তখন কালীগঞ্জ উপজেলা, দেবহাটা, গাজিরহাট, পারুলিয়া, নলতায় দলবেঁধে পুজো দেখতে শুরু করেছি

কুমার দীপ

৩.

যখন কলেজে পড়ি, দুর্গাপুজোর সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি হতে শুরু করে চারদিকে। দেড় কিলোমিটারের মধ্যে খানপুরেই শুরু হয় দু’টো পুজো। মনোরঞ্জন ডাক্তার মহাশয়ের ব্যক্তিগত আয়োজনের পুজোটি আমাদের সবচেয়ে কাছের। সময়ও সেখানে কেটেছে বেশি। ঝালমুড়ি, বাদাম, আখ কিংবা মল কটকটির মতো কিছু চিবোতে চিবোতে এখানে কত গল্প হয়েছে জীবনের!  সেখান থেকে খুব অল্প, কয়েক মিনিটের পায়ে হাঁটা দূরত্বে, খানপুরের শেষ আর চণ্ডীপুরের শুরু তিন রাস্তার মোড়েই আরেকটি। শ্যামনগর উপজেলার আরও বেশকিছু এলাকায়, একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামেও দুর্গাপুজোর আনন্দ। আমরা তখন উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে পাশের কালীগঞ্জ উপজেলা, তার উপরে দেবহাটা, গাজিরহাট, পারুলিয়া, নলতা ইত্যাদি স্থানে দলবেঁধে পুজো দেখতে শুরু করেছি। আর পুজো দেখতে দেখতে, কারো ভিন্নবুদ্ধি ঠেলে উঠলে সিনেমা হলে একটা ঢুঁ মারাও। একবার এমন রাত হয়েছিল ফিরতে ফিরতে, আমাদের বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের কালীগঞ্জে এসে আর বাড়ি যাওয়ার কোনও বাহন খুঁজে না-পেয়ে বাসস্ট্যান্ডে রাস্তার পাশের ফাঁকা চৌকিতে শুয়ে পড়েছিলাম আমরা। আমরা মানে উৎপল, রসিক মামা, পরিতোষদা, তপন আরও কেউ কেউ হয়তো ছিল। খুব রোমাঞ্চকর ছিল সেইসব দিনগুলি, রাতগুলি। তখন পুজো মানে শুধু পুজো নয়, ঘুরে বেড়ানো। আর মাটির প্রতিমার পাশাপাশি রক্তমাংসের প্রতিমাগুলো দর্শনেরও যে খুব আকর্ষণ ছিল সেই বয়সে, একথা স্বীকার না-করলে সত্যের অপলাপ হবে। তাপস, অজয়, তপন, কখনও কখনও সাধন, দু-একসময় নিমাইদা এবং আরও কোনও কোনও সমবয়সি আমরা তখন সকাল-সন্ধ্যা-রাত একাকার করে ফেলতাম। তপনের অতুল্য হাস্যরস, তাতে অজয়ের সরস কথার খেলা, তাপসের হা হা হাসি… এসব স্মৃতি আজও সেইসব দিনগুলোকে জীবন্ত করে তোলো; কানে বাজে হারিয়ে যাওয়া সেদিনের সুর। নির্মল আনন্দের সেই দিনগুলো এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাসের ফুল।

আরও পড়ুন­: ছোটবেলার পুজো দেখতে যেতাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও চণ্ডীপুরে

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় পর্বে এসে পুজোর অর্থ বদলাতে শুরু করল ভেতরে ভেতরে। বদলানো মানে ভাবনার রূপান্তর। যে-আমি দেবদেবী, ঈশ্বর এসব বলতে মুগ্ধ ছিলাম, কোনও কোনও দেব-দেবীর প্রতি ভক্তিতে নত ছিলাম, শৈশবে একসময় সিদ্ধার্থের মতো ঘর ছেড়ে অরণ্যবাসী হওয়া কল্পনা করতাম; সেই আমি সাহিত্য পড়তে পড়তে কিছুটা দর্শনেরও ছাত্র হয়ে গেছি— দেবদেবীদের কাহিনিগুলো তখন আমার কাছে পুরাণ। পুরাণ কাহিনির ভেতরের রহস্যগুলো আস্তে আস্তে জট খুলতে শুরু করে আমার ভাবনায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পূজিত হয়ে আসা প্রভাবশালী দেবদেবীরা আর্যদের, অথচ ইতিহাস বলছে—এ-মাটির প্রাচীনতমরা অনার্য, আর আমরা অধিকাংশই অনার্য, কেউ কেউ আধা-আর্য। অসুর বলতে যাদের বোঝানো হয়েছে দৈবকাহিনিগুলোতে, সেই অসুররা প্রকৃতপক্ষে এ-মাটিরই আদিম সন্তান বা তাদের প্রতিনিধি। যে-মহিষাসুর রক্তাক্ত হয়ে শুয়ে থাকে দুর্গার পদতলে, যাদের রাক্ষস বলা হয়েছে, তারা তো এ-মাটিরই অনার্য-সন্তান। এই সমস্ত পাঠ ও জানাশোনার একসময় পুজো-পার্বণ হয়ে উঠল শুধুই আমার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর উৎসবের অনুষঙ্গ। কর্মফল ছাড়া আর কোনও ফল নেই জগতে। একেবারে শুরুতেই গাণিতিক ইন্ধন হিসেবে এসেছিল অক্ষয়কুমার দত্তের সেই বিখ্যাত কর্মফল ও প্রার্থনার অঙ্কটি। কিন্তু তাই বলে আমি যে-সমাজে বাস করি, যে-ভূখণ্ডের জল-মাটিতে বেড়ে উঠি; সেই সমাজ, সেই ভূখণ্ডের মানুষের হাজার-হাজার বছরের যে আচার-আচরণ, যে সংস্কৃতি, তার থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত হতে পারি না, দূরে সরে থাকতে পারি না। তাছাড়া আজকের প্রেক্ষাপটে দেবতা-অসুরের লড়াইয়েরও একটি ভিন্ন তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারি। সমস্ত অলৌকিক লীলাখেলাকে অতিক্রম করে অনুভব করতে পারি, আমাদের মায়েদের এক কর্মময় দশভুজ রূপ। এবং ইন্দ্রলোকের দেবতাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, মানুষের শুভবোধের বিজয় নিশ্চিত করতেও চাই দুর্গার মতো দশ হাতের শক্তি নিয়ে অশুভকে প্রতিরোধ করা।

বিভিন্ন পুজো-পার্বণ এলে আমিও তাই কম-বেশি যুক্ত হয়ে পড়ি পরিবারের সঙ্গে, বন্ধু-স্বজনের সঙ্গে, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে। এটা একটা সামাজিক দায়িত্বও বটে। যে-কথা বলতে চেয়েছিলাম, তার থেকে একটু দূরে সরে গেছি বোধহয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, ১৯৯৬ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে ছিলাম। এই দীর্ঘসময়ে, খুব সম্ভবত একবছর দুর্গাপুজোর সময় রাজশাহীতে কাটিয়েছি। দুর্গা যেমন বাপের বাড়িতে আসেন পুজোর সময়টাতে, আমিও তো এমন দুর্গাপুজোতে পৈতৃক বাড়িতে ফিরব, এটাই স্বাভাবিক। রাজশাহীতে পুজো দেখাটা বিশেষ জমজমাট ছিল না। মনে পড়ে, একদিন গিয়েছিলাম। আমার মনোসিজ দাদাই নিয়ে গিয়েছিল বোধহয়। পাঞ্চালিদিও ছিল। তখন আমার সার্বক্ষণিক বন্ধুত্রয়— আজাদ, আতাহার ও জুয়েল কি ছিল? স্পষ্ট মনে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছাকাছি কোনও পুজো হত না। তবে রাজশাহী শহরের একাধিক জায়গায় হত। বড় শহরের কোনও পুজো কখনও তেমন বড় হয় না বলে আমার মনে হয়। দালান-কোঠার অরণ্যে পুজো-পার্বণের জন্য সাজগোজ করাটা বাড়তি, জায়গাই-বা কোথায়? পর্যাপ্ত জায়গার অভাব, মানুষের ইচ্ছে মতো চলাফেরার সমস্যা। আলাদাভাবে কোনও দোকানপাট বসে না, মেলার আসর জমে না বিধায় কেমন বাসি বাসি লাগে। তখন জানতাম না, রাজশাহী শহর থেকে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার দূরে তাহেরপুরে রাজা কংসনারায়ণের মন্দির আছে, যেখানে ৮৮৭ বঙ্গাব্দে মহারাজ কংসনারায়ণ দুর্গপুজো শুরু করেছিলেন, যেটা কিনা শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশেরই প্রথম দুর্গাপুজো। উল্লেখ্য, এখানে বর্তমানে একটনের বেশি ওজনের অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা স্থাপিত হয়েছে।

অন্য বছরগুলোতে বাড়িতে গিয়ে প্রভূত আনন্দ করেছি পুজোয়। দল বেঁধে শুধু পুজো দেখেই ক্ষান্ত হতাম না, রাতের বেলায় আরতি দেখতেও যেতাম। বিশেষ করে খানপুরের মনোরঞ্জন ডাক্তারের (গ্রাম্য ডাক্তার) বাড়ির পুজো, যেটা কি না দেড় কিলোমিটারের ভেতরে, রাতে হেঁটেই যেতাম আমরা। শিশু-বয়স্ক, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী সব বয়সের মানুষের জন্যেই অষ্টমী ও নবমীর আরতি তখন আকর্ষণীয় ছিল। মা-কাকিমারা অবশ্য দিনের বেলাতেও যেতেন অঞ্জলি দিতে।

৪.

সময়ের সঙ্গে সবকিছুর আবেদন বদলে যেতে থাকে। ২০০৪ সাল থেকে এই ২০২০ সাল পর্যন্ত, আমার কর্মজীবনের সময়টাতে, দুর্গাপুজো ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দিয়েছে আমার কাছে। এক সময় যে-পুজোটা আমার জন্য কেবল আনন্দের আর মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়ানোর ছিল, সেই পুজোটা আস্তে আস্তে হয়ে উঠল—  মা-বাবার, ভাই-বোনের, ভাইপো-ভাইঝি-ভাগ্নেদের আর বিয়ের পরে যুক্ত হল স্ত্রীর; কয়েক বছরের ব্যবধানে পুত্রের, আরও পরে কন্যার। চার ভাই আর তিন বোনের মধ্যে আমি সকলের ছোট, কিন্তু সকলেরই আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে আমার অবস্থান। নিজের ছোটবেলায় জামাকাপড় প্রায় কিছুই পায়নি পুজোতে, বাজার খরচ বলতে— একটাকা, দু’টাকা, পাঁচ টাকা; বড় হল হয়তো আরও সামান্য বেশি কিছু টাকা খরচ করতে পেরেছি। আর এখন? আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে দুর্গাপুজো মানে নতুন পোশাক আগে, পরে ঘোরাঘুরির হাদিয়া। সবসময় সবাইকে দিতে পারি না, সীমিত সামর্থ্যে যাকে যে-বছর যেটুকু পারি, দিতে চেষ্টা করি। দু-এক বছর আবার অন্য কোনও কাজের কারণে কাউকেই কিছু দিতে পারি না।

ছবি লেখকের সংগ্রহ থেকে

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *