প্রণববাবুকে যেমন দেখেছি

ড. অরবিন্দ ঘোষ

শিক্ষকের কর্মজীবন এমনিতেই বেশ ঘটনাবহুল। কত নতুন মুখ প্রতিবছর আনাগোনা করে। তাদের সঙ্গে নতুন অভিভাবক, নতুন গল্প। শিক্ষক হিসেবে এই পাওয়াটা আমায় বারবার মুগ্ধ করেছে। শুধুমাত্র কাজের সুবাদেই কত মানুষের সঙ্গে আলাপ, কত গুণিজনের সান্নিধ্য পাওয়ার অবকাশ হয়েছে আমার, ভাবলে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে হয়। হয়তো নেহাতই কাজের সূত্রে যোগাযোগ, তবু সেই স্বল্প পরিসরেই কিছু মানুষ আজীবনের মতো দাগ কেটে যান হৃদয়ে। শ্রদ্ধায়, সমীহে মাথানত হয়ে আসে। সেইরকমই এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি শ্রীপ্রণব মুখোপাধ্যায়। আমার অসীম সৌভাগ্য যে, এমন প্রাজ্ঞ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ আমার জীবনে এসেছে একাধিকবার।

বিদ্যানগর কলেজ। ছবি সৌজন্য: vidyanagarcollege.net

১৯৬৩ সালে বিদ্যানগর কলেজ প্রতিষ্ঠা হলে প্রণববাবু সেই কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। শুধু যোগদান করেন বললে ভুল বলা হবে। প্রকৃত অর্থেই তিনি সর্বোতভাবে এই কলেজের সমস্ত কিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েন। ভালোবেসে ফেলেন এই প্রতিষ্ঠান ও তার ছাত্রছাত্রীদের। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্বও গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর পথ তো আর এই চৌহদ্দিতে আটকে থাকার নয়। ভাগ্য সবার অজান্তেই তখন তাঁর ভাগ্যে লিখছে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারীর গরিমা। সেই পথে এগিয়ে যেতে চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণ রূপে রাজনীতিতে যোগ দিলেন ১৯৬৮ সালে। চাকরি থেকে ইস্তফা দিলেও বিদ্যানগর কলেজকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি কখনোই। সত্যিই যে এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি ভালোবেসে ছিলেন তার প্রমাণ পেয়েছি বারবার। বিদ্যানগর কলেজে আমার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তাই বারবার পেয়েছি তাঁর সান্নিধ্য।

২০ জানুয়ারি, ২০১৩। রাষ্ট্রপতি হিসাবে বিল্ডিংয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনে প্রণব মুখোপাধ্যায়। ছবি: ড. অরবিন্দ ঘোষ

সালটা ২০১১। সেপ্টেম্বর মাস। কলেজ ক্যাম্পাসেই জ্যুলজি এবং ফিলোজফি ডিপার্টমেন্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হল এক ন্যাশনাল সেমিনার। আমি তখন জ্যুলজি ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধান। তাই তৎপরতা কিঞ্চিৎ বেশিই। ওই সেমিনারে প্রণববাবু ছিলেন মুখ্য অতিথি এবং প্রধান বক্তা। উনি তখন কেন্দ্রে অর্থমন্ত্রী। সেমিনারের পরে আমরা বেশ কয়েকজন শিক্ষক, গভর্নিং বডির সদস্য, তৎকালীন অঞ্চলের বিধায়ক সোনালি গুহ, জেলা পরিষদের সভাপতি শমিমা সেখ এবং আরও কয়েকজন মিলে আমাদের প্রিন্সিপালের উপস্থিতিতে প্রণববাবুর সঙ্গে একটা মিটিং করি। কলেজের উন্নয়নের জন্য তহবিল সংগ্রহ ছিল যার মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রস্তাব পাওয়া মাত্র উনি হয়ে উঠলেন এই প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ কাণ্ডারি। ওনার প্রদর্শিত পথেই শুরু হল কাজ। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইউজিসি থেকে প্রায় দশ কোটি টাকার তহবিল পাওয়া গেল।

ছবি: ড. অরবিন্দ ঘোষ

২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারি নতুন বিল্ডিংয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করতে উনি আবার এলেন বিদ্যানগর কলেজে। ততদিনে তিনি ভারতবর্ষের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন। তাঁর কলেজের অনুষ্ঠানে উপস্থিতির বিষয়টা তখন আর কোনওভাবে সামান্য ঘটনা নয়। নানাবিধ প্রোটোকলে চেনা মানুষ তখন নতুন আঙ্গিকে। আমি তখন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। একটু বেশিই উদ্বেগে কাটছে দিন। কিন্তু তিনি এসে পৌঁছলে দেখলাম, ডেকরাম আছে কিন্তু কলেজ চত্বরে ঢুকে পরার পর যেন কিছু কিছু ফাঁকও থেকে যাচ্ছে সেই নিয়মে। সেই আগের মতোই খোঁজ নিচ্ছেন সবার। খতিয়ে দেখছেন প্রজেক্টের বিবরণ। পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করছেন। পদের গরিমায় আন্তরিকতা কোথাও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না। এটা অবশ্য ওনার বরাবরের স্বভাব। যখনই কলেজে আসতেন আগেই নির্দেশ দিয়ে রাখতেন পুরনো কলিগ এবং ছাত্রদের যেন ডাকা হয়। সবার সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন। ওনার সময়ের ছাত্রছাত্রীদের এমনকী নাম ধরে হাঁক পারতেন— এমন ছিল তাঁর স্মৃতিশক্তি। যখন বিদ্যানগর কলেজে চাকরি করতেন, তখন কলেজ সংলগ্ন কোয়ার্টারে থাকতেন প্রণববাবু। আমাদের বিশ্বনাথদা মানে বিশ্বনাথ কুলে তখন তাঁর দেখাশোনা করতেন। প্রণববাবু কিন্তু প্রতিবার কলেজে এলেই বিশ্বনাথদার খবর নিতেন। খবর নিতেন চন্দ্রদার-ও। শুধু তাই নয়, ওনার সঙ্গে কাজ করেছেন যাঁরা সেই সব অশিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে উনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। সবাই তাঁকে ভালোবাসত। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসত। উনিও বিদ্যানগর কলেজের সঙ্গে সামান্য সম্পর্ক থাকলেও কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না। কলেজের কোনও অনুষ্ঠানে এসে কখনও ওনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখতে শুনিনি। উনি কথা বলতেন এডুকেশন পলিসি নিয়ে, ছাত্রদের ভবিষ্যতের একটা আশাবাদী চিত্র সব সময় তুলে ধরতে চাইতেন। যা বলতেন তাতে এটুকু স্পষ্ট যে, ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ওনার সম্যক জ্ঞান ছিল। আমার চোখে তাই তিনি একজন রাজনিতিবিদ নন, বরং শিক্ষাবিদ হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছেন। কীভাবে সময়োপযোগী করে তোলা যায় শিক্ষাব্যবাস্থাকে, এ নিয়ে তিনি দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছেন বিভিন্ন সময়ে।

ছবি: ড. অরবিন্দ ঘোষ

আপাত গুরুগম্ভীর মনে হলেও আদতে কিন্তু ছিলেন হাসিমুখ, রসিক মানুষ। অত্যন্ত স্বল্পাহারী। ব্ল্যাক কফি আর দু-চারটে কাজু ছাড়া প্রায় কিছুই কক্ষনও খাওয়ানো যেত না তাঁকে। পুরনো খাতা ঘাঁটতে ঘাঁটতে দেখেছি মুক্তোর মতো হাতের লেখায় কি সুন্দর লিপিবদ্ধ করে রাখতেন রেজ্যুলিউশন। শুনেছি এক সময় নাকি চুরুট খাওয়া ধরেছিলেন। পরে অবশ্য সে অভ্যাস ত্যাগ করেছিলেন।

২০১৬-র জানুয়ারিতে ভবন উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র

ওনার অভিভাবকত্বে পাওয়া তহবিল থেকে তিনটে বিল্ডিং তৈরি হয়েছে কলেজে। জিমনাসিয়াম, গেস্ট হাউজ, ক্লাসরুম, লাইব্রেরি সব তৈরি করা গেছে আধুনিক মানের। সেই প্রয়োজনে বার কতক রাষ্ট্রপতি ভবনে কথাও হয়েছে ওনার সঙ্গে। প্রতিবার অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সৌজন্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। জানতে চেয়েছেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কাজ কতটা এগালো, সুবিধা-অসুবিধার খবর রেখেছেন। উনি বলে গিয়েছিলেন ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের দিন সুযোগ হলে আবার আসবেন। সে কথাও রেখেছিলেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভবন উদ্বোধনের জন্য উনি আবার এসেছিলেন কলেজে। তখন কলেজের অধ্যক্ষ শ্রীসূর্য প্রকাশ আগরওয়াল।

ফাইল চিত্র

কলেজে যে চেয়ারটাতে বসে উনি কাজ করতেন, সেটা আমরা সংরক্ষণ করে রেখেছি। হয়তো ভবিষ্যতে তাঁর ব্যবহৃত আরও কিছু সামগ্রী নিয়ে একটা সংগ্রহশালা জাতীয় কক্ষ করা হবে। তাঁর যে অসীম অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসা এই প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ করেছে, তা এক কথায় বিরল। তাঁর মতো শিক্ষিত, রুচিশীল, নিপাট ভদ্রলোক শুধু রাজনীতি কেন আজকের সামগ্রিক সমাজেই প্রায় অবলুপ্তির পথে। সর্বোচ্চ পদে থেকেও যে মানুষ কতটা বিনয়ী ও নম্র হতে পারে, তা ওনাকে দেখে শেখার সুযোগ পেয়েছি— এ আমাদের পরম সৌভাগ্য।

অনুলিখন: অলক্তা মাইতি

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. অরবিন্দ ঘোষ, বিদ্যানগর কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

3 comments

  • Sushobhan Sarkar

    Thank you for sharing such real life experiences. Your article speaks volumes about a wonderful and rare personality and provides an opportunity to understand why he received so much respect from everyone including the opposition leaders .
    Today common people are absolutely confused by the biased approach of different media channels. Hence this article has great significance as it is written by another wonderful human being who believes in truthfulness and highly respected by thousands of students .

  • Asit Kumar Ghosh

    আরে দারুন তো। খুব ভালো লেখা হয়েছে ।ভীষণ ভালো লেগেছে ।বিজ্ঞানের লোকেরাও ভালো লিখতে পারে। থ্যাঙ্ক ইউ ।থ্যাঙ্ক ইউ।

  • Excellent uposthapona. Lekhati pore khub valo laglo. Pronob babu jekhanei thakun valo thakun. RIP.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *