১৯৭১-এর ২৪ আগস্ট: পঞ্চাশ বছর পরে ফিরে দেখা ভারতের এক অলৌকিক জয়

শুভ্রাংশু রায়

১৯৭১। বহু চর্চিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ১১৪ দিন আগে একটি বিশেষ যুদ্ধে ভারতীয়রা জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। সেই যুদ্ধ হয়েছিল উইলো ব্যাটের সঙ্গে বলের। ঘটনাটি ঘটেছিল ভারতের একদা শাসক ইংল্যান্ডের মাটিতেই। ১৯৭১-এর ২৪ আগস্ট ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি তারিখ। ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে আজকের তারিখেই অজিত ওয়াদেকারের বাহিনী প্রথমবারের জন্য ইংল্যান্ডকে সে-দেশের মাটিতে হারিয়ে টেস্ট সিরিজ জিতে নিয়েছিল ১-০’তে।

আরও পড়ুন: অনন্য অলিম্পিক দর্শন

ক্রিকেট পরিসংখ্যানের পুরনো পাতা উল্টেপাল্টে দেখলে মালুম হয়, বিদেশের মাটিতে ১৯৭১-এ ইংল্যান্ড সফরের টেস্ট সিরিজ জয় অবশ্যই বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট বা সিরিজ জয় নয়। কারণ প্রথম নিউজিল্যান্ড তারপর ওয়েস্ট ইন্ডিজে এর আগেই বিদেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতে গিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট দল। কিন্তু ওভালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সে-দেশের বিরুদ্ধে যে জয় ভারতীয় ক্রিকেটাররা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, তার স্বাদই ছিল অনন্য। কেন অনন্য এবং কেনই-বা অলৌকিক, এটা বোঝার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে অর্ধশতাব্দী আগে।

সেই বছরই ১০ মার্চ, পোর্ট অফ স্পেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ৭ উইকেটে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচে জয়লাভ করেছিল ভারত এবং সেই জয়ের সুবাদে চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০’এ জিতে প্রথমবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টেস্ট জয়ের কৃতিত্ব গড়েছিল অজিত ওয়াদেকরের ছেলেরা। সেই সিরিজ শুধু জয়লাভের জন্য নয়, সুনীল মনোহর গাভাস্করের আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে আবির্ভাব এবং আবির্ভাবেই তিনটি টেস্ট মিলে (প্রথম টেস্ট ম্যাচে সুনীল গাভাস্কর খেলেননি) তিনটি সেঞ্চুরি ও একটি ডবল সেঞ্চুরি সহ ৭৭৪ রান ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ অধ্যায়ের রচনা করেছিল। খুব স্বাভাবিক কারণে ১৯৭১ ভারতীয় দল যখন ইংল্যান্ডের মাটিতে খেলতে হাজির হয়, তখন কিন্তু তাঁরা আর আন্ডারডগ হিসেবে বিবেচিত ছিল না।

আরও পড়ুন: পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি, মোহনবাগান এবং বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ: ১৫ আগস্ট, ১৯২০

প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল ভারতের সপ্তম ইংল্যান্ড সফর। আগের ছয়টি সফরে ভারতীয় দলের সাফল্যের ভাঁড়ার ছিল কার্যত শূন্য। অন্যদিকে, ১৯৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা টেস্ট ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পরে ইংল্যান্ড কার্যত হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সেরা ক্রিকেট দল। ভারতীয় দলের মুখোমুখি হওয়ার আগে টানা ২৪টি টেস্ট অপরাজিত ছিল। অপরাজিত থাকার সেই টেস্ট সংখ্যা ২৬-এ নিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড কারণ সফরকারী ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে লর্ডস এবং ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে অনুষ্ঠিত প্রথম দু’টি টেস্ট অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়েছিল।

আরও পড়ুন: একশো বছর পূর্ণ প্রথম কলকাতা ডার্বির গোলের

আমাদের আলোচ্য তৃতীয় টেস্ট শুরু হয়েছিল ১৯ আগস্ট কেনিংটনের ওভাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। টেস্ট ইতিহাসের প্রথম টেস্ট (ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া, ৬-৮ সেপ্টেম্বর, ১৮৮০) অনুষ্ঠিত হওয়া ওভাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডে তৃতীয় টেস্টে ইংল্যান্ড অধিনায়ক রে ইলিংওয়ার্থ টসে জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ৩৫৫ রানে। ভারতের হয়ে একনাথ সোলকার ৩টি এবং ভারতের তিন স্পিনার বিষেন সিং বেদী, ভগবৎ এস চন্দ্রশেখর ও শ্রীনিবাস বেঙ্কটরাঘবন ২টি করে উইকেট পান। এরপর ভারত খেলতে নেমে তাদের প্রথম ইনিংস শেষ করে ২৮৪ রানে। ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন উইকেটরক্ষক ফারুখ ইঞ্জিনিয়র ৫৯। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য ভারতের আরও দুই উল্লেখ্যযোগ্য রান সংগ্রাহক ছিলেন দিলীপ সারদেশাই (৫৪) এবং একনাথ সোলকার (৪৪)। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের ৭১ রানের লিড এবং ম্যাচের চতুর্থ ইনিংস ভারতকে খেলতে হওয়ার কারণে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচ ইংল্যান্ডের অনুকূলে ঢলতে শুরু করেছে। ৭১ রান হাতে নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের স্কোর যখন বিনা উইকেটে ২৩, তখনই চন্দ্রশেখর রান আউট করে দেন ওপেনার জন জেমসনকে।

আরও পড়ুন: একশো বছর পূর্ণ প্রথম কলকাতা ডার্বির গোলের

অর্থাৎ ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে প্রথম উইকেট যখন পড়েছিল, তখনই ইংল্যান্ডের লিড ৯৪ রানের হয়ে গিয়েছিল। পরের ওভারে চন্দ্রশেখরের হাতেই বল তুলে দেন অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকর। আর প্রথম ওভারের পঞ্চম বলে চন্দ্রশেখর জন এডরিখের স্ট্যাম্প ছিটকে দেন। পরের বলে ইংলিশ ব্যাটসম্যান কেইথ ফ্লিচার চন্দ্রের বলে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে একনাথ সোলকারের হাতে ধরা পড়লেন। সেই ম্যাচে এক ভারতীয় তরুণ ক্রিকেটার গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘সেদিন চন্দ্রশেখর আনপ্লেয়েবল ছিলেন।” ফ্লিচারের উইকেটের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনের বিরতি হয়।

আরও পড়ুন: ৪১ বছর পরে হকিতে মেডেল এলো ভারতের: এখন প্রশ্ন একটা না দু’টি?

A divine visitation

সেদিন ছিল গণেশ চতুর্থীর দিন। তাই মধ্যাহ্নভোজনের সময় একটি অভিনব পদ্ধতিতে স্থানীয় ভারতীয়রা এই উৎসব পালন করেন মাঠে। এই উপলক্ষে স্থানীয় চেসিংটন চিড়িয়াখানা থেকে ‘বেল্লা’ নামে একটি তিন বছরের হাতিকে মাঠে আনা হয়। বিরতিতে হাতিটি গোটা মাঠ প্রদক্ষিণ করে এবং শুঁড় তুলে ভারতীয় দলকে আশীর্বাদ জানায়। এই উৎসবের পরিবেশেই মধ্যাহ্নভোজনের পরে খেলা শুরু হয় এবং চন্দ্রশেখর একই বিধ্বংসী মেজাজে একের পর এক ইংল্যান্ডের দুর্গে আঘাত হানতে থাকেন। মধ্যাহ্নভোজনের পরে এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের মধ্যে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয় ১০১ রানে। আর চন্দ্রশেখরের বোলিং স্পেল? ১৮.১-৩-৩৮-৬। তবে আরেকটি বিশেষ মুহূর্তকে সেদিন মাঠে উপস্থিত দর্শকরা ভুলতে পারেন না। তা হল, ইংল্যান্ডের স্কোর যখন ৫৪/৪, স্পিনার ভেঙ্কটরাঘবনের বলে একনাথ সোলকারের অ্যালান নটের ক্যাচ পুরো ড্রাইভ মেরে তালুবন্দি করা। ভেঙ্কটরাঘবন অবশ্য আরেকটি উইকেট পেয়েছিলেন। আরেকটি উইকেট শিকার করেছিলেন বিষেন সিং বেদী। ভারতের সামনে শেষ ইনিংসে জয়ের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭৩ রান এবং হাতে ছিল পুরো একদিন এবং আরও দুই ঘণ্টার বেশি কিছু সময়।

আরও পড়ুন: অমল জলে অমল পুজো

চতুর্থ দিনের শেষে ভারতের রান ছিল ২ উইকেটে ৭৬। ২৪ আগস্ট ম্যাচের শেষ দিনে প্রথম ওভারেই অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকার রান  আউট হয়ে যান। ভারতীয় দলের স্কোর ছিল তখন ৭৬/৩। স্বভাবতই ইংল্যান্ডের ম্যাচে আবার ফেরার ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সত্যিকথা বলতে কি চন্দ্রশেখরের মতো বিধ্বংসী স্পেল সেদিন ইংল্যান্ডের তরফে কেউ করতে পারেননি। তাই ভারতীয় দল  সহজেই তাঁদের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে যায়। ইনিংসের ১০১তম ওভারে  সৈয়দ আবিদ আলি যখন বাউন্ডারি মেরে জয়সূচক রান তুলে প্যাভিলিয়নের দিকে ফারুক ইঞ্জিনিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে ইতিহাস গড়ে ফিরে আসছেন, ভারতীয় দলের মাত্র ছয়টি উইকেটের পতন ঘটেছিল।

আরও পড়ুন: শৈশবের হিরো, কৈশোরের গুরু

চার উইকেটে ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট এবং সিরিজ জয়, তাও ওভাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডে মতো ঐতিহাসিক ভেন্যুতে, নিঃসন্দেহে এক অন্য উৎসবের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ইউটিউবে খোঁজ লাগলে এই ম্যাচের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ভিডিয়ো আমরা দেখতে পাব। স্বাভাবিক কারণেই আজকের মতো ঝকঝকে আধুনিক প্রযুক্তি মিশ্রিত সম্প্রচার সেই সময় সম্ভব ছিল না। কিন্তু ইউটিউবে সেই টেস্ট ম্যাচের মুহূর্তগুলি দেখলে কোথাও একটা ভিনটেজ ফিলিং এনে দেয়, যা ভারতীয় ক্রিকেটের সাদা-কালো দিনগুলির গৌরবগাথাকে নতুন করে ক্রিকেটপ্রেমী বিশেষত এই প্রজন্মের ক্রিকেট বিষয়ে উৎসাহীদের পুনরায় দেখার সুযোগ করে দেয়। পঞ্চাশ বছর আগে ইংল্যান্ডের এই গৌরব মুহূর্ত অনেক কিছু কাহিনি-ঘটনার জন্ম দিয়েছিল, আজকে তার অনেকটাই রূপকথা। কিছুর সন্ধান মেলে পুরনো খবরের কাগজ, ম্যাগাজিনে প্রকাশিত খবর বা পরবর্তীতে ভারতীয় ক্রিকেটারদের প্রকাশিত ইন্টারভিউতে। কিছু ঘটনা  হয়তো হারিয়েই গেছে সময়ের আড়ালে। এই জয়ের গুরুত্ব নিয়ে যদি এককথায় কোনও প্রশ্ন ওঠে, তাহলে এটাই বলা যেতে পারে ওভালের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে টেস্ট সিরিজ জেতার পরে ইংল্যান্ডে এই সাফল্য আন্তর্জাতিক টেস্ট খেলিয়ে দুনিয়ায় ভারতকে বিশেষত বিদেশের মাটিতে আন্ডারডগের তকমাকে চিরতরে মুছে ফেলতে সমর্থ হয়েছিল। অর্ধশতাব্দী আগে উইলো কাঠ ও বলের এই সাফল্যের এটাই সম্ভবত সবথেকে বড় গুরুত্ব।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

7 comments

  • রাহুল ভৌমিক

    পড়ে ভালো লাগলো।

  • Paramita Ghosh

    বেশ লাগলো , সকলকে পড়ার অনুরোধ জানালাম …

  • ভারতীয় ক্রিকেটের গৌরবজনক এই অধ‍্যায়টিকে খুব সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে।হাতির ব‍্যাপারটা দারুণ উপভোগ্য ।

  • Debashis Majumder

    Darun article. Karjoto ei joyer madhyomei India sei somoy hoye uthechhilo test e unofficial world champion.

  • Dr.Bratati Hore

    অনবদ্য লেখা — পড়ে ভালো লাগলো । লেখক কে অনুরোধ — এমন লেখা আরো লিখুন।

  • অনবদ্য লেখা — লেখক কে অনুরোধ আরো এই ধরনের লেখা লিখতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *