‘বিনিসুতোয়’ দেখে ফিরে

পারমিতা দাস

কোভিড বিধি মেনে শহরের প্রেক্ষাগৃহগুলি খুলে গেছে। মানুষও গৃহবন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া। আবার কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠে হলে গিয়ে নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা দেখে ফেলাই যায়। এরকমই সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘বিনিসুতোয়’। আগ্রহীদের জন্য জানিয়ে রাখি নন্দন আর নজরুল তীর্থতে চলছে এই সিনেমা। পরিচালক অতনু ঘোষ। প্রধান ভূমিকায় ঋত্বিক চক্রবর্তী ও জয়া আহসান।

আরও পড়ুন: নতুন ফরম্যাটে প্রয়াসের অ্যাবসার্ড থিয়েটার

এটি একেবারেই অন্য স্বাদের সিনেমা। ঋত্বিক চক্রবর্তীর চরিত্র কাজল সরকার আর জয়া  আহসানের চরিত্রের নাম শ্রাবণী বড়ুয়া। অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের দু’জনের রিয়েলিটির শোয়ের অডিশনে দেখা। শ্রাবণী বড়ুয়া খুব লাজুক, কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত মহিলা। দু’জনের চেহারাতে এবং ঘরের অগোছালো পরিবেশে আর্থিক সংগ্রামের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। কাজল সরকার কিচেন চিমনি কোম্পানির সহকারী ম্যানেজার। একটা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে থাকে। নিজে স্টোব জ্বেলে রান্না করে খায়। শ্রাবণী বড়ুয়া রেলের পাশের একটি এক ঘরের অতি সাধারণ ছোট ঘর নিয়ে থাকে। অডিশনের পরই খুব সহজে দু’জনের পরিচয়, আলাপ, বন্ধুত্ব দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল। এতটাই এগিয়ে গেল যে, বৃষ্টির জলে আটকে লজের একটি ঘরে দু’জনে আশ্রয় নিয়ে নেয়। সাধারণ দর্শকের মনে হবে এ আবার কি এত তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব হয় নাকি? তার ওপর একজনের প্রেমিকা আছে খুব শীঘ্রই বিয়ে আর শ্রাবণী বিবাহিত এবং কন্যাসন্তানের জননী। পরক্ষণেই দর্শকের মনে হতে পারে, সিনেমা কি বাস্তবের সঙ্গে মেলে কখনও?

আরও পড়ুন: আফগানদের মৌলিক অধিকারের কথা বলতে ইনস্টাগ্রামে এলেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, শেয়ার করলেন এক আফগান মেয়ের চিঠি

তারপরেই দর্শক একটা চমক খাবে। এর পরেই দেখা যাবে দু’জনের জীবনযাত্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত একটা চিত্র। এবার দর্শক সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। কারণ এখন তাঁর সামনে শ্রাবণী বড়ুয়া রেলের পাশের এক কামরার ঘরের বউ না। সে এখন চা কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর।  ঝকঝকে অফিসের, চকচকে টেবিলের ওপরে অ্যাপেলের ল্যাপটপ। গায়ে সালোয়ার কামিজের ওপরে দামি অসম সিল্কের দোপাট্টা। এক কথায় এখনকার বুদ্ধিমতী, সাহসী আধুনিক নারী। বিরাট বড় বাংলো বাড়িতে সে থাকে। দামি সেগুন কাঠের অলংকরণে মোড়া বাড়িতে প্রাচুর্য উপছে পড়ছে।  বিবাহিত কিন্তু একাই থাকে সে। অন্যদিকে, নায়ক বহুতল বাড়ি নির্মাণে ব্যস্ত একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বিবাহিত এবং পুত্র সন্তান কাহনের পিতা। বিরাট বড় ফ্ল্যাটে শৌখিনতা ও আর্থিক সুখের ছাপ স্পষ্ট। আগের দিন শ্রাবণী বড়ুয়ার সঙ্গে দেখা হবার ঘটনা বাড়িতে ছেলে, বউ সবার কাছে লুকিয়ে যায়। সুখী পিতা। ছেলেকে নিয়ে লেকে হাঁটতে যায়। ছেলেকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলায় উৎসাহিত করে।

আরও পড়ুন: কাবুল যখন কণ্টকময়: এক সিনেমাওয়ালির আঁখো দেখা হাল

হঠাৎ ফেসবুকের মাধ্যমে কাজল সরকার, শ্রাবণী বড়ুয়ার আসল পরিচয় জানতে পেরে যায়। তাঁর অফিস খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় না। দু’জনেই দু’জনের কাছে এক সত্যিকে স্বীকার করে, যা তাঁদের পরিবারের কেউ জানে না। আপাতদৃষ্টিতে প্রচুর সুখ, তবুও সব পেয়েছির আসর থেকে মাঝেমাঝে পালিয়ে যাবার জন্য গল্পের জগতে ঢুকে পড়ার ইচ্ছা দু’জনেরই। মাঝেমাঝে অন্য চরিত্রের সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রতিদিনকার কঠিন বাস্তব থেকে পালিয়ে যাওয়া। এই গল্প বানাতে বানাতেই দু’জনের দু’জনকে খুঁজে পাওয়া। গল্প বানাতে বানাতে  বাস্তবের সঙ্গে যোগ খুঁজে পাওয়া। ‘বিনিসুতোয়’ তৈরি হয়ে গেল হয়তো অল্প ভালোলাগা। এক সুন্দর অনুভূতি। ‘কোথাও হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ এমন একটা সত্যিকে আবিষ্কার। এক ছাদের তলার এক সুতোয় বাঁধা মানুষগুলি সেই কাহন জানল না।

আরও পড়ুন: স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রিলিজ হলে মরা গাঙে জোয়ার আনতে পারত ‘শেরশাহ’

এই হারিয়ে যাওয়া কি একাকীত্ব থেকে পালানো, নাকি কঠিন বাস্তব থেকে ছুটি নেওয়া মাঝেমাঝে, নাকি অন্য চরিত্রে নিজেকে বসিয়ে নেবার খামখেয়ালিপনা নাকি নিজের বিলাসবহুল শৌখিন দুনিয়া ছেড়ে মাঝেমাঝে বেরিয়ে গিয়ে জীবনকে জানার কৌতূহল? গল্প আর বাস্তব কি সত্যি মিলে গেল নাকি তারা কখনও মিলতে পারে না। নাকি কাহনের মতো মানুষরা এমন গল্প বানিয়ে যাবে আর সমান্তরালে চলবে সুখ-দুঃখে মেশানো বাস্তব? এই প্রশ্নগুলি দর্শকের মনে উঁকি দেবে সমানে।

সবমিলিয়ে নিঃসন্দেহে এক অন্য স্বাদের ভালো লাগা তৈরি করে নিয়েছে অতনু ঘোষের পরিচালনায় আর ঋত্বিক চক্রবর্তী ও জয়া আহসানের আকর্ষণীয় ও দক্ষ অভিনয়ে তৈরি ‘বিনিসুতোয়’।

লেখক সহযোগী অধ্যাপিকা, ইতিহাস বিভাগ, চিত্তরঞ্জন কলেজ, কলকাতা

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • Oshadharon review. Khub bhalo laaglo pore. Odhyapok Paramita Das ke oshonkhyo dhonyobad.

  • Review lekhatao je ekta art, seta Adhyapika Paromita Das er bhshay ujjwal bhave poriskar. Sob surprise guloke okshoto rekhe, koyek line e, puro muchmuche story telling… er jonyo bishesh munsiyanar proyojon. Ami poster dekhe prothome khub ekta utsahito chilam na, but after this review… I positively view this movie.
    My well wishes to Adhyapika Paromita Das to appear as leading film critic in near future.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *