দুর্গোৎসবে সাঁওতালরা পুজো করেন মহিষাসুরকে

অনিন্দ্য বর্মন

সাহিত্যের ইতিহাস বেশ সরল। হিরোইজমটাই সবক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য। বিশেষত পৌরাণিক গপ্পে আমরা দেব-দেবীদের কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে অবহিত হয়ে থাকি। আমাদের দেশের রামায়ন-মহাভারত অথবা পাশ্চাত্য মহাকাব্য ইলিয়ড-ওডিসি; সর্বত্রই দেব-দেবীদের জয়গানের পালা চলে এসেছে। ব্যতিক্রমী মাত্র দু’জন কবি, যাঁরা দেবতাদের বদলে অসুরদের জয়গান করার সাহস দেখিয়েছিলেন।

সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইংরেজ কবি জন মিল্টনের কলমে নরক থেকে উত্থিত হয়েছিল স্যাটান, যাকে বাইবেলে ভগবানের পরম শত্রু শয়তান হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাইবেল মতে, ভগবানের একনিষ্ট ভক্ত ছিল দেবদূত লুসিফার। তাকে বাইবেল আখ্যা দিয়েছে ‘দ্য ব্রাইটেস্ট অফ দেম অল’। এই লুসিফারই যখন প্রকাশ্যে ভগবানের বিরোধিতা করে, ভগবান ক্রোধে তাকে নরকে ছুড়ে ফেলেন। সেখান থেকেই জন্ম স্যাটান বা শয়তানের। নিজের মহাকাব্য প্যারাডাইস লস্ট-এ কবি মিল্টন এই স্যাটানেরই জয়গান করেছেন, যা পৌরাণিক কাব্যরূপ হিসেবে এক বৈপ্লবিক সৃষ্টি।

আরও পড়ুন: ঝাড়খণ্ডের আটত্রিশ পঞ্চায়েত জুড়ে সিটি চন্দনকেয়ারির ওঝাদের সাবেকি দুর্গাপুজো

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগেও এক বাঙালি কবি এরকমই নিদর্শন সৃষ্টি করেন। তাঁকে বর্তমানে অভিহিত করা হয় আধুনিক বাংলা কবিতার জনক হিসেবে। যুব বয়সে এই কবি বিলেত যাত্রা করেন এবং কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো কবি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যদোষে তা সম্ভব হয়নি। বাংলায় ফিরে এসে প্রায় মিল্টনের মতোই সৃষ্টি করেন নিজরচিত মহাকাব্য। এবং সেই কবিতাতেও দেবতার বদলে অসুরের জয়গান। মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বদলে দিয়েছিল আধুনিক বাংলা কবিতার পরিভাষা।

সামনেই দুর্গাপুজো। আপামর বাঙালি মেতে উঠবে মায়ের আরাধনায়। কিন্তু যদি বলি ওই মিল্টন বা মধুসূদনের মতোই কিছু মানুষ প্রতি বছরের মতোই এবারও মায়ের বদলে মহিষাসুরকে পুজো করবেন, বিশ্বাস করবেন?

ভারতে একটিই জায়গা আছে, যেখানে দুর্গাপুজো আনন্দের উৎসব নয়। বরং শোক পালনই রীতি। সারাবাংলা এবং ভারতের তথা সমগ্র বিশ্বের বহু মানুষ যখন দুর্গাপুজোর উৎসব পালন করবে, তখন এই বাংলারই এক প্রান্তে ঘরে ঘরে থাকবে শোকের ছায়া। তারা শোকাতুর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করবেন মহিষাসুরকে। কলকাতা বা বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের থেকে পৃথক সেই জায়গায় তখন শুধুই নিস্তব্ধতা বিরাজ করবে। যখন আমরা আলো, প্যান্ডেল, নতুন জামাকাপড় পরে আনন্দে মেতে উঠব, তখন তারা শুধুই দুঃখে ডুবে থাকবেন। দুর্গাপুজোর আগমনীর সঙ্গেই চোখে অশ্রুধারা নেমে আসবে পুরুলিয়ার সাঁওতাল গ্রামগুলিতে।

পুরুলিয়ার বেশিরভাগই সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চল। পুজোর ক’টা দিন বাকি বাংলার সঙ্গে তাদের জীবনযাপনের কোনও মিল নেই। মাতৃ-আরাধনার বদলে তারা যুদ্ধে হত মহিষাসুরের জন্য শোক পালন করে থাকেন। সাঁওতাল ভাষায় এই পরবের নাম হল দশানি পরব। তবে কেবল পুরুলিয়া নয়, মালদাসহ আরও বেশ কিছু জায়গায় এই পুজোর রীতি রয়েছে।

এই ঘটনার পেছনে একটা সুন্দর গল্প আছে। এখানের মানুষ বিশ্বাস করেন যে, পৌরাণিক যুগে তাদের রাজা ছিল মহিষাসুর। সে বহু যুদ্ধে আর্যদের পরাজিত করেছিল। যুদ্ধে হেরে, পরামর্শ করে আর্যরা এক নারীকে যুদ্ধে পাঠায়। মহিষাসুর নিয়ম অনুযায়ী কোনও নারীর সঙ্গে যুদ্ধ করার কথা প্রত্যাখ্যান করে। তবে লড়তে তাকে হয়েছিলই। এই যুদ্ধেই তার প্রাণ গিয়েছিল। তাই পুরুলিয়ার সাঁওতালরা ওইদিন শোক পালন করে এবং মহিষাসুরকে পুজো করে, গান গায়।

আরও পড়ুন: ছোটবেলার পুজো দেখতে যেতাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও চণ্ডীপুরে

এই শোকপালনে কিন্তু শুধু করুণ সুরই বিদ্যমান নয়। ওই একটি বিশেষ পুজোর দিন ছাড়া এই সময় তাদের নাচের অনুষ্ঠান দেখার জন্য সারা পৃথিবীর পর্যটকেরা ভিড় করেন। সাঁওতালি নাচ, গান এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামগুলি। কংসাবতী নদীর পাড়ের কটেজে রাত্রিবাস, রকমারি আহার এবং সারারাত সাঁওতালি নাচগানে মুখর হয়ে ওঠা—  এই টানেই বহু মানুষ আসেন। এটাই জীবন। যা একজনের কাছে আনন্দের, তা-ই হয়তো অন্য কারও শোকের কারণ। পুরুলিয়ার এই হুদুড় দুর্গা-র প্রচলন এবং মহিষাসুর পুজো এর সবথেকে বড় উদাহরণ।

কভার ছবি ইন্দ্রজিৎ মেঘ

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *