আশা ৮৮

ইন্দ্রজিৎ মেঘ

প্রায় ২২টি ভাষায় ১১ হাজারের বেশি গান গাওয়ায় তাঁর নাম রয়েছে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। তিনি আশা ভোঁসলে। কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পী আজ ৮৮ বছর পূর্ণ করলেন। ১৯৩৩-এ মহারাষ্ট্রের একটি ছোট গ্রাম সাংলিতে জন্মেছিলেন তিনি। ১৯৪৩-এ মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি চলচ্চিত্র ‘মাজা বালা’-তে ‘চল চালা নব বালা…’ গেয়ে সংগীত জগতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। ১৯৪৮-এ আশা বলিউডে হংসরাজ বেহলের ছবি ‘চুনারিয়া’য় ‘সাওয়ান আয়া’ গেয়েছিলেন। ওস্তাদ আলি আকবর খানের সঙ্গে একটি বিশেষ অ্যালবামের জন্য ১৯৯৭-এ সালে ‘গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য মনোনীত হন তিনি।

আরও পড়ুন: ‘বিনিসুতোয়’ দেখে ফিরে

আশা ভোঁসলে ১৯৪৮ থেকে হিন্দি ছবিতে গান গাওয়া শুরু করেন। এ পর্যন্ত ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা মহিলা প্লেব্যাক পুরস্কার পেয়েছেন সাতবার। দু’টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেওসম্মানিত আশা ভোঁসলে ২০০৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা দেবী সিং পাতিল কর্তৃক ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৩-এ আশা ভোঁসলে ‘মাঈ’ ছবিতে অভিনয়ও করেছেন। অভিনয়ের জন্য তিনি সবার মনজয় করে নিয়েছিলেন।

জানেন কি গান গাওয়ার পাশাপাশি আশা ভোঁসলে রান্নাতেও পারদর্শী। বলিউডে এমন অনেক সেলিব্রেটি আছেন, যাঁরা প্রায়ই আশা ভোঁসলের কাছ থেকে ‘কধাই মিট’ এবং বিরিয়ানির চেখে দেখবেন বলে আবদার করে বসেন। এই কধাই মিট হল একধরনেই ট্র্যাডিশনাল পঞ্জাবি খাবার। একবার একটি সাক্ষাৎকারের আশা ভোঁসলে জানিয়েছিলেন যে, যদি তিনি সংগীত জগতে সফল না হতেন, তাহলে একজন রাঁধুনি হয়ে যেতেন। যদিও আশা ভোঁসলের রেস্তরাঁর ব্যবসা কিন্তু অসাধারণ। দুবাই এবং কুয়েতে তাঁর ‘আশাজ’ নামে রেস্তরাঁ রয়েছে। যেখানে বিশেষভাবে ঐতিহ্যবাহী উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় খাবার পাওয়া যায়। আবুধাবি, দোহা, বাহরাইনেও তাঁর রেস্তরাঁ আছে। তিনি প্রায় ৬ মাস ধরে শেফদের প্রশিক্ষণও দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কুক রাসেল স্কট গ্রেট ব্রিটেনে আশা ব্র্যান্ডের অধিকার স্বত্ব কিনেছেন। তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আশা নামে ৪০টি রেস্তরাঁ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে খোলা হবে।

আরও পড়ুন: নতুন ফরম্যাটে প্রয়াসের অ্যাবসার্ড থিয়েটার

১৬ বছর বয়সে আশা ভোঁসলে ৩১ বছর বয়সি গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। গণপত রাও ছিলেন লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তিগত সচিব। লতা-সহ পুরো মঙ্গেশকর পরিবার এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিল। যদিও আশা সেইসময় কোনও বাধার ধার ধরেননি। এই বিয়ের পর দুই বোন লতা এবং আশার মধ্যে সম্পর্কের অবনতিও ঘটে। দীর্ঘদিন উভয়ের মধ্যে কথা বলা বন্ধ ছিল। তবে বিয়ের কয়েক বছর যেতে না যেতেই মোহভঙ্গ হয় আশার। দাম্পত্য জীবনের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, তৃতীয় গর্ভাবস্থার সময় আশা তাঁর স্বামী গণপতরাওয়ের বাড়ি ছেড়ে বোনের বাড়িতে চলে আসেন। আশা ও গণপতের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ১৯৬০ সালে এই দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।

অন্যদিকে, প্রথম স্ত্রী রীতা প্যাটেলের সঙ্গে আর ডি বর্মন ওরফে পঞ্চমদার সম্পর্ক ভেঙে যায় একাত্তরে। পঞ্চমদা তাঁর স্ত্রীর প্রতি এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে, তিনি বাড়ি ছেড়ে হোটেলে থাকতে শুরু করেছিলেন। এরই মধ্যে আশা ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবিতে আর ডি বর্মনের জন্য গান করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ধীরে ধীরে দু’জনেই একসঙ্গে অনেক ছবিতে কাজ শুরু করেন, যার অধিকাংশই হিট। এই সুরেলা সম্পর্কই তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কে বসন্ত নিয়ে আসে। কিন্তু জানা যায় যে, রাহুল দেব বর্মনের মা এই সম্পর্ক নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন না, বরং বেশ বিরোধিতাই করেছিলেন। তবে আরডি-র মা কয়েকবছর পর খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাউকে চিনতে পারতেন না তিনি। এর পরে আরডি বর্মন এবং আশা বিয়ে করেন। বিয়ের মাত্র ১৪ বছর পর ১৯৯৪-এ আর ডি বর্মন প্রয়াত হন। আরডি-র দেহাবসানের আগে তাঁর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। সেই কারণে আশা এবং রাহুল আলাদা থাকতেন।

আরও পড়ুন: প্রয়াত প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী গৌরী ঘোষ: বাংলা শিল্পীমহলে শোকের ছায়া

সুন্দর একটি ঘটনা দিয়ে এই লেখার ইতি টানা যাক। আরডি বর্মন যখন সংগীতের জগতে আসেন, তিনি আশা ভোঁসলের কাছে যান। ১৯৬৬-তে, ‘তিসরি মঞ্জিল’ চলচ্চিত্রের জন্য একটি গান আশাকে দিয়ে গাওয়াতে চেয়েছিলেন পঞ্চমদা। সেই সময় তো রীতিমতো বিখ্যাত আশা ভোঁসলে। তাই আরডি প্রথম দেখাতেই আশার কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিয়ে রেখেছিলেন। আর এই ছবিতে ‘ও হাসিনা জুলফোঁ ওয়ালি’ গানটি বানানোর সময় দু’জনেই একে অপরকে পছন্দ করতে শুরু করেন। ছবির গানগুলো যেমন হিট হয়েছিল, তেমনি জুটিও আলোচনায় এসেছিল। এমন একটা সময় ছিল, যখন আশা ভোঁসলে শুধু আরডি বর্মনের জন্য গান করতেন। একবার আশা ভোঁসলে কল্যাণ সেনকে একটি গান রেকর্ডের জন্য ডেট দিয়েছিলেন। কিন্তু আশা গেলেন না। অজুহাত দেখিয়ে আরডি বর্মনের জন্য গান গাইতে গিয়েছিলেন আশা। লেকার হাম দিওয়ানা দিল ফিরতে হ্যায় মঞ্জিল মঞ্জিল­­— তাঁদের প্রেম এভাবেই ‘মঞ্জিল­­’ পেয়েছিল।

আর আজ জীবনের ৮৮টি বসন্ত পেরোনো আশা ভোঁসলের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাঁর দিদি লতা মঙ্গেশকর। তিনি টুইট করে লিখেছেন, “নমস্কার। আজ আমার ছোট বোন আশা ভোঁসলের জন্মদিন। তার জন্য অনেক অভিনন্দন এবং আশীর্বাদ দিচ্ছি। আশা অসাধারণ এক বহুমুখী গায়িকা। এক কামাল কি গায়িকা হ্যায়, বহুমুখী গায়ক হ্যায়। ওর দীর্ঘায়ু কামনা করি। ঈশ্বর তাকে এবং তার পরিবারকে সদাসুখী রাখুক, এটাই আমার মনোকামনা।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *