতে ক্যাপ্টেন ল্যাম্বের ডায়েরি থেকে জানিয়েছেন। বিগত শতকের ষাটের দশকের শেষ থেকে উত্তরবঙ্গের চা-শিল্পের সত্যিকারের সংকট দেখা দিয়েছিল, যা আজও অব্যাহত। সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন ছিল বা আছে, কিন্তু দৃশ্যত নেই। মালিকেরা ইচ্ছেমতো চা-বাগান লকআউট ঘোষণা করে। সেই মালিকরা শ্রমিকের প্রাপ্য অর্থ শুধু নয়, বাগানের সম্পদ লুট করে চলে যাচ্ছে। এই চা-লুটেরাই উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের মৃত্যুর বীজ বপন করে থাকে। এরাই লুট করছে চা-শিল্পকে। বর্তমানে ৪০০টি চা-বাগানের মধ্যে বেশ কয়েকটি বন্ধ। ফলস্বরূপ, হাজারে-হাজারে কর্মহীন শ্রমিকের মধ্যে অনাহারে মৃত্যুর পদধ্বনি। খুন হচ্ছে উত্তরবঙ্গের প্রাণস্পন্দন, ধুঁকছে অর্থনীতি, মরছে চা শ্রমিক। 

ইতিহাসের এই অনুষঙ্গেই গৌতমের গ্রন্থের  চার আখ্যানকে ব্যাখ্যা করা যায়।

সূচিপত্রের চার আখ্যানমালা

ক) পোড়া মানুষ: একটি খসড়া প্রতিবেদন

লেখক উত্তরবঙ্গের তাঁর জীবন অভিজ্ঞতার কথা ন্যারেটিভে বলতে শুরু করেন। কাহিনির শুরুতেই জানা যায় মংলু-র জেলে মৃত্যু দিয়ে। মৃত্যুর কারণও জানা যায়। এক সপ্তাহ ধরে জেলখানায় কয়েদিদের রান্নাঘরে ডিউটি পড়েছিল। ভাতের হাঁড়ির নামানোর সময় ফ্যান গালতে গিয়ে দারুণভাবে দগ্ধ হয় সে। হাসপাতালে স্ট্রেচারে শোয়ানো মংলুর শরীরের ডান দিক ভাত ও মাড়ে থকথক করে, ভাতের মাড়ের নীচেই তার পুরো শরীরটা আড়াল হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৫)

মংলু আসলে ছিল একজন বিচারাধীন বন্দি। সংরক্ষিত অভয়ারণ্য থেকে ধৃত সে; ‘ভারতীয় অরণ্য আইন ১৯২৭-এর ২৬ (১) (ক) আর ‘পশ্চিমবঙ্গ সংশোধনী ১৯৮৮’ এবং ডিপিপি অ্যাক্টের কেস নম্বর ৫০৫/এ-তে অভিযুক্ত হয় মংলু। জলপাইগুড়ি চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে মাত্র ১০০০ টাকায় মংলু জামিনও মঞ্জুর হয়। কিন্তু একজন বিচারাধীন বন্দির জেলে সশ্রম অবস্থায় মৃত্যু কেন? এর উত্তর জেল কর্তৃপক্ষ বা সরকার কারও কাছেই নেই। মলুকে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। কিন্তু তাই বা হবে কেন! সংবাদপত্রে এই খবরটা পড়ে দেবপ্রসাদ দত্ত ওরফে দেবুর মন সাগর নতুন করে তোলপাড় হয়ে ওঠে। নতুন করে আবারও বিচলিত হয় সে। দেবু প্রাক্তন নকশাল। নকশাল শব্দে সে তার আধা মফস্‌সলের মহালয় এক এক্সট্রা ওজোনে নিজেকে কিছুটা আলাদা করে রেখেছেন। মংলুর ব্যাপারে সরকার হাত ধুয়ে ফেললেও দেবু দত্তের মতো মানুষরা চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। এই কাহিনির কথক অর্থাৎ সাংবাদিক দেবুর বাল্যবন্ধু। বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে দেবু মংলুর মৃত্যুর পোস্টমর্টেম চালায়। তারা যায় বামনডাঙা চা-বাগানে, যার পত্তন ১৮৭৯ সালের ১৮ অক্টোবর— এর সোয়াশো বছরের মাথায় বাগানে তালা ঝোলে। এই বাগানের লেবার লাইন অর্থাৎ বনবস্তিতেই মংলুর শিকড়ের সন্ধান পায় তারা। আবিষ্কার হয় ‘লালশুকরা ওঁরাও’। কিন্তু শেষমেশ মংলু বেওয়ারিশই থেকে যায়।

দেবু দত্ত দৌড়ে চলে উজানে, সবুজ গালিচায় মোড়া সত্তরের সেই স্বপ্নের দিকে।

খ) মৃত্যুর নিজস্ব উপত্যকা

উত্তরবঙ্গ চা-বাগানের ঔপনিবেশিক শোষণের যোগ্য উত্তরসূরি আজকের এই নয়া উপনিবেশবাদের সংস্কৃতির অভিঘাত এসে পড়েছিল রঞ্জনের জীবনেও। শোষণের যৌন চরিত্রটি এখানে ধরা দিয়েছে। বাবা ছিল চা-বাগানের করণিক। অকালে বাবার মৃত্যুর পর মধ্যবিত্ত রঞ্জনের পরিবার নিছক নিম্নবিত্তে উপনীত হয়। বড়বাবু সত্যপ্রসন্নের মাধ্যমে রঞ্জন অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে কোনওরকমে সেই বাগানে একটি চাকরি জোটায়। বাগানের ‘সংকটকাল’ তখন শুরু হয়েছে। সে আবিষ্কার করে ‘মালিক ও দালালদের উদ্বৃত্ত কামাইয়ের ঘাটতি নেই, বাবুদের কমিশন কামাইয়ের ঘাটতি নেই, মালিকের বাড়ির দুর্গাপুজোয়, উৎসবের জাঁকজমকের ঘাটতি নেই, অথচ শ্রমিক কর্মচারীর বেলায় শুধুই ‘সংকট’, ‘সংকট’। ইন্ডাস্ট্রি বিপন্ন।’ এক সময় কবিতা লিখত সেই স্পর্শকাতর রঞ্জনকে শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হয়। রঞ্জন নিজেই নিজের মৃত্যুর পোস্টমর্টেম করে দিয়ে যায় তার মৃত্যুর আগে। সে জেনে যায় তার বউয়ের সন্তানও সত্যপ্রসন্নের দান!

গ) দাঙ্গার আঁচে বাইরের সেই রন্ধনশালা

[ছিটমহলের হাহাকার: “বাংলাদেশের মাটিতে থাকা ভারতীয় ছিটের বাসিন্দারা বাজার-হাট থেকে শুরু করে নানা প্রয়োজনের জন্য বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। একই রকম ভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল ভারতের মাটিতে থাকা বাংলাদেশি ছিটের বাসিন্দারা। নানা হুমকিকে অগ্রাহ্য করে ১৫ আগস্ট দাশিয়ারছড়ার বাসিন্দারা নিজের দেশ ভারতের স্বাধীনতা দিবস পালন করার পর তাদের ওপর এসেছে অর্থনৈতিক অবরোধের খাঁড়া।

কোচবিহার তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক এলাকা বাসিন্দাদের সুবিধা-অসুবিধা ও মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাজ্য সরকার ন্যূনতম কাজটুকু করেছে বলে জানা যায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে ব্রাত্য ভারতীয় ছিটের বাসিন্দারা আর ক’দিন ভারতীয় হয়ে থাকতে পারে!: “ভারতের মাটিতে জাতীয় পতাকা তোলার অপরাধে অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ ছিটমহলের বাসিন্দারা”: স্বস্তিকা, ৬৭ বর্ষ সংখ্যা, ২২ ভাদ্র, ১৪২১ বঙ্গাব্দ, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪)]

আরও পড়ুন: রিপন কলেজ: কলকাতা থেকে দিনাজপুর

দাশিয়ারছড়ার মতোই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত এই ছিটের অন্তর্ভুক্ত উপছিট (নম্বর ১৫০) চন্দ্রকোণা। দেশভাগের কারণে ভুবনের পরিবার একদিন এই ছিটে আশ্রয় নেয়। ভুবনদের জাল রেশন কার্ড আছে। দারিদ্র্যে বিধ্বস্ত ভুবনের পরিবার। চোরাকারবারিতে যুক্ত ভুবনকে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের হাত থেকে বাঁচতে একদিন পেটের তাগিদে সুদূর দক্ষিণবঙ্গে পালিয়ে আসতে হয়। ওঠে সুবলের লোহা-লক্কড়ের দোকানে। ঘটনাচক্রে সুবলও  ওপার বাংলার রিফিউজি। সে-ও নিজের মহল্লা ছেড়ে কাল্লুর বউ বিন্নিকে নিয়ে পালিয়ে আসে। কারণ কাল্লুর বউয়ের দরকার ছিল ঠিকঠাকভাবে বেঁচে থাকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সুবলকে জেলে যেতে হয় চোরাই মালের কারবারে যুক্ত থাকার অপরাধে। বিন্নির নিষ্পেষিত অন্তরাত্মাকে আবিষ্কার করে ভুবন। এদিকে ভুবনের সহকর্মী রিফিউজি রফিক ধর্ষিতা হিন্দু চন্দ্রার সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে, কারণ দেশে তখন দাঙ্গার আঁচ লেগেছে।

ঘ) দেহাংশের প্রদীপ

এই আখ্যানটিও উত্তরবঙ্গের পটভূমিকায় রচিত। শহরের উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক সমরের সঙ্গে ভালোবাসা ছিল দেবলীনার। সে সমাজতত্ত্বের ছাত্রী। সুদর্শনা। ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত হয় দেবলীনাকে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয় উত্তরবঙ্গে এসে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য একটি এনজিও’র সামান্য মাইনের চাকরির কাজ নেয়। নিজেকে বাঁচাতে প্রায় বেকার অমিতাভকে বিয়ে করে। নিম্নবিত্তের জীবনের অর্থকষ্টে দেবলীনাকে বাঁচার অনুপ্রেরণা জাগাতে থাকে রাজীব। দেবলীনা আবিষ্কার করে মুখোশ পরে থাকা সমর ও অমিতাভ একই মানুষ— তারা দেবলীনার শরীর ছাড়া কিছুই বোঝে না। রাজীবের কাছে জীবনের বাঁচার অর্থ খুঁজে পায় সে। বিবাহিতা দেবলীনা তার কাছেই নিজেকে সমর্পন করে। কিন্তু ক্যানসার তার জীবন কেড়ে নেয়।

আরও পড়ুন: নদিয়ার পুতুলনাচ

গৌতমের এই আখ্যানগুলো মোটেও সেই অর্থে ছোট গল্প নয়। বড় কাহিনি, অথবা বলা যেতে পারে কোনও নভেলেট বা উপন্যাসের প্রাথমিক খসড়া। প্রতিটি আখ্যানজুড়ে একাধিক চরিত্রের উপস্থিতি বর্তমান। একদা সাংবাদিক গৌতম গুহ রায় তাঁর নিজস্ব জীবন অভিজ্ঞতা রিপোর্টার্স ধর্মী কাহিনিগুলোতে প্রতিটি চরিত্রকে জীবনের ক্যানভাসে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর কলমের শৈল্পিক দক্ষতায়। আখ্যানগুলো পড়ার আগে স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের ফ্রন্ট ব্যাক কভারে চোখ গিয়েছিল। সেখানে দেখা যায় লেখা আছে— তাঁর চারটি আখ্যানের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষুধা। এক ভূমিহীন মানুষের ক্ষুধা, এক চা-শ্রমিক কর্মীর ক্ষুধা, এক অনাগরিক মানুষের ক্ষুধা, এবং এক স্বপ্ন দেখা ও দেখানোর ব্রত নেওয়া এক মেয়ের ক্ষুধা ও মৃত্যু। বাস্তবতই, প্রতিটি ক্ষুধা ও মৃত্যুর চরিত্রকে গৌতম তাঁর অন্তরের অসীম ভালোবাসা ও মায়া জড়ানো চোখ দিয়ে এঁকেছেন, যা অনশন শিল্পের এক সার্থক খুঁটিনাটি প্রকাশ।

বইয়ের নাম অনশনশিল্পের খুঁটিনাটি
লেখক গৌতম গুহ রায়
প্রকাশক চিন্তা

ছবি: ইন্টারনেট

জয় ভদ্র-এর জন্ম মুর্শিদাবাদ শহরে (লালবাগ)।  ‘হরপ্পা’, ‘হাজার শতাব্দীর রূপকথা অথবা রাজনৈতিক বিষণ্ণতা’, ‘ইডিকেস’-এর মতো বইয়ের লেখক তিনি, নয়ের দশকের শেষ লগ্ন থেকে লেখালেখি শুরু। ‘হরপ্পা’ অনূদিত হয়েছে হিন্দি ভাষায়। এছাড়াও তাঁর ছোটগল্পগুলো একসময় বিভিন্ন হিন্দি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ছিলেন এক বিশেষ পত্রিকার কার্যকরী সম্পাদক। একটা সময়  মূলত সাংবাদিকতার সঙ্গে সঙ্গে চালিয়ে গিয়েছিলেন সাহিত্যকর্ম। ২০১৩-২০১৭ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ শিশু কমিশনের (WBCPCR) সদস্য ছিলেন। এই মুহূর্তে পুরোপুরি সাহিত্যেই মনোনিবেশ করেছেন। গল্প, উপন্যাস যেমন তাঁর অবাধ বিচরণক্ষেত্র, তেমনি পুস্তক সমালোচনা এবং নাট্য-সমালোচক হিসাবেও সমাদৃত হয়েছেন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *