Latest News

Popular Posts

অনাথ

অনাথ

টিনা ভট্টাচার্য

বাজার থেকে ফেরার পথে উপেন মাস্টারের সঙ্গে দেখা হল মনোজ বাবুর। উপেন মাস্টারের হাতে বাজারের থলে আর কিছু জামাকাপড়ের প্যাকেট দেখে মনোজবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হে উপেন, হঠাৎ এত জামাকাপড় কিনলে যে? কোনও অনুষ্ঠান বাড়ি আছে?’

‘আরে না গো মনোজ, অনুষ্ঠান বাড়ি নয়, আসলে নতুন বছর আসছে তো, ছেলেটা যদি নাতি বউমাকে নিয়ে বাড়ি আসে তাই ছোট্ট নাতিটার জন্য আর ছেলে-বউমার জন্য সামান্য কিছু জামাকাপড় কিনলাম। নাতির মুখ দেখব প্রথমবার, তাই আর কি।’ উপেন মাস্টার বললেন।

‘প্রতি বছরই তো তুমি জামাকাপড় কেনো, আর বলো যে তোমার ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি আসবে। বিগত দশ বছর ধরে তো তাদের আসা আর দেখতে পাই না।’ মনোজবাবু বললেন। 

‘আসলে ওর অফিসের চাপ প্রচুর।  তাই সেরমভাবে আসতে পারে না, আর বিদেশ-বিভুইয়ে থাকে, হয়তো ভিসা পাসপোর্টের সমস্যা হয় তাই আসতে পারে না। এবার আসি। তোমার বউদি আবার বসে আছেন রান্নার জন্য।’ উপেন মাস্টার এই বলে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালেন।

আরও পড়ুন: সুলেমানের গল্প

দশবছর আগে নিজের জমি বেচে উপেন মাস্টার ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়তে যায় উপেন মাস্টারের ছেলে অরিত্র। বিদেশে গিয়ে প্রথম প্রথম বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালোই যোগাযোগ রেখেছিল অরিত্র। মাসে দু’বার করে ফোন করত। তখন মা-বাবাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অরিত্র, চাকরি করে বাবার জমি ফিরিয়ে দেবে। নতুন বাড়ি করে দেবে আর নয়তো নিজে যেই দেশে কর্মরত, সেখানেই নিয়ে যাবে বাবা মা-কে। কিন্তু সেসব প্রতিশ্রুতি হয়তো অরিত্র ভুলে গেছে। বিয়ের পর একবারও আসেনি অরিত্র দেশে। শুধুমাত্র একটা ফোন কলে জানিয়েছিল নিজের বিয়ের কথা। নাতিকেও একবারের জন্য আনেনি অরিত্র। কিন্তু প্রতি বছর উপেনবাবু তার ছেলে-বউমা আর নাতির জন্য জামাকাপড় কেনেন। উপেনবাবুর মস্তিষ্ক জানে যে ছেলে আসবে না, কিন্তু তবু মন মানতে চায় না। প্রতিবছর এই জামাকাপড় গুলো কিনে তিনি যেন এক আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন।

বাড়ির কাছে এসে উপেনবাবু দেখলেন তার স্ত্রী সুরবালা দেবী বারান্দার গ্রিল ধরে তারই অপেক্ষা করছে।

‘আবার এসব জামাকাপড় কিনে পয়সা খরচ করতে গেলে কেন?’ সুরবালা দেবী তাঁর স্বামীর উদ্দ্যেশ্যে বললেন।

‘কিনলাম সুর, যদি ভুল করেও তোমার ছেলে কখনও আসে, তবে সে দেখবে তার বাবা-মা তাকে ভুলতে পারেনি একমুহূর্তের জন্যও। দশবছর আগেও সে যেমন আমাদের আদরের দুলাল ছিল আজও তাই আছে।’ উপেনবাবু বললেন।

সুরবালা দেবী রান্নাঘরের দিকে এগোলেন।

••

বিকেলে মনোজবাবুর সঙ্গে হাঁটতে বের হন উপেনবাবু। মনোজবাবু নিঃসন্তান। স্ত্রী বিয়োগের পর তিনি একাই থাকেন তাঁর একতলা বাড়িতে। সঙ্গে খাওয়া-পরার একজন লোক রামু। মনোজবাবু আর উপেনবাবুর জীবনের কাহিনি বলতে গেলে প্রায় একই। মনোজবাবুর এই সত্তর বছর বয়সে দেখার কেউ নেই কাজের লোক রামু ছাড়া; আর উপেনবাবুর দেখার লোক থেকেও নেই, ছেলে অরিত্রর তৈরি পরিগণ্ডির মধ্যে উপেনবাবু আর তাঁর স্ত্রী সুরবালার স্থান হয়নি। তবুও ‘আশায় বাঁচে চাষা’র মতোই উপেনবাবু স্বপ্ন দেখেন ছেলে-বউমা আর নাতি একদিন দেশে ফিরে আসবেই। সেদিন তাঁর ভরা সংসার হবে। ছোট্ট দাদুভাইকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মনোজবাবুর সঙ্গে বিকেলে হাঁটতে বেরোবেন।

‘উপেন, আজ যে বড় মনমরা হয়ে হাঁটছ? কী হয়েছে?’ মনোজবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

‘মাঠে ছোট ছোট বাচ্চাদের খেলতে দেখে মনটা বড় আনচান করে গো।  আমার ছোট্ট নাতিকে তো দেখিনি। বেঁচে থাকতে আর দেখতে পাব কিনা জানি না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন উপেনবাবু।

মনোজবাবু কোনও সান্ত্বনা বাক্য খুঁজে পেলেন না উপেনবাবুকে দেওয়ার জন্য। দু’জনে হাঁটতে লাগলেন বাড়ির পথে।

বাড়ি ফিরে উপেনবাবু দেখেন, সুরবালা দেবী ছেলে অরিত্রর ছোটবেলার খেলনা গাড়ি আর বইখাতাগুলো লোহার ট্রাঙ্ক থেকে বের করেছেন; শাড়ির আঁচল দিয়ে জমে থাকা ধুলো মুছছেন।

‘স্মৃতির পাতা যত খুলবে বুকের ভিতর থেকে তত রক্ত ঝড়বে সুর, খুলো না। রেখে দাও।’ উপেনবাবু বললেন। 

‘এই স্মৃতিগুলোই তো আছে গো, যার স্মৃতি সে তো থেকেও নেই গো। হ্যাঁ গো তোমার মনে আছে, প্রতিবার কালীপুজোর মেলায় গেলেই খোকন বায়না করত ওই চারচাকা গাড়ি কেনার জন্য…?’ সুরবালা দেবী আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন।

‘মনে থাকবে না আবার! সে এক কাণ্ড হত। মেলায় গিয়ে বাবুর জিলিপি খাওয়া পছন্দ না, নাগরদোলায় চড়াও পছন্দ না। শুধু চারচাকা গাড়ি চাই তার।’ উপেনবাবু বললেন।

‘আর আদো আদো গলায় কি সুন্দর বলত’, আমি বও হয়ে টোমাদের এমন গাঈ চওয়াব।’ সুরবালা দেবী ছেলের গলা নকল করে বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন।

আরও পড়ুন: চোর

‘কেঁদো না সুর, আমাকে দেখো না আমি কেমন শক্ত আছি। ছেলের আমাদের বড় চাকরি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, হয়তো বা বিদেশে তার একটা বাড়িও হয়েছে। শুধু আমাদের আর সে গাড়ি চড়া হল না। তাতে দুঃখ কি সুর? তুমি তোমার ছেলের জন্য নিজের গায়ের গয়না খুলে দিয়েছ, আমি আমার সাধের জমি বেচে দিয়েছি। সন্তানের জন্য এটুকু ত্যাগ কিছুই নয় গো। আজ দশ বছর পেরোতে যায় ছেলেটার স্পর্শ পাইনি। এর থেকে বড় দুঃখ আর…”  বলতে বলতে গলা বুজে আসে উপেনবাবুর। পাঞ্জাবির খুঁট দিয়ে চোখ মোছেন তিনি।

এমন করেই দিন চলে যায় দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধার। স্মৃতির পাতায় চোখ রেখে দীর্ঘশ্বাস পড়ে তাদের। ছুঁয়ে দেখতে পারেন না নিজের সন্তানকে। যে ভরা সংসারের স্বপ্ন দেখেছেন তারা চিরকাল তা যেন আজ মরীচিকা। 

উপেনবাবু একটা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। জমানো প্রভিডেন্ট ফান্ড ও আস্তে আস্তে ক্ষুদ্র আকার ধারণ করছে।

ইতিমধ্যে স্ত্রী সুরবালার অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথা তীব্র আকার ধারণ করছে।  অপারেশন না করলেই নয়। উপেনবাবু ভাবলেন ছেলেকে একবার ফোন করবেন। যদি সপ্তাহখানেকের জন্য ছেলে, বউমা আর নাতি আসে। বয়স হয়েছে তার, এইসব অপারেশপনে একটু হলেও তার এখন আতঙ্ক হয়। ছেলে আর বউমা যদি এসে একটু পাশে দাঁড়ায়, তবে হয়তো একটু সাহস পাবেন। তাই ভাবার সঙ্গে সঙ্গে ফোনে ছেলের নম্বর ডায়াল করল;

‘হ্যাঁ…  হ্যালো খোকন?’

‘হ্যাঁ বাবা, বলো।’

‘খোকন, বলছি বাবু, তোর মায়ের অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যথাটা খুব বেড়েছে রে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন না করলেই নয়। তোরা যদি একটু…’

‘বাবা এই মুহূর্তে তো আমি কিছু পাঠাতে পারব না। আর যেতেও পারব না কারণ আমার ছেলের তো স্কুল স্টার্ট হয়েছে।’

‘আমি তো তোর কাছে কিছু চাইনি বাবা, শুধু বলেছি একটু যদি আসতি তোরা। দ্যাখ আমাদেরও তো বয়স হয়েছে। আজ আছি কাল নেই। তাই চোখ বোজার আগে যদি নাতিকে একবার দেখতাম; মানে বড় সাধ ছিল তোর মায়ের আর আমার।’

‘বাবা, অফিসে আছি। এত কথা বলতে পারছি না। রাখছি। পরে কথা বলব।’ ফোনটা কেটে গেল। 

উপেনবাবু ফোনের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, তিনি কি নিজের ছেলের সঙ্গে কথা বললেন?

বিকেলে তিনি আজ হাঁটতে বেরোননি। নিজের সাধের জমিটার কিছুদূরে দাঁড়িয়ে একভাবে তাকিয়ে আছেন। রক্তজল করা পরিশ্রমের টাকায় জমিটা কিনেছিলেন। ছেলের স্বপ্নপূরণের জন্য বিক্রি করে দিয়েছেন। সেখানে এখন বড় ফ্ল্যাটের ভিত হচ্ছে। আর উপেনবাবুর সংসারের ভিত? যে ভিত তিনি তৈরি করতে নিজের শখ আহ্লাদ ত্যাগ করেছেন সেই ভিতে যেন পোকা ধরেছে। কোনও ইমারতই আর দাঁড়াবে না হয়তো।

‘উপেন, এখানে দাঁড়িয়ে মনখারাপ করলে হবে না। বউদির অবস্থা ভালো নয়। রামুকে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আনতে পাঠিয়েছি। চলো হাসপাতালে যেতে হবে।’ মনোজবাবুর কথায় চমক ভাঙে উপেনবাবুর। তড়িঘড়ি তিনি আর মনোজবাবু হাঁটা লাগান বাড়ির দিকে। গিয়ে দেখেন অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। তাড়াতাড়ি সুরবালা দেবীকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিলেন উপেনমাস্টার আর তার প্রতিবেশী বন্ধু মনোজবাবু।

অপারেশনের দু’দিন পর সুরবালা দেবীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেন উপেনবাবু। স্ত্রীর সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করলেন বাড়ি বেচে দেবেন তিনি। তারপর দুই বুড়ো বুড়ি মিলে এক অনাথ আশ্রমে চলে যাবেন। তারাও আজ একপ্রকার অনাথ। আর অনাথ আশ্রমের অনাথ শিশুদের মাঝে নিজেদেরকে আবার পিতা-মাতা হিসেবে খুঁজে পেতে চান উপেনবাবু। স্ত্রী সুরবালা দেবীও রাজি। কিন্তু ছেলের ছোটবেলার স্মৃতি তার দুর্বলতা।

উপেনবাবু চিঠি লিখলেন ছেলের উদ্দ্যেশ্যে, 

স্নেহের অরিত্র,

তোমার জীবনে সব কিছু কুশল হোক এই কামনা করি। কোনও অর্থনৈতিক কিংবা মানসিক সাহায্য চাইতে তোমার কাছে আমার এই চিঠি নয়; নিতান্তই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি এবং তোমার মা। তাই জানাতেই এই চিঠি। তোমার স্বপ্নপূরণের জন্য আমি আমার জমি বেচেছি, তোমার মা তার গায়ের গয়নাও নির্দ্বিধায় খুলে দিয়েছেন। তাতে আমাদের কোনও আপশোস নেই। কারণ তুমি আমাদের একমাত্র সন্তান। তোমার ভালো থাকাই আমাদের ভালো থাকা। তবে তোমার গড়ে তোলা বিলাসবহুল পরিমণ্ডলে আমরা হয়তও উচ্ছিষ্ট। যাই হোক,  কথা না বাড়িয়ে আসল কথায় আসি। যে বাড়িতে তুমি তোমার ছেলেবেলা থেকে যৌবনকাল অবধি কাটিয়েছ, সেই ভিটেমাটি আমি বিক্রি করে দিচ্ছি। আমরা আমাদের নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে পা বাড়াচ্ছি। শুধু চোখ বোজার আগে আদরের দাদুভাইকে একটু দেখতে পেলাম না— এই একটাই আপশোস। সঙ্গে তোমার কিছু সামগ্রী পাঠালাম; কারণ এই বুড়ো বয়সে স্মৃতির পাতা আঁকড়ে আমি বা তোমার মা কেউই দুর্বলতার বোঝা বাড়াতে চাই না। ভালো থেকো। 

ইতি
তোমার জন্মদাতা

আরও পড়ুন: অভ্যাসবশত

এরপর উপেনবাবু তার খোকনের যাবতীয় জিনিসপত্র, খেলনা গাড়ি, ছড়ার বই সমস্ত কিছু প্যাকিং করে স্পিড পোস্ট করে দিলেন লন্ডনবাসী ছেলের ঠিকানায়।

বাড়ির দলিল যখন ক্রেতার হাতে হস্তান্তর হচ্ছে, উপেনবাবু আর সুরবালা দেবীর যেন বুক থেকে রক্ত ঝরছে। এরপর আর পিছন ফিরে তাকান না তারা। এগিয়ে যেতে থাকেন নতুন গন্তব্যের পথে। যেতে যেতে দেখেন মনোজবাবুও তাদের সঙ্গী হতে আসছেন। মনোজবাবু বললেন— ‘উপেন, আজ সকালে খবরের কাগজে একটা খবর দেখলাম হেডলাইনে।’

‘কি খবর মনোজ?’

‘আরে, সুপ্রিম কোর্ট নাকি রায় দিয়েছে বৃদ্ধ বাবা-মা’কে না দেখলে কড়া পদক্ষেপ নেবে। খবরটা আর ক’দিন আগে বেরোলে তোমার ছেলে জব্দ হত।’

‘ঠাকুরপো, যে নাড়িছেঁড়া ধনের কাছে গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় জরুরি, সে নাড়িছেঁড়া ধন নয় গো ঠাকুরপো… সে নাড়িছেঁড়া ধন নয়। এই যে এত বছর ধরে তোমার বন্ধু যে ছেলে-বউমা নাতির জন্য এত জামাকাপড় কিনেছে, সেগুলো আজ নিয়ে যাচ্ছি আমাদের অনাথ সন্তানদের জন্য। আমরা এখন নিঃসন্তান দম্পতি, নতুন সন্তানদের আপন করে নিয়ে নিজেদের বুকফাটা কষ্টের জ্বালা একটু হলেও ভুলতে চাই ঠাকুরপো।’ সুরবালা দেবী কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন।

সুরবালা দেবীর কথা শেষ হতেই উপেনমাস্টারের ফোনে ফোন আসল একটা।

‘হ্যালো… আমি তোমার চিঠি আর…’

‘কে বলছেন?’ উপেনমাস্টার জিজ্ঞেস করলেন।

‘খোকন বলছি বাবা…’

‘রং নম্বর।’ এই বলে ফোন কেটে দেন উপেনবাবু।

সুরবালা দেবী জিজ্ঞাসু চোখে স্বামীর দিকে তাকালে উপেনবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দেন, ‘রং নম্বর সুর।’

ছবি ইন্টারনেট

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *