অং সান সু কি-র ক্ষমতাচ্যুতি: এক অনিবার্য রাজনৈতিক সমীকরণের পরিণতি?

অনিন্দ্য বর্মন

সামরিক বাহিনীর দ্বারা অং সান সু কি-র গৃহবন্দি হওয়া বুঝিয়ে দিল, তিনি সাধারণ মানুষ এবং সামরিক শক্তির মধ্যে যে ভারসাম্য আনতে চেয়েছিলেন, তা অনেকাংশেই বিফল হয়েছে। বিগত বছরে মায়ানমারে এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো অং সু কি-র ছবি সে-দেশের মানুষ গর্বের সঙ্গে বহন করেন। তাঁরা মনে করেন যে, অং সান সু কি তাঁদের সামরিক অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। অবশ্য সেই সময়েও অং সান সু কি গৃহবন্দি ছিলেন।

আরও পড়ুন: মায়ানমারে গ্রেফতার অং সান সুকি

অং সান সু কি-কে আটকের বিরুদ্ধে সোমবার ব্যাঙ্ককে মায়ানমারের দূতাবাসের বাইরে একটি বিক্ষোভ। ছবি সৌজন্য নিউইয়র্ক টাইমসের অ্যাডাম ডিন

২০১৫ এবং ২০২০-তে তিনি এবং তাঁর দল নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। এতে সু কি-র জনপ্রিয়তাও বিপুল বৃদ্ধি পায়। অথচ ভাগ্যের পরিহাসে তাঁর এমনই অবস্থা যে, তিনি হয়তো আর নোবেল শান্তি পুরস্কারও পাবেন না। শেষ অবধি ৭৫ বছর বয়সি অং সান সু কি নিজের লোকেদের বাঁচাতে পারলেন না। সামরিক নেতাদের দমন করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। গত সোমবার সামরিক সেনা, যারা প্রায় পাঁচ দশক ধরে রাজত্ব করেছে; একটি সামরিক বিপ্লবের মাধ্যমে অং সান সু কি-র ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি-র হাত থেকে শাসন ব্যবস্থা ছিনিয়ে নিয়েছে।

ভোরবেলায় সেনা অং সান সু কি-র বাড়ি হানা দেয়। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সু কি-র কিছু আমলা এবং মন্ত্রী। বহু মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করেছেন। এখনও সারা মায়ানমারে অং সান সু কি-র ছবি এবং তার দলের প্রতীক বিদ্যমান। কিন্তু বর্তমানে শাসনভার প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লায়েং-এর হাতে এসে গেছে। জেনারেল মিন অং লায়েং-কে দেওয়া কথা না রাখতে পেরে সু কি বিপদে পড়েছেন। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেনার ব্যবহার মানুষকে তাঁর বিরুদ্ধে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

আএও পড়ুন: মায়ানমার ইস্যু: আজ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ

Hundreds of police officers were deployed across Yangon, the country’s largest city and commercial capital.
দেশের বৃহত্তম শহর এবং বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুন জুড়ে কয়েকশো পুলিশ অফিসার মোতায়েন করা হয়েছিল। সৌজন্য নিউইয়র্ক টাইমস

এশিয়া হিউম্যান রাইটসের ডেপুটি ডিরেক্টর ফিল রবার্টসন-এর মতে সু কি জানিয়েছিলেন যে, তিনি রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষের রক্ষাকর্তা নন। এর ফলে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস হারান। তিনি রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীকে সমর্থনও করেন। এর ফলেই এই বিপ্লব এবং সু কি নিজের জায়গা বজায় রাখায় অক্ষম প্রমাণিত হলেন। যে গতিতে এই ঘটনাটা ঘটল, তা অভাবনীয়। বহু দশক ধরেই মায়ানমার সামরিক শাসনের অধীন ছিল। এবং এই বিপ্লব হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল ছিল।

গতবছর নভেম্বরেই ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়। সাধারণ মানুষ সু কি-র পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক শক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে সু কি কি রাজনৈতিক খেলাকেই আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন? সামরিক সেনা অবশ্য আগেই জাল ভোটারের প্রসঙ্গ তুলেছিল। ২৮ জানুয়ারি জেনারেল মিন অং লায়েং এই মর্মে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন সমস্ত ভোট আবার নতুন করে গণনা করা হোক। নচেৎ, তিনি অন্য ব্যবস্থা নেবেন। এই সামরিক অধিগ্রহণের সঙ্গেই সমগ্র দেশে একবছরের জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। সু কি-র গণতন্ত্রের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে এই সামরিক বিপ্লব।

আরও পড়ুন: মায়ানমার ইস্যু: নিষেধাজ্ঞার হুমকি বাইডেনের

Supporters of Myanmar’s military celebrated the takeover in Yangon.
মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সমর্থকরা টেকওভারটি উদ্‌যাপন করেছে,ইয়াঙ্গুন। সৌজন্য দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

৭৩ বর্ষীয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইউ অং কাও জানান যে, সু কি-ই সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন যিনি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারতেন। আর আজ, সারাদেশে অন্ধকার নেমে এসেছে। অং সান সু কি বরাবরই সামরিক অধিকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ২০১০-এ গৃহবন্দি অবস্থা থেকে বেরোনোর পর এদের সঙ্গেই সময় কাটাতেন, যারা আজ তাকে উৎখাত করল। অবশ্য এর মাঝেই সু কি জানিয়েছিলেন যে, তার বাবাই আধুনিক মায়ানমার সেনার জনক এবং তিনি সামরিক বাহিনীকে সম্মান করেন।

ইউনাইটেড নেশনসের তদন্তকারী দল জানায় যে মানুষ খুন, গ্রাম জ্বালানোর মতো কাজ নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই করা হয়েছিল। এর ফলে বহু মুসলমান পরিবার বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু ২০১৯-এ ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস সু কি-কে ছাড় দেয় যে ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী নিজেদের ইচ্ছেমতো পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার পেয়ে যায়। সু কি নিজেও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য কোনও পদক্ষেপ নেননি।

ফর্টিফাই রাইটসের ম্যাথিউ স্মিথ জানান যে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কারণেই সু কি চুপ ছিলেন। বরং কিছু ক্ষেত্রে সামরিক শক্তিকে সমর্থন করে তিনি নিজের বিপদ বাড়িয়েছেন। তাঁর মতে, এটাই প্রথম ধাপ। আরও অনেক কিছু দেখা বাকি আছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যদিও সু কি সামরিক শক্তিকে সমর্থন জুগিয়েছেন, জেনারেল মিন অং লায়েং-এর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। গত ১ বছর যাবৎ তাদের মধ্যে কোনও কথা হয়নি। এই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ফল ভোগ করছে দেশের সাধারণ মানুষ।

জেনারেল মিন অং লায়েং বহুদিন দেশের শাসক হওয়ার সুবিধে লাভ করেছেন। ২০১৬-তে অবসর নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি নিজের মেয়াদ বাড়িয়ে নেন। সেই অনুযায়ী, এই বছর তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের মতে জেনারেল নিজের শেষবেলায় মোক্ষম চাল দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক স্বার্থ থাকতেই পারে। সু কি কোনওদিন দেশের রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। কিন্তু জেনারেলের সামনে সেই সুযোগ আছে। এই সামরিক বিপ্লবের ফলে জেনারেল প্রায় এক বছর দেশের শাসন ব্যবস্থা সঞ্চালন করবেন। গত সোমবারই (১ ফেব্রুয়ারি) ঘোষণা করা হয়েছে যে, নতুন মন্ত্রিসভা তৈরি করা হবে। এর ফলে সু কি-র নির্বাচনে জেতার আর কোনও মূল্য রইল না।

এই সামরিক বিপ্লব বুঝিয়ে দিল, যে অকথ্য অত্যাচার এবং অজাচার মায়ানমারে বিগত দশকে হয়েছে, তার থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই। একজন সামরিক নেতাকেও সুবিচারের জন্য কোর্টে পেশ করা হয়নি। ব্রিটেনের ইউএনও প্রতিনিধি বারবারা উডওয়ার্ড জানান যে, মঙ্গলবারই ইউএনও-তে মায়ানমারের এই জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবে। সেক্ষেত্রে এই সামরিক বিপ্লবকে নিষিদ্ধও ঘোষণা করার সম্ভাবনা আছে। তিনি জানিয়েছেন যে, ইউএনও-র মূল লক্ষ্যই হল সমস্ত দেশে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা।

ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানিয়েছেন যে, বিগত বছরে মায়ানমারের উন্নতি দেখে আমেরিকা তাদের বিশেষ ছাড় এবং সুবিধা প্রদান করার চেষ্টা করেছিল। যদি সামরিক শাসন প্রত্যাহার না করা হয়, সেক্ষেত্রে আমেরিকা পুনরায় নিজের সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখবে। শোনা যাচ্ছে যে, চিন এই দেশের অনেক নির্মাণে সাহায্য করে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমেরিকা এবং চিনের সম্পর্ক মায়ানমারের কারণে খারাপ হতে পারে।

গত সোম্পবার মায়ানমারের বিভিন্ন জায়গায় এক অদ্ভুত ছবি ধরা পড়ল। সারাদেশের মানুষ এই সামরিক অধিগ্রহণের কারণে বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। এনএলডি-র পতাকা সরিয়ে দিয়েছেন এবং গোপন ভাষায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলছেন। এই অবস্থায় এনএলডি-র স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইস্তফা দিয়েছেন। সন্ধ্যার মধ্যেই এনএলডি-র আইনজ্ঞদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজধানী ন্যাপিডাওতে সু কি-কে ফের গৃহবন্দি করা হয়েছে। ইউ কো কো গি, যিনি ১৭ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন, তাঁর মতে যা প্রয়োজনীয়, তাঁরা তাই করবেন। এখন বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *