Latest News

Popular Posts

অন্য ২৫ জুনের গল্প: নব্বুইয়ে পা ভারতীয় ক্রিকেটের এক গৌরবোজ্জ্বল দিনের

অন্য ২৫ জুনের গল্প: নব্বুইয়ে পা ভারতীয় ক্রিকেটের এক গৌরবোজ্জ্বল দিনের

শুভ্রাংশু রায়

সাধারণভাবে ২৫ জুন তারিখটি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি বিশেষ গৌরবের দিন হিসেবে পালিত হয় ১৯৮৩ সালের পর থেকেই। কারণ ওইদিন ভারত একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তৃতীয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বিশ্ব খেতাব জয়ী হয়েছিল। অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ এবং ইতিহাসবিদ ওই দিনটিকে ‘চাকা ঘোরানোর দিন’ হিসেবে মনে করেন, কারণ এই বিশ্বজয় ভারতীয় খেলাধুলার ক্ষেত্রে ক্রিকেটকে ক্রমশ এক নম্বরে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

আরও পড়ুন: লেন্সের ভিতর থেকে বিশ্বজয় দর্শন: স্মৃতির সফরে শ্রেণিক শেঠ

তবে ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের পাতা ওলটালে এই ২৫ জুন তারিখে আরও একটি গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা চোখে পড়ে। সেটি ঘটেছিল ১৯৮৩ থেকে আরও ৫১ বছর আগে। একই ভেন্যু অর্থাৎ লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডেই। ১৯৩২ সালে প্রথমবার টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নেমেছিল ভারতীয় দল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। যদিও সেই ম্যাচে সফরকারী ভারতীয় দল চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু ২৫ জুন ১৯৩২ কেবলমাত্র প্রথমবারের জন্য  টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামার জন্য ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইন ফিল্ড অর্থাৎ মাঠের মধ্যে পারফরম্যান্সের জন্য এই দিনটি ভারতীয় ক্রিকেট বিশেষভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: মাদেইরার আগুন, রোজারিওর বৃষ্টি

তবে এই ঘটনা অর্থাৎ ভারতের প্রথম টেস্ট খেলার ঘটনাটি এই দিনে নাও ঘটতে পারত, যদি না দৃশ্যপটে মহাত্মা গান্ধি চলে আসতেন। ভারতের টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নামার সঙ্গে গান্ধির সম্পর্ক কীভাবে আসছে? প্রশ্নটা নিশ্চয় মনে জাগছে। আসলে ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স বা আইসিসি (সেই আমলে এটাই ছিল আইসিসি-র পুরো নাম। ১৯৬৫ সালে নাম পরিবর্তিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কনফারেন্স এবং তারপর ১৯৮৯ বর্তমান নাম ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল।) ভারতকে ষষ্ঠ দল হিসেবে টেস্ট স্ট্যাটাস দিয়েছিল ১৯৩১ সালে এবং স্থির হয়েছিল ইংল্যান্ড সেই বছরে ভারতে এসে প্রথম টেস্ট খেলবে আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলনজনিত কারণে দেশের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলার অভাব দেখা দেওয়ায় ব্রিটিশ টিমের পক্ষে ভারতে এসে টেস্ট খেলা সম্ভবপর হয়নি। তাই ১৯৩২-এর ২৫ জুন অবধি ভারতীয় দলকে অপেক্ষা করতে হয় প্রথম টেস্ট ম্যাচটি খেলার জন্য।

আরও পড়ুন: দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

তবে ১৯৩২-এ ভারতীয় দলের ইংল্যান্ড সফর স্থিরীকৃত হলেও মহাত্মা ইস্যু সম্পূর্ণভাবে এই সফরকেও ছেড়ে যায়নি। ১৯৩২-এর জানুয়ারিতে মহাত্মা গান্ধি গ্রেপ্তার হন। ফলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিলই। সফরের জন্য নির্বাচিত হলেও গান্ধির সমর্থনে বিজয় মার্চেন্ট ইংল্যান্ড সফরে দলের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেন। শেষপর্যন্ত বিভিন্ন টানাপোড়েন কাটিয়ে শেষপর্যন্ত আঠারো সদস্যের দল ঘোষিত হয়, যাঁরা ইংল্যান্ড সফরের জন্য নির্বাচিত হন।

মহম্মদ নিসার

এবার একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। ১৯১১-তে একটি ভারতীয় বেসরকারি দল ইংল্যান্ডে বেশ কয়েকটি ম্যাচ খেলেছিল। সেই সফরে অধিকাংশ ম্যাচে সফরকারী দলের কপালে পরাজয় জুটলেও ভারতীয়দের মধ্যে ক্রিকেট যে ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে এবং সেখানকার অধিবাসীরা খেলাটিতে যে যথেষ্ট পরাঙ্গম হয়ে উঠছে, তার সাক্ষ্য রেখেছিল। ১৯২৬-এ ভারতে আর্থার গিলিগানের অধিনায়কত্বে সফরে আসা এমসিসি দলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ভারতীয়রা বেশকিছু উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স (এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বোম্বে জিমখানার হয়ে ১১টি ছক্কা সহ কর্নেল সি কে নাইডুর ১৫৩ এবং পুনা জিমখানার হয়ে অধ্যাপক ডি বি দেওধরের অনবদ্য ১৪৮-এর কথা বলা যেতে পারে।) ভারতকে টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে সাহায্য করে। শোনা যায়, এমসিসির অথরিটির কাছে সুপারিশ জানিয়েছিলেন স্বয়ং ব্রিটিশ দলের অধিনায়ক আর্থার গিলিগান। আইসিসি-র ১৯৩০ সালের বার্ষিক সভায় ভারতকে ষষ্ঠ টেস্ট খেলিয়ে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর আগেই ১৯২৮-তে গ্রান্ট গ্রোভান, এন্টনি ডি মেলো, নবাব হামিদুল্লা খান প্রমুখের পৃষ্ঠপোষকতায় বিসিসিআই অর্থাৎ বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন: ফুটবল পরিসরে উপেক্ষিত দুই ইতালীয় ‘তরুণে’র গল্প

১৯৩২ সেই আলোচিত সফরের জন্য আঠারো সদস্যের দলের অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হল পোরবন্দরের মহারাজা নটবর সিংহজি এবং সহ-অধিনায়ক হিসেবে ঘোষিত হল লিম্বডির রাজকুমার কুমারশ্রী ঘনশ্যামজির নাম। সেই সময় রীতি ছিল উচ্চ বংশজাতদের দলের অধিনায়ক এবং সহ-অধিনায়কের পদ দেওয়া। ১৯৩২ সফরে সেই ধারাকেই অক্ষুণ্ণ রাখা হয় ক্রিকেটীয় স্কিলে যোগ্য খেলোয়াড়দের বাদ রেখে রাজ পরিবারের লোকদের অধিনায়ক বা সহ-অধিনায়ক পদ দিয়ে। কিন্তু ঘটনাচক্রে এই ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে টেস্টের দল থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন সফরের অধিনায়ক মহারাজা নটবর সিংহজি ও সহ-অধিনায়ক ঘনশ্যামজি। শেষমেশ প্রাথমিক বিতর্কের পরে অভিষেক টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব কর্নেম কোট্টারি কানাকাইয়া নাইডু অর্থাৎ সি কে নাইডুকে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: কপিল দেব ১৭৫:৩৮, ইতিহাস থেকে ক্রিকেট রূপকথা

The longest shot
সি কে নাইডু, ১৯৩২

বোম্বে বন্দর থেকে ভারতীয় দল জলপথে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ২ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে। ১৫ এপ্রিল জাহাজ মার্সেই বন্দরে পৌঁছয়। সেখান থেকে ভারতীয় দল ট্রেনযোগে পরের দিন লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে উপনীত হয়। ভারতীয় দলের লন্ডন শহরে ঠিকানা হয় মিডল্যান্ড গ্র্যান্ড হোটেল। বেশ কয়েকটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার পরে অবশেষে লর্ডসে ভারতীয় দল প্রথমবারের জন্য টেস্ট খেলতে নামার জন্য প্রস্তুত হয়। আগেই উল্লেখিত দিনটি ছিল ২৫ জুন, ১৯৩২। ভারতীয় দলের প্রথম এগারো যাঁরা সেদিনের সেই ঐতিহাসিক টেস্টে লর্ডসের এমসিসি প্যাভিলিয়ন থেকে মাঠে নেমেছিলেন, তাঁরা হলেন অধিনায়ক সি কে নাইডু, নাওমেল জিওমল, সৈয়দ ওয়াজির আলি, সোরাবজি কলাহ, ফিরোজ পালিয়া, মহম্মদ নিশার, জাহাঙ্গির খান, জনার্দন নভলে (উইকেটকিপার) অমর সিং, লাল সিং এবং নাজির আলি।

বডিলাইন সিরিজ খ্যাত ডগলাস জার্ডিন ছিলেন ব্রিটিশ অধিনায়ক। দলে ছিলেন পার্সি হোমস, হারবার্ট সাটক্লিফ, ফ্র্যাঙ্ক উলি, ওয়াল্টার হ্যামন্ড, ওয়াল্টার রবিনস, এডি পেন্টার, বিল ভোসের মতো তৎকালীন সময়ের রীতিমতো তারকা মর্যাদা খেলোয়াড়। টসে জিতে ইংল্যান্ড ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমবার টেস্ট খেলতে নামা সত্ত্বেও ভারতীয় দল সবুজ মাঠে যথেষ্ট উজ্জীবিত হয়ে খেলতে শুরু করে। খেলা শুরু হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে ১৯ রানের মাথায় তিন উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। এই তিনজন আউট হওয়া ব্যাটসম্যান ছিলেন হোমস, সাটক্লিফ এবং ফ্র্যাঙ্ক উলি। পরবর্তী সময়ে অবশ্য খেলার রাশ নিজেদের হাতে কিছুক্ষণের জন্য তুলে নেন অধিনায়ক জার্ডিন এবং হ্যামন্ড। তা সত্ত্বেও বোলিং আর ফিল্ডিংয়ে দারুণ পারফরম্যান্স ছিল ভারতীয় খেলোয়াড়দের। পরের দিনের কাগজের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, দুর্ধর্ষ ফিল্ডিং করেছিলেন লাল সিং। ভারতের দুই ওপেনিং ফাস্ট বোলার মহম্মদ নিসার ও অমর সিং লোধা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। মহম্মদ নিসার তাঁর বিধ্বংসী গতিতে নেন মাত্র ৯৩ রানের বিনিময়ে ইংল্যান্ডের ৫ উইকেট। স্বাভাবিকভাবে এটি ছিল টেস্ট কোনও ভারতীয়ের এক ইনিংসে প্রথম পাঁচ উইকেট এবং এই কৃতিত্ব ২৫ জুন তারিখেই অর্জিত হয়। অপর পেসার অমর সিং আউট করেন দু’জন ইংরেজ ব্যাটসম্যানকে। অধিনায়ক সি কে নাইডু নেন আরও দু’টি উইকেট। ইংল্যান্ডের ইনিংস প্রথম দিনের চা-পানের সামান্য আগে শেষ হয়ে যায় ২৫৯ রানে। তাঁরা ভারতীয়দের ১০৫.১ ওভার খেলতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর খেলতে নেমে ভারতের দুই ওপেনার জনার্দন নাভলে এবং নাওমেল জিওমল দিনের শেষে অপরাজিত থেকে ভারতীয় দলের রান সংখ্যা বিনা উইকেট ৩০ নিয়ে যান।

তবে অনভিজ্ঞতার কারণে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা পরের দিন থেকে ব্যাট হাতে সেভাবে সফল হতে পারেননি। তার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ভারতীয় দলের ব্যাটিংয়ে প্রথম ইনিংসে সি কে নাইডু ৪০ রান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে সৈয়দ ওয়াজির আলি ৩৯ রান। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে এবং ম্যাচে ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর এবং ভারতীয় দলের মধ্যে ব্যাট হাতে একমাত্র অর্ধশতরান করেন অমর সিং (৫১)। ভারত ম্যাচটি হেরে যায় ১৫৮ রানে। ২৫ জুন, ১৯৩২ দিনটি কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটারদেরই ছিল। সেদিন শুধুমাত্র ভারতীয় ক্রিকেট দল টেস্ট ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ করেছিল বলে নয় বোলিং এবং চা-পানের পরে ব্যাটিংয়ে রীতিমতো টক্কর দিয়েছিল শক্তিশালী ব্রিটিশ টিমের সঙ্গে। আলোচনার শুরুতেই বলা হয়েছে যে, এই লর্ডসের মাঠেই ৫১ বছর পরে এই ২৫ জুন তারিখেই একদিনের আন্তজার্তিক ক্রিকেটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত। সে জয় বহু চর্চিত। কিন্তু ৯০ বছরে পা দিতে চলা ১৯৩২ আনকোরা ভারতীয় দলের টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম দিনের নজরকাড়া পারফরমেন্স আলোচনার বৃত্ত থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

7 thoughts on “অন্য ২৫ জুনের গল্প: নব্বুইয়ে পা ভারতীয় ক্রিকেটের এক গৌরবোজ্জ্বল দিনের

  1. এই লেখাটা পড়তে গিয়ে রাজাদের বিলিয়ার্ডস আর পোলো খেলার কথা মনে হচ্ছিল।
    কী ছিল ফুটবল তৈরির ইতিহাস ।
    সাধারণ মানুষ খেলত কী?
    জানার আগ্রহ রইলো ক্রীড়া গবেষক ও অধ্যাপক শুভ্রাংশু রায় এর কাছে।

  2. ক্রীড়াজগৎ আর মিডিয়ার সম্পর্কে ও একজন ফটো জার্নালিস্টের জীবনভাষ‍্য রচনার জন‍্য শুভ্রাংশু ও প্রসেনজিতকে শাবাস জানাই।

  3. দাদা চিরাচরিতভাবে অনবদ্য। অনেক নতুন অজানা তথ্য জানতে পারলাম। ধন্যবাদ।

  4. এইদিনটা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। আমাদের স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দিলো এই অনবদ্য লেখাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *