একসময় কলকাতায় নানান ধরনের উপধারার গান নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছিল

জুবিন ঘোষ

বিভিন্ন অঞ্চলকে ঘিরে তার নিজস্ব সংগীতধারা তৈরি হয়। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কলকাতা বলতে একটা বিরাট সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্র বুঝি। সেখানে মঞ্চ ও প্রচারমাধ্যমের উপস্থিতির জন্য শিল্পীরাও চেষ্টা করেন কলকাতামুখীন হবার। কিন্তু আঞ্চলিক গানের জগতে কলকাতার গান বলে তেমন কিছু প্রচার নেই, বেশ কিছুদিন ধরে লোকসংগীত চর্চা অন্যতম আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পল্লিগীতির মতো সেভাবে নগরগীতি নিয়ে আমাদের চর্চা কমই। কিন্তু উনিশ শতকে কলকাতা-কেন্দ্রিক বিভিন্ন উপধারার নতুন গানের জন্ম হয়ে উঠেছিল আঞ্চলিক গানের অন্যতম সম্পদ। এই বিষয়ে আমরা জানতে পারি হুতোম প্যাঁচার নক্সা-এ কলকাতার নিজস্ব চণ্ডীর গান-হাফ আখড়াই-ফুল আখড়াই-পাঁচালি-যাত্রাদলের গান-ঝুমুর গান-খ্যামটা নাচ-বারইয়ারি, ১৮২০-তে জয়নারায়ণ ঘোষাল রচিত করুণানিধান বিলাস-এ সামগ্রিক কলকাতার উপগান বিষয়ক একটি কবিতায়, ১৮৩১-এ ৩০ এপ্রিল সমাচার দর্পণ-এ প্রকাশিত কলকাতার চড়কের গান বিষয়ে, ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারির সমাচার দর্পণ এবং গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্নের আত্মকথায়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনচরিত-এ আমরা জানতে পারি সেই সময়কার কলকাতার ‘অন্তর্জলি সংকীর্তন’ গান বিষয়ে। আবার ১৯৩২-এর ১৩ অক্টোবর, ১৯৩৭-তে ১৪ অক্টোবর এবং ২১ অক্টোবর সমাচার দর্পণ এবং ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে ফ্যানি পার্কস রচিত দুর্গার অনারে-তে আমরা পাই দুর্গোৎসবের গান ও সেই উপলক্ষ্যে বাইজি গান। যোগেনচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির স্মৃতিকথায় এবং বিখ্যাত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল দত্তের লেখনীতে আমরা পাই অগ্রহায়ণের নববর্ষের ‘কাদামাটির গান’ বিষয়ক নানান আত্মস্মৃতি, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল এছাড়াও জানিয়েছেন ‘ঢুলি বিদায়ের গান’― ‘তেল-মাষকলাইয়ের গান’।

আরও পড়ুন: বিদ্যাসাগরের শকুন্তলা, এক অনুপম সাহিত্যরস

• এই শ্রেণিবিভাগ আমার নিজস্ব উপলব্ধির ফসল। অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। দুই একটি উপধারা একে-অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। যাইহোক, শ্রেণিবিভাগে গানের কিই-বা এসে যায়, শুধু মনে রাখার সুবিধার জন্য বানানো। আসল কথা তত্ত্ব নয়, তার স্বাদ নিয়ে মূল কথা হোক।

এভাবে তথ্য দেওয়ায় বোঝা গেল একসময় কলকাতায় নানান ধরনের উপধারার গান নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছিল। তার নামও নানানরকম। হয়তো সেইসব গান খুব বিরাট কিছু সাংস্কৃতিক বোধ তৈরি করত না, কিন্তু তাৎক্ষণিক আবেশ তৈরিতে ছিল অদ্বিতীয়। তার বেশিরভাগ গানই সেভাবে সংকলিত হয়নি, তবে কিছু স্মৃতিকথা, সংবাদ, গবেষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কিছু সংকলন আর ঊনবিংশ শতকে তাঁতিদের কাপড়ের পাড়ে বোনা নানান গান এইসব স্মৃতি বহন করে আনে। এর মধ্যে অনেক গানকেই নগুরে লোকেরা নাক সিটকাত― কিছু গান অন্ত্যজ-পিছিয়ে পড়া শ্রেণিদের হওয়ায় শিক্ষিত বাবু সম্প্রদায় এড়িয়ে চলাতেও এইরকম কিছু অসাধারণ গান আজকের সময় আমরা হারিয়ে ফেলেছি।  

পুরনো কলকাতার এমনই কিছু উপধারার গানের সামান্য একটা তালিকা দিলাম। বলা বাহুল্য এটাই শেষ নয়, এর বাইরেও কলকাতা-কেন্দ্রিক বিভিন্ন আঞ্চলিক গান হয়তো আছে, তাই আগেই সংগীতপ্রেমী বিদগ্ধ পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

আরও পড়ুন: সুধীন-শ্যামল জুটি এবং বাঙালিয়ানায় মোড়া জিঙ্গল বেল

আমার এই লেখাতে পুরনো কলকাতার অনালোচিত কিছু উপধারার উপরেই সামান্য নজর রাখব। পরিসরের অভাবে খুব বিশদে যাওয়া যাবে না, বরং জানার ছলে জেনে নিই পুরনো কিছু কলকাতার নিজস্ব আঞ্চলিক সংগীতধারা। এই পর্বে আধুনিক বাংলা গানের জনয়িতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদ সেনের নাম যথাযথক্রমে উল্লেখ করা যেতে পরে। শাস্ত্রীয় সংগীত বা বাউল গান কলকাতায় বিশেষ জনপ্রিয়। কিন্তু এগুলিকে কলকাতার গান বলা চলে না। শাস্ত্রীয় সংগীতে কোনও ‘কলকাতা ঘরানা’ নেই, আছে ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’। আবার বাউল গানের উৎপত্তিস্থলও কলকাতা নয়। তবে আঠারো-উনিশ শতকে বাংলা গানে একটি কলকাতা-কেন্দ্রিক ধারা সৃষ্টি হয়েছিল। নিধুবাবু, রাম বসু, হরু ঠাকুর, দাশু রায়, কালী মির্জা, রূপচাঁদ পক্ষী প্রমুখ সংগীতস্রষ্টাদের গান সেযুগের কলকাতার গানের আসরে ছিল অবশ্য গেয়, লোকের মুখে মুখে ফিরত সে গান। আজ এই গানগুলিই পুরাতনী নামে পরিচিত। কালীক্ষেত্র কলকাতায় শ্যামাসংগীতের জনপ্রিয়তা বিশেষভাবে উল্লেখনীয়। রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখ থাকা দরকার কলকাতার রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায়তনগুলির।

৬.২) সাপুড়ের গান

গঙ্গার পলি বুকে নিয়ে তিনটি গ্রাম দাঁড়িয়ে রয়েছে, মূলত হুগলির সপ্তগ্রাম তখন প্রধান বন্দর। নব্য কলকাতা তখন গঠন হচ্ছে। চারদিকেই জলাজঙ্গল। সেই সময় থেকেই এই উপধারার জন্ম। কয়েক দশক আগেও এই উপধারা শোনা যেত। আমার ঠাকুমার কাছে গল্প শোনা, তাঁরাও দেখেছেন এবং মা-ঠাকুমাদের কাছ থেকে শুনেছেন। তখনও কলকাতার বাড়িগুলির লাগোয়া জমি থাকত অনেকটাই। সেখানে গেরস্থালী জঙ্গল, আম-কলা-লেবু গাছ। সাপখোপের আড্ডা। বেদে শ্রেণির সাপুড়েরা এসে জংলি সুরে মনসামঙ্গলের গান ধরত কিংবা নিজস্ব সাপের বা বেহুলার গান ধরত। সঙ্গে থাকত বীণ, ডমরু। সাপ পেলে নিয়ে চলে যেত। সাপ না-পেলে ঝুলি থেকে সাপ বার করে খেলা দেখাতে দেখাতে গান করত। কখনও পাড়ার মধ্যে দিয়ে গান করতে করতে তারা যেত। ‘সাপ আছে নাকি?’ ‘সাপের খেলা দেখবে নাকি?’ গানের মাঝে মাঝে তারা ফেরিওলার মতো চিৎকার করত আর বীণ বাজাত। ওদের পেছন পেছন সাপ দেখবার জন্য কাচ্চা-বাচ্চা ছুটে ছুটে যেত, আর মা-ঠাকুমারা তটষ্ট হয়ে থাকত। সাপুড়ে মানেই কী জানি একটা আতঙ্ক ছিল বাড়ির মেয়েদের। বাচ্চাদের ভয় দেখানো হত, ‘দুষ্টুমি করলে সাপুড়ে ধরে নিয়ে যাবে’। আসলে ওদের চেহারা হত কৃষ্ণকলি, সুঠাম, কখনও গলায় নানান রকম তাবিজ-মাদুলি। মাথায় রঙিন ফেট্টি। বেশিরভাগ সাপুড়ে মানেই যেন দাড়িওলা। অনেকক্ষেত্রে কলকাতার একটু বিত্তশালী বাবুরা মনোরঞ্জনের জন্য দু’জন সাপুড়েকে বায়না দিয়ে নিয়ে আসত।

আরও পড়ুন: সেই খেলা নেই, খেলার সাথিও নেই, লোকক্রীড়া হারিয়ে গেছে

প্রতিযোগিতা হত, সাপুড়েরা অনেক সাপ একসঙ্গে ছেড়ে দিত, যার কাছে বেশি সাপ তাকেই বিজয়ী  বলে ঘোষণা করা  হতো। এই ধরনের খেলা দেখানোর সময় আরও কয়েকটা এক্সট্রা বাদ্যযন্ত্র বেশি ব্যবহার করত, যেমন― ঢোল, বাঁশি, খোল, জুড়ি, বেহালা ও হারমোনিয়াম, বীণ প্রভৃতি ব্যবহার করে গান গাইত। মূলত ভাসান গান কিংবা বেহুলার বা মনসামঙ্গলের গান। অনেক গান নিজস্ব রচনাও হত। আমার বাড়ি এখন চুঁচুড়াতে। আমি কিন্তু এখনও এই সাপুড়ে গান মাঝেমাঝে শুনতে পাই। আর বর্ষার সময় মাঝেমাঝে সাপুড়েরা আসে। সাপ ধরতেও দেখেছি, এই তো ক’দিন আগেই দেখলাম। পদ্মগোখরো ধরল সেদিন। কলকাতার সাহিত্যিক প্রখ্যাত সুকুমার রায় তাঁর বাবুরাম সাপুড়ে ছড়াতেও সাপুড়েদের প্রতিচ্ছবি লেখনীতে ধরেছেন।

কয়েকটা গানের কলি তুলে ধরলাম।

১)

“সাতালি পরবতের উপর

লোহার বাসর ঘর

আর তার মেঝেতে শুয়েছিল সোনার লখিন্দর…”

২)

“আমি কোন দেশে যাবও যাবরে (ধুয়া) 

সকল বান্ধব হাহাকার করে।

চারিজনে ধরিয়া লখাইরে 

ঘরের বাহিরে করে।

দীর্ঘভূজলক্ষীন্দর দীঘল মাথার চুল।

জ্ঞাতি সবে লয়ে গেলো গাঙ্গরীর কুল।

পরম সুন্দর হয় চান্দর নন্দন।

দিব্যবস্ত্র পরাইল দিব্য আভারণ

আঁচলে বান্দিয়া দিলো বহু মূল্যধন।

যাইওনা যাইওনা লখাই এইখানেরও।

আগে তোমার মায় মরুক পাছে তুমি যাও।

সোনা বলে বধূ তুমি আমার কথা রাখ

লখাইর বদলে তুমি মাবলিয়া ডাক

চারিভিতে বন্ধু সব কান্দে উচ্চস্বরে

জ্ঞাতি সবে ধরে নিলো ভুরের উপরে।

মাজুসে শোয়াইললখাই উত্তর শিয়ারী।

নিকটে দাঁড়াইল লখাই সাহেব কুমারী

হস্তজোড় করিয়া বেহুলা হইলো আগুসার

সবার চরণে বেহুলা করে নমস্কার”

৩)

“নিতি ধোপানি কাপড় কাচে

ক্ষারে আর বোলে

বেহুলা কাপড় কাচে

শুধু গঙ্গাজলে”

এই নিতি ধোপানির কাপড় কাচার পাথরটা কিন্তু আমি দেখে এসেছি। মানে একদম জাস্ট এইমাত্র দেখে এসে লিখতে বসেছি। লিখতে লিখতেই হঠাৎ মনে হল, যাই একবার নিজের চোখে দেখে আসি। আমার বাড়ি থেকে বেশি দূরে না, প্রায় ১৯৯৬ থেকে ২০০৮― ১২ বছর আমি সেখানেই থেকেছি, মগরা-ত্রিবেণী অঞ্চলে। এখন চুঁচুড়াতে থাকি। একটা অটো করেই আধঘণ্টায় ত্রিবেণী যাওয়া যায়। ত্রিবেণীর অনতিদূরে ভাগীরথী তীরে বন্দিপাড়া গ্রামে। আমি কিন্তু বন্দিপাড়া বলে গ্রামের নাম শুনিনি। জায়গাটা চিরকাল ত্রিবেণীর ঘাট বলেই জানি। সেখানে একটি বেশ চওড়া ভারি কারুকার্যময় ভাঙা পাথরের অবশেষ রয়েছে, সেটাকেই বলে ‘নেতা ধোবানির পাট’। বলা হয় এই ত্রিবেণী তীরেই বেহুলার স্বামী লখিন্দর নাকি পুনর্জীবন লাভ করেছিলেন। কী আশ্চর্য পাথরটা যেখানে রক্ষিত আছে, সেটির পাশেই সেখানকার গৃহস্থের বাড়ি। এক রমণী তার পাশেই টিউবওয়েলে কাপড় কাচছিল। তাকেই যেন আমার নেতা ধোপানী মনে হচ্ছিল। সে বলল, পাথরটা সে এখানে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে দেখে আসছে। যাক অন্য কথায় চলে গিয়েছিলাম, আবার সংগীত উপধারাগুলোতে ফিরে আসি। আসলে লিখতে লিখিতে একঘেমেয়ি যাতে না-ধরে তাই কিছু ব্যক্তিগত কথা হয়তো এই লেখাটাকে কিছুটা প্রাণ দেবে।

৬.৫) পশু-পাখি খেলা দেখানো গান

একইভাবে কলকাতায় বাঁদর নাচ, ভালুক নাচ দেখাতে আসত। তারাও লোক জড়ো করে খেলা দেখাত। নানানরকম গল্প জুড়ে বাঁদরদের বা ভালুক নাচাত, কখনও তার সঙ্গে লাঠি উঁচিয়ে গান। কিছু কিছু গানে নিজস্বতা থাকত। আমি কিন্তু এখনও কলকাতার রাস্তাঘাটে এই বাঁদর-ভালুক নাচিয়েদের দেখেছি। সঙ্গে ডুগডুগি, ছোট ঢোল। অনেকেই এর মধ্যে খাস কলকাতাতেই বংশ পরম্পরায় ঝুপড়িতে থাকে। বাদশা সিনেমাতেও বাঁদর নাচের গান আমরা শুনেছি। তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাগিনী কন্যার কাহিনী-তেই আমরা বাঁদর নাচের গানের কথা পাই।― বেদেনী “কখনও পোষা বাঁদরটাকে বলে, ― হীরামন, ― ধর মা, ― গিন্নীর চরণে ধর।” এইভাবে কাপড় টানাটানি করে। এই নিয়ে কিছু সংলাপ। এরপর তারাশংকর লিখছেন,― “দর্শক পুরুষ হলে তো কথাই নাই !”

আরও পড়ুন: যদুনাথ সরকার: ইতিহাস চর্চার কলম্বাস

বাঁদর নাচাতে নাচাতে, সাপ নাচাতে নাচাতে, গানের সঙ্গেই তার অফুরন্ত দাবি জানিয়ে যায়―

যেমন বাবুরা চাঁদা মুখো

তেমনি বিদায় পাব গো।  

বেনারসীর শাড়ী পর‍্যা

               লেচে লেচে যাব গ !

প্রভু রাঙা হাত ঝাড়িলে

আমার পাহাড় হয় গ !

মাথায় নিয়ে সোনার পাহাড়

               দিব প্রভুর জয় গ !”

কভার ছবি আল নোমান (বাংলাদেশ)

পরবর্তী পর্ব আগামী মঙ্গলবার...

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Goutam Chattopadhyay

    কবি জুবিনএর গদ্যের হাতটিও চমৎকার দেখি। অপেক্ষা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *